একটা প্রায় নষ্ট ছবি অনেক গল্পকথার প্রতিচ্ছবি যেন ফিরিয়ে দিয়ে গেল। ছবিটা কলেজ প্রাক্তনী গ্রুপে পোস্ট করেছিল সিঙ্গার রাকেশ। সিঙ্গার রাকেশ এখন বোম্বের প্রতিষ্ঠিত গায়ক। একই ফ্রেমে ওদের সাতাশির ব্যাচের মালঞ্চ গ্রুপের সবাই। টুয়েলভের ক্যাওড়া ব্যাচ বলতে যা বোঝায় ঠিক তাই। মঞ্চের ঠিক নিচে হাতে বোনা লতাপাতায় আঁকা উলের সোয়েটার গায়ে সিঙ্গার রাকেশ আর পাশে ফুলহাতা সোয়েটার গায়ে কলেজের সাতাশির ব্যাচের বেস্ট গোলকিপার পদ্মনাভ দাশগুপ্ত।

প্রাক্তনী ব্যাচের শিপ্রাদি এবারে মে মাসের টপিক দিয়েছিলেন – ‘সেদিনের ছবি হোক এদিনের ছবি রবি’। নানা ছবি পোস্ট করছে নানা ব্যাচের নানা ছেলেমেয়েরা। বেশিরভাগই ন্যাশনাল থার্টি ফাইভ বা কোডাক ক্রোমায় তোলা। দু একটা এস এল আর’এর তোলা ছবিও দিয়েছে। এগুলো থেকেই নানা গল্প মনে করাচ্ছে অনেক প্রাক্তনী। পছন্দের আনকোরা গল্পগুলো নিয়ে একটা মজাদার গল্পের আসর বসবে এবারের প্রাক্তনীদের মিলন উৎসবে। শীতের রোদে প্রতিবারই বার্ষিক মিলন উৎসবে অন্যান্য অনুষ্ঠানের সাথে থাকে ডাউন মেমোরি লেনে – স্মৃতিচারণের একটা হাফ অ্যান আওয়ার ওয়াক। শিপ্রা দি নতুন সেক্রেটারি হিসাবে এবার সেটার সাথে জুড়ে দিয়েছে আধঘন্টার নতুন প্রোগ্রাম – ব্যাক পাশে গোল। এবার কলেজের নতুন সেক্রেটারি বিরাশির ব্যাচের শিপ্রা ভাদুড়ী। নরসিংহ দত্ত কলেজের প্রাক্তনী সংসদের নতুন কমিটি। ইংলিশের হেড ডি পি। হেব্বি মিশুকে। হেব্বি মজাদার। জানিয়েছেন – নিয়ম যথা সময়ে।

হোয়াটস অ্যাপে প্রাক্তনী গ্রুপটা সারাদিনের অফিসের ক্লান্তিকে যেন এক ঝটকায় নামিয়ে দেয় প্রতীতি আর তীর্থর। প্রতীতি সান্যাল আজও ট্রিনিটির প্রোফেসর হয়েও কলেজের এক্স মিটে আসে মাঝেমধ্যেই। এবারে আসছে তীর্থর গার্লফ্রেন্ড হয়ে। তীর্থ মানে তীর্থঙ্কর দত্ত সে যুগের কলেজ টিমের বেস্ট সেন্টার ফরোয়ার্ড। আজ ডেল এর চিফ মার্কেটিং ম্যানেজার। ছবিটা দেখেই প্রতীতি চেঁচাল – শুনছো। রাকেশের পোস্টে তোমার ছবি!

বাথরুম থেকে তোয়ালে গায়ে বেরিয়ে ঘরে ঢুকে বউএর হাত থেকে মোবাইলটা ছিনিয়ে বলল – কারেক্ট। তোমার মনে আছে! ছবিটা আমি তুলেছিলাম। কলেজ সোশ্যালের দিন বাপির এস. এল. আরে। তুমি দূরে দাঁড়িয়েছিলে। আর সেদিনই তো …

‘ একদম চুপ। ওসব কথা একবারই শোনা যায়। হাসতে হাসতে তার প্রাণের প্রতীকে জড়িয়ে ধরল – ছবিটা তোলার পরই পদ্ম বলছিল – পেছন ফিরে দেখ, তোমার প্রতীতি ইজ রেডি টু বিকাম ইওর লাইফের অতিথি। কত কষ্ট করে সেদিন ঐ ছবিটা তুলতে পেরেছিলাম বাবা, ধন্যি মেয়ে – বলতে বলতে হাতের মোচড়ে বক্ষলগ্না করে বলল – এই ছবিটা আবার সেই দিনটাকে ফিরিয়ে দিচ্ছে। আজ খুব ঐ প্রতীতিকে পেতে ইচ্ছে করছে, বলে বেডরুমের ওপরের একটা সুইট এইট্টিন এর মেয়ের দুপাশের বেনি ঝোলানো ছবিটা দেখাল।

‘ আঃ ছাড়ো। কি হচ্ছে? যাচ্ছি তো আমরা এবারের মিটে। সেদিন তোমায় পুরোনো হার্ট থ্রব প্রতীকে পাবে। এখন ছাড়ো। তিস্তা পাশের ঘরে। সেকেন্ড রিলেশনটাও ব্রেক করার পর ও খুব ডিপ্রেসড্‌।

‘ খুব চিন্তা লাগে গো। আমরা তো কাটিয়ে দিলাম জীবনটা একসাথে। ওর যে কী হবে? আমরা তো চিরকাল থাকব না। সৌহার্দ্যর সাথে ঠিক সেভাবে অ্যাডজাস্ট হল না। আকাশের সাথেও একইভাবে ব্রেকআপ হল। তোমার আমার মেয়ের এত সমস্যা হওয়ার কথা নয় কিন্তু।

প্রতীতিকে ছেড়ে ট্রাউজার পরতে পরতে তীর্থ বলল – শৈলেনদাকে মনে আছে প্রতী?

‘ হ্যাঁ, হ্যাঁ। ছড়াকার শৈলেন দত্ত। ছোট্ট খাট্টো মজাদার লোক। কেন কী হল?

‘ শৈলেন দা একবার আমাকে আর তোমাকে দেখে একটা গল্প শুনিয়েছিলেন কলেজের মনে আছে? লাভ আর লাইকের গপ্পো, মনে আছে?

‘ হ্যাঁ, হ্যাঁ খুব মনে আছে। প্রিন্সিপাল এর স্ত্রীর গল্প ভুল করে ভুল ব্যবহার হয়েছিল লাভ আর লাইকের। গতবারের ম্যাগাজিনেও দেখলাম লিখেছেন গল্পটা।

‘ এক্স্যাক্টলি। আমাদের মেয়ে তিস্তাদের জেনারেশনের সেম প্রবলেম হচ্ছে গো – লাভ আর লাইকের ডিফারেন্সটা ধরতে পারছে না। বুঝতে পারছে না, সব লাইকে লাভ হয় না। লাভার হতে গেলে লাইকারের লাভটা না দেখেই ভালবাসতে হয়।

‘ হাতটা ধরে টেনে বিছানায় স্বামীকে বসাল প্রতীতি – আচ্ছা লাভার বাবু আপনি কি ছবি ক্লিক করার আগেই বুঝেছিলেন লাইকারের লাভটা কোথায়?

প্রাণের প্রতীকে আবার জড়িয়ে ধরে তীর্থ বলল ‘ আজকে মোবাইলে লাইকের মধ্যে না হয় লাভ অপশন আছে। কিন্তু তবুও তা তিস্তারা বোঝে না। কিন্তু আমাদের সময়ে তো ছিল না। তবুও তো চোখের বিশ্বাসই বলে দিত – কোনটা লাভের চাউনি, কোনটা লাভের গুড়।

আজকের এই অনুষ্ঠান লাভ লোকসানের বাইরের এক অতীত ছুঁয়ে থাকার অনুষ্ঠান। অতীতের ভাল লাগার, ভালবাসার আর ভাল থাকার মধ্যে একটু টাইম ট্র্যাভেল করতেই আজ একটা ছোট্ট ব্যাক পাশে পিছিয়ে খেলব – আমরা। তাই আজ সব্বাই আমাদের নিজের নিজের প্রফেশনাল চরিত্রটা বাইরে ঝুলিয়ে রেখে সেই সময়ের পরিচয় আর কার্ডটা নিয়ে কলেজের মেন বিল্ডিং এর প্রাঙ্গনে ঢুকেছি। আর বেরিয়েও যাব সেই স্মৃতিগুলোকে নাড়াচাড়া করতে করতে, তাতে আর কিছুই হবে না – হবে আমাদের ব্যস্ত ব্যতিব্যাস্ত জীবনের ধারাবাহিকতার বাইরের একটা অন্য ধারাপাত। সেই ধারাপাত থেকেই হয়তো খুঁজে পেতে পারি অন্য কোন না মেলা উত্তর – অতীতের বা বর্তমানের বা ভবিষ্যতের। উদ্বোধনী ভাষণ দিচ্ছেন প্রাক্তনীর সম্পাদিকা শিপ্রা ভাদুড়ি, হেড ডিপ ইংলিশ।

গাড়িটা মেন গেটের বাইরে পার্ক করে মেন বিল্ডিং এর লম্বা বনবীথিটা ধরে হাঁটছে তীর্থ আর প্রতীতি। হাতটা ধরেই রেখেছে। প্রতীতি বলল – সত্যি এখনও শিপ্রা দি আগের মতনই সুন্দর বলে তাই না! পি.এন.বি. আর ডি.পি.বি. দু’জনেই বলতেন – শিপ্রা ইউনিক। জাস্ট অসাধারণ বক্তা।

‘ ওরে প্রতীর হাত কেউ ধরবে না রে।

‘ কলেজে হাত ধরাধরির বয়স পেরিয়ে গেছে গুরু – দুটো কমেন্টসেই তাল কাটলো তীর্থ আর প্রতীতির। সিঙ্গার রাকেশ আর পদ্মনাভ।

প্রতীকে ছেড়ে দৌড়ে গেল তীর্থ – শালা, এত বছর বাদ। খেলাটা ছাড়লি কেন?

পদ্ম চেঁচাচ্ছে ‘ শালা বিদেশে বসে বসে খেলবে। মাল কামাবে। আর এখানে খেলা হবে কিনা খোঁজ নেবে একদিন।

দুজনেই দুজনকে জড়িয়ে ধরেছে। তীর্থর কাঁধে হাত রেখে কানের কাছে মুখ নিয়ে এসে বলল – ছাড়তাম না রে বিশ্বাস কর। ইস্টবেঙ্গলের মতন ক্লাব। কত গোল সামলালাম। শুধু রিয়াকে নিয়ে গিয়ে ভগবান বড় গোলটা দিয়ে গেল। আমাকে আর মৈত্রেয়ীকে। আটকাতে পারলাম কৈ?

কথাটা শুনেছে রাকেশ আর প্রতীতি। চিৎকার করে উঠল – দেখার শুরুতেই এসব চলবে না। তোরা থামবি। আমার মেয়েটাও তো থ্যালাসেমিক। কোন গানটা গাই না বল? রীণা পারে না। কাঁদে। আজও এলো না। কতবার বললাম, বলল – মেয়ে একা থাকবে।

প্রতীতি সামলাল – ওমা আমি ভাবলাম, মৈত্রেয়ী, রীণা আসবে। কথা হয় ঠিকই। কতদিন পর দেশে এলাম। আড্ডা মারব চুটিয়ে।

সিঙ্গার রাকেশ চোখের সানগ্লাসটা মাথায় তুলে বলল – দুজনেরই এক কথা – ভাল লাগে না আর। এখন বাকি জীবনটা কাটানোই আসল কাজ। কী হবে পুরোনো দিনে ফিরে গিয়ে? সাময়িক আনন্দ, ফিরলেই তো সেই রূঢ় বাস্তব। জানি সব। কী বলি বল তো? দূরের দিকে তাকিয়ে আছে রাকেশ – ঐ দ্যাখ কে আসছে।

ওরা সবাই ফিরল। দ্যাখে দূরে গেট দিয়ে ঢুকছে ওদের মালঞ্চ গ্রুপের সৌমেন্দু রায় আর ওদের বান্ধবী আর ওর স্ত্রী বিশাখা।

রাকেশ বলল – কিছুতেই আসবে না। কী যুক্তি না আমরা একটা সাধারণ গ্রোসারি চালাই। ওখানে সব মালদার আর পায়াভারি লোকজনদের আড্ডা। মেলাতে পারব?

কাঁচা খিস্তি করলাম। শালা আমাদের সঙ্গে আড্ডা দেবে তাতে পাওয়ার দেখাচ্ছো? পেছনে একটা লাথি দেবো। যাক কথা রেখেছে।

কথা তোমরা আমারও রেখেছো – শিপ্রাদির ব্যালান্সড টোনে ওরা ঘুরে গেল। প্রতী বলল – আপনার ভাষণ আজও ডি.পি.বি. আর পি.এন.বি. মনে করাল।

‘ রিয়েলি? থ্যাঙ্কস। সেই মিষ্টি হাসি মুখে ছড়িয়ে শিপ্রা বলল – তুমি তো এখন এন.আর.আই। তোমাদের টিমটা মনে আছে খুব। আজকের ব্যাক পাশে গোল ইভেন্টে তোমাদের টিমটাকে সিলেক্ট করা আছে। রেডি হও। খাওয়া দাওয়া করো। এনজয় করো। আফটার লাঞ্চ ব্রেক – উই উইল স্টার্ট টু প্লে – ‘ব্যাক পাশে গোল’।

‘কেসটা কী বল তো?’ সিঙ্গার রাকেশ, পদ্ম আর তীর্থর দিকে তাকিয়ে প্রশ্নটা করল।

‘ জানি নারে। লেটস সি। চল খাওয়ার দিকে যাওয়া যাক। বলে দূরে দাঁড়ানো ওদের এইট্টি সেভেন ব্যাচের আরও কিছু চেনা মুখের দিকে ওদের নিয়ে এগোতে চাইল তীর্থ।

দুপুর অবধি কাটল দারুণ। স্ন্যাকস, কফি থেকে শুরু করে পাঁচ রকম খাবারের লাঞ্চ এর মাঝে সব্বাই মিলে পুরোনো ক্লাসের টাচ নিয়েছে রুমে রুমে ফটো সেশন করে। ভীষণ থ্রিলিং ব্যাপার এটা ওদের কাছে। সেই ব্ল্যাক বোর্ড, সেই রুম নাম্বার টুয়েন্টি, টুয়েন্টি ওয়ান, টুয়েন্টি নাইন। প্রতীতি বলেই ফেলল – এক আছে প্রায়। বিদেশের ক্লাস রুম কত আপডেটেড। কিন্তু এখানে যেন একটা মায়া জড়িয়ে থাকে। তীর্থ খেলোয়াড় সুলভ মনোভাবের ছেলে – ওটা ফ্যাক্টর নয়। ওখানকার এক্সরাও একই মায়ায় থাকে পরে আসলে। মাঝে রুম নাম্বার টুয়েন্টিতে ও প্রতীকে একা পেয়ে একটু কাছে টেনে বলতে গিয়েছিল – মনে আছে সেই বর্ষার দিনটার কথা? প্রথম ঠোঁট ছোয়ানোর… কথাটা শেষ করার আগেই ঘরে ঢুকল সৌমেন্দু আর বিশাখা। প্রতী দ্রুত সরল। হঠাৎ সিঁড়ি থেকে চিৎকার ভেসে এল পদ্মর – এইখানেই জি.ডি.বি. ধরেছিল আমাকে কলেজ কাটছিলাম ইস্টবেঙ্গল – মোহনবাগান ম্যাচ দেখতে যাব বলে। আর আজ ইস্টবেঙ্গল ক্লাব বসে আছে যদি যাই একবার। পিঠে হাত বুলিয়ে তীর্থ বলল – চল লাঞ্চ করি। প্রতীতিও যোগ দিল – শিগগির চল। লাঞ্চের সাথে ডাউন মেমোরি লেনের গল্পগুলোও শুনবো। মেন বিল্ডিং এর চাতালে বসে ডাউন মেমোরি লেনে নানা প্রফেসরের নানা ঘটনা, নানা ব্যাচের গপ্পোকথা শুনতে শুনতে প্রতীতি ভুলেই গিয়েছিল ও এক অধ্যাপিকা। বিশেষত ডি.পি.বি. র সম্পাদনায় চলচ্চিত্র পত্রিকার গপ্পো বলছিলেন এক সিনিয়র। যে পত্রিকার সম্পাদনা করতেন যৌথভাবে সত্যজিৎ রায়। তীর্থ বলল – তোমার কাছে আছে না পত্রিকাটা? প্রতী বলল – হ্যাঁ আছে সল্টলেকে দাদার কাছে। এস.কে.এস. দিয়েছিলেন। পদ্ম বলল – কোন এস.কে.এস.? কেন ইকনমিক্সের এস.কে.এস. ‘ ওনার কাছে দুটো ছিল। দাদা ইকনমিক্সে ভাল মার্কস পাওয়ায় স্যার গিফট করেছিলেন। এরমধ্যেই হয়ে গেল লাঞ্চ ব্রেক।

লাঞ্চ ব্রেকের পর শুরু হল সেই মজাদার ব্যাক পাশে গোল। শুরুতেই শিপ্রাদির মোহময়ী গলা জানিয়ে দিল – ব্যাক পাশ গেম। এক জীবনের ফুটবলের পাশ। ফিফার একটি নিয়ম আছে – ব্যাক পাশ রুল। ওপোনেন্টকে অক্ষম করে বল নিজেদের মধ্যে ফিরিয়ে খেলতে খেলতে হঠাৎ অ্যাটাক। নিজেদের গোলকিপারকে বল যোগানো যায়, তবে পায়ে। সেও খেলবে পায়ে। হাত দিলেই পেনাল্টি। গোলকিপারের ক্ষেত্রেই এই নিয়ম। বাকিদের হলে হ্যাণ্ডবল। তো আমি মানে আমরা এই গোল দেওয়ার কৃতিত্ব দিয়ে বেছেছি বিভিন্ন ব্যাচের দশজন কাপেলকে। যারা ব্যাক পাশ দিয়েই নিজেদের জীবনে গোল দিয়ে জীবন সাথী বা জীবন সঙ্গীনীকে পেয়েছেন এই কলেজেই। তাঁদেরকে একটি করে গাছ গিফট করা হবে। এই নির্বাচন একেবারেই র‍্যাপিড। প্রত্যেক বছর নানাভাবে বাকিদের ডাকা হবে। গ্রুপের ছবি যারা পোস্ট করেছেন তাদেরকেই ডেকেছি। আর তাঁদের ঐ গোল করার সময়ের জীবনের খেলার গল্প শুনব ছোট্ট করে। আর সেই সময়ের বিখ্যাত পাঁচ জন কলেজ গোলকিপারকেও নেব। তাঁরা তাঁদের ব্যাচের এই গোলদাতাদের গোল দেওয়ার কাহিনীর বিশেষ অংশটায় মজার ঘটনা বলে বাঁশি বাজাবেন। হাততালি পড়ল খুব।

ওদের এইট্টি সেভেনের মালঞ্চ গ্রুপ ফুল ডাক পেয়েছে সিঙ্গার রাকেশের জন্য। অন্যান্য ব্যাচের বেশিরভাগই মুখ চেনা। সবাই এই কলেজেই পড়াশুনো করেছে হায়ার সেকেণ্ডারি বা প্রি ইউনিভার্সিটি থেকে। পুরোনো প্রেমের গল্পে মজবুত ভিতের রহস্যটা কী? ‘ মাঝপথে প্রশ্ন ছুঁড়লেন শিপ্রা দি। প্রতীতি মাইক্রোফোনটা হাতে নিয়েই পালটা প্রশ্ন ছুঁড়ল – পাক্কা জোড়। লাইকের লাভটা ঠিক চেনার শক্তি। যেটা আমাদের ছেলেমেয়েরা পারছে না। তাতে সম্পর্কটা টিকছে না, যেমন – আমার মেয়ের টেকে নি। পদ্মও যেন তৈরি ছিল। বলল – প্রতী আর তীর্থর ব্যাক পাশে বল আমি টেনে নিয়ে গিয়েছিলাম প্রতীর দাদাকে বলে। আর তীর্থ আমার আর মৈত্রেয়ীর বল ঠেলে পাশ করেছিল আমার দিদিকে। কারণ আমার দিদি ছিল তীর্থর দিদির বন্ধু। আজ কোথায় সেই দাদা দিদিরা যারা রেফারি হয়ে অফ সাইড দেখেও বাঁশি না বাজিয়ে গোল করতে দিয়েছে। আমার মেয়েই তো পারল না। মতে মিলল না। আমাকে আর মৈত্রেয়ীকে না জানিয়ে চলে গেল না ফেরার দেশে। হাউহাউ করে কাঁদছে মাইক্রোফোন নিয়ে। আর বলছে – মৈত্রেয়ীকে কত করে বললাম – চল একটু হালকা হয়ে আসি কলেজে গিয়ে। বলল – যেও না, ভারি হয়ে ফিরবে। তাই হল।

স্তব্ধ হয়ে গেল চত্বর। বোঝা যাচ্ছে অনেকেরই একই অভিজ্ঞতা। শিপ্রা দি সামলালেন নিজের দক্ষতায়। বললেন – জানতাম না, এত হৃদয়বিদারক বাস্তব উঠে আসবে। তবে এটাই বাস্তব। আজকের জেনারেশনে ব্যাক পাশের কোন প্রশ্নই নেই। আছে শুধু ফরোয়ার্ডে পাশ। ফলে মজাটাই হারাচ্ছে। পদ্মনাভর দুঃখের সাথী আমরা সবাই। তারই মধ্যে ডেকে নিলেন সৌমেন্দু আর বিশাখাকে। সৌমেন্দু এত ভাল কথা বলবে কেউ ভাবে নি। মাইক নিয়েই বলল – মূল সমস্যাটা হায়ার সেকেণ্ডারিটা কলেজ থেকে চলে গিয়ে। আমার আর বিশাখার প্রেম তো ইলেভেনে। টুয়েলভ কেটে গেল। ফার্স্ট ইয়ারে জুড়ল এই পদ্মনাভ মালঞ্চ গ্রুপ খুলে দীঘা এক্সকার্শনে। আজ তো হায়ার সেকেন্ডারি স্কুলে। সেখান থেকে কলেজে আসে ক’জন? কলেজের মজা মারে ক’জন? সবাই প্রফেশনাল কোর্সেই বিচ্ছিন্ন। বন্ধু বান্ধবীর ক্ষেত্র হয়েছে ঐ ফেসবুক। ফলে ঘটছে এইসব। আমার ছেলেরা দু’জনেই এই কলেজেই পাশ করেছে। এখান থেকেই বউ তুলেছে আমাদের মতন। চারদিকে হাততালির জোয়ার। পদ্মনাভ অনেকটা সামলেছে ‘ আজকের বেস্ট বেস্ট গোলদাতা। শিপ্রা দি বললেন – কারেক্ট। আর এদের ওনারে গান শোনাবে বম্বের বিখ্যাত সিঙ্গার রাকেশ। সিঙ্গার রাকেশকে পাওয়া এক সৌভাগ্যের। বাংলা, হিন্দি গান শোনালো খান পনেরো।

গান শেষে সূর্য ঢলেছে পশ্চিমে। ওরাও চুপচাপ হাঁটছে মেন বিল্ডিং এর পাশের বনবীথি ধরে। সবাই চুপ, ওদের সঙ্গে সঙ্গেই শিপ্রা দি। নিস্তব্ধতা ভাঙলেন উনিই – প্রতী তোমার মেয়ের ব্যাপারটা আর পদ্মর ব্যাপারগুলো আমি জানতাম না। ইনফ্যাক্ট আমি আমাদের নেক্সট জেনারেশনটার ব্যাপারটা নিয়ে ভাবি নি। ভাবিনি – এরাও পার্ট অফ আওয়ার লাইফ। ব্যাক টু গোলে আমাদের মজা। ওদের না পাওয়াটার দায়ও আমাদের ওপরেই বর্তায় না? সরি, এক্সট্রিমলি সরি। তীর্থ সামলাল – নো প্রবলেম। আপনি একটা কনসেপ্ট নিয়ে কাজ করেছেন তাতে কী? সত্যটা বেরিয়ে আসছে।

কলেজের স্টাফ রুমের বিল্ডিং এর পাশ দিয়ে যাচ্ছে। তীর্থ যোগ করল – ওপরে যান। পি.এন.বি. দেখবেন ঠিক বলছেন”’ বি পারফেক্ট। তোমার থিঙ্কিং পারসেপসন এসেনশিয়াল। মোস্ট এসেনশিয়াল।

শিপ্রা দি বললেন – কারেক্ট, বাট আই মাইসেলফ ক্যান নট ক্যারি দিস হেভি লোড। সবাই চুপ।

তীর্থই লিড দিচ্ছে – চলুন না দয়াল দার চায়ের দোকানে একবার যাই। সবাই নীরবে ওকে ফলো করল।

দয়াল চা বানাতে বানাতে গল্পে প্রায় সবই শুনল। আগেও ওদের সমস্যাগুলো শুনতো ছোটবেলায়। আজও শুনে বলল – কী বলব বল। যেদিন শুনলাম ছেলে নাতিকে বলছে ল্যাপটপে আপলোড দিবি, ব্যাকআপ দিয়ে দিস। ভাবলাম বলি – ব্যাকআপ নেবে বাচ্চাটা, ওকে ব্যাক পাশে খেলতে দিয়েছিস কখনও? দাদু দিদারা ব্যাক পাশে খেলায়। পাঠাস দাদু দিদার কাছে কখনও? ফ্ল্যাট কিনে রাজারহাটে পালিয়েছিস। ব্যাক পাশের পিছুটানই চেনে না। ফিরিয়ে আনা বলটাকে এগিয়ে যাওয়ার কায়দাটাই শেখে না এই বাচ্চারা। ব্যাক পাশের পেনাল্টিতে কত থ্রিল বল তো। গোল হলে হারল। গোল আটকালে আবার এগোও। আবার চান্স। এরা তো হারতেই শেখে নি। জিতবে কী? শুধু মোবাইল গতি। কনজিউম করো। ওরা হারার এনজয়টা জানলে জেতাটা বুঝবে ঠিক। রাত হওয়ায় কথা থামিয়ে উঠে পড়ল সবাই। দয়াল সবাইকে লম্বা আড্ডায় আমন্ত্রণ জানালো। কলেজের বাইরে শিপ্রা দি গাড়িতে উঠছে – হঠাৎ প্রশ্নটা ছুঁড়ল – দিদি একটা কথা জানা হল না। রুদ্রদা এলেন না। ছলছল করে উঠল শিপ্রাদির চোখটা –” হি হ্যাড পাসড অ্যাওয়ে জাস্ট থ্রি ইয়ার্স বিফোর।

‘ হোয়াট?

‘ ইয়েস ওনলি মি। সেইজন্যই তো করলাম ব্যাক পাশ। কী করব? গ্রুপে সময়টা কাটে কিছুটা। আর লেখালেখি। রুমালটা বের করে কখন নিজেই চশমা খুলে রেখেছেন পাশের সিটে। ওকে, গাড়িটা স্টার্ট দিল। দূরে মিলিয়ে যাচ্ছে গাড়িটা। লাল ব্যাক লাইট জ্বলছে। হালকা করে হয়তো কোন ব্যাক পাশ আর কি পাবে?

সহযোগিতার হাত বাড়াতে ওপরের ছবিতে ক্লিক করুন

[লেখকের পূর্ব রচনা]

[পরম্পরা ওয়েবজিন, এপ্রিল ২৬, সূচিপত্র – এখানে ক্লিক করুন]

5 1 ভোট
Article Rating
1 Comment
Oldest
Newest Most Voted
পংক্তির ভেতর মন্তব্য
সব মন্তব্য
AMALESH KUNDU
AMALESH KUNDU
2 months ago

VERY NICE.