গোষ্ঠী নিজে নিজে কখন ও সম্পূর্ণ হয় না। তাকে সম্পূর্ণ হতে হলে কাউকে বাদ দিতে হয়। কাউকে আলাদা করতে হয়। কাউকে শত্রু বানাতে হয়। এই নির্মম সত্যটা আমরা প্রায়ই মানতে চাই না, কারণ আমরা গোষ্ঠীকে ভালোবাসি। গোষ্ঠী আমাদের নিরাপত্তা দেয়, পরিচয় দেয়, আশ্রয় দেয়। কিন্তু এই আশ্রয়ের মূল্য আছে—আর সেই মূল্যটাই হলো শত্রু।এক জন মানুষ একা থাকলে তার নৈতিকতা থাকে। সে নিজের কাজের দায় বহন করে। কিন্তু মানুষ যখন গোষ্ঠীর অংশ হয়, তখন দায়িত্ব ছড়িয়ে যায়। তখন নৈতিকতা আর ব্যক্তিগত থাকে না, হয়ে ওঠে সমষ্টিগত। এই সমষ্টিগত নৈতিকতা সবচেয়ে বিপজ্জনক, কারণ এখানে অপরাধের বোঝা কারও ঘাড়ে ঠিকমতো পড়ে না। “আমি করিনি”—এই বাক্যটাই গোষ্ঠীর সবচেয়ে বড় মিথ্যা।

ইতিহাসে তাকালেই দেখা যায়, কোনো গোষ্ঠী নিজের অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখতে চেয়েছে শত্রু নির্মাণের মাধ্যমে। আদিম গোত্র সমাজ থেকে শুরু করে আধুনিক জাতিরাষ্ট্র—সবখানেই একই প্যাটার্ন। “আমরা” তৈরি হয় তখনই, যখন “ওরা” চিহ্নিত হয়। এই বিভাজন ছাড়া গোষ্ঠীর আত্মপরিচয় ঝাপসা হয়ে যায়।ধর্মীয় গোষ্ঠীর ক্ষেত্রে এই প্রক্রিয়া আরও তীব্র। কারণ এখানে শত্রু শুধু রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ নয়, নৈতিক শত্রু। শত্রুকে এখানে ভুল বলা হয় না, তাকে পাপী বলা হয়। এই পাপী ধারণাটাই হিংসাকে বৈধতা দেয়। কারণ পাপীকে মারলে সেটা আর অপরাধ থাকে না, হয়ে ওঠে পুণ্য।

রাজনৈতিক তত্ত্ব বিদরা মনে করেন রাজনীতির মূল ভিত্তি হলো “বন্ধু বনাম শত্রু” বিভাজন। ধর্মীয় গোষ্ঠী এই তত্ত্বকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে যায়। এখানে শত্রু শুধু রাষ্ট্রের নয়, ঈশ্বরেরও শত্রু। ফলে শত্রুকে ধ্বংস করা শুধু রাজনৈতিক কর্তব্য নয়, ধর্মীয় দায়িত্ব হয়ে ওঠে।

এই খানেই গোষ্ঠী শত্রুর ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। শত্রু থাকলে গোষ্ঠী ঐক্যবদ্ধ থাকে। শত্রু থাকলে প্রশ্ন চাপা পড়ে যায়। শত্রু থাকলে অভ্যন্তরীণ অন্যায়গুলো অদৃশ্য হয়ে যায়। গোষ্ঠীর ভেতরের শোষণ, দুর্নীতি, ব্যর্থতা—সবকিছুর দোষ চাপিয়ে দেওয়া যায় শত্রুর ঘাড়ে।এই কারণে শান্তি গোষ্ঠীর জন্য বিপজ্জনক। শান্তি মানে প্রশ্ন। শান্তি মানে হিসাব। শান্তি মানে মানুষ একদিন জিজ্ঞেস করতে শুরু করে আমরা আসলে কী পাচ্ছি? আমাদের নেতারা কী করছে? আমাদের ঈশ্বর কি সত্যিই ন্যায় বিচারের পক্ষে?এই প্রশ্নগুলো গোষ্ঠী সহ্য করতে পারে না। তাই শান্তি এলেই গোষ্ঠী নতুন শত্রু খোঁজে। পুরোনো শত্রু শেষ হয়ে গেলে নতুন শত্রু তৈরি করা হয়। কখনও সংখ্যালঘু, কখনও ভিন্নমতাবলম্বী, কখনও নারী, কখনও শিল্পী, কখনও প্রশ্নকারী মানুষ।

মনস্তত্ত্ব বলে, মানুষ নিজের ব্যর্থতা স্বীকার করতে ভয় পায়। গোষ্ঠী সেই ভয়কে কাজে লাগায়। গোষ্ঠী মানুষকে বলে—তোমার কষ্টের কারণ তুমি নও, ওরা। এই “ওরা” শব্দটাই গোষ্ঠীর জ্বালানি। যত বেশি ব্যর্থতা, তত বেশি শত্রু।

আধুনিক সময়ে এই শত্রু নির্মাণ আরও নিখুঁত হয়েছে। গণমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, রাজনৈতিক বক্তৃতা—সব মিলিয়ে একটানা ভয়ের পরিবেশ তৈরি করা হয়। মানুষকে বোঝানো হয়—শত্রু খুব কাছেই আছে। সে তোমার কাজ কেড়ে নেবে, তোমার ধর্ম নষ্ট করবে, তোমার সন্তানদের বিপথে নিয়ে যাবে। এই ভয় মানুষকে যুক্তিহীন করে তোলে। যুক্তিহীন মানুষ প্রশ্ন করে না, সে শুধু আনুগত্য দেখায়।

সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার হলো—গোষ্ঠী একসময় নিজের ভেতরের শত্রু খুঁজতে শুরু করে। কারণ বাইরের শত্রু সবসময় পর্যাপ্ত হয় না। তখন শুরু হয় শুদ্ধতার পরীক্ষা। কে যথেষ্ট বিশ্বাসী, কে যথেষ্ট অনুগত। এখান থেকেই জন্ম নেয় ধর্মীয় ফ্যাসিবাদ। যেখানে সামান্য ভিন্ন মত মানেই বিশ্বাসঘাতকতা।

এই পর্যায়ে গোষ্ঠী আর সমাজকে রক্ষা করে না, গোষ্ঠী সমাজকে গ্রাস করে। শিল্প, সাহিত্য, বিজ্ঞান, প্রশ্ন—সবই সন্দেহজনক হয়ে ওঠে। কারণ এ গুলো শত্রু না হলেও শত্রু তৈরি করতে সাহায্য করে না। আর গোষ্ঠীর কাছে সবচেয়ে অপ্রয়োজনীয় জিনিস হলো জটিলতা।

ইতিহাসের প্রতিটি ধর্মীয় বা আদর্শিক গণহত্যার আগে এই পর্যায়টাই আসে। প্রথমে শত্রু বলে তাকে চিহ্নিত করে। তারপর শত্রুকে মানবিকতা থেকে বঞ্চিত করে তাকে পোকা, ভাইরাস, ষড়যন্ত্রকারী হিসেবে চিহ্নিত করা হয় । শেষ ধাপে তাকে ধ্বংস করা হয়—আর গোষ্ঠী হাততালি দেয়।

এই হাততালির ভেতরেই গোষ্ঠীর আত্ম বিনাশ লুকিয়ে থাকে। কারণ শত্রু শেষ হয়ে গেলে গোষ্ঠী শূন্য হয়ে পড়ে। তখন গোষ্ঠী নিজের দিকেই ফিরে তাকায়। তখন প্রশ্ন ওঠে—এত রক্তের পর আমরা কী পেলাম? এই প্রশ্নের উত্তর নেই। তাই গোষ্ঠী আবার নতুন শত্রু বানায়।এভাবেই গোষ্ঠী এক চিরস্থায়ী যুদ্ধের মধ্যে নিজেকে আটকে রাখে। এই যুদ্ধের শেষ নেই, কারণ শেষ হলে গোষ্ঠীর অস্তিত্বই প্রশ্নের মুখে পড়ে।

এই খানে এসে সব চেয়ে অস্বস্তি কর সত্যটা সামনে আসে—গোষ্ঠী মানুষকে শক্তিশালী করে না, গোষ্ঠী মানুষ কে অপরিণত করে রাখে। গোষ্ঠী মানুষকে শিশু বানিয়ে রাখে, যাতে সে নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নিতে না পারে।

এই কারণে বিশ্বাস বিপজ্জনক, আর গোষ্ঠী নিরাপদ। বিশ্বাস মানুষকে একা করে, প্রশ্ন করতে শেখায়। গোষ্ঠী মানুষকে ভিড়ে লুকিয়ে থাকতে শেখায়।শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটা ধর্মের নয়, মানুষের। আমরা কি এমন সমাজ চাই, যেখানে শত্রু ছাড়া বাঁচা যায় না? নাকি এমন সমাজ চাই, যেখানে প্রশ্ন করা যায় শত্রু না হয়ে?কারণ যেদিন শত্রু শেষ হবে, সেদিনই গোষ্ঠীর আসল পরীক্ষা শুরু হবে।আর সেই পরীক্ষায় বেশির ভাগ গোষ্ঠীই টিকে থাকতে পারে না।প্রশ্ন হলো—আমরা কি সেই দিনটার জন্য প্রস্তুত?

সহযোগিতার হাত বাড়াতে ওপরের ছবিতে ক্লিক করুন

[লেখকের পূর্ব রচনা]

[পরম্পরা ওয়েবজিন, জানুয়ারি ২৬, সূচিপত্র – এখানে ক্লিক করুন]