
যাওয়া আসা
রবীন্দ্রনাথ তাঁর গানে বলেছেন
“যেতে যদি হয় হবে —
যাব, যাব, যাব তবে।।
লেগেছিল কত ভালো এই- যে আঁধার আলো– খেলা করে সাদা কালো উদার নভে।
যেতে যদি হয় হবে–
গেল দিন ধরা- মাঝে কত ভাবে কত কাজে
সুখে দুখে কভু লাজে ,কভু গরবে
দেওয়া-নেওয়া যাবে চুকে বোঝা- খসে যাওয়া বুকে
যাব চলে হাসিমুখে — যাব নীরবে”
কী অনিবার্য এই চলে যাওয়া! কত মায়া, জীবনকে আঁকড়ে ধরে তিল তিল করে বেঁচে থাকা, কত মুহূর্তকে নিঙড়ে আনন্দ গান সৃজন করা ,কত পলে পলে দুঃখে আঘাতে অপমানে ক্ষতবিক্ষত হওয়া !
কত সার্থক প্রতীক্ষা কত আজন্মের পথ চাওয়া, কত সীমাবদ্ধতা ,কত সীমার মাঝে অসীমের সন্ধানে আপ্লুত হওয়া! সব ফেলে রেখে একদিন নীরবে চলে যেতে হবে।
পড়ে থাকবে ‘আমি আমি’ করে আঁচলে গিট বেঁধে রাখা সংসার , সন্তান,আত্মীয় পরিজন, বন্ধু বান্ধব, প্রিয় গান, প্রিয় শাড়ি, প্রিয় বই সব।
কত চোখের জল, হাহাকার, কত নিঃসঙ্গতা আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলবে যারা রয়ে গেল তাদেরকে।
কোন এক বিদগ্ধ মানুষকে বলতে শুনেছিলাম, শোকের বিচ্ছেদের প্রথম রাতটা কোনরকমে কাটিয়ে ফেলতে পারলে তারপর আস্তে আস্তে শোকের তীব্রতা কমে। একদিন যাকে না দেখলে দিন শুরু বা শেষ করা যেত না একসময় সেই মানুষটার অপরিহার্যতা কমে আসে জীবনে। তার শূন্যতাতেই মানুষকে অভ্যস্ত করে তোলে।
আসলে শোক শব্দটার ব্যাপ্তি মাপা যায় না। স্থান কাল পাত্রের সীমা ছাড়িয়ে সেও অনন্তের পথে যাত্রা করে। মাঝে মাঝে মনে হয় শোক মানে কি? একলা না ঘুম রাতে চোখের জল ফেলে বালিশ ভেজানো ? নাকি চলতেই ফিরতে সেই মানুষটাকে স্মরণে মননে বয়ে বেড়ানো?
একটা ঘটনার কথা বলি। আমার একজন পরিচিত মানুষ ছিলেন যাকে অনায়াসে আমি কাকু বলে ডাকতে পারতাম। কিন্তু তাঁর সহজতা বয়সের সীমা ডিঙিয়ে সম্পর্ককে খুব একটা বন্ধুর জায়গায় নিয়ে গিয়েছিল। খুব স্নেহ করতেন তিনি। একদিন অকস্মাৎ এক পয়লা বৈশাখে তিনি বাকশক্তি হারিয়ে ফেলেন। খবরটা পেয়েছিলাম আমি মাসখানেক বাদে । তাকে দেখতে গিয়েছিলাম । কিন্তু কথা বলতে না পারার জন্য মানুষটার ভিতর যে অস্বাভাবিক যন্ত্রণা দেখেছিলাম তারপর আর তার কাছে যেতে সাহস পাই নি। তিনি ক্রমশ চলতশক্তিহীন হয়েছেন, তিন চার বছর বিছানায় থেকেছেন তারপর একদিন চলে গেলেন। সত্যি কথা বলতে গেলে বলতে হয় প্রথম পৃষ্ঠা থেকে কী ভাবে যেন তিনি পিছনের পৃষ্ঠায় চলে গিয়েছিলেন। আমার এই বিস্মরণ কী মৃত্যুর চেয়েও মর্মান্তিক নয় তাঁর কাছে?
মৃত্যুর আগে শেষবার যখন গেলাম তীব্র অভিমানে তিনি আমার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলেন। তাঁর যন্ত্রণা ক্লিষ্ট মুখে তীব্র হয়ে ফুটে উঠেছিল আমার প্রতি অভিমান । সেই দিন যে কষ্ট নিজের জন্য নিজে পেয়েছিলাম আমি মনে করি সেটাই শোক, আজও যখন তখন সেই দৃষ্টি আমাকে তাড়া করে ফেরে। এই শোক থেকে বেরিয়ে যাবার কোন রাস্তা আমার জানা নেই।।
মৃত্যু অনুষঙ্গ কে প্রথম স্পর্শ করছিলাম যখন, তখন আমি নিতান্তই চার পাঁচ বছরের শিশু।আমাদের তালা গ্রামের স্কুলের কোয়ার্টারের বাইরের বারান্দার মেঝেতে একটি পেরেক পোঁতা ছিল । আমি চলতে ফিরতে সেখানে হোঁচট খেয়ে পড়ে যেতাম। হালকা মনে করতে পারি বাড়ির কোনো বৃদ্ধ এক আত্মীয়ের মৃতদেহ শোয়ানো সেখানে। হালকা চোখের জল মুছে ফেলছে মা বাবা।
এরপর থেকে আমাদের শোক ওই পেরেকে থমকে থেকেছে । যতবার সেখানে হোঁচট খেয়েছি কেউ না কেউ ,ততবার সেই দাদুর কথা উঠতো। পরিবেশটা থমথমে হয়ে থাকতো কিছুক্ষণ।
আমরা তখন ক্লাস সিক্সে পড়তাম। আমাদের কোলের কাছে আস্তে আস্তে শান্তির ঘুমে ঘুমিয়ে পরেছিল আমাদের পোষা খরগোশ গোদোস। একটা ছোট্ট খরগোশ কিভাবে যে আমাদের বাড়ির সবার মন জয় করেছিল ভাবা যায় না! পরিবারের একজন হয়ে গিয়েছিল সে। তার চলে যাওয়ার পর কী সাংঘাতিক শোক নেমে এসেছিল আমাদের দু’ভাইবোনের জীবনে!
মা তখন প্রতিজ্ঞা করেছিলেন আর কোন পশু আমাদের বাড়িতে আনবেন না। আনাও হয়নি তারপর।
সেই গোদোসের খাঁচা পরিষ্কার , তার খাবারের জন্য কাঁটা গাছ তুলে আনা প্রতিবেশীর বাড়ির উঠোন থেকে, তাকে স্নান করানো এইসব কাজ নিয়ে কেবল ঝগড়া হতো আমাদের দুই ভাই বোনের মধ্যে। মায়ের মধ্যস্থতাতেও সে বিবাদ থামেনি। কিন্তু গোদোসের মৃত্যুর পর ওকে বাড়ির পিছনে মহানিম গাছটার তলায় মাটি খুঁড়ে শুয়ে দেবার পরে আমি আর দাদা সব বিবাদ ভুলে পরস্পরকে জড়িয়ে ধরে ডুকরে ডুকরে কেঁদেছিলাম।
আজও কোথাও খরগোশ দেখলে গোদোসের
তুই নরম তুলতুলে স্পর্শ হাতের মুঠোয় ফিরে পাই। এক অশনাক্ত অনুভূতিতে থমকে যায় কয়েক মিনিট।
বাবা চলে গেছেন ১২ বছর। বাবাকে ছাড়া আমরা অভ্যস্ত হয়ে গেছি। কিন্তু আমার সাদা সিঁথির সাদা থানের মা কে যতবার দেখি ততবার একটা শূন্যতা অনুভব করি। যতক্ষণ মায়ের কাছে থাকি একটা হারিয়ে ফেলার যন্ত্রণা তিরতির করে বুকের চার অলিন্দে ঘুরে বেড়ায়। এটাই তো শোকের স্তিমিত রূপ? রবীন্দ্রনাথের কথা মনে পড়ে। তিনি বলেছিলেন “সেদিন তোমাকে শ্রাবণের মেঘের মতো কালো দেখেছি। আজ যে দেখি আশ্বিনে সোনার প্রতিমা । সেদিনকার সব চোখের জল কি হারিয়ে ফেলেছ?”
যে চোখের জলে একদিন বুক ভেসে যেতো সেই চোখের জল আপন নিয়মেই একসময় শান্ত হয়।আমরা যে শোককে কাটিয়ে উঠে দাঁড়াতে পারি সে তো অন্তর্যামীর বর।
জীবনে মৃত্যুর চেয়ে জীবনের দাম অনেক বেশি। শোক কখনো শেষ কথা বলতে পারে না।

