(পরিণীতা)

পাড়ায় মাত্র কয়েকটা বাড়িতেই সাদাকালো টিভি আছে। অনেকটা দূর থেকে অ্যান্টেনা দেখা যায়। কার বাড়ির অ্যান্টেনা কত উঁচুতে থাকবে সেই নিয়ে বাড়িগুলোর মধ্যে গোপন প্রতিযোগিতা চলে। আমার চিন্তা নেই, টুকাইদের বাড়িতে আরামসে দেখতে পাব। টুকাই আমার বন্ধু। ও পাহাড়ে পড়াশোনা করে। শীতকালে অনেকদিনের জন্য বাড়ি আসে, তখন আমরা কয়েকজন বন্ধু মিলে মজাসে টিভি দেখি। বাংলাদেশ চ্যানেল দেখা যায়। কত অনুষ্ঠান! সব অবশ্য দেখার সময় হয় না। পড়াশোনার পর ছুটি মিললে টুকাইদের বাড়িতে টিভি দেখতে যাই। ইয়া বড় টিভির বাক্স, লম্বাটে বাক্সটায় শাটার সরালে উঁকি দেয় টিভির পর্দা। পর্দাটা টিভির মত অতটা বড় না। শুক্রবার বিকেলে ‘এসো গান শিখি’ অনুষ্ঠানে ফেরদৌসী রহমান গান শেখান। দুটো পুতুল মাথা নাড়ায় আর উনি কী সুন্দর করে হাসিমুখে গান শেখান! বড়রা বলেন উনি নাকি আব্বাসউদ্দীন-এর মেয়ে। বিখ্যাত ভাওইয়া শিল্পী আব্বাসউদ্দীন তো কুচবিহার জেলাতেই থাকতেন। দেশভাগের পরে নাকি বাংলাদেশে চলে যান। আমরা মঞ্চ নাটক দেখি।ধারাবাহিক নাটকও দেখি।

পাড়ার ক্লাবে বড় বড় কাকুরা নাটকের রিহার্সাল দেয়। কয়েকজন দাদাও রিহার্সালে থাকে। সারাবছর নাটকের রিহার্সাল চলতে থাকে। পথনাটকেরও। মায়া টকিজে বাবার সাথে দেখেছি ক্লাবের প্রযোজনায় মঞ্চস্থ ‘জুলিয়াস সিজারের শেষ সাতদিন’, ‘ইতিহাস কথা কয়’, ‘স্পার্টাকাস’— আরও আরও কত কত নাটক। বাংলাদেশের নাটকগুলো কী দারুণ! সংশপ্তক, বহুব্রীহি আরও কত দারুণ নাটক। আসাদুজ্জামান নূর, আবুল হায়াত, সুবর্ণা মুস্তাফা, হুমায়ুন ফরিদি আরও কত কত জন যখন নাটক করেন আমরা হাঁ হয়ে গিলতে থাকি। সন্ধ্যার সময় মগরিব-এর আজান হয়। এই প্রথম আমি আজান শুনলাম। গায় কাঁটা দেয়, গা শিরশির করে ওঠে। ‘আরব্য রজনীর’ কথা মনে পড়ে। রবিবার করে বিকেলে ‘টারজান’ আর শুক্রবার ‘ইনক্রেডিবল হাল্ক’ ধারাবাহিক দেখতে একেকটা বাড়িতে বন্ধুদের ভীড় জমে। ১৯৮২’র স্পেন বিশ্বকাপ ফুটবল নিয়ে বন্ধুদের মধ্যে সে কী উত্তেজনা! ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, ইতালি, জার্মানি, আরও কত দলের ফুটবল খেলা হল। আমার প্রিয় দল ব্রাজিল হেরে গেল ইতালির কাছে। পাউলো রোসির জন্য হেরে গেল। একাই তিনটে গোল করল। মনটা খুব খারাপ হয়ে গেল। ঠাকুর, ও ঠাকুর..ফাইনাল ম্যাচে পশ্চিম জার্মানি যেন ইতালিকে হারিয়ে ব্রাজিলের হারের বদলা নেয়, আমি বাড়ির তুলসী বেদীতে পঞ্চাশবার প্রণাম করব, মিলিয়ে নিও ঠাকুর। সক্রেটিস আমার নায়ক। জিকো, ফ্যালকাও এরাও দারুণ তবে সক্রেটিস হল রাজার রাজা। যিশু খ্রিষ্টের মত দেখতে, কী ফুটবলটাই না খেলে। কোচিং ক্যাম্পে বড়রা সবাই সক্রেটিসকে নকল করে। নকল করলেই হ’ল? অতই সোজা!

অবশেষে কলকাতা দূরদর্শন দেখা যাচ্ছে। টিভির আন্টেনা ঘুরিয়ে একবার বাংলাদেশ একবার কলকাতা— এটাই এখনের নিয়ম। শরৎচন্দ্রের পরিণীতা’ দেখানো হচ্ছে। আমিও দেখতে বসেছি। ললিতা কী দারুণ! আন্নাকালীটাও, শেখরদাকেও ভালই লাগছে। সিনেমা দেখতে দেখতে টেরই পাইনি কখন যে কাঁদতে আরম্ভ করেছি। ললিতার সঙ্গে শেখরদা-র বিয়ে হল না দেখে বুক দুমড়ে উঠছে। ললিতার জন্য একবুক কান্না গলার কাছে দলা পাকিয়ে উঠে আসছে। সিনেমা শেষ হতেই মনকেমন করতে আরম্ভ করল। রাতে পড়তে বসেছি কিন্ত পড়তে পারছি না।

বারেবারে ললিতা-র মুখ, হাসি, কথা চোখের সামনে ভেসে উঠছে। মনে পড়ল, বাড়িতে বড়দের বইয়ের আলমারিতে ‘পরিণীতা’ আছে তো। আলমারি খুলে খুঁজে পেতেই আবার কান্না এল। বইটা বুকে চেপে হুহু করে কাঁদছি। ঘরে টিমটিম করে হলুদ বালব্ জ্বলছে। মনের মধ্যে একটা তোলপাড় চলছে। কেন যে এত কাঁদছি জানি না। লুকিয়ে কাঁদছি আর মনেমনে ভাবছি যদি কেউ দেখে ফেলে, কী হবে তখন!

সহযোগিতার হাত বাড়াতে ওপরের ছবিতে ক্লিক করুন

[লেখকের পূর্ব রচনা]

[ পরম্পরা ওয়েবজিন, সেপ্টেম্বর ২৬, সূচিপত্র – এখানে ক্লিক করুন]

0 0 ভোট
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
পংক্তির ভেতর মন্তব্য
সব মন্তব্য