আনুমানিক অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষভাগে আমাদের বাড়িতে ঠাকুর দালান নির্মাণ করে কালীপূজো শুরু। আবার এসে গেল পূজো। একে ঘিরে অনেক স্মৃতি, অনেক কাহিনী। ছোটবেলার গল্প ভোলার নয়।

একমাস আগে থাকতেই বাবার নেতৃত্বে আমরা ঠাকুর দালান, উঠোন সাফাইয়ে নেমে পড়তাম। আগের দিন গোবর জলে ধোয়া, তারপর পূজোর ঘরে, উঠোনে, চৌকাঠে দিদিদের আলপনা দেওয়া। এখন বোন, ভাইঝি, মেয়েরা, বউমা রা হাত লাগায়।
যখন স্কুলের উঁচু ক্লাসে , পূজোর হিসাব লেখালিখির দায়িত্ব পড়লো আমার আর খুড়তুতো ভাই অপুর ওপর। কাকাদের কাছে শিখলাম ,খাতার বাঁদিকে জমা আর ডানদিকে খরচের হিসাব। এখন এসব সাধারণ মনে হলেও, তখন ঐ বয়সে, নিজেকে বেশ ভারিক্কি, ব্যক্তিত্বপূর্ণ মনে হতো। আজও প্রথম দুটি খরচের হিসাব মনে আছে। ডানদিকে লিখতাম, ‘সিদ্ধি’ – এক আনা, আর “হবিষ্যান্ন দরুন পুরোহিত কে” – এক টাকা।
আমাদের প্রতিমা আসতো ( এখনও আসে ) স্থানীয় পটুয়াপাড়া থেকে। আমাদের ছাত্রজীবনে গত শতকের ৬০ এর দশকে এর দাম ছিল পাঁচ টাকা। পূজোর পরদিন পটুয়াবাড়ির একজন আসতো ধামা নিয়ে। চাল, ডাল, তেল, মশলা, সবজি, কাপড় ইত্যাদি “সিধে” নিয়ে যেত।

পূজোর আগের সন্ধ্যায় – কুটনো কোটা। হাত লাগাতো মা-কাকিমা- জ্যাঠাইমা- পিসি ও দিদিরা। পূজোর দিনে ভোগ রান্নায় হাত লাগাতো মেজদা (সুকুমার দা), বাবা, নিমাই দা, পুসি পিসি, খুনি পিসি, কাকীমারা কেউ কেউ।

পূজোর গল্প অনেক, অনেক আনন্দ….. আজও মনে পড়ে, মাঝ রাতে বেহালার গাবু কাকার বাজখাঁই , উদাত্ত আওয়াজ, ” জয় মা, মাগো”, উপেন দাদুর বলিদান করা, জনাইয়ের ঠাকুমা- বেহালার ঠাকুমার কুমারী পূজো, কুমারী র ছোট্ট শাড়ি পাওয়া, মহিলাদের “ধুনো পোড়ানো”, পরে আমরা ওনাদের কোলে বসতাম, বলিদানের পর উঠোন জুড়ে বাজি পোড়ানো, শেষ রাতে শতাধিক আত্মীয় স্বজন ভোগ খেতে বসা……… সব কেমন আজ যান্ত্রিক।

যে জন্য আজ লিখতে বসা, সে এক চমকপ্রদ কাহিনী। তখন আমরা পূজোর দিনে ভোরবেলা অন্ধকার থাকতে দাদাদের সঙ্গে বেরোতাম ফুল তুলতে….. বলা ভালো, “ফুল চুরি করতে।” বেলায় বাড়ি ফিরতাম ঝুড়ি ভর্তি, সাজি ভর্তি ফুল নিয়ে —- বাড়ির সবাইয়ের সে কি উৎসাহ, ফুল দেখার জন্য। আমরাও গর্বিত হতাম।
সেবার আমরা এপাশ ওপাশ থেকে কিছু ফুল তুলে, জলকল মাঠ পেরিয়ে যাচ্ছি, চোখে পড়লো চৌধুরী দের টিন দিয়ে ঘেরা পুকুরের পাশের গাছে প্রচুর স্থল পদ্ম, তার পাশে প্রচুর জবা, টগর ফুটে। এ পাশে ত আবর্জনা, তাও টিনের বেড়া টপকিয়ে ঢুকে পড়লাম, আবর্জনা মাড়িয়ে ফুল গাছের পাশে। প্রচুর ফুল — ফুলের বন্যা, আমরা কথা বলছিলাম ফিসফিস করে।
হঠাৎ একটা আওয়াজ, আলো- আঁধারিতে দেখি, চৌধুরী গিন্নী খিড়কির দরজা খুলে পুকুর ঘাটের সিঁড়িতে ধীর লয়ে। আমাদের দেখে ফেললেন। গম্ভীর স্বরে চিৎকার — কে ওখানে? তাঁর কন্ঠে দৃঢ়তা, আচরণে মাতৃভাব, আদেশে তীক্ষ্ণতা –‘এদিকে এসো’।
আমরা চার জন মাথা নিচু করে সামনে এলাম।
আবার সেই ব্যক্তিত্বসম্পন্ন স্নেহময়ী জিজ্ঞাসা, ” কে তোমরা? কী করছো? ” বললাম, আমরা চাটুজ্যে বাড়ির ছেলে, কালী পূজোর ফুল তুলছিলাম।
প্রচ্ছন্ন ধমক — ‘ ছি ছি, মায়ের পূজোর ফুল তুলেছ আর ওপাশ দিয়ে এসেছো, যত রাজ্যের নোংরা আবর্জনা, কুকুরের মলমূত্র মাড়িয়ে… ছিঃ’
তাঁর নির্দেশে সমস্ত ফুল ফেলে দিতে হলো, পুকুরে হাত পা ধুয়ে, তাঁর পিছন পিছন বাড়িতে ঢুকলাম।

ওনার ঠাকুর ঘর থেকে এক ঝুড়ি ফুল আমাদের হাতে দিয়ে বললেন, ” যাও, সদর দরজা দিয়ে বেরিয়ে যাও “।
মদনমোহন মন্দিরের পাশে, ওনাদের সদর দরজা দিয়ে বেরিয়ে গেলাম। অনেকক্ষণ চুপ ছিলাম।
পরে ভাবছিলাম, এ কেমন হলো?
ফুল চোর ধরা পড়লো, কোনো শাস্তি নেই, শুধুমাত্র স্নেহশীল ধমক আর অনেক তাজা ফুল উপহার। এ ঘটনা আজও মধুর স্মৃতি বহন করে।
ওই পরিবারের আমার বাল্যবন্ধু অমল -কমল কিন্তু জানে না এই বর্ণময় কাহিনীর কথা।

সহযোগিতার হাত বাড়াতে ওপরের ছবিতে ক্লিক করুন

[লেখকের পূর্ব রচনা]

[পরম্পরা ওয়েবজিন, জুলাই ২৬, সূচিপত্র – এখানে ক্লিক করুন]

0 0 ভোট
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
পংক্তির ভেতর মন্তব্য
সব মন্তব্য