
ঈশ্বরই ধ্রুবক(পর্ব ১8)
আমাদের মানসজমিন তখন সম্ভাব্য বিস্ফোরণের প্রহর গুনছে… স্বপ্ন, আত্মা, পরলোক, পুনর্জন্ম – অলীক এবং অস্পৃশ্য এইসব ধারণা সেই সম্ভাবনায় ইন্ধন যোগাচ্ছিল বেশ কিছুকাল ধরেই!
আগের কয়েকটি পর্বে বিদগ্ধ পাঠককুলের সামনে এই সামান্য লেখকের প্রচেষ্টা ছিল – আত্মা নামক আশ্চর্য ধারণাটি কীভাবে মানুষের মধ্যে সৃষ্টি হল, তার নিতান্তই সরলীকৃত এক চিত্র পেশ করার। একথা অনস্বীকার্য যে সেই চিত্র যতটা সরলরৈখিক হিসাবে পরিবেশিত হয়েছে, বাস্তবে তা ছিল অনেক বেশি সময়সাপেক্ষ এবং বহুস্তরীয়। কিন্তু সেই বহুস্তরের খোঁজ পাওয়া আজকের যুগে দাঁড়িয়ে যথেষ্ট কঠিন। তার একমাত্র কারণ, মানুষের সেই বৌদ্ধিক বিবর্তনের পক্ষে খুব বেশি নৃতাত্ত্বিক প্রমাণ মেলে না। যেটুকুও বা মেলে, তা থেকে সেই যুগের বস্তুনির্ভর জীবনের আভাস হয়তো মেলে, কিন্তু মানসিক উত্তরণের খুব বেশি প্রত্যক্ষ্য ধারণা সেখান থেকে পাওয়া যায় না। ফলতঃ, সেই উত্তরণের খোঁজ পেতে অনুমানের শরণাপন্ন হতে হয়, পরোক্ষ সংযোগের উপর জোর দিতে হয় এবং সমকালীন আদিবাসী গোষ্ঠী, যাদের উপরে এখনো আধুনিকতার ছায়াপাত ঘটেনি, তাদের উপর নির্ভর করতে হয়। ভুয়োদর্শী নৃতত্ত্ববিদদের অনুমান নির্ভর নানান মতের মধ্যে একটি যোগসূত্র নির্মাণেরই প্রচেষ্টা ছিল গত কয়েকটি পর্বে। ধারণার উৎস সন্ধান করতে গিয়ে কোথাও কোথাও হয়তো অতি-সরলীকরণ ঘটেছে। নানান মতবাদকে বিনিসুতোর মালায় গাঁথতে গিয়ে হয়তো নানান কাল্পনিক সংলাপের আড়াল নিতে হয়েছে। তবে যা কিছুই করা হয়েছে, তা ধারাবাহিকটির মূল প্রতিপাদ্য অক্ষুণ্ণ রাখতে গিয়েই করা হয়েছে। এ বিষয়ে নানান তাত্ত্বিক আলোচনা হয়তো লেখাটির কলেবর বাড়াতে সাহায্য করতো, কিন্তু তা করলে বোধহয় মূল বক্তব্য থেকে বিচ্যুত হবার উপক্রম হতে পারতো। অবশ্য, রসিক পাঠক এই সাফাইকে লেখকের স্বল্পজ্ঞানের ফসল বলে ধরে নিতেই পারেন! আসলে, এই লেখার অন্যতম উদ্দেশ্য – মানুষের ঈশ্বর কল্পনার মূল কারণটি অনুসন্ধান করা। সরেস গোয়েন্দা গল্পের অনুরাগীরা বুঝবেন, আসলে অনুসন্ধান মানে হল অজানা জট ছাড়ানো, সেখানে থেকে অচেনা সূত্র খোঁজা, সেইসব সূত্রের মধ্যে যেগুলো বর্তমান অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে সম্পর্কহীন – সেগুলিকে বর্জন করে বাকি সূত্রগুলির মধ্যে সংযোগ অনুমান করা এবং সেখানে থেকে কার্য-কারণের সম্ভাব্য সম্পর্ক স্থাপন করা। এক্ষেত্রেও সেই একই পথ অনুসরণ করার চেষ্টা করা হয়েছে। অনুমান করার চেষ্টা করা হয়েছে, কীভাবে বা কোন সম্ভাব্য পথে ঈশ্বর নামক দুরূহ অথচ প্রয়োজনীয় ধারণাটি মানবজাতির ইতিহাসে প্রাসঙ্গিক রূপ ধারণ করে। সেই অনুমান করতে গিয়ে অনেক সময় কাল্পনিক যোগসূত্র স্থাপন করতে হয়েছে। অবশ্য সে’টুকু স্বাধীনতা যেকোনো সত্যান্বেষীরই প্রাপ্য, শুধু তা খুব বেশি গাঁজাখুরি না হলেই হল!
আধুনিক ঈশ্বর ভাবনার নির্মাণ একটি বহুমাত্রিক এবং বহুস্তরীয় প্রসঙ্গ। সেই জটিল নির্মাণ ভাবনার বুনিয়াদি স্তরটুকুতেই পৌঁছনো গেছে এ যাবৎ। সেই মৌলিক স্তরে দেখা যাচ্ছে – আসলে জিজ্ঞাসা, কৌতূহলই এগুলোই বরাবর মানুষকে পরিচালিত করেছে নতুন ভাবনার পথে। সেই আনকোরা পথ সে নিজে খুঁজেছে এবং চলাচলযোগ্য বানাবার চেষ্টা করেছে। কখনো সেই পথে চলতে চলতেই আবার নতুন পথের সন্ধান পেয়েছে। এই ভাবে যুগ যুগ ধরে এক পথ অযুত পথে রূপান্তরিত হয়েছে। সামান্য স্বপ্ন দেখতে দেখতে কৌতূহলী মানুষ যখন আত্মার সংজ্ঞা উদ্ভাবন করেছিল, সে কল্পনাও করতে পারেনি যে তা কালক্রমে ধর্ম নামক এমন সর্বব্যাপী প্রতিষ্ঠানে, ঈশ্বর নামক এমন নির্বিকল্প ধারণায় বদলে যাবে! আত্মার সেই ধারণা থেকেই ধীরে ধীরে সর্বপ্রাণবাদ বা অ্যানিমিস্ম-র উদ্ভব। সেই ধারণা-স্রোত এরপর এসে মেশে পরলোক ভাবনা তথা জন্মান্তরবাদের দিকে যেখানে মানুষের ইহকাল ভাবনা হঠাৎ-ই পরলোক ভাবনার দিকে বাঁক বদল করে। সেই নতুন ভাবনা-প্রবাহ ক্রমাগত তাকে নিয়ে যায় প্রকৃতির নিভৃত কোল থেকে দূরে, আরো দূরে এক অজানা গন্তব্যের দিকে এবং শেষমেশ সেই স্রোতের উজান বেয়ে ভাসতে ভাসতে, মানুষ এসে পৌঁছায় সভ্যতা-সিন্ধুর মোহনায়…

মানুষ তখনো তাদের পরজীবী পরিচয়টি মুছে ফেলতে পারেনি। নানান প্রকৌশল অর্থাৎ টেকনিক যদিও সে ততদিনে করায়ত্ত করেছিল, তবুও খাদ্যের জন্য তাকে নির্ভর করতে হত আঞ্চলিক প্রাণী বা ফলমূলের উপর। নানান প্রকৌশল আবিষ্কারের মাধ্যমে সে খাদ্যের বিষয়ে কিছুটা স্বনির্ভর হবার চেষ্টা চালাচ্ছিল বটে, কিন্তু তা ফলপ্রসূ হতে ছিল ঢের দেরি। আসলে আদিম সেসব প্রকৌশলগুলোর ক্ষেত্রে গোড়ায় একটু গলদ ছিল। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে প্রকৌশলের পিছনে কার্যকারণ সম্পর্কটির থেকে তার ফলাফলটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল; ‘কীভাবে হচ্ছে?’-র বদলে ‘হলে কী উপকার হবে?’ – এই প্রশ্ন বা বোধ থেকেই এই প্রকৌশল বা টেকনিকগুলির গোড়াপত্তন হত। ফলতঃ সেখানে যুক্তির ঘাটতি স্বাভাবিক নিয়মেই সবসময় কাঙ্ক্ষিত ফল দিত না এবং অনেক সময়ই বিভিন্ন কারণে প্রয়োজনীয় রসদে ঘাটতি পড়তো। অধিক শিকারের ফলে সেই স্থানের প্রাণীদের সংখ্যা কখনোসখনো খুব বেশি কমে যেত, ফলে সেই প্রাণীর শিকারের সম্ভাবনাও কমে যেত। আবার আবহাওয়া বা জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য গাছ থেকে প্রাপ্ত ফলমূলের যোগানও কম বেশি হত। মোটের উপর, তৎকালীন প্রকৌশল সেই সম্ভাবনার ঘাটতি সর্বদা মেটাতে পারতো না। এখন খাদ্য হল এমন একটি চাহিদা, যাকে খুব বেশি হেলাফেলা করা যায় না; গোষ্ঠীর সবার জীবন-মরণ নির্ভর করে এর উপরে। ততদিনে মানুষ অলৌকিকতার স্বাদ পেয়ে গেছে। ফলে প্রকৌশল যখন অনিশ্চিত প্রকৃতির মেজাজের সাথে খাপ খাওয়াতে পারলো না, তখন এই দুইয়ের মধ্যে সামঞ্জস্য বিধানের জন্য সে অলৌকিক, কল্পনাপ্রসূত এক ঘুরপথের আশ্রয় নিল। সেই পথ আসলে ছিল বিভ্রান্তিকর, অলীক; সেই পথ ছিল মায়াবী, বিভ্রমসৃষ্টিকারী; সেই পথ ছিল অপব্যাখ্যা-নির্ভর, দুর্বোধ্য – সেই পথ ছিল ‘জাদু’, ‘টোনা’, ‘তুকতাক’ নির্ভর। বস্তুবাদী সমাধানের বদলে মায়াবাদী সে সমাধান-পথেই মানবজাতির পদস্খলনের শুরু…
মানুষের স্নায়ুতন্ত্র ততদিনে পর্যাপ্ত মাত্রায় পরিণত এবং সংবেদনশীল। দেহের বাইরে হোক বা ভিতরে, যে কোনো পরিবর্তনের প্রতি সে সজাগ। পারিপার্শ্বিক অথবা আভ্যন্তরীন উদ্দীপনাজনিত যেকোনো স্নায়বিক প্রতিক্রিয়া এখন শুধু মানুষের শরীরের উপর প্রভাব ফেলে না, সে প্রতিক্রিয়ায় তার মনও সাড়া দেয়। মানুষের শরীর আর মন এক সুরে বাজতে শুরু করেছে, পরস্পরের প্রতিপূরক হতে শুরু করেছে। আর তার ফলে যে আবহ নির্মিত হয়েছে, তার নামই আবেগ। মানুষ ক্রমশঃ আবেগ নির্ভর হয়ে উঠেছে। অবশ্য সে আবেগে যে একমাত্র মানুষেরই একচেটিয়া দখলদারি ছিল, এমনটা নয়। আর পাঁচটা প্রাণীদের মধ্যেও সে আবেগ নির্ভরতা ছিল। অজানা কোনোকিছু দেখলে পরে তাদের মধ্যে ভয়ের আবেগ কাজ করতো, ফলত হৃদস্পন্দন বাড়তো। আবার প্রেয়সীকে দেখলেও তাদের হৃদস্পন্দন বাড়তো, কিন্তু এবারে তাদের মধ্যে প্রেমের আবেগ কাজ করতো… এই ভাবেই শরীর আর মনকে একসাথে নিয়ন্ত্রণ করার কাজটি করতো আবেগ।
আবেগের সাথে সাথে, মানুষের মস্তিষ্কে স্মৃতির আমানতও ক্রমশ পাল্লা দিয়ে বেড়ে চলছিল, বিভিন্ন ভাবে প্রতিদিন তার অভিজ্ঞতার ঝুলি পুষ্ট হচ্ছিল আরও। মানুষের মস্তিষ্কে প্রতিনিয়ত চলছিল নানান ক্রিয়া-বিক্রিয়া, পরীক্ষা-নিরীক্ষা। অতিরিক্ত বিক্রিয়াশীল মানবমস্তিষ্ক তাই এবার আবেগের সাথে অভিজ্ঞতাকে মেশাতে চাইলো। আবেগ আর অভিজ্ঞতা, এই দুই মৌলের বিক্রিয়ায় মানবমস্তিষ্কের রসায়নাগারে সৃষ্টি হল এক অভূতপূর্ব নতুন যৌগের – অনুভূতি! আবেগকে অন্যমাত্রায় নিয়ে গেল অনুভূতি, যা আরো বেশি পরিশীলিত, সূক্ষ্ম এবং আন্তরিক। যে আবেগ ছিল মন আর দেহের সংযোজক, অনুভূতি সেই সংযোজনকেই প্রসারিত করল চেতনার স্তরে। তুরীয় সে অনুভূতির আবেশে মানুষ উড়ান দিল নতুন এক আকাশে, পরিচিত হল মননের এমন এক সাতরঙা রামধনুর সাথে, যেখানে একই আবেগ একই মানুষের কাছে সময়ের ফেরে ভিন্ন ভিন্ন অনুভূতির বর্ণচ্ছটা তৈরি করে; আবার একই আবেগ একই সময়ে ভিন্ন ভিন্ন মানুষের কাছে ভিন্ন ভিন্ন অনুভূতির বর্ণালী বিস্তার করে! সমকালীন পাঠক হয়তো বুঝতে পারবেন আবেগ আর অনুভূতির সামান্য পার্থক্য – প্রশাসনের মার, লাঠি সকলের কাছেই ব্যাথাদায়ক, ভয়ের; তা সত্ত্বেও কেউকেউ সেই প্রাথমিক আবেগকে অগ্রাহ্য করে, কোথা থেকে যেন সাহস, আদর্শের মত কিছু বেয়াদব অনুভূতির উপর ভরসা করে দিন বদলের স্বপ্ন দেখেন! একই আবেগ আলাদা অনুভূতিকে উস্কে দিল এক্ষেত্রে। এই অনুভূতির বিষয়টি নিয়ে যবে থেকে মানুষ সচেতন হল, তবে থেকে তার প্রহেলিকায় মানুষ চিরতরে আটকা পড়ে গেল; এবং যুগ যুগ ধরে কিছু মানুষ বাকি মানুষের অনুভূতিগুলিকে কৌশলে নিয়ন্ত্রণ করার উদ্দেশ্যে ফেঁদে বসল – সহানুভূতিশীল মায়াজাদুর এক জমজমাট পসার, যা কিনা, বর্তমান সময়েও রমরমিয়ে চলছে…
আদিলগ্ন থেকেই জাদুবিদ্যা যারা চর্চা করতেন, তারা সেই জাদুর পেছনে কোনো যুক্তির প্রয়োজন আছে বলে মনে করতেন না। যে কোনো মনগড়া তত্ত্ব খাড়া করবার জন্য নেহাতই কিছু সমাপতনকে তারা যথেষ্ট বলে মনে করতেন। এবং সেই তত্ত্বটিকে চারিয়ে দেবার জন্য তারা হাতিয়ার করতেন মানুষের অনুভূতিকে। তাই মায়াজাদু মূলতঃ সহানুভূতিধর্মী (Sympathetic Magic)। বিখ্যাত নৃতত্ত্ববিদ ফ্রেজার তাঁর ‘দ্য গোল্ডেন বাও’ বইটিতে এই বিষয়ে বিশদে আলোকপাত করেছিলেন। তাঁর চেনানো আলোয় যদি দেখতে শেখা যায়, তাহলে দেখা যাবে – সেই মায়াজাদুর অন্তর্লীন ভাবধারাটি আজও মানুষের প্রতিটি চিন্তায়, প্রতিটি কাজে কোনো না কোনোভাবে ফল্গুধারার মতই বহমান!
প্রকৌশল বা টেকনিক আসলে মানুষের প্রকৃতি থেকেই শেখা। আদিম সেই প্রকৌশলের মধ্যে তাই জটিলতার আভাস তেমন পাওয়া যায় না। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে গোষ্ঠীর সদস্যদের মধ্যে সেই প্রকৌশলের পরম্পরা অব্যাহত থাকতো। এখন কোনো একটি স্থানে দীর্ঘদিন ধরে থাকতে থাকতে প্রকৃতি তার স্বাভাবিক নিয়মেই সেই গোষ্ঠীর সামনে কিছু সংকট মুহূর্তের জন্ম দিল। হতে পারে সেই সংকট – খাদ্যের চাহিদা এবং যোগানের মধ্যে অসমতা, অথবা অন্য কোনো প্রাকৃতিক কারণে অস্তিত্বের বিপন্নতা। সেই টানাপোড়েনের মূহুর্তে প্রচলিত প্রকৌশলকে আরো বেশি শানিত করা, আরো বেশি ভরসাযোগ্য করা প্রয়োজনীয় হয়ে পড়েছিল। কিন্তু তখনো অবধি গোষ্ঠীসদস্যদের হাতের কাছে যেসব বস্তুসামগ্রী ছিল, তার মোটামুটি সদ্ব্যবহার তারা শিখে গিয়েছিল। তাই বস্তুগত ভাবে সমাধানের কোনো রাস্তা তাদের কাছে আর খোলা ছিল না। ততদিনে গোষ্ঠীসদস্যরা অলৌকিকতার প্রাথমিক সহজপাঠে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছিল। এতদিন নানান প্রশ্নের উত্তর খোঁজার জন্য তারা যেসব অলীক ধারণা উদ্ভাবন করেছিল – আত্মা, পরলোক, পরজন্ম; এবার সেই ধারণাগুলিকেই তারা তাদের মুস্কিল আসানের জন্য প্রয়োগ করার কথা ভাবলো! তাদের উর্বর মস্তিষ্কে ততদিনে অ্যানিমিস্ম বা সর্বপ্রাণবাদ অর্থাৎ সবকিছুর মধ্যে প্রাণ আছে, তা মোটামুটি শিকড় বিছিয়ে ফেলেছিল। আত্মা এবং তার অনুসারী ভাবনার সাহায্যে সবকিছুকে একটা সূত্রে গেঁথে ফেলার প্রচেষ্টা চালালো গোষ্ঠীগুলো… প্রচলিত প্রকৌশলের খামতিকে ঢেকে দেবার জন্য তারা তাদের নব অর্জিত অলৌকিক ধারণাকে কাজে লাগানোর দিকে ঝুঁকলো। সেই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে, পরিবেশ পরিস্থিতি বিচার করে, এছাড়া তাদের কাছে আর কোনো উপায় ছিল না।

গোষ্ঠী যে এলাকায় বাস করতো, সেই স্থানের বিভিন্ন জীব, মূলতঃ প্রাণীদের কিছু বিশেষ ক্ষমতার দিকে তাদের দৃষ্টি আকর্ষিত হল। যেমন বাজপাখী বা বাঘের ক্ষিপ্রতা, কচ্ছপের সহনশীলতা, সজারুর আত্মরক্ষার ক্ষমতা, বন্যমহিষ অথবা বন্যশূকরের ভরবেগ, সিংহ, হাতি কিম্বা গন্ডারের শক্তি, নেকড়েদের দলবদ্ধ শিকারের কৌশল, ভাল্লুকের টিকে থাকার পন্থা, সাপের মত আড়াল থেকে শিকার ধরার ক্ষমতা, দাঁড়কাকের বুদ্ধিমত্তা ইত্যাদি। এইসব গুণগুলি তারা নিজেদের প্রকৌশলের মধ্যে ধারণ করতে চাইল। সেই লক্ষ্যে প্রতিটি গোষ্ঠী নিজেদের চাহিদা অনুযায়ী একেকটি প্রানীকে বেছে নিল। এবার সেই প্রাণীটির বাঞ্ছিত গুণটিকে নিজেদের মধ্যে আয়ত্ত করার জন্য তারা আরেকটি অদ্ভুত প্রস্তাবে সহমত হল – তাদের ধারণা হল, পৃথিবীর আদিলগ্নে এই প্রাণীটির থেকেই তাদের গোষ্ঠীর শুরুয়াত। এবং পরলোক থেকে এই প্রাণীর আদিতম আত্মা অভিভাবকবৎ তাদের এখনো পরিচালনা করছে এবং আত্মা যেহেতু বহমান, তাই পুনর্জন্মের মাধ্যমে তাদের মধ্যেও সেই প্রাণীটির বিশেষ গুণাবলীটি প্রচ্ছন্নভাবে সঞ্চিত। এখন সেই প্রচ্ছন্ন গুণকে প্রকট করার জন্য, তাকে কার্যক্ষেত্রে ব্যবহারের জন্য গোষ্ঠীসদস্যরা কিছু বিশেষ বিশেষ অবশ্যপালনীয় কর্তব্যকে চিহ্নিত করলো। এই যে একটি নির্দিষ্ট প্রাণীর সাথে গোষ্ঠীসদস্যদের একধরণের আত্মীয়তার সম্পর্ক তৈরি হল, যাকে মানুষ তাদের পূর্বপুরুষ হিসাবে চিহ্নিত করল এবং ক্রমে ক্রমে সেই প্রাণীটি তার আরাধ্যে পরিণত হল, এই বন্দোবস্তের নামই হল ‘টোটেম’, যে শব্দটির উৎপত্তি ওজিবওয়ে (Ojibwe) নামক উত্তর আমেরিকার এক আদিম জনগোষ্ঠী থেকে।
ধর্ম, অর্থ ধারণ করা – মানুষকে, তার অস্তিত্বকে। সমকাল যাপন যখন ধর্মের অবিশ্বাস্য উন্মাদনায় নাভিশ্বাস তুলছে, তখন সেই ধর্মের আকর বিন্দুতে যদি একান্তই পৌঁছতে হয়, তাহলে সেখানে খুঁজে পাওয়া যাবে এই ‘টোটেমিস্ম’ (Totemism ) নামক প্রত্নতত্ত্বটি। টোটেমিস্ম-ই মানুষকে প্রথম শেখায় কী কী করণীয়, কী কী বর্জনীয়। যদিও সেই আচার-বিচারের ফর্দ-তালিকা একদিনে তৈরি হয়নি, যুগের পর যুগ ধরে মানুষ তা নির্মাণ করেছে এবং অত্যন্ত্য সচেতনভাবে তার নিজের পায়ে সেই সংস্কারের বেড়ি চাপিয়েছে। অন্যান্য প্রাণীকুল যখন স্বাধীন-স্বেচ্ছাচারী, নিজেদের সহজাত প্রবৃত্তি দ্বারা পরিচালিত, সেখানে মানুষ আশ্চর্যজনকভাবে নিজেদের আদিম মানবিক প্রবৃত্তিগুলিকে অবদমনের মাধ্যমেই নিজেদের জন্য কৃত্রিম এক মুক্তির অনুভূতি বুনেছে এবং এখনো বুনে চলেছে! এ এক অদ্ভুত রহস্য মানব সভ্যতার, যেখানে মানুষ নিজের স্বাধীন চিন্তা, স্বাধীন জীবন ধারণের ইচ্ছেগুলোকে সভ্যতার সুদৃশ্য অলিন্দে, সংস্কারের কারুকার্য খচিত খাঁচায় বন্দী হতে দেখে, পরমানন্দে পরিতৃপ্তির ঢেকুর তোলে!
একদিকে যখন টোটেমিস্ম নিজের মুঠো মজবুত করছিল, তখন তাকে কেন্দ্র করে আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ বিবর্তনের সম্ভাবনা দানা বাঁধছিল। যে কোনো প্রাণীদের মধ্যেই ভাষার ব্যবহার আছে, সে ভাষা আসলে একধরণের কন্ঠস্বর প্রয়োগ, যার মাধ্যমে সে তার যৌনকামনা, ক্রোধ বা ভয়কে ব্যক্ত করতে চায়। মানুষের ক্ষেত্রেও তার ব্যত্যয় ছিল না। কিন্তু টোটেম চিহ্নিতকরণের জন্য শুধুমাত্র একটি প্রাণীকে চিহ্নিতকরণই জরুরী ছিল না, তার সাথে সাথে সেই প্রাণীটি বিষয়ে নিজ গোষ্ঠী সদস্যের প্রত্যেককে সন্দেহাতীতভাবে অবহিত করাও প্রয়োজনীয় ছিল। নচেৎ, সেই উদ্দিষ্ট্য প্রাণীটিকে আরাধ্য হিসাবে কীভাবেই বা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে প্রবাহিত করা সম্ভব। তাছাড়াও, যেহেতু প্রতিটি গোষ্ঠীর নিজস্ব আলাদা আলাদা টোটেম ছিল, তাই অন্য গোষ্ঠীর কাছেও আপন আপন টোটেমের পরিচয় দেওয়াও আবশ্যিক হয়ে পড়ল, নতুবা নিজ নিজ গোষ্ঠীর স্বকীয়তা প্রমাণ ‘হবে কেমনে’! তাই এক্ষেত্রে এমন একটি বন্দোবস্তের প্রয়োজন হল, যা সন্দেহাতীতভাবে প্রত্যেকের কাছে একই ব্যঞ্জনা, একই পরিচিতি, একই অভিব্যক্তিকে নির্দেশ করবে। এভাবেই ভাষাকে সুশৃঙ্খল করার উপযোগিতা মানুষ প্রথম অনুভব করল। মজার বিষয় হল, যে প্রকৌশলকে টেকসই করার জন্য টোটেম সৃষ্টি এবং পর্যায়ক্রমে সেই টোটেমকে মজবুত বানানোর জন্য যে ভাষার উৎপত্তি, সেই ভাষাই শেষ অবধি নানান ঘাত-প্রতিঘাত, বাঁকবদল সত্ত্বেও, নিজের সমস্ত বৈচিত্র নিয়ে টিকে গেল; অথচ প্রকৌশল যুগে যুগে, কালে কালে, বছরে বছরে, মাসে মাসে, দিনে দিনে বদলাতে থাকলো!
সমান্তরালে আরো একটি বিকাশের ধারাও ডানা মেলছিল। টোটেম প্রণীত প্রাণীটি আরাধ্য। কিন্তু আরাধনার জন্য শুধু ভাষা একমাত্র চাহিদা নয়, ভাষা বা শব্দের সাহায্যে একটা দৃশ্যকল্প হয়তো তৈরি হতে পারে, কিন্তু সেই বিমূর্ততা – আরাধনার জন্য যথেষ্ট নয়। যদিও প্রাণীটি আরাধ্য, কিন্তু সে কথা তো আর বাস্তবে সেই বিশেষ প্রাণীটির জানা থাকার কথা ছিল না! তাই তাকে আরাধনা করা হবে বলে ভুলিয়ে ভালিয়ে আরাধনাস্থলে বা গোষ্ঠী সম্মুখে নিয়ে আসাও ছিল অসম্ভব, হয়তো বা অবাস্তবও বটে! কিন্তু মানুষ দমে যাওয়ার নয়। যে ততদিনে তার কৌতুহল নিবৃত্তির জন্য আত্মার মত এক অবিশ্বাস্য ভাবনার আমদানি ঘটিয়ে ফেলেছে, তার কাছে এই সামান্য ঘাটতি আর কী এমন দুর্লঙ্ঘ্য ব্যাপার। অতএব সে আয়োজন করল প্রতীকের, যা সেই আরাধ্যকে তার সকল বৈশিষ্ট্যসহ প্রকাশ করবে!
প্রাথমিক সেই প্রতীক ছিল সরল, অনাড়ম্বর। সে প্রতীক হতে পারে কোনো বিশেষ পাথর, যার মধ্যে হয়তো কোনোভাবে সেই আরাধ্য প্রাণীটির আদল দেখতে পাওয়া যায়। হতে পারে, তা কোনো গাছ যার শাখায় কোনোকালে সেই আরাধ্য প্রাণীটি দেখা মিলেছিল। হতে পারে, সেই প্রতীক কোনো আনকোরা হাতে খোদাই পাথর বা গাছের ডাল, অথবা গুহার দেওয়ালে আঁচড়। হতে পারে, সেই প্রতীক আরাধ্য প্রাণীটির কোনো দেহাবশেষ। যাই হোক না কেন, গোষ্ঠী সদস্যরা কিন্তু নির্বিরোধে সেই বিকল্প প্রতীকটিকে মেনে নিল এবং নিজেদের সকল কিছু সেই প্রতীকের কাছে সমর্পণ করল। প্রতীক নির্ভর সমর্পণের সেই ধারা কিন্তু আজও অব্যাহত…
তবে প্রশ্ন অন্য জায়গায়… কেন এই প্রতীক নির্ভরতা মানুষকে প্রভাবিত করল? নৃতাত্ত্বিকদের মতে, বিশেষতঃ ফ্রেজারের মতে, এর পেছনে ছিল সেই সহানুভূতিধর্মী মায়াজাদু, যা মানুষের অনুভূতির সূক্ষ্ম তন্ত্রীতে আঘাত করতে পেরেছিল এবং দু’ধরণের সুরধারা সৃষ্টি করেছিল। একটি, সাদৃশ্যভিত্তিক মায়াজাদু এবং অন্যটি স্পর্শভিত্তিক মায়াজাদু।
সাদৃশ্য অর্থাৎ আরাধ্যের সাথে যদি কোনো শিলাখন্ডের মিল পাওয়া যায় বা তার মত করে যদি কোনো চিত্র আঁকা হয়, তাহলে মানুষের কল্পনায় সেই প্রতীক হয়ে উঠলো আরাধ্যের সমতুল। সেক্ষেত্রে বিনা বাক্যব্যয়ে মানুষ সেই প্রতীকটির মধ্যে যাবতীয় ইপ্সিত গুণাবলী আরোপ করে দিল এবং নিজেকে নির্দ্বিধায় তার পদতলে সমর্পণ করে দিল। শুধুমাত্র কল্পিত সাদৃশ্যই এক্ষেত্রে তার ওপর মায়াবিস্তারে সমর্থ হল। অন্যদিকে, স্পর্শ অর্থাৎ যদি আরাধ্যের স্পর্শ কোনোকিছুর মধ্যে থেকে থাকে, হতে পারে সে কোনো গাছের ডাল, বা নখ, বা পালক বা দাঁত, তার মধ্যেও মানুষ তার অভীষ্টের সমস্ত গুণাবলী একইভাবে আরোপ করলো এবং তার আরাধনায় নিজেকে নিয়োজিত করলো। অতএব, উভয়ক্ষেত্রেই সে অনুভূতির এমন এক মায়াবী স্তরে বিচরণ করতে শুরু করল, যেখানে অসম্ভবের ছন্দে সে দিগ্বিদিক জ্ঞান হারিয়ে একপ্রকার মোহগ্রস্ত হয়ে পড়ল! অবশ্য, তলিয়ে দেখলে রসিক পাঠক বুঝতে পারবেন, বর্তমান সমাজের প্রায় সব আচার-বিচার-সংস্কার, বিধি-নিষেধ, এই দুই ধরণের মায়াজাদু – সাদৃশ্যভিত্তিক এবং স্পর্শভিত্তিক, এদের দ্বারাই নিয়ন্ত্রিত… আর বলা বাহুল্য, এই নিয়ন্ত্রনের যারা নিয়ন্তা, তারাই আপামর জনগনমনের নিয়ন্ত্রক… আদিম টোটেমীয় গোষ্ঠীসমাজে তারা পুরোহিত হিসাবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছিল এবং সুকৌশলে গোষ্ঠীসমাজের দন্ডমুন্ডের কর্তা হিসাবে, নিজের নিরঙ্কুশ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছিল… সেই নিয়ে আরো আলোচনা থাকবে আগামী পর্বে।
আপাতত সকলকে বিজয়ার প্রীতি শুভেচ্ছা, অগ্রজদের প্রণাম, বয়স্য ও অনুজদের সাথে কোলাকুলি…
অলমিতি।

