পাহাড়ে ঘোরার প্রশ্নে বাঙালি মূলত দুই প্রকার। এক দল তিস্তা-তোর্সা দেখে বুক চাপড়ে কবিতা লেখে, অন্য দল তিব্বতি মোমোর দোকানে বসে স্যুপের বাটিতে চামচ ঠোকে। সত্যজিৎ রায়ের ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’ সিনেমাটায় পাহাড়ি সান্যাল আর ছবি বিশ্বাসের ওই মোলাকাতটা আসলে এই দুই প্রজাতির বাঙালির আদিমতম ঠোকাঠুকি।

জগদীশ বাবু অর্থাৎ পাহাড়ি সান্যাল তখন দার্জিলিংয়ের কুয়াশায় চাদর জড়িয়ে একটা বিরল পাখির ছবি দেখে বুক চেপে আদিখ্যেতা করছেন। বিশ্ব চরাচরের সমস্ত মুগ্ধতা তাঁর চোখে। আর তার পাশে বসা ঝানু কর্পোরেট ও বৈষয়িক ইন্টেলেকচুয়াল ইন্দ্রনাথ বাবু মানে ছবি বিশ্বাস। জাস্ট ভাবুন, একজন পরম আবেগে একটা জীবন্ত ওয়ান-পিস সেলুলয়েড মোমেন্ট তৈরি করতে যাচ্ছেন, আর অন্যজন স্রেফ তিনটে শব্দে তাঁর পিঠে চাবুকটা মারলেন:
“রোস্ট হয়?”
“অ্যাঁ?”
“বলি, রোস্ট করে খাওয়া যায়?”
“না, না… দিস বার্ড ইজ…আই টেল ইউ…”
“তাহলে ও পাখিতে আমার কোনো ইন্টারেস্ট নেই।”
এই ‘অ্যাঁ’ শব্দটার মধ্যে যে তীব্র মহাজাগতিক ক্যালকুলেশন লুকিয়ে আছে, তা আজকের ডেটে যেকোনো স্টার্ট-আপের পিচিং সেশনে গেলে টের পাওয়া যায়। আপনি বুক ফালি ফালি করে বলবেন, “দেখুন, আমার আইডিয়াটা সমাজের মানুষের আত্মিক ও নান্দনিক বিকাশ ঘটাবে!” ওপাশ থেকে ল্যাপটপের ওপরে চোখ রেখে ইনভেস্টর জিজ্ঞেস করবে, “সব বুঝলাম, বাট রেভিনিউ মডেলটা কী? মনিটাইজ করা যাবে?” অর্থাৎ, দিনশেষে রোস্ট হবে তো ভাই? নাকি স্রেফ ডানা ঝাপটে হাওয়া খাওয়াবে?
আসলে উপযোগিতাবাদ বা ইউটিলিটারিয়ানিজম জিনিসটা ভারী চমৎকার, যতক্ষণ না সেটা আপনার নিজের শোওয়ার ঘরে এসে সিঁধ কাটছে। ইন্দ্রনাথবাবু খুব অনেস্ট লোক। তিনি কপট ন্যাকামি পছন্দ করেন না। পাখিটার পালকের রং দিয়ে যদি পেট না ভরে, তবে তার জ্যামিতিক সৌন্দর্য দিয়ে ড্রয়িংরুম সাজিয়ে কী লাভ? এই যুক্তিটা যখন আমরা খাসির মাংসের দোকানে দাঁড়িয়ে দিই, তখন আমরা সবাই ক্যাপিট্যালিস্ট। কিন্তু এই যুক্তিটাই যখন আমাদের কোনো পুরনো বন্ধু হোয়াটসঅ্যাপে টেক্সট করে দেয়—যেহেতু আমাদের থেকে আর কোনো জাগতিক সুবিধা বা রেফারেন্স পাওয়ার সম্ভাবনা নেই—তখন আমাদের আঁতাতটা ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। চ্যাটবক্সের ওপারে থাকা মানুষটা তখন আর মানুষ থাকে না, স্রেফ একটা ‘ইউজলেস কন্ট্যাক্ট’ হয়ে যায়। কাজের কাজ না হলে আমরা যেমন অবলীলায় চ্যাট হিস্ট্রি ডিলিট করে দিই, ঠিক তেমনি।
আর বাঙালি যখনই দার্জিলিংয়ের কুয়াশায় এই লাভ-ক্ষতির হিসেব কষতে বসে, তখনই ব্যাকগ্রাউন্ডে গিটার হাতে এন্ট্রি নেন অঞ্জন দত্ত। আমাদের মজ্জায় মজ্জায় যিনি আসলে ‘দার্জিলিং দত্ত’। আমরা যখনই ওখানকার মল বা খাদের ধারের রেলিংয়ে গিয়ে দাঁড়াই, আমাদের অবচেতনে বেজে ওঠে—‘সেই দুষ্টু দু ধ সিড়িংটা / আমার শৈশবের দার্জিলিংটা…’। কিন্তু আজকের দিনে দাঁড়িয়ে ওই ম্যাপে চোখ বোলালে মোচড় দিয়ে ওঠে বুকটা। অঞ্জন দত্তর গানে যে ছবিটা নিঃশ্বাসে আঁকা যেত, সেই ‘হারিয়ে যাওয়া ড্রয়িং খাতা’টা আসলে আর কিছুই নয়—আমাদের হারিয়ে যাওয়া ওই নিষ্পাপ জগদীশ-সুলভ বিস্ময়বোধ। আজ পাহাড় আঁকা আর সোজা নেই বস! এখন পাহাড়ে গিয়ে রিলস বানাতে হয়, ট্রাভেল ভ্লগিংয়ের স্পনসর খুঁজতে হয়। ‘যখন তখন সাদা কুয়াশা’র মধ্যে যে উদাসীন নস্টালজিয়া ছিল, তাকে আমরা ক্যাশ-ইন করে নিয়েছি ইনস্টাগ্রামের গ্রিডে। ঘুম বা সোনাদা পেরিয়ে যে একা বাঁকা রাস্তা ধরে আমরা অনায়াসে পৌঁছে যেতে পারতাম নিজেদের অন্দরমহলে, আজ সেখানে জিপিএস ম্যাপ অন করে শুধু ট্রাফিক জ্যাম মাপি। আর তাই, দিনশেষে আমাদেরও উপলব্ধি হয়—‘খাদে নামতে আজ ভয় করে / নেই যে কেউ আর হাতটাকে ধরার’। হাত ধরার লোক থাকবে কী করে? আমরা তো প্রত্যেকেই একে অপরের হাত ধরার আগে তার নেট-ওর্থ বা ইউটিলিটি ভ্যালু স্ক্রিন করে নিচ্ছি!

আজকের পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি এটাই। আমরা কোনো কিছুর সৌন্দর্য উপভোগ করার আগেই তার ইউটিলিটি ভ্যালু বা বাজারমূল্য মেপে ফেলি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর ‘আমি’ কবিতায় লিখেছিলেন, “আমারই চেতনার রঙে পান্না হল সবুজ, / চুনি উঠল রাঙা হয়ে।” অর্থাৎ মানুষের মুগ্ধতা আর ভালোবাসার চোখ আছে বলেই এই বিশ্বজগৎ এত সুন্দর। আজ আমরা একটা দারুণ সূর্যাস্ত দেখলে, সেই চেতনার রঙে ডুব দেওয়ার আগেই আমাদের হাত নিশপিশ করে ওটার একটা ছবি তুলে সোশ্যাল মিডিয়ায় আপলোড করার জন্য। রিলে ভিউ বা পোস্টে লাইক না এলে ওই গোধূলি আলোর কোনো দাম নেই আমাদের কাছে। যে রিল বা পোস্টে ভিউ আসে না, আজকের প্রজন্ম সেটাকে প্রোফাইল থেকে ডিলিট করে দেয়। যেন ভিউ না পাওয়া অবহেলাটুকুই ওই মুহূর্তটার একমাত্র অপরাধ! ওই লাইক আর ভিউ-ই হলো আজকের যুগের ডিজিটাল রোস্ট। মন দিয়ে একটা গান শোনার ফুরসত নেই, কিন্তু ব্যাকগ্রাউন্ডে ওটা বাজিয়ে সিক্সটি-সেকেন্ডের হাইপ তৈরি করতে হবে।
রবীন্দ্রনাথ তার আমি কবিতায় আরও এক চরম সত্যের হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন। যেদিন মানুষের মন বিশ্ব থেকে রস ছিনিয়ে নেবে, সেদিন মহাকালের খাতার পাতা জুড়ে কেবল একটা ‘শূন্য’ নামবে। শক্তির কম্পন আকাশে বাতাসে চললেও কোথাও আলো জ্বলবে না। বিধাতা একা বসে থাকবেন নীলিমাহীন আকাশে, “ব্যক্তিত্বহারা অস্তিত্বের গণিততত্ত্ব নিয়ে।” আজকের দিনে দাঁড়িয়ে এই ‘গণিততত্ত্ব’ শব্দটা শুনলে গায়ে কাঁটা দেয়। এ তো আর কিছু নয়, এ হলো আমাদের চারপাশের অ্যালগরিদম! যে অ্যালগরিদম আমাদের রিদমিক জীবনকে স্রেফ ডেটা আর স্ট্যাটিস্টিক্সে কনভার্ট করে দিচ্ছে। আমরাও কি তবে সেই ব্যক্তিত্বহারা অস্তিত্বের দিকেই এগোচ্ছি, যেখানে কোনও কবিতা থাকবে না, কেবল থাকবে স্ক্রিন আর ডেটা প্যাক?

এর শেষটা কোথায়? শেষটা বড্ড স্যাঁতসেঁতে আর একা। যখন চারপাশে কেবল সেই জিনিসগুলোই বেঁচে থাকবে যা আমাদের কোনো না কোনো কাজে লাগে, তখন পৃথিবীটা একটা আস্ত কোল্ড স্টোরেজ হয়ে যাবে। সেখানে আলু থাকবে, পোলট্রি মুরগি থাকবে, স্টক মার্কেটের গ্রাফ থাকবে। সেখানে থাকবে ইনবক্সের কাজের চ্যাটটুকু, আর মেমোরি খালি করার জন্য ডিলিট করে দেওয়া হবে সমস্ত অকেজো আবেগের স্ক্রিনশট। শুধু থাকবে না জানলার পাশে এসে বসা ওই নাম-না-জানা পাখিটা।
আমরা প্রত্যেকেই ভেতরে ভেতরে একেকজন জগদীশ বাবু বা দার্জিলিং দত্তর সেই খাদের ধারের রেলিংয়ে দাঁড়িয়ে থাকা রোমান্টিক ছেলেটা হতে চেয়ে, দিনশেষে ইন্দ্রনাথের খাঁচায় গিয়ে ঢুকবে এটাই বাস্তব। কারণ, পেট চালানোর জন্য রোস্টের প্লেটটা বড্ড জরুরি, আর মন ভালো রাখার জন্য পাখিটার বেঁচে থাকা বা ড্রয়িং খাতাটার অস্তিত্ব বড্ড বেশি লাক্সারি। জীবন আসলে ওই রোস্টের চর্বি আর ডানার পালকের মাঝখানে জানলার ধারে বসে থাকা এক অন্তহীন স্যান্ডউইচ, যার দুটো স্লাইসের নাম—ক্ষিদে আর হাহাকার।

সহযোগিতার হাত বাড়াতে ওপরের ছবিতে ক্লিক করুন

[লেখকের পূর্ব রচনা]

[পরম্পরা ওয়েবজিন, অগাস্ট ২৬, সূচিপত্র – এখানে ক্লিক করুন]

3.2 5 ভোট
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
1 Comment
Oldest
Newest Most Voted
পংক্তির ভেতর মন্তব্য
সব মন্তব্য
Lopamudra Seth
Lopamudra Seth
14 hours ago

গভীর দার্শনিক উপলব্ধি