স্মরণ: অর্ঘ্য সেন

চোখ বুজে তোমারই গান শুনছিলাম
চোখ খুলে দেখি সব ভোঁ ভাঁ
কখন উঠে গেছ তুমি,
চারিদিকে বেবাক শূন্যতা
ঘর নেই, বাড়ি নেই
বসে আছি এক খোলা প্রান্তরে
মাথার ওপরে অযুত নিযুত তারা
যেন আমাকেই পাহারা দিচ্ছে,
যেন কতকালের আত্মীয় সব,
সকলেই আমাকে কিছু বলতে চায়।

কখন উঠে গেছ তুমি বুঝতে পারিনি,
তোমার গান শেষ হয়েছে আগেই,
এখন চরাচর জুড়ে খেলে বেড়াচ্ছে সুর তরঙ্গ।

প্রথমে হেলমেটটা ছুঁড়ে ফেলে দিতে গিয়েও‌ ঝুলিয়ে দিল বাইকের হাতলে,
ঘড়ির দিকে তাকাল একবার,
সেটাকেও খুলে রেখে দিল ডিকিতে,
এইভাবে মানিব্যাগ, মোবাইল,আই কার্ড।
মোবাইলটা কি বেজে উঠল একবার?
কার ফোন? সে একবার তাকিয়েও দেখল না।
সূর্য অস্তে যাবার অন্তিম মুহূর্ত।
নীচে ব্রিজের ছায়া পেরিয়ে যাচ্ছে
খড় বোঝাই নৌকো।
সে দেখল না, সে দেখল না, সে দেখল না।

এ্যাকাডেমিতে খুব জোরে জোরে থার্ড বেল বাজছে।
হরির চায়ের দোকানের সামনের জটলা ক্রমশ পাতলা।

কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই লোকটা নিজেকে ছুঁড়ে দিল ব্রিজের রেলিঙের ওপারে।

বাইকের চাবিটা ঝুলেই রইল।

লোক বাড়ছে, বাড়ি ‌বাড়ছে, লোভ বাড়ছে
তবু রোজ পৃথিবী ছোটো হয়ে যাচ্ছে।

এক বেণি, দু-বেণির মেয়েটা যে লোকটার হাত ধরে ঘুরে বেড়াত প্যান্ডেলে প্যান্ডেলে,
লাল নীল রিবন, আলো আলো পুজোর দিনরাত্রি।
সেই লোকটা কোথায় যে হারিয়ে গেল?

এখন মেয়েটা একাই চোর একাই পুলিশ।

আকাশে আজ মেঘ নেই,
সব জল ওই মেয়েটার চোখে,
আর চোখ জানালার বাইরে দিগন্ত পেরিয়ে —

কত প্রিয়জন, কত চেনামুখ স্রেফ নেই।

বড়োর মতো দেখায়, আসলে আমাদের পৃথিবী
আমাদেরই মতো ছোটো হয়ে যাচ্ছে রোজ।

বারবার সিঁড়ি বেয়ে লাফাতে লাফাতে উঠি।
দরোজা খোলা নেই আজও,
কালও ছিল না ।
পর্দার ফাঁক দিয়ে মনে হয়
নিঃসঙ্গ টেবল ল্যাম্প জ্বলছে ভিতরে।

বন্ড সাহেব,বন্ড সাহেব,
শব্দ খুঁটে খুঁটে, শব্দ খুঁটে খুঁটে,
বড়ো আশা করে এসেছিলাম সন্তানের হাত মুঠোয় নিয়ে ।
ছোঁয়া হল না তোমায়,বন্ড সাহেব ।

সিঁড়ি বেয়ে ধীর মনে নেমে আসি।

ট্রেন ধরতে হবে।

পুরোনো ছবিগুলি ড্রয়ারের খাঁজে,
বাতিল ফাইলের গহনে
মুখ লুকিয়ে থাকে।
শুধু ছবির সমীকরণ বদলে বদলে যায়।
বদলে যেতে যেতে মেঘ জমে অসময়ে,
বৃষ্টি হয় খুব।

মনখারাপের গাছ থেকে
ঝরে পড়ে সাদা ফুল,
রাত্রি জুড়ে ।

সহযোগিতার হাত বাড়াতে ওপরের ছবিতে ক্লিক করুন

[লেখকের পূর্ব রচনা]

[পরম্পরা ওয়েবজিন, অগাস্ট ২৬, সূচিপত্র – এখানে ক্লিক করুন]

0 0 ভোট
Article Rating
2 Comments
Oldest
Newest Most Voted
পংক্তির ভেতর মন্তব্য
সব মন্তব্য
আশিস সরকার
আশিস সরকার
2 months ago

এই লেখা পুনঃমূদ্রন বা পোষ্ট হলো আগেই পড়েছি বেশ ভালো লেগেছে ।পরম্পরার সুযোগে ,অনেকদিন পর আপনার লেখা পড়বার সুযোগ পেলাম ।

Nandita Sinha
Nandita Sinha
2 months ago

অপূর্ব লাগলো দাদা কবিতা গুলো