২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচন পশ্চিমবঙ্গের ইতিহাসে এক অভাবনীয় পরিবর্তন এনে দিয়েছে। দীর্ঘ দেড় দশকের তৃণমূল জমানার অবসান ঘটিয়ে রাজ্যে ক্ষমতা দখল করেছে বিজেপি। টানা ৩৪ বছরের বাম শাসন এবং ১৫ বছরের তৃণমূল জমানার পর এই ‘পরিবর্তনের পরিবর্তন’ সাধারণ মানুষের মনে নতুন আশার সঞ্চার করেছে। কারণ, দীর্ঘ পাঁচ দশক পর বাংলা এমন এক রাজনৈতিক সমীকরণের সাক্ষী হলো, যেখানে কেন্দ্র ও রাজ্য—উভয় স্তরেই একই শাসকদল। তবে এই অভূতপূর্ব পরিস্থিতি একই সাথে জন্ম দিয়েছে কিছু গভীর ও মৌলিক প্রশ্নের।

বিজেপির প্রচারিত ‘ডাবল ইঞ্জিন’ সরকারের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী, কেন্দ্রীয় প্রকল্পের নিরবচ্ছিন্ন প্রয়োগ এবং রাজ্যের নিজস্ব প্রশাসনিক ক্ষমতার মেলবন্ধনে এক নতুন ‘সোনার বাংলা’ গড়ে ওঠার কথা। তবে কেন্দ্রীয় সুবিধা রাজ্যের সঙ্গে যুক্ত হোক বা না হোক, কেবল নিজস্ব সাংবিধানিক ক্ষমতা ব্যবহার করেই একটি রাজ্য সরকার অনেক মৌলিক পরিবর্তন আনতে পারে। ভারতের সংবিধানের ‘স্টেট লিস্ট’ বা রাজ্য তালিকা অনুযায়ী স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কৃষি এবং পুলিশ-প্রশাসনের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো সম্পূর্ণ রাজ্যের এক্তিয়ারভুক্ত। ক্ষমতার এই পালাবদল কি কেবল শাসকের নামবদল হিসেবেই থেকে যাবে, নাকি বিজেপি সরকার সংবিধানপ্রদত্ত এই ক্ষমতাগুলোকে ব্যবহার করে বাংলার সাধারণ মানুষকে দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক শ্বাসরোধ ও দুর্নীতি থেকে প্রকৃত মুক্তি দিতে পারবে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের রাজ্যের বর্তমান অবস্থা এবং সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ মডেলের একটি তুলনামূলক কাটাছেঁড়া প্রয়োজন। রাজ্য তালিকার এই সাংবিধানিক ক্ষমতাগুলোর প্রথম এবং প্রধান প্রয়োগক্ষেত্র হলো বাংলার অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র— কৃষি ও গ্রামীণ ব্যবস্থা।

কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতি

সংবিধান অনুযায়ী কৃষি রাজ্যের এক্তিয়ারভুক্ত। রাজ্য সরকার চাইলে নিজস্ব তহবিল থেকে শস্য বিমা নিশ্চিত করতে পারে এবং সেই তহবিল দিয়ে সেচের আধুনিকীকরণ, কোল্ড স্টোরেজ চেইন ও উন্নত বিপণন পরিকাঠামোয় বিনিয়োগ করতে পারে। গত দেড় দশক ধরে পশ্চিমবঙ্গ মূলত ‘ভাতা-নির্ভর’ কৃষিনীতি দেখেছে; যেখানে দীর্ঘমেয়াদী পরিকাঠামো উন্নয়নের চেয়ে নগদ অনুদান দিয়েই চাষিদের ক্ষোভ প্রশমনের চেষ্টা করা হয়েছে। পঞ্চায়েত স্তরে ফড়ে রাজ ও শক্তিশালী সিন্ডিকেটের কারণে সাধারণ কৃষক আজও ফসলের ন্যায্য দাম পায় না। শস্য বিমার সুবিধা অনেক ক্ষেত্রেই প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত চাষির বদলে দলীয় অনুগতদের পকেটে গিয়েছে।

ক্ষমতার এই বড় পটপরিবর্তনের পর নতুন রাজ্য সরকার ইতিমধ্যেই পিএম-কিষাণ এবং কেন্দ্রীয় শস্য বিমার (PMFBY) পূর্ণ রূপায়ণের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা করেছে। দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকা এই কেন্দ্রীয় সুবিধাগুলো সরাসরি বাংলার কৃষকদের অ্যাকাউন্টে পৌঁছানোর এই সিদ্ধান্ত নিঃসন্দেহে গ্রামীণ অর্থনীতিতে একটি বড় ইতিবাচক পদক্ষেপ এবং এটি চাষিদের দীর্ঘদিনের ক্ষোভের সাময়িক উপশম ঘটাবে।

তবে এই ঘোষণার আপাত সাফল্যের আড়ালে এক বড় কাঠামোগত বিপদও লুকিয়ে আছে। বিজেপির কেন্দ্রীয় নীতি মূলত কৃষিক্ষেত্রকে বড় কর্পোরেটদের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া। বিজেপি শাসিত অনেক রাজ্যের চিত্র বলছে, সরকারি মান্ডি ব্যবস্থা দুর্বল হওয়ার ফলে এবং এমএসপি-র আইনি গ্যারান্টি না থাকায় প্রান্তিক চাষিরা শেষ পর্যন্ত বড় পুঁজিপতিদের মর্জির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন। ফলে পিএম-কিষাণের টাকা সরাসরি অ্যাকাউন্টে এলেও, কেন্দ্রীয় নীতিতে আমাদের রাজ্যেও আগামী দিনে স্থানীয় ফড়েদের বদলে জায়গা করে নিতে পারে এক বিশাল ‘কর্পোরেট সিন্ডিকেট’, যাদের সাথে মুক্ত বাজারে দরদাম করার ক্ষমতা বাংলার ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের বিন্দুমাত্র নেই।

স্বাস্থ্য ও শিক্ষা

কৃষিজীবী মানুষের আর্থিক সুরক্ষার পাশাপাশি দরকার জনগণের স্বাস্থ্য ও শিক্ষার উন্নতি—তবেই প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব। অর্থাৎ স্বচ্ছ নিয়োগের মাধ্যমে শিক্ষা ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা এবং হাসপাতালে বিনামূল্যে আধুনিক চিকিৎসা নিশ্চিত করা রাজ্য সরকারের প্রাথমিক দায়িত্ব। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে এই দুই মৌলিক অধিকার আজ গভীর সংকটের মুখে। গত দেড় দশক ধরে পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষা দপ্তর দুর্নীতির সমার্থক হয়ে দাঁড়িয়েছে। ওএমআর শিট জালিয়াতি ও অর্থের বিনিময়ে অযোগ্যদের নিয়োগ করে কয়েক প্রজন্মের ভবিষ্যৎ লুঠ করার এক ‘প্রাতিষ্ঠানিক’ ব্যবস্থা চালু করেছিল। যোগ্য মেধাবীরা রাজপথে বছরের পর বছর লড়াই করলেও সরকার ছিল নির্বিকার। স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে ঝকঝকে বিল্ডিংয়ের আড়ালে ‘রেফার’ সংস্কৃতি ও নার্সিং হোম সিন্ডিকেট সাধারণ মানুষকে নাজেহাল করেছে। স্বাস্থ্যসাথী কার্ড হাতে থাকলেও অনেক সময় চিকিৎসার অভাবে সাধারণ মানুষকে হাসপাতাল থেকে ফিরে আসতে হয়েছে।

তবে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর নতুন প্রশাসন কিছু কড়া পদক্ষেপের ইঙ্গিত দিচ্ছে। যেমন, আর জি কর হাসপাতালের মতো সংবেদনশীল ও বড় চিকিৎসা কেন্দ্রে দীর্ঘদিন ধরে চলা দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত অফিসারদের তড়িঘড়ি সাসপেন্ড করা হয়েছে। সমস্ত স্তরের দুর্নীতির বিচার হবে বলে সরকার আশ্বাস দিচ্ছে, যা আমজনতার মনে কিছুটা স্বস্তি ও আশার আলো তৈরি করেছে। নতুন সরকার ইতিমধ্যেই রাজ্যে বহুল চর্চিত জাতীয় শিক্ষানীতি (NEP 2020) এবং ‘আয়ুষ্মান ভারত’ স্বাস্থ্য প্রকল্প পুরোপুরি চালু করে দিয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকা এই দুই কেন্দ্রীয় নীতি কার্যকর হওয়ায় যেমন শিক্ষার কাঠামোয় বড় বদল আসছে, তেমনই আয়ুষ্মান ভারতের হাত ধরে সাধারণ মানুষের ভিন রাজ্যে গিয়েও আধুনিক চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগ উন্মুক্ত হয়েছে।

তা সত্ত্বেও, এই কেন্দ্রীয় মডেলের অন্ধ অনুকরণের পেছনে কিছু গভীর অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তাও লুকিয়ে আছে। উত্তরপ্রদেশ বা গুজরাটের মতো রাজ্য—যেখানে এই ব্যবস্থাগুলো দীর্ঘ দিন ধরে চলছে—সেখানকার অভিজ্ঞতা বলছে, সরকারি স্বাস্থ্য পরিকাঠামোকে শক্তিশালী করার বদলে ‘পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ’ মডেলে বেসরকারি হাসপাতালের দাপট ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পায়। ফলে চিকিৎসা পরিষেবা শেষ পর্যন্ত সাধারণ মধ্যবিত্ত ও প্রান্তিক মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যাওয়ার ঝুঁকি থেকে যায়। একইভাবে, শিক্ষার ক্ষেত্রেও জাতীয় শিক্ষানীতি (NEP 2020) নিয়ে দেশজুড়ে চলা বিতর্ককে উপেক্ষা করা যায় না। শিক্ষাবিদদের একাংশের আশঙ্কা, এই নীতির আড়ালে শিক্ষার অতি-কেন্দ্রীয়করণ ঘটিয়ে রাজ্যের এক্তিয়ারকে খর্ব করা হতে পারে। পাশাপশি, বহু-স্তরীয় প্রবেশ ও প্রস্থানের (Multi-entry and Exit) মতো ব্যবস্থাগুলো গ্রামীণ ও প্রান্তিক স্তরের পড়ুয়াদের মাঝপথে পড়াশোনা ছেড়ে দেওয়ার প্রবণতা বাড়িয়ে দেবে কি না, তা নিয়ে তীব্র সংশয় রয়েছে। উপরন্তু, পরিকাঠামোগত আমূল সংস্কারের চেয়ে যদি সিলেবাসের কাঠামো বা ইতিহাস পুনর্লিখনের মতো আদর্শগত পরিবর্তনের বিতর্ক বেশি প্রাধান্য পায়, তবে শিক্ষার মূল গুণমান, বহুত্ববাদ ও নিরপেক্ষতা বড়সড় প্রশ্নের মুখে পড়বে।

জ্বালানি ও বিদ্যুৎ

স্বাস্থ্য ও শিক্ষার মতো বুনিয়াদি পরিষেবার সমান্তরালে যে বিষয়টি আজ সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস তুলছে, তা হলো আকাশছোঁয়া জ্বালানি ও বিদ্যুতের দাম। এই মুহূর্তে পশ্চিমবঙ্গ ভারতের অন্যতম সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ মাশুলের রাজ্য। বিদ্যুতের বিলের সাথে নানাবিধ সেস ও ‘অ্যাডজাস্টিং চার্জ’ যোগ করে সাধারণ মানুষের ওপর অসহনীয় আর্থিক চাপ তৈরি করা হয়েছিল। তৃণমূল কংগ্রেসের সরকার সবসময় কেন্দ্রের দোহাই দিয়ে দায় এড়ালেও ডিজেলের আকাশছোঁয়া দাম কৃষিকাজ ও নিত্যপণ্যের পরিবহণ খরচ বাড়িয়ে সাধারণ মানুষের জীবন দুর্বিষহ করে তুলেছিল।

নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিতে ভ্যাট কমিয়ে পেট্রোল-ডিজেলের দাম কমানোর প্রবল আশ্বাস দেওয়া হলেও, ক্ষমতার হস্তান্তরের পর বাস্তব চিত্রটা সম্পূর্ণ উল্টো রূপ নিয়েছে। নতুন সরকার আসার পর রাজ্যে পেট্রোল ও ডিজেলের দাম কমার বদলে উল্টে আরও বেড়ে গেছে। ‘ডাবল ইঞ্জিন’ সরকারের এই প্রাথমিক ধাক্কা সাধারণ আমজনতা ও কৃষিজীবী মানুষের মনে তীব্র ক্ষোভ ও আশঙ্কার জন্ম দিয়েছে, কারণ জ্বালানির এই মূল্যবৃদ্ধি সরাসরি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে আগুন লাগিয়ে দিচ্ছে। এই পরিস্থিতি থেকে সাধারণ মানুষকে প্রকৃত স্বস্তি দিতে নতুন প্রশাসনের অনতিবিলম্বে কিছু সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি:

অনতিবিলম্বে ভ্যাট হ্রাস: নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে রাজ্য সরকারকে অবিলম্বে পেট্রোল ও ডিজেলের ওপর নিজস্ব ভ্যাটের হার কমাতে হবে, যাতে লিটার প্রতি দাম উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায়।

ডাবল ইঞ্জিন সমন্বয়ের প্রয়োগ: যেহেতু কেন্দ্র ও রাজ্যে একই দল আসীন, তাই রাজ্য সরকারকে কেন্দ্রের সাথে কথা বলে জ্বালানি তেলকে জিএসটি -এর আওতায় আনার জন্য জোরালো সওয়াল করতে হবে।

বিদ্যুৎ মাশুল নিয়ন্ত্রণ ও ভর্তুকি: রাজ্য বিদ্যুৎ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (WERC) মাধ্যমে বিদ্যুতের বিলের সাথে যুক্ত নানাবিধ গোপন সেস ও অ্যাডজাস্টিং চার্জ অবিলম্বে প্রত্যাহার করতে হবে এবং প্রান্তিক মানুষের জন্য নির্দিষ্ট ইউনিট পর্যন্ত বিদ্যুৎ বিনামূল্যে বা সুলভ মূল্যে দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।

নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিতে ৩০০ ইউনিট পর্যন্ত নিখরচায় সৌর বিদ্যুৎ (PM Surya Ghar) দেওয়ার কথা বলা হলেও, তা মূলত সোলার প্যানেল বসানোর প্রাথমিক খরচের ওপর নির্ভরশীল। ফলে সাধারণ গৃহস্থের জন্য তাৎক্ষণিক আর্থিক স্বস্তি কতটা আসবে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। উপরন্তু, বিদ্যুৎ বণ্টন ব্যবস্থাকে লাভজনক করতে বিজেপি যদি অনেক রাজ্যের মতো বেসরকারীকরণের পথে হাঁটে, তবে পরিষেয়ার মান বাড়লেও বিদ্যুৎ মাশুল নিয়ন্ত্রণের চাবিকাঠি আমজনতার হাত থেকে বড় কর্পোরেটদের হাতে চলে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। পরিশেষে, যদি তেলের দামের এই ঊর্ধ্বমুখী গ্রাফকে রাজ্য সরকার অবিলম্বে ভ্যাট কমিয়ে লাগাম পরাতে না পারে, তবে এই পরিবর্তন সাধারণ মানুষের কাছে নিছকই এক বড় মোহভঙ্গ হিসেবে প্রমাণিত হবে।

পুলিশ ও আইন-শৃঙ্খলা

একটি স্বাধীন পুলিশ প্রশাসন গড়া এবং আমলাতন্ত্রকে রাজনীতিমুক্ত রাখা সুশাসনের প্রাথমিক শর্ত। কিন্তু গত দেড় দশকে পুলিশকে অপরাধ দমনের বদলে বিরোধী দমনে এবং শাসকদলের স্বার্থ রক্ষায় ‘দলীয় ক্যাডারে’ পরিণত করার অভিযোগ উঠেছে। বালি, কয়লা ও গরু পাচারের মতো বড় দুর্নীতিতে পুলিশি নিষ্ক্রিয়তা বা পরোক্ষ মদত আজ জনসমক্ষে। নিরপেক্ষ আধিকারিকদের বদলে অনুগতদের বসিয়ে প্রশাসনকে পঙ্গু করা হয়েছিল। পুলিশ যেখানে রক্ষক হওয়ার কথা ছিল, সেখানে তারা আজ নির্দিষ্ট একটি রাজনৈতিক দলের আজ্ঞাবহ যন্ত্রে পরিণত হয়েছিল।

শাসনক্ষমতা দখল করেই নতুন বিজেপি সরকার স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে যে তারা প্রশাসনের প্রতিটি স্তরে দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি নিয়ে চলবে। একই সাথে, তোলাবাজি ও সিন্ডিকেট রাজের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে কড়া হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে এবং সাফ জানানো হয়েছে যে কোনো ধরণের বেআইনি আর্থিক লেনদেন বরদাস্ত করা হবে না। তবে বিজেপি বারবার ‘পুলিশি রাজ’ খতমের কথা বললেও বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলোর পরিস্থিতি বিচার করলে এক নতুন ভয়ের সৃষ্টি হয়। সেখানে পুলিশকে সরাসরি ক্যাডারমুক্ত করার বদলে অনেক ক্ষেত্রে এক বিশেষ ধরণের ‘আদর্শগত নিয়ন্ত্রণে’ ব্যবহার করা হয়েছে। বিশেষ করে ভিন্নমতাবলম্বী বা প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর দমনে পুলিশের অতি-সক্রিয়তা অনেক সময় পূর্বতন জমানার রেকর্ড ছাপিয়ে যায়। এছাড়া আইনি প্রক্রিয়া এড়িয়ে তাৎক্ষণিক বিচারের যে ‘বুলডোজার জাস্টিস’ সংস্কৃতি, তা গণতান্ত্রিক পুলিশের চরিত্রকে আরও ধ্বংস করে। যদি পুলিশ এক রাজনৈতিক প্রভুর বদলে অন্য এক আদর্শগত প্রভুর আজ্ঞাবহ হয়, তবে সাধারণ মানুষের কাছে তা হবে নিছকই ক্ষমতার “হাতবদল”। সেক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা অধরাই থেকে যাবে।

সামাজিক সুরক্ষা ও কর্মসংস্থান

প্রশাসনিক নিরাপত্তা না থাকলে সাধারণ মানুষ তখন নিছক বেঁচে থাকার তাগিদে সরকারের সরাসরি সামাজিক সুরক্ষা ও খয়রাতি ভাতার মুখাপেক্ষী হয়ে পড়ে। স্থায়ী পরিকাঠামো তৈরি করে কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা এবং বার্ধক্য বা বিধবা ভাতা স্বচ্ছতার সাথে প্রদান করা হলো রাজ্যের সাংবিধানিক অধিকার। গত ১৫ বছর পশ্চিমবঙ্গ দেখেছে কেবল ‘ভাতা’র রাজনীতি। মানুষকে স্বাবলম্বী করার বদলে ভাতা দিয়ে ভুলিয়ে রাখা হয়েছে, যাতে তারা কোনোদিন বড় শিল্প বা স্থায়ী কর্মসংস্থানের দাবি তুলতে না পারে। ফলে আজ রাজ্যে কাজ নেই, শিল্প নেই এবং শিক্ষিত যুবকরা ভিন রাজ্যে পরিযায়ী শ্রমিক হতে বাধ্য হচ্ছে। সরকারি প্রকল্পের সুবিধা পেতেও দলীয় নেতাদের ‘কাটমানি’ দেওয়া এখন অলিখিত নিয়ম। বিজেপি নির্বাচনে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে তারা মানুষকে ভাতার মুখাপেক্ষী না করে স্বনির্ভর করতে চায়।

তাই সাধারণ মানুষের মনে সংশয় ছিল—‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’-এর মতো নিশ্চিত সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পগুলো কি বন্ধ হয়ে যাবে? জনমানসের সেই আশঙ্কা দূর করতে নতুন প্রশাসন স্পষ্ট জানিয়েছে যে, পুরোনো সামাজিক প্রকল্পগুলো যেমন চলছে তেমনই চালু রাখা হবে এবং ভোটের আগে প্রতিশ্রুতি দেওয়া নতুন প্রকল্পগুলো আগামী ১ জুন থেকেই পুরোপুরি কার্যকরী করা হবে। কিন্তু ভাতার সুরক্ষার পাশাপাশি বড় শিল্প এলেও তা যদি মূলত কর্পোরেট-নির্ভর এবং অনেক ক্ষেত্রে চুক্তিভিত্তিক হওয়ার সম্ভাবনা থাকে, যা বাংলার গ্রামীণ অদক্ষ শ্রমিকদের কতটা সুরাহা দেবে তা নিয়ে সংশয় আছে। যদি ভাতার সুরক্ষা চলে যায় এবং শিল্প কেবল খাতায়-কলমে থেকে যায়, তবে গ্রামীণ অর্থনীতি এক গভীর সংকটে পড়বে।

প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক এই মৌলিক ক্ষেত্রগুলো মূলত সংবিধানপ্রদত্ত ‘রাজ্য তালিকার’ এক্তিয়ারভুক্ত। ক্ষমতার এই বড় পালাবদলের পর নতুন সরকার এই ক্ষেত্রগুলোতে ঠিক কতটা সফল হবে, তা সময়ের সাথেই স্পষ্ট হবে। তবে শাসনের প্রকৃত রূপ কেবল রাজ্য তালিকার এই কয়েকটি বিষয়ের ওপর নির্ভর করে না; এর বাইরেও এমন কিছু ক্ষেত্র রয়েছে, যেখানে কেন্দ্র ও রাজ্যের যৌথ ভূমিকা একটি রাজ্যের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে অনুঘটক হিসেবে কাজ করে।

কেন্দ্র-রাজ্য সমন্বয়: নতুন আশা

ঠিক এই জায়গাতেই নতুন রাজনৈতিক সমীকরণের একটি উজ্জ্বল ও ইতিবাচক দিক ইতিমধ্যেই আশা জাগাচ্ছে । দীর্ঘ পাঁচ দশক পর কেন্দ্র ও রাজ্যে একই দলের শাসন বা ‘ডাবল ইঞ্জিন’ সমন্বয়ের সুফল পশ্চিমবঙ্গ পেতে শুরু করেছে পরিকাঠামো ও সুরক্ষার হাত ধরে।

দীর্ঘদিন ধরে কেন্দ্র ও রাজ্যের রাজনৈতিক টানাপোড়েন এবং জমি জটে আটকে থাকা কলকাতা ও শহরতলির বন্ধ মেট্রো প্রকল্পগুলোর জট অভূতপূর্ব দ্রুততায় কেটেছে। যুদ্ধকালীন তৎপরতায় মেট্রোর কাজ পুনরায় শুরু হয়েছে, যা সাধারণ মানুষের দৈনিক যাতায়াতের দুর্ভোগ অচিরেই কমাবে বলে আশা করা হচ্ছে। প্রশাসনিক ফাইল চালাচালির লাল ফিতের ফাঁস যে কেন্দ্র-রাজ্য সমন্বয়ের মাধ্যমে কত দ্রুত আলগা হতে পারে, এটি তার এক অনন্য উদাহরণ।

একই সাথে, নতুন প্রশাসন রাজ্যের ভূ-কৌশলগত অবস্থানকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে আন্তর্জাতিক সীমান্ত সুরক্ষায় এক নজিরবিহীন ও কড়া পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। দেশের অখণ্ডতা ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বজায় রাখতে, দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক জড়তা ও ভোটব্যাঙ্কের রাজনীতি কাটিয়ে, জাতীয় সুরক্ষার স্বার্থে বিএসএফ-কে (BSF) প্রয়োজনীয় কৌশলগত জমি হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত তড়িঘড়ি নেওয়া হয়েছে। পরিকাঠামো ও সুরক্ষার এই নতুন গতি এবং কেন্দ্র-রাজ্যের এই যুগলবন্দি আমজনতার মনে দীর্ঘদিনের স্থবিরতা কাটার এক নতুন আশা জাগাচ্ছে।

অতীত অভিজ্ঞতার নিরিখে সংশয়

কেন্দ্র-রাজ্য সমন্বয়ের এই প্রাথমিক ইতিবাচক গতি দেখে এবং তৃণমূল জমানার প্রশাসনিক স্থবিরতা থেকে মুক্তি পেয়ে সাধারণ মানুষ আশার আলো দেখলেও, বিজেপির আসন্ন শাসনকাল নিয়ে জনমানসে কিছু গভীর ও মৌলিক প্রশ্নও দানা বাঁধছে। প্রশাসনিক এই রদবদলের চেয়েও আজ বড় জিজ্ঞাসা— বিজেপি শাসনের মূল রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দর্শনে বাংলার জন্য কোনো ইতিবাচক দিক আছে, নাকি এই পরিবর্তনের আড়ালে লুকিয়ে আছে অন্য কোনো সংকট? মূলত অতীত অভিজ্ঞতা এবং বিজেপি শাসিত অন্যান্য রাজ্যের রাজনৈতিক গতিপ্রকৃতিই এই সংশয়গুলোকে উস্কে দিচ্ছে:

পরিচয়বাদী রাজনীতি: বিজেপির রাজনীতির একটি প্রধান স্তম্ভ হলো ধর্ম বা জাত-পাতের পরিচয়ভিত্তিক মেরুকরণ। সাধারণ মানুষের মনে আশঙ্কা, যখন দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, জ্বালানির দাম বাড়া বা বেকারত্বের মতো কঠিন অর্থনৈতিক সমস্যাগুলো সরকারকে বিপাকে ফেলবে, তখন মানুষের নজর ঘোরাতে আবেগ সর্বস্ব ধর্মীয় ইস্যুকে সামনে আনা হতে পারে। যদি প্রকৃত উন্নয়নের চেয়ে ‘ধর্মীয় আবেগ’ বেশি গুরুত্ব পায়, তবে সাধারণ মানুষের রুটি-রুজির লড়াই এবং দৈনন্দিন অভাব-অনটন এক বিন্দুও কমবে না।

দুর্নীতিগ্রস্তদের দলবদল: তৃণমূল জমানার শেষ কয়েক বছরে দেখা গেছে, বহু বিতর্কিত ও দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত প্রভাবশালী নেতা ভোল বদলে বিজেপিতে নাম লিখিয়েছেন। যাদের হাত ধরে রাজ্যে ‘কাটমানি’ বা সিন্ডিকেট রাজ প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছিল, তারাই যদি নতুন সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসেন, তবে দুর্নীতির অবসান ঘটবে কীভাবে? এক্ষেত্রে আশঙ্কা – কেবল দুর্নীতির পদ্ধতি বদলাবে; হয়তো সরাসরি ‘কাটমানি’র বদলে নতুন মোড়কে কর্পোরেট নিয়ন্ত্রিত এক ‘কমিশন রাজ’ শুরু হবে, যেখানে সাধারণ মানুষের শোষণ বজায় থাকবে।

স্বায়ত্তশাসন খর্ব হওয়ার ঝুঁকি: ‘ডাবল ইঞ্জিন’ সরকারের অন্যতম বড় ঝুঁকি হলো রাজ্যের স্বায়ত্তশাসন খর্ব হওয়া। বিজেপি শাসিত অনেক রাজ্যে দেখা গেছে, প্রতিটি ছোট-বড় নীতি নির্ধারণ বা প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের জন্য রাজ্য নেতৃত্বকে দিল্লির মুখাপেক্ষী হয়ে থাকতে হয়। এর ফলে বাংলার নিজস্ব ইতিহাস, ভাষা, সংস্কৃতি এবং বিশেষ কিছু আঞ্চলিক সমস্যা (যেমন গঙ্গা ভাঙন বা সুন্দরবনের পরিবেশ রক্ষা) দিল্লির জাতীয় রাজনীতির চাপে গুরুত্ব হারাতে পারে। একটি শক্তিশালী যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোয় রাজ্যের যে স্বকীয়তা থাকা প্রয়োজন, দিল্লির অতি-নিয়ন্ত্রণে তা দুর্বল হয়ে পড়ার সম্ভাবনা প্রবল।

কর্পোরেট আধিপত্য: বিজেপির অর্থনৈতিক মডেল মূলত বড় পুঁজি এবং কর্পোরেট বিনিয়োগের ওপর নির্ভরশীল। আশঙ্কা করা হচ্ছে, শিল্পায়নের দোহাই দিয়ে কৃষিজমি অধিগ্রহণ বা প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর কর্পোরেট নিয়ন্ত্রণ বাড়তে পারে। তৃণমূলের আমলে যেমন স্থানীয় নেতাদের ‘তোলাবাজি’ ছিল বড় সমস্যা, বিজেপি জমানায় তেমনি বড় সংস্থার বাণিজ্যিক স্বার্থ যদি সাধারণ মানুষের জীবন-জীবিকাকে ছাপিয়ে যায়, তবে প্রান্তিক মানুষের জন্য তা হবে আরও বড় দীর্ঘমেয়াদী বঞ্চনা।

বর্তমানের রূপরেখা

২০২৬-এর এই ঐতিহাসিক পরিবর্তন কি সত্যিই বাংলার মানুষের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের স্থায়ী সমাধান করবে, নাকি এটিও নিছক এক রাজনৈতিক মোহভঙ্গ হিসেবেই শেষ হবে? তাত্ত্বিক এই সংশয়গুলোর সমান্তরালে এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, নতুন প্রশাসনের প্রাথমিক কিছু কড়া পদক্ষেপ এবং সিদ্ধান্ত আমজনতার মনে দীর্ঘদিনের স্থবিরতা কাটার একটা ইতিবাচক আবহ তৈরি করেছে। পরিকাঠামো উন্নয়নে মন্থর গতি আনা, সুশাসনের স্বার্থে কিছু প্রশাসনিক রদবদল, কিংবা সামাজিক সুরক্ষার ধারাবাহিকতা বজায় রাখার প্রতিশ্রুতি— নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষকে এক ধরণের তাৎক্ষণিক আশার আলো দেখাচ্ছে। কিন্তু এই সাময়িক ‘আশা’ আর দীর্ঘমেয়াদী ‘বাস্তবায়ন’-এর চাবিকাঠি কার হাতে, তা নিয়ে একটি রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক স্পষ্টতা থাকা প্রয়োজন। আমাদের মনে রাখা দরকার, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা করা, তোলাবাজি দমন কিংবা সামাজিক প্রকল্পগুলোর সুষ্ঠু দেখভাল করা সম্পূর্ণভাবে রাজ্য সরকারের নিজস্ব সদিচ্ছা ও এক্তিয়ারের বিষয়। অন্যদিকে, বড় রেল বা মেট্রো পরিকাঠামো এবং আন্তর্জাতিক সীমান্ত সুরক্ষার মতো বিষয়গুলো সরাসরি কেন্দ্রীয় সরকারের নীতি ও নিয়ন্ত্রণের অধীন। ফলে, কেন্দ্র-রাজ্যের এই যৌথ সমীকরণে কে নিজের ভাগের দায়িত্ব কতটা পালন করছে, তার ওপরই নির্ভর করছে এই পরিবর্তনের ভবিষ্যৎ।

বাংলার মানুষ কেবল অনুদান বা প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরি চায় না, তারা চায় আত্মমর্যাদা এবং স্থায়ী কর্মসংস্থানের গ্যারান্টি। একইসাথে তারা এমন এক সুশাসন প্রত্যাশা করে, যা দিল্লির অন্ধ অনুকরণে না চলে বাংলার মাটির মানুষের প্রকৃত প্রয়োজন বুঝে কাজ করবে। কেন্দ্র ও রাজ্যের এই নতুন সমীকরণ যদি নিয়োগে প্রকৃত স্বচ্ছতা আনতে না পারে, পুলিশ যদি কেবল এক রাজনৈতিক প্রভুর বদলে অন্য এক আদর্শগত প্রভুর আজ্ঞাবহ যন্ত্র হিসেবেই থেকে যায়, এবং প্রকৃত উন্নয়নকে ছাপিয়ে যদি পরিচয়বাদী স্লোগানই মুখ্য হয়ে ওঠে— তবে এই ঐতিহাসিক পরিবর্তন সাধারণ মানুষের কাছে স্রেফ “মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ” হয়েই রয়ে যাবে।

সহযোগিতার হাত বাড়াতে ওপরের ছবিতে ক্লিক করুন

[লেখকের পূর্ব রচনা]

[পরম্পরা ওয়েবজিন, জুন ২৬, সূচিপত্র – এখানে ক্লিক করুন]

0 0 ভোট
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
পংক্তির ভেতর মন্তব্য
সব মন্তব্য