(টারজান)

টুকাইদের বাড়িতে একটা নতুন ধরনের বাক্স এসেছে। রাসমেলায় একটা লোক বড় একটা মুড়ির টিনের মত বাক্স নিয়ে যেদিকেই যায়, সেদিকেই ছেলে-মেয়েরা তার পিছু নেয়। বাক্সটার সামনে কতগুলো ঢাকনা। ঢাকনা খুলে উবু হয়ে একচোখ বন্ধ করে একহাত কপালের কাছে ধরে ভিতরে দেখতে হয়। ভিতরে সিনেমার ছবি দেখা যায়। কী ভীড়! ঠেলাঠেলি করে দেখতে হলেও দারুণ লাগে। শুনলাম টুকাইদের বাড়িতে যে বাক্সটা এসেছে ওটার দরজা খুললে সাদাকালো চলমান ছবি দেখা যায়। কাকাই বলল ওটাকে টেলিভিশন বলে। ওতে অনেককিছু দেখা যায়। টুকাইয়ের তখন কী গর্ব! আমাকে নিশ্চয়ই দেখতে দেবে, আমি তো টুকাইয়ের বন্ধু। আমারও আনন্দ হচ্ছে খুব। বাড়ির উঠোন থেকেই দেখতে পাচ্ছি টুকাইদের বাড়ির ছাদের উপর একটা বড় লম্বা পাইপ, তার মাথায় মাছের কাঁটার মত দেখতে ছোটো একটা জিনিস। ওটা নাকি অ্যান্টেনা। সারাদিন কাক বসে থাকে ওটায়। মাঝেমাঝে দেখি ওটা এদিক-ওদিকে সরে সরে যাচ্ছে। কাকাই বলেছে ওটা ঘোরালে টিভিতে স্পষ্ট ছবি আসে। টুকাই বলেছে রবিবার করে টারজান-এর সিনেমা দেখায়, বন্ধুরা মিলে দেখব বরিবার দুপুরে।

লোকটা কী সুন্দর! আনন্দমেলার পাতায় যে টারজানের কমিকস পড়ি, অনেকটা তেমন। জঙ্গলে খালি গায় থাকে। গাছের ঝুরি ধরে আ-আ-আ-আ-আ-আ-আ করে অদ্ভুত একটা সুর তুলে চিৎকার করে, তারপর একডাল থেকে অন্য ডালে, এক ঝুরি থেকে অন্য ঝুরিতে লাফ দিয়ে কী তাড়াতাড়ি চলে যায়! ওর ডাকে শিম্পাঞ্জি, বানর, বাঘ আর জঙ্গলের আদিবাসীরাও এক হয়ে দুষ্টু লোকদের ঢিসুম-ঢুসুম করে পিট্টি দেয়। রবিবার করে সব বন্ধুরা টুকাইদের বাড়িতে টারজান দেখি। সিনেমা শেষ হয়ে গেলে রাস্তায় বেড়িয়ে বিজু টারজান সাজে আর অঞ্জন, তনু টারজানের হাতে পিট্টি খায়। এটা টারজান-টারজান খেলা অবশ্য। টুকাইদের বড়বাগানটা কী বড়! কত গাছ। গুনেও শেষ করা যায় না। টুকাই চালতা গাছের উপর থেকে টারজানের মত লাফ দিয়ে নিচে পড়ে, আর আমাদের পিট্টি দেয়। আমাদের ‘দুষ্টু লোক’ সাজতে বলে, ও টারজান সাজে। প্রতি বোববার সকালে আমরা বড়বাগানে খেলি। বাঁশ কেটে ‘চাকু’ বানিয়েছে টুকাই। আমার একটা খেলনা বন্দুক আছে, কাকাই কিনে দিয়েছে রাসমেলা থেকে। অমন বন্দুক আরও কয়েকজন বন্ধুরও আছে। আমরা দুষ্টু লোক সাজি। টুকাই না খুব জোরে আমাদের পিট্টি দেয়, কী ব্যথা লাগে!

টুকাই বলেছে, টারজান, মহম্মদ আলী আর ব্রুস-লি’র মধ্যে মারপিট হলে ব্রুস-লি নাকি জিতবে। টুকাইয়ের চারটা বক্সিং গ্লাভস্ আছে। ও দার্জিলিংয়ে পড়ে। শীতের ছুটিতে বাড়িতে আসে। আমরা বক্সিং খেলি। আমি তো অত ভালো পারিনা খেলতে। টুকাই ‘মহম্মদ আলি’র মত করে আমার নাকে ঘুসি দেয়। আমি প্রতিবারই হেরে যাই। ধুর, এরচে আমি ব্রুস-লি হব। কাকাই একটা নান-চাকু বানিয়ে দিয়েছে। আমি ওটা নিয়ে ঘুরি। অনেক বন্ধুরই অমন নান-চাকু আছে। আমরা সবাই ব্রুস-লি হব। আমার তো নেফ্রাইটিস হয়েছিল, তাই বাড়িতে দাদু কাকাই বলে খুব বেশি ছোটাছুটি যেন না করি আরও কয়েকবছর। তাই নিজেকে ব্রুস-লি ভাবলেও বেশিক্ষণ খেলতে পারি না। হাঁপ ধরে যায়। আমি মাঠের ধারে বসে টারজান,মহম্মদ আলি আর ব্রুস-লির লড়াই দেখি— বন্ধুরা খেলছে যে! টিভির টারজানের নায়িকাটা কী সুন্দর! টারজান ওকে বারবার বাঁচায়, বন্ধুরা বলে নায়িকা নাকি টারজানের ‘ইয়ে’, আমাদের সবার চোখে তখন কেমন জানি স্বপ্ন খেলতে আরম্ভ করে! আমি তো স্বপ্ন দেখি। বাড়িতে আমি নিজেকে টারজান ভাবি আর টারজানের একটা নায়িকা বানিয়ে নিই। তারপর মনেমনে নায়িকার সাথে টারজান-টারজান খেলি। তখন টুকাই, বিজু, অঞ্জন— ওদের সব্বাইকে মনেমনে খুব পেটাই।

হাডুডু খেলার মাঠে বিকেলে টারজান-টারজান খেলার সময় ‘মিষ্টি’ নামের বন্ধুটা টারজানের নায়িকা সাজে। আমারও টারজান হতে ইচ্ছে করে। বন্ধুরা বলে— ” তুই তো কালো, কালো মানুষ কখনও টারজান হয়? তুই জংলিই সাজবি।” এটা শুনলে আমার খুব কষ্ট হয়। আমাকে একদিনও টারজান সাজতে দেয় না কেন? আমি কালো যে, তাই সব বন্ধুরা আমাকে ‘কালু’ বলে। খেলার সময় সবাই আমাকে টারজানের দলের জংলি বা দুষ্টুলোকদের একজন বানায়। আচ্ছা, কালো হলেই কি টারজান হতে নেই? কালোদিদা আমাকে বলেছে কষ্ট যেন না পাই। বলেছে, বন্ধুরা ‘কালো’ বললেই আমি যেন ওদের বলি—”কালো জগতের আলো, ধলা পায়ের তলা”, আমি না এসব কথা বন্ধুদের কিছুতেই বলতে পারি না! সবাই কালো বলে, স্কুলের বন্ধুরাও বলে। কষ্ট হয় খুব। তখন মনেমনে নিজেকেই বলি— ‘দেখিস, একদিন আমি খুব ‘ফরসা’ মেয়েকে বিয়ে করব। করবই করব। দেখে নিস একদিন। টারজানের নায়িকার মত ‘ফরসা’ আর ‘সুন্দর’ একটা বৌ আমার হবে, দেখিস…’

সহযোগিতার হাত বাড়াতে ওপরের ছবিতে ক্লিক করুন

[লেখকের পূর্ব রচনা]

[পরম্পরা ওয়েবজিন, মে ২৬, সূচিপত্র – এখানে ক্লিক করুন]