
শেষে দিল রা -উনিশ

বাড়ির একতলাতেই পার্টির অফিস।
সন্ধের পর সেখানেই সময় চলে যায় রতন গোস্বামীর।
উঠতে উঠতেই দশটা সাড়ে দশটা।
ছেলেটা দূরে। মেয়েটার বিয়ে দিয়েছেন বছর দুয়েক হ’ল।
ভি আর এস নেওয়ার পর আর নতুন কোথাও জুড়তে মন চায়নি রতনবাবু র।
কমবয়েস থেকেই ওই পার্টি, এখন তো ওটাই একমাত্র কাজ। জেলার মিটিং পড়লে যেতেই হয়।
ফাঁকা বাড়িতে ভূতের মতন মাধুরী বসে থাকে।
সিরিয়াল দ্যাখে, আসন সেলাই করে।
অথচ রতনবাবু কে কখনই কোনও কথা শোনায় নি সে।
অভ্যাস হয়ে গেছিল গোস্বামী বাবুর।
হাজার কাজ তাঁর।
নেতাজী কলোনির বৃষ্টির জমা জল সরেনি সাতদিন।
ঘোষপাড়ার দিকটায় পুকুর বোঁজানো নিয়ে খুব ঝঞ্ঝাট চলছে ক’দিন।
শেখপাড়ায় আবার মসজিদের পেছনের মাঠ নিয়ে ঝামেলা।
রতন বাবুকে ছুটতে হয়, সামনে ভোট।
পার্টির ওপরতলা থেকেও কতরকম নির্দেশ আসে।
সেদিনও নাকেমুখে গুঁজে ঝোলাটা কাঁধের উপর ফেলতে গিয়েও একটু থামেন– ভেতরের ঘরে মাধুরী শুয়ে আছে–
এসময় তো শুয়ে থাকেনা!

কাছে যেতেই ধরমর করে উঠে বসে মাধুরী।
— ঠিকই আছি, তবে কদিন ধরেই বুকে পিঠে কিরকম একটা চাপ হচ্ছে ! অম্বল বোধহয়!
তোমার কি ফিরতে দেরী হবে?
–অ্যান্টাসিড খেয়ে নিও একটু! দেখি যদি পারি একটু জলদি ফিরতে!
পায়ে জুতোজেড়া গলাতে গলাতেই রতনবাবু কথাটা বলেন, না বেরিয়ে উপায় নেই তাঁর।
ফিরতে সেই রাত।
টেবিলে খাবার ঢাকা দেওয়া রয়েছে।
মাধুরী ঘুমোচ্ছে তখনও।

রাত ফুরোনোর আগেই অবশ্য উঠতে হলো রতন গোস্বামীকে।
মেঘ জমছিল ধীরে, খেয়াল করেন নি তিনি।
বজ্রপাত হলো যখন তখন আর সামলানোর সুযোগ ছিল না।
মাসিভ হার্ট অ্যাটাক, ইনফিরিয়র ওয়াল।
কাছের একটা নার্সিংহোমের আই সি ইউ-তে ভোর রাতেই চলে গেল মাধুরী।

হায়দ্রাবাদ থেকে ছেলে এলো, কৃষ্ণনগর থেকে মেয়ে। পার্টির নেতা, বন্ধু, আত্মীয়স্বজন। বাড়ি ভর্তি লোকজনের ভিড়ে চোখের জলটাও ফেলার সুযোগ হলোনা রতন বাবুর।
বাড়ি ফাঁকা হয়ে এলো।
মাস তিনেক কেটেও গেছে।
পার্টির লোকে অনেক বলেছে, যা হওয়ার তো হয়েই গেছে রতনদা, নিচে নেমে বসো একটু, সবার মধ্যে থাকলে মনটা ঠিক হতো!
রতনবাবু নামেননি একদিনও।
ছেলের মাধ্যমেই এলেন একদিন আমার কাছে।
কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন,
ঘরামির ঘর ফুটো হয় জানেন তো ডাক্তারবাবু! আমার হচ্ছে সেই দশা!
আশ্চর্য মানুষ ছিল আমার স্ত্রী,নিজে হাতে মেরে ফেলেছি তাকে! আমার কি বাঁচার রাইট আছে, বলুন?
গভীর অবসাদ, তীব্র অপরাধবোধ।
মেয়ে এসে থাকল কদিন কাছে। ছেলেও।
দিনের পর দিন আসেন তাঁরা।
আশানুরূপ উন্নতি নেই। তবুও তার মধ্যেই একটু আধটু বেরোতে শুরু করেছেন।
একদিন এসে বললেন, বাড়ি থেকে পার্টি অফিসটা সরিয়ে দিলাম ডাক্তারবাবু!
রাগারাগি হলো একটু, তবুও শেষ পর্যন্ত শুনেছে ওরা।
ওই শেষবার।
বেশ কয়েক বছর কেটে গেছে তারপর।
সময়ের নদীতে আরও খানিক জল বয়ে গেছে।
শীতকাল।
সন্ধ্যার দিকে ক্লিনিক থেকে ওঠবার মুখে বছর তিরিশের স্যুটেড বুটেড একটি ছেলে এসে বললে,
আমার বাবা-কে একসময় আপনি দেখেছেন স্যার!
একটু সময় দিলে ঐ বিষয়েই জরুরি প্রশ্ন ছিল একটা!
বসলাম আবার।
কথা বলতে গিয়ে জানলাম, এ সেই রতনবাবুর ছেলে, এখন থাকে কানাডায়।
— কেমন আছেন তোমার বাবা? সুস্থ তো?
জিগ্যেস করি আমি।
— বাবা খুবই খারাপ ছিলেন ডাক্তারবাবু! কোভিডের সময়ে তো সবাই আটকে গেছি আমরা, বেশ দুশ্চিন্তায় ছিলাম বাবাকে নিয়ে। বাবার এক বন্ধু মারা গেলেন। বাবা ঐ দুর্যোগের মধ্যেও ওদের সাহায্য করছিলেন নিয়মিত–
খানিকটা গার্জেনের মতোই হয়ে উঠলেন ফ্যামিলি-টার !
এখন তো কোভিড টোভিড নেই, এবার ফিরে এসে দেখছি বাবা অনেকটাই বেটার!
আমরা একটা ডিসিশন নিয়ে ফেলেছি ডাক্তারবাবু!
দুটো পরিবারের কেউ ই তো এখন দেশেই থাকি না, এঁদের দেখবে কে?
ওঁদের নিজেদের মধ্যে তো বেশ নির্ভরতাই দেখছি !
একটা বিয়ে দিয়ে দিলে কেমন হয়?
— বাবাকে বলেছ কথাটা?
বলি আমি।
— বলেছি স্যার, বাবা রাজি! শুধু বললেন, একবার আপনার পরামর্শ টা নিতে।
ওদিকেও কথা হয়েছে।
আপনি কি একবার ওঁদের সঙ্গে কথা বলবেন ডাক্তারবাবু?
উন্মুখ হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে থাকে রতনবাবুর ছেলে কুন্তল।
আজ সেই দিন।
খানিক আগেই এসেছিলেন ওঁরা। একজন একাত্তর, আরেকজন আটান্ন।
স্পষ্ট করেই কথা হলো। ওঠার সময় রতনবাবু আমার হাতটা জড়িয়ে ধরলেন,
ছেলেটা বড্ড চিন্তা করে আমার জন্য! ওকে খানিকটা শান্তি দিতেই বলতে পারেন…..!
আর কটা দিনই বা বাঁচব ডাক্তার সাহেব? এখন আর…
আকাশ এখনও অংশত লাজুক।
আরোগ্য নিকেতনের জীবন মশাই না হলেও জীবন তো আমিও দেখি রোজ-ই।
অভিনন্দন জানাই ওঁদের।

ঘর ছেঁদা ঘরামিই যখন আবার নিজের সঙ্গে অন্য কারও ঘর জুড়তে লেগেছেন, তখন এটুকুই তো পারি আমরা।
আফটার অল, সব জীবনই তো ভেলক্রোর মতন!

