অনাহত

[দুঃস্বপ্নের রোজনামচা, যা আমরা কিছুদিন আগে পার হয়ে এসেছি। কোভিড সময়ে, যখন বিশ্বজুড়ে মৃত্যুর ভয়াল বিভীষিকা আমাদের তাড়া করে ফিরেছে, সেই প্রতিদ্বন্দ্বী কালখন্ডের এক টুকরো দলিল।

পূর্বানুবৃত্তিঃ শুরু হয়ে গেল লক-ডাউন। রেশন দোকানে লম্বা লাইন। গগন তিয়াসা-র মধ্যেকার রসায়ন নতুন করে ধরা দেয়। গগনের বেতন কমে গেল। সনতের পুত্র আদিত্য আর পুত্রবধূ ধৃতি আলাদা হয়ে রয়েছে। বিল্টুবাবুর কাছে কথা বলতে আসে গগন। পথে একবৃদ্ধকে অকারণ মার খেতে দেখে। রাতে ন’মিনিটের ব্ল্যাক আউটের পর অকাল দীপাবলি। বন্ধু বিকাশ আত্মশক্তির ওপর নির্ভর করতে বলে। বুঝতে পারেনা কোথায় সেই শক্তি পাবে? বিকাশের কথায় জোর পায়, ঠিক করে একদিন ওর আশ্রমে যাবে। বিকাশের জন্যই যাবে। বিকাশ বলে, আমার জন্য নয়, তোর নিজের জন্য আসবি।]

নুরুলের বছর দশেক বয়েস। গ্রামের বাড়িতে থাকতে স্কুল যেত। মিড ডে মিলের খাওয়া পেত। নুরুলের স্কুলে না গিয়ে, বাবার সাথে থাকতে বেশি ভালো লাগে। কত নিমন্ত্রণ বাড়ি যেতে পারে। কী আলোর রোশনাই! কত গাড়ি, বাজনা! আর কত রকম যে খাবার, বলে শেষ করা যায় না। ওর বাবার জন্য খুব গর্ব হয়। মোশারফ মানেই ওস্তাদ কারিগর। সবাই খেয়ে কত তারিফ করে। নুরুল শেখে, মন দিয়ে। কতটা ময়দায় কতটা ঘি-এর ময়ান, কিম্বা ইস্ট। কীভাবে তন্দুরে সেঁকে? পটল চিঁড়ে চিঁড়ে চিংড়ির পুর। অন্য মশলার পরে টমাটো কষাতে হবে, তা না হলে টমাটোর জলে মশলার স্বাদ পাল্টে যাবে। আরও কত কী! বড় হয়ে বাবার মতো হবে। বিল্টুবাবুর ক্যাটারিংএর খুব নাম। সব জায়গাতেই মুশারফকে নিয়ে যায়। আর নুরুলও অপেক্ষায় থাকে বাবা কখন ওকে নিয়ে যাবে। এবারে স্কুলের পরীক্ষা শেষে ফাইভে উঠল। বাবা ক’দিনের জন্য শহরে নিয়ে এল। বিল্টুবাবুর বাড়িটা পেল্লায়। টিভি-তেই এমন বাড়ি দেখেছে। সেখানে থাকতে পাওয়া এক বিশাল প্রাপ্তি। স্কুল খোলার সময় হয়ে গেছে। এর মধ্যে লকডাউন হয়ে গেল। রাস্তাঘাট ফাঁকা, দোকানপাট বন্ধ। মুহূর্তে শহরটা জ্বীনের রাজ্য মনে হয়।

তার মধ্যেই নুরুলকে চুপিসারে বেরতে হয়। বিল্টুবাবুর সিগারেট আনতে। বড়রা গেলে পুলিশ ধরবে। নুরুল ছেলেমানুষ বলে সন্দেহ করবে না। নুরুলও ঘুর পথে রতনের পানের দোকানে যায়। ঝাঁপ ফেলা থাকে। বাইরে থেকে বোঝা যায় না যে দোকান খোলা। প্রথমদিন তো ফিরেই যাচ্ছিল। তারপর খেয়াল করে দেখে, ফাঁক দিয়ে লোক দেখা যাচ্ছে। সাহস করে এগিয়ে যায়, লক্ষ্য করে বন্ধ ঝাঁপের ভেতরে রতন পান সাজাচ্ছে, সিগারেট বিক্রি করছে। একদিন এক উর্দিধারীকেও দেখেছে। ভয়ে কাছে যাচ্ছিল না। পরে বোঝে, সেও ওরই মতো সিগারেট কিনতে এসেছে। নুরুলকে এখন আর কিছু বলতেই হয় না। ও যে বিল্টুবাবুর লোক, রতন জানে। দুটো সিগারেটের প্যাকেট একটা কাগজের ঠোঙাতে ভরে নুরুলকে দিয়ে দেয়। নুরুল পকেট থেকে টাকা বার করে।

সেদিন বড় রাস্তার মোড়ের মাথায় চোঙ লাগানো, সেখানে গান হচ্ছে। “স্তব্ধ করো, জব্দ করো। করোনাকে ভয় পেয়ো না। ভিড় থেকে সব্বাই দূরে থাকো। করোনাকে ছুঁতে দেব না।” পকেটে সিগারেট নিয়ে গানটা মুখস্থ করার চেষ্টা করে। ফিরে গিয়ে বাবাকে শোনাবে। ফিরে আসতে আসতে দেখতে পায় বিল্টুবাবুদের পাড়ার ভেতর পুলিশের ভ্যান দাঁড়িয়ে। নুরুল গ্রামের ছেলে, পুলিশের গাড়ি দেখলেই ভয় পেয়ে যায়। সিগারেটের প্যকেটটা ফেলে দেবে কিনা ভাবছে, ঠিক তখন দেখে, একটা পুলিশ মাইক নিয়ে শাহরুখ খানের মতো গান গাইছে। “সুনোনা সুননা সুন লো না”-র গানটার সুরে “করোনা করোনা…।” বেশ মজা পেল। কোনও দিন গান গাওয়া পুলিশ দেখে নি। অনেক গুলো পুলিশ ঘুরে ঘুরে হাততালি দিচ্ছিল। একটা বড় বক্স-এ গান শোনা যচ্ছে। দুজন পুলিশ পর পর দুটো গান গাইল। একটা গান-গাওয়া পুলিশকে দেখে মনে হল, কোথায় যেন দেখেছে। দুটোই হিন্দি ছবির গানের সুর, তবে কথাগুলো বাঙলায়। গান শেষ হতে, বেশ হাসিমুখে, মনে মনে গানটা আওড়াতে আওড়াতে ঘরে ফেরে।

মুশারফ ছেলেকে দেখে জিজ্ঞাসা করে, “এত ফূর্তি কিসের?”
শুনে নুরুল বলে, “বা-জান, কোরানা কী কোনো পূজা?”
“ওমা! সে কী কথা? ক্যান?”
“কত সুন্দার গান হইছে! সব করোনা নিয়া গান। তুমি শোনবা? বাইরে চল।”
মুশারফ রান্নাবান্না সেরে সবে একটু জিরোতে বসেছে। নিমন্ত্রণ বাড়ি না থাকলেও বিল্টুবাবুর বাড়িতে অনেক লোক। তাছাড়া, ক্লাবের ছেলেরা গরীব মানুষদের খাওয়াবে বলে সাইকেল ভ্যানে করে ভাত-ডাল-সবজি-ডিম নিয়ে যায়। সেখানেও প্রতিদিন প্রায় একশো জনের খাবার বানিয়ে দেয়। বলে বটে একশোজন, অনায়াসে একশো পঁচিশজন খেতে পারে। বিল্টুবাবু এসবের খরচ যোগান। সবার রান্না করে, মুশারফের এখন আর বাইরে যেতে ইচ্ছে করল না, “শুনবো-হানে। আইজ থাক। কাল দ্যাখবো, কেমন?”

নুরুল একটু বিমর্ষ হল। করোনার গান, ওর কাছে এক অভূতপূর্ব আবিষ্কার। বাবা ঠিক মতো পাত্তা দিলনা, বলে একটু দুঃখ পেল। যাহোক, একা একাই সুর করে গাইতে থাকে। হঠাৎ মনে পড়ে, সামনেই রমজান মাস আসছে।
“বা-জান রমজান আসতিছে, বাড়ি যাবা না?”
মুশারফ ঘাড় নাড়ে, “গাড়ি না চললি, যাবা ক্যামনে?”
“গাড়ি কবে চঅলবে?”
“চোদ্দ তারিখ লকডাউন উঠতি পারে, তখন খোঁজ নিতি হবে।”

আসন্ন ঈদের খুশি কিশোরের মনে দানা বাঁধতে থাকে। এখানে অনেক ভালোমন্দ খাচ্ছে বটে, তবে ঈদের কথা এলেই তার মন ছুটে যায় তাদের গ্রামের পথ ধরে, ছোট নদীটা পার করে, ঈদগা ময়দান টপকে, মজুমদার বাড়ি, হাজি সাহেবের বাড়ি পার করে, ছোট্ট উঠোন ঘেরা টালি ছাওয়া বাড়িতে। সেখানে ওর মা আছে, বুড়া নানা নানী আর আর ছোট্ট বোন আয়েষা। আর চাচা হাবিব, মুশারফের ভাই। মুম্বাই থাকে। গয়নার কাজ করে।

হাবিব সেদিন মুশারফকে ফোন করে বলে, “কাজ নাই ভাইজান। মালিক আর পয়সা দেবে না বলেছে। বাড়ি ভাড়াও জোটবে না।”
মুশারফ বলে, “ফিরা আয়।”
“গাড়ি না চললে কী করবার পারি?”

নুরুল বাপ চাচার কথা শুনেছে। খুব অনাসৃষ্টি লাগে। কবে যে আগের মতো হবে? এখন মা-র কাছেও যেতে ইচ্ছে করছে। শহরে আর মজা নেই। নিমন্ত্রণ বাড়ি তো বন্ধই হয়ে গেছে। তাও বাবার জন্য দুবেলা মাছভাত জুটছে।

মুশারফের মনের ভেতর কথাটা পাক খাচ্ছিল। নুরুলের কথায় সেটা যেন ভেসে ওঠে। বিকেলে বিল্টুবাবু স্ত্রী মনিদীপাকে নিয়ে বাগানে বসে। উঁচু পাঁচিল ঘেরা সবুজ ঘাসের গালচে। মুশারফ চা-য়ের সাথে এটাসেটা বানিয়ে দেয়। আজ পেঁয়াজি, বেগুনি, টমাটো আর ক্যপসিকামের চপ বানিয়েছে। নিজেই ট্রে সাজিয়ে নিয়ে যায়। চা-য়ের সাথে টা-য়ের উপস্থাপনে কর্তা গিন্নি দুজনেই খুব খুশি। মুশারফ সুযোগ বুঝে বলে, “বাবু একটা কথা ছিল।”
“বল”
“এখন তো কাজও হচ্ছে না। ভাবছি কদিন বাড়ি ঘুরে আসি?”
“যা, কিন্তু যাবি কী করে?”
“সংক্রান্তির দিন যদি লকডাউন ওঠে, তাহলে নতুন বছরে যেতে পারি।”
“বেশ! দেখ কী হয়?”
বিল্টুবাবুর কথায় খুশি হয়ে ফিরে আসে। রান্নাঘরে নুরুলকে দেখতে পায় না। বিকেল বেলা, ছেলে হয়তো আশেপাশেই আছে। ফিরে আসলে বলতে হবে যে, ছুটি মঞ্জুর হয়ে গেছে। ভাবতে থাকে এবারে ঈদে সবার জন্য কিছু একটা নিয়ে যাবে, কিন্তু দোকানপাট খুললে হয়। এইসব ভাবনার মধ্যে নুরুল হাঁফাতে হাঁফাতে ঘরে ঢোকে। মুশারফ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে, “কীরে কী হইছে?”
নুরুল আতঙ্কিত। ধাতস্থ হতে সময় নেয়। “পাড়ায় অ্যাম্বুলেন্স আইছে। একজন-রে তুইল্যা নিয়া গেল। আর পুলিশ আইস্যা বাঁশ দিয়া রাস্তা আটাকাইয়া দিছে। বাড়ি যাবা কেমনে?”


“অত ডরাস না। এখনও সময় আসবার আছে। নববর্ষ আসপে, তার পর।”
“বা-জান, ওই লোকটা কী বাঁচবার পারবে?”
“ডাক্তার দ্যাখবে। নিশ্চই ব্যবস্থা হবে। তুই অত ভাবিবার পারিস না।”
ছেলেকে বলল বটে ভাবিস না। নিজের মনের মধ্যে ভয় চেপে বসছে। তাহলে রোগটা পাড়ার ভেতর ঢুকে এসেছে। ওদেরকেও ধরল বলে। ওর অসুখ হলে, সংসার কে দেখবে? ভাবতে ভাবতে অশান্তি বাড়তে থাকে। ওদিকে হাবিবেরও কাজ নেই, পয়সাও নেই। কতদিন এভাবে চলবে? পয়সা না থকলেও খাওয়া তো বন্ধ হবে না। সেই খাওয়ার জোগান কে দেবে? এখানে না হয়, মাথার ওপর বিল্টুবাবু আছে। কিন্তু বাড়িতে বা হাবিবের কাছে তো তেমন কেউ নেই।

সংক্রান্তির দিন রাতে হাবিব ফোন করেছে। গলার স্বর শুনেই মুশারফ ভয় পেয়ে যায়। ভাইএর এত ক্লান্ত গলা কখনও শোনেনি। “আজ ট্রেন চলবার পারেনি রে। উল্টে পুলিশ খুব মেরেছে। আমরা কয়েক শো ছেলে গেছিলাম বান্দ্রা স্টেশনে। কী মার মারল, কী বলব! আমি তো ছুটে পলাইছি। ভীড়ের মধ্যে চটিখান কোথায় ফুটগে গেল।
“তরে মারে নাই তো?”
“না আমার গায়ে লাগে নাই। আমার অনেক বন্ধুর লাগছে।”
“তাহলে কী করবি?”
“বুঝি না। সকলের সাথে কথা বলি। সবাই যা করবে, তাই করবো। তবে কেউ কেউ হাঁইটা যাবে কইছিল।”
“হাঁইটা মানে?”
“হাঁইটা মানে, হেঁটে যাবে।”
“মুম্বাই থেকে মুর্শিদাবাদ হেঁটে?! তুই কি পাগল হইছো?”
“এখনও হই নাই। ভাইজান, এখানে থাইক্যা গেলে, পাগল হইতে লাগে। থাকার জায়গায়, থাকবার পারবে না। খাইবার পয়সা নাই। কাজের ব্যবস্থা নাই। তইলে খাবা কী আর পরবা-ই কী? রোগে না মরলেও, না খাইয়া মরবার লাগে। আর মরতেই যদি হয়, বাড়ি গিয়াই মরি। তুইও ফেরার চেষ্টা কর।”
“বাবু ছুটি দিয়েছে। কিন্তু গাড়ি না চললে, যাইবার পারবো না।”
“দেখ, কী হয়?”

পাশে বসে নুরুল বুঝেছে, ভীষণ সাংঘাতিক কিছু একটা হয়েছে। কিন্তু সবটা বুঝে উঠতে পারে না। বাবাকে জিজ্ঞেস করে, “কী হইছে বা-জান?”
“বুঝবার পারি না। কতগুলো লোক বাড়ি ফিরতি চায়। ত্যাগো মারবে ক্যান? হ্যারা তো চোর বদমাইশ না?”
“কারে মারছে? বা-জান? চাচা-রে?”
“চাচা-র গায়ে পড়ে নাই, অর বন্ধু বান্ধবদের লাগছে।”
নুরুল, বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। বিল্টুবাবুর বিশাল প্রাসাদের এক কোণায় বসে এক কিশোর ভয়ার্ত মুখে তার বাবার দিকে তাকিয়ে থাকে। সন্ধে নেমে গেছে অনেকক্ষণ। দুজনের কারও বাতি জ্বালানোর কথা মনে হয় নি। দূরে কোথাও আবার অ্যাম্বুলেন্স যাচ্ছে। তার ঘন ঘন আর্তনাদ, বাতাসকে আরো ভারী করে তুলছে।

সহযোগিতার হাত বাড়াতে ওপরের ছবিতে ক্লিক করুন

[লেখকের পরম্পরায় প্রকাশিত রচনা]

[পরম্পরা ওয়েবজিন, অগাস্ট ২৬, সূচিপত্র – এখানে ক্লিক করুন]

0 0 ভোট
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
পংক্তির ভেতর মন্তব্য
সব মন্তব্য