
সমাপতন
এক
-তোর নাম কি ?
উত্তর নেই । ঘাড় ঝুঁকিয়ে নীচু মুখটা দুহাতের মধ্যে রেখে ধর্ষণের চেষ্টায় অভিযুক্ত ছেলেটা বসে আছে ।
এএসপি সত্যম দুবের প্রশ্নে একবার মুখটা তুলে তার দিকে তাকিয়ে আবার সেইভাবে বসে থাকলো ।
সত্যম দেখলো, ছেলেটার গোঁফের রেখাই ভালো করে ওঠেনি…দুচোখের দৃষ্টি ভয়ার্ত…’ষোলোর নিচেই হয়তো বয়েস হবে…পরণের জামাকাপড় তো ভালো অবস্থারই পরিচয় দিচ্ছে…‘
সত্যম ভাবলো থানার কন্ট্রাক্ট-করা প্রফেশনাল কাউন্সিলর না ডেকে সে নিজে প্রথমে একটু নরমে গরমে চেষ্টা করবে ।
-কি রে মাথাটা তোল । তোর নাম ঠিকানা না জানলে তোর বাড়ির লোককে আমরা খবর দেবো কি করে !
মুখ এবার উঠে কাঁপা কাঁপা ভাঙ্গা গলায় বললো, মেরে পিতাজি নে থানে মে ফোন কিয়া থা । থানেদারসাব নে মুঝসে মিলনে কে লিয়ে উনকো মানা কর দিয়া।
-ওহ ! কিন্তু তোর নামটা আ-মি তো জানি না । কি রে, বল !
কোনো উত্তর নেই ।
সত্যম উঠে ঘরের দরজাটা ভেতর থেকে বন্ধ করে ঘরের কোণের একটা টুলের ওপরে রাখা একটা জগ থেকে গ্লাসে জল ঢেলে এনে টেবিলে রেখে বললো, নে, জল খা।
ছেলেটা মাথা উঠিয়ে এবার হাত বাড়িয়ে জলটা নিয়ে এক নিঃশ্বাসে পুরোটা শেষ করে গ্লাস নামিয়ে রাখলো।
সত্যম একদৃষ্টে ছেলেটার বডি ল্যাঙ্গুয়েজ লক্ষ্য করছিলো…কাজ হবে বলে মনে হলো তার।
-তোকে এখানে কেউ মারধোর করেছে ?
এবার মুখমাথা আর নিচে যায়নি। মাথাটা দুপাশে নেড়ে ছেলেটা বোঝালো কেউ তাকে মারেনি।
-সেই তো ! সত্যি কথা বললে এখানে পিটাই কক্ষনো করবে না ।
দৃষ্টিতে বিশ্বাস অবিশ্বাস মিশিয়ে এবার ছেলেটা সত্যমের দিকে পরিষ্কার তাকালো ।
কিছুটা উৎসাহিত হয়ে সত্যম মিষ্টি করে বললো, এবার তোর নামটা আমাকে বলে দে !
ছেলেটা থেমে থেমে বললো, আমার নাম অজায়ব সিং ।
-আচ্ছা ! অজায়ব সিং !
সত্যম ভাবলো, কেস ভি তো অজায়ব হ্যয় ! গোঁফ ওঠার বয়েস হয়েছে কি হয়নি, এর মধ্যেই…
মুখে বললো, সাবাশ ! এবার আমাকে বল তো, এই কাণ্ডটা কেন করলি ? এতনা গন্দি কাম !
অজায়ব সত্যমের একবার চোখে চোখ রেখে মুখটা আবার দুহাতের পাতায় গুঁজে ফেললো ।
সত্যম জিজ্ঞেস করলো, ওই বাচ্চা মেয়েটাকে তুই চিনতিস ?
মুখ ওইভাবেই রেখে ছেলেটা আবার মাথাটা নাড়িয়ে জবাব দিলো, না, চিনতো না।
একটু অবাক হয়ে সত্যম জিজ্ঞেস করলো, চিনতিস না ! আচ্ছা ! মুখটা তুলে ওদিকে একবার দ্যাখ, দরজা বন্ধ, তুই যা বলবি কেউ কিচ্ছু শুনতে পাবে না । আমিও কাউকে কিচ্ছু বলবো না । আচ্ছা, ঠিক আছে ! খিদে পেয়েছে নিশ্চয়ই ? কিছু খাবি ?
এবার অজায়ব মুখ তুলে বললো, হাঁ, খাউঙ্গা ।
-সেটা আগে বলবি তো !
সত্যম দরজার পাল্লাটা খুলে বাইরে দাঁড়ানো কনস্টেবলটাকে ইঙ্গিত করে পাল্লাটা আবার ভেজিয়ে দিলো ।
দু-মিনিটেই দরজায় টোকা দিয়ে একজন কনস্টেবল ঘরে ঢুকে একটা প্লেটে পোহা আর জলেবি আর জলের গ্লাস টেবিলে রেখে সত্যমকে স্যালুট করে দরজা আবার ভেজিয়ে দিয়ে বেরিয়ে গেলো।
ছেলেটা, অজায়ব সিং, সব লক্ষ্য করছিলো।
সত্যম ইঙ্গিত করতেই প্লেটটা নিজের দিকে টেনে নিয়ে খেতে শুরু করলো।
ছেলেটা খাচ্ছে, সত্যম ছেলেটার দিকে তাকিয়ে আছে একদৃষ্টে, কিন্তু তার মনে নানারকম ভাবনা…’লখনউয়ে আমার ছোট ভাইটা… এই অজায়বের বয়েসই হবে…এবার মাধ্যমিক দেবে…শান্ত, নম্র, আইপিএস বড়ে ভাইয়া তার আইডল…সে কি কখনও এরকম একটা জঘন্য কাজ করতে পারবে…এই ছেলেটা… বোঝাই যাচ্ছে গাঁয়ের ধনী ঘরের স্পয়েলড ছেলে…’
দুই
টেবিলে জলের গ্লাস নামানোর আওয়াজে সত্যমের চিন্তার সুতো ছিঁড়ে গেলো ।
‘অজায়ব সিংয়ের পেট তো এখন ভর্তি, ভর্তি পেট থেকে কার্যকারণের সত্য কি এখন বেরিয়ে আসবে ?’
-হ্যাঁ রে ! খাওয়া হয়েছে তো ! এইবার তুই আমাকে খুলে বল তো, একটা অচেনা বাচ্চা মেয়ের সঙ্গে এই নোংরা কাজটা কেন করতে গিয়েছিলি ?
সত্যম দেখলো অজায়ব উসখুস করছে, চারদিকে তাকাচ্ছে, যেন বলবে কি না ঠিক করতে পারছে না !
-আরে আমি তো তোকে বললাম, দরজা বন্ধ, আমাকে তুই যা বলবি, সেটা কেউ জানতে পারবে না। এবার বল। সত্যমের গলায় উৎসাহের সুর ।
অজায়বের ঠোঁট নড়ে উঠলো, ম্যয়নে সোচা ওয়হ লড়কি দলিত থি !
ছেলেটার এ কথায় সত্যম বেশ অবাক হলো, তার সঙ্গে কৌতূহল ।
-হাঁ তো ! দলিতই তো হ্যয় উয়হ বচ্চি। উসসসে ক্যয়া হুয়া ?
অজায়ব আবার মাথা হেঁট করে বসে আছে ।
কৌতূহল আর অসহিষ্ণুতা মিলে গিয়ে এবার সত্যমের গলার স্বর কিছুটা উঁচু হয়ে গেলো, বোল খোলকে ! দলিত লড়কি কে সাথ কুছ ভি করনে কা পারমিশন মিল যাতা হ্যয় ক্যয়া…হাঁ ? বোল ! নহি তো আভি ম্যয়…
অজায়ব মাথাটা তুলে ভাঙ্গা গলায় হড়বড় করে বলে উঠলো, দলিত লড়কি কি ইজ্জৎ লুটনে সে পুণ্য হোতা হ্যয়, মেরা মরনে কা বাদ স্বরগবাস পাক্কা হো যাতা হ্যয় !
এ কথা শুনে সত্যম কয়েক মুহূর্তের জন্য হতবাক, স্তব্ধ হয়ে গেলো ।
একটা টিন-এজার কিশোর, সে স্পয়েলট হতে পারে, কিন্তু তার মুখ থেকে এমন কথা শোনা, তার কুকর্মের এমন অভাবিত সাফাই দেওয়া, বোধহয় তার স্বপ্নেরও অতীত ছিলো।
সত্যমের কয়েক মুহূর্ত লাগলো সামলাতে, তারপর গম্ভীর সন্দিগ্ধ গলায় প্রশ্ন করলো, কিসনে কহা তেরে কো ইয়ে সব গন্দি বেহুদা বাত ? কিসনে কহা ? মুঝে বোল…জলদি !
অজায়ব আবার চুপ, মাথা হেঁট, টেবিলে রাখা দু হাতের পাতা অল্প অল্প কাঁপছে ।
সত্যম আর নিজেকে সামলাতে পারলো না । চাপা চিৎকার করে টেবিলের ওপর প্রচণ্ড জোরে একটা চাপড় মেরে বলে উঠলো, বল, বল তুই আমাকে !
তার হাতের জোরালো আঘাতে টেবিলের ওপরে রাখা খালি প্লেট ঝনঝন করে উঠলো, স্টিলের গ্লাসটা মাটিতে পড়ে শব্দ করে গড়িয়ে গেলো ঘরের কোণে ।
অজায়ব চমকে মাথা তুলে একবার গেলাসটার দিকে তারপর সত্যমের দিকে ভয়ার্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে কাঁপা কাঁপা গলায় থেমে থেমে বললো, কিসিনে মুঝে কহা নহি, ম্যয়নে দুসরে কা বাতচিত সে শুনা থা।
সত্যম টেবিলের দিকে ঝুঁকে এলো, তার চোখে পুলিশের জেরার কড়া দৃষ্টি, কাঁহা শুনা থা ? আমাকে খুলে বল…এক্ষুনি।
সেই একই রকম ভাবে অজায়ব থেমে থেমে বললো, কাল সুবে, হামারা ঘরমে । পিতাজী কে দো-তিন দোস্ত আয়েথে। ওরা নিজেদের মধ্যে এ কথা বলাবলি করছিলো, আমি বাইরে থেকে শুনেছি । এক দোস্ত হসতে হুয়ে কহ রহা থা, উনহোনে জওয়ানি মে অ্যায়সা বহত পুণ্য কামায়া ।
সত্যম শুনে স্তব্ধ হয়ে অজায়বের দিকে তাকিয়ে রইলো কয়েক মুহূর্ত ।
কথা শেষ করেই অজায়বের আবার মাথা ঝুলে গেছে, চোখ নীচের দিকে ।
সত্যম একটা বড়ো নিঃশ্বাস ফেলে ভাবলো, তার এসপি বস, সত্যমের চোখে আর্টিকল ফিফটিনের আয়ান রঞ্জন, এই কনফেশন শুনলে তাঁর মনের ভাব কেমন হতো !
সত্যম আবার কড়া গলায় ধমকে উঠলো, সর উঠা, সর উঠাকে বাত কর মেরে সে । কল অউর এক বুজুর্গ ক্রিমিনাল সে এহি প্রবচন শুনা, আউর আজ হি পুণ্য কমানে কে লিয়ে নিকল পড়া, হাঁ ? ইউ ইডিয়ট !
অজায়ব মাথা তুলে এক মুহূর্ত সত্যমের দিকে তাকিয়ে থেকে অনুযোগের সুরে বললো, ম্যয় তো হাইওয়ে মে দৌড় রহা থা, রোজ দো-তিন মিল ভাগতা হু । উয়হ লড়কি রাস্তে কা পাস জঙ্গল কি তরফ যা রহি থি, মুঝে লগা কি ম্যয় নে পহেলে উসকো কহাঁ দেখা থা, শায়দ গাঁও কি দলিত বস্তি মে…ইসি লিয়ে তো…এতোটা বলেই থেমে গিয়ে অজায়ব আবার মাথা নীচু করে নিলো ।
সত্যম একটা বড়ো নিঃশ্বাস নিলো ।
কাউনসেলিং না করেই এই জেরায় অভাবিত যেটুকু ইনফরমেশন সে পেয়েছে তা আগামী কয়েকদিন তাকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত রাখতে যথেষ্ট…‘ছেলেটাকে কম সে কম তিন বছর তো জেল খাটতেই হবে, জেল থেকে বেরিয়ে হয়তো আবার একই অপরাধ করবে !’
সত্যম ওর দিকে একবার তাকিয়ে আবার একটা নিঃশ্বাস ফেলে উঠে পড়লো।
টেবিলে মাথা ঝুঁকিয়ে সেই একই ভাবে বসে থাকলো অজায়ব ।
তিন
-তোর নাম তো রিজওয়ান ?
পাশের লকআপের এই ছেলেটাকে দেখেও সত্যমের মনে হলো বয়েস আঠেরোর নীচেই হবে ।
‘আজকের দুটো কেসই তো দেখছি পকসো আদালতে যাবে । এ আবার হাতে ছুরিসমেত ধরা পড়েছে !‘
রিজওয়ান ছেলেটা ঘরের এদিক ওদিক দেখতে দেখতেই সত্যমের দিকে তাকিয়ে মাথা নেড়ে হ্যাঁ বুঝিয়ে দিয়ে আবার চঞ্চল দৃষ্টি !
-এই, এদিক ওদিক কি দেখছিস ! আমার দিকে দ্যাখ, উর্দিটা দেখছিস তো ! যা জিজ্ঞেস করছি ঠিকঠাক জবাব দিবি । রিজওয়ান…পদবি কি ?
-শেখ।
-বাড়ি থেকে কেউ এসেছিলো ?
-তবে ! চিনতিস না ! তাও ছুরি মেরেছিস ! লোকটা তো মরে যেতে পারতো !
-লেকিন উয়হ হিন্দু তো মরা নহি ! বাঁচ গয়া না ! মুখটা তুলে রিজওয়ান যেন হতাশ গলায় বললো ।
-হাঁ, শুকর হ্যয়, বাল বাল বাঁচ গয়া ! লেকিন তু আভি আভি কেয়া বোলা ? উয়হ হিন্দু তো…? হিন্দু সে তেরা ক্যয়া মতলব ? কি করে তুই বুঝলি যে লোকটা হিন্দু ?
-কপালে টিকা ছিল, ইস লিয়ে তো ম্যয় চাকু লেকে…বলেই আবার মাথাটা নীচু করে ফেললো রিজওয়ান।
সত্যম এবার জোরগলায় বলে উঠলো, ইস লিয়ে তো চাকু লেকে ক্যয়া…চাকু সে উনকো মারনা থা ?
সত্যম জোর ধমকে উঠলো, বল, বল তুই আমাকে ।
-উসকে মর জানেসে মুঝে হামেশা কে লিয়ে জন্নত হাসিল হো যাতি । মেরা ইন্তেকাল কে বাদ মুঝে মজবুরন রিজওয়ান বনকে বেহেস্ত কা দরওয়াজে পর হামেশা খড়ে রহনে কা তকলিফ নহি হোতি । জন্নত কা খুবসুরত হুরপরী আ কে মেরা খিদমত করতি, বেশক মেরে জাঙ মে আ কে বৈঠতি, মেরে সে পেয়ার করতি ! ম্যয় ওইসা হি আয়েশ করতা…হামেশা !
হাঁফিয়ে হাঁফিয়ে জোরে জোরে একটানা এতোগুলো কথা বলে রিজওয়ান মাথাটা নীচু করে নিলো।
সত্যম শুনে একেবারে স্তব্ধ হয়ে গেলো কয়েক মুহূর্তের জন্য ।
তারপর সামলে নিয়ে গলা নামিয়ে প্রায় ফিসফিস করে বললো, ইয়ে সব তেরে কো কিসনে বোলা ?
-কিউ ! হর ওয়ক্ত শুনতা রহতা হু…ঘরমে, বেরাদরি মে…দোস্তলোগ ভি বোলতে রহতে হ্যয় ।
থানার বাইরে বেরিয়ে সত্যম হাতের ঘড়ির দিকে তাকালো।
বেলা দুটো বেজে গেছে, এখন কোয়ার্টারে গিয়ে কিছু মুখে দিয়ে তারপর এসপি স্যারের অফিসে যেতে হবে। আকাশের দিকে তাকালো সত্যম…রোদের তেজ এখন একেবারে নেই…কখন ঘন কালো মেঘ এসে গ্রীষ্মের রোদ-ঝরা আকাশ ছেয়ে ফেলেছে, উত্তর-পশ্চিম কোণে ঝড় ওঠার পূর্বাভাস ।
একটা বড়ো নিঃশ্বাস ফেলে সত্যম জীপে উঠতে উঠতে বললো, জলদি ঘর চলো রনবীর, জবরদস্ত তুফান আনেবালা হ্যয়।

