
হৃদয়পুরের বিবেক, অনুত্তমা ও ভিক্ষের ভাগ
প্রতিদিনই স্টেশনের ‘পানীয় জল’ বলে লেখা জায়গার পাশেই বসে থাকে ভিখিরিটা। আজকেও তার ব্যাতিক্রম হয় নি। লোকটা অনেকটা নামাজ পড়ার মত পা মুড়ে একটা ময়লা চটের উপর বসে থাকে। আর তার সামনে থাকে কিনারা উঁচু একটা স্টিলের থালা। ভিক্ষে চাইতে লোকটা মুখে অ্যাঁ – অ্যাঁ করে বিচ্ছিরি আওয়াজ করে। বোধহয় বোবা, হয়ত কষ্ট হয়! যদিও স্টেশন বা বাজার এলাকায় এসবে খুব একটা বিশ্বাস করে না বিবেক। সেয়ানা লোকজনের অভাব নেই। এখন তো কত রকম কিছু হয়। ধাপ্পাবাজির শেষ নেই। চোখ – কান খোলা না রাখলেই গেল, তোমার মাথায় ঘোল ঢেলে টুপি পরিয়ে ছেড়ে দেবে। জানতেও পারবে না।
ভিখিরিটাকে গত পাঁচ বছর ধরে এরকমভাবেই দেখে আসছে সে। বিবেক প্রতিদিন অফিস থেকে বাড়ি ফেরার পথে দমদম থেকে ট্রেন ধরে। টালিগঞ্জে ওর অফিস। সেখান থেকে মেট্রো করে আসে দমদম, আর দমদম থেকে বনগাঁ বা বারাসত যাওয়ার লোকালে চেপে নামে হৃদয়পুর। প্রতিদিন যাওয়া আসার এই একই রুট। ম্যাড়মেড়ে ব্যাচেলার লাইফে এর কোনও ব্যতিক্রম নেই বিবেকের রুটিন জীবনে। চাকরিটা ভালো না হওয়ায় প্রায় চল্লিশেও বিয়ের সিদ্ধন্ত নিতে পারে নি সে। কিন্তু আজ এক বিশেষ দিন। বিবেকের অফিসের কলিগ তুলতুলিদির মাসতুতো বোনকে ডানকুনি লাইনের ট্রেনে তুলে দিতে হবে তাকে। সেই সুন্দরীকে সঙ্গে নিয়েই স্টেশনের জলের বন্দোবস্তের ‘পানীয় জল’ লেখা জায়গার কাছে দাড়িয়ে আছে সে।
তুলতুলিদির সেই বোনের নাম অনুত্তমা। অফিসের স্পেশাল পিকনিকে একবার এসেছিল। তখনই বিবেকের সঙ্গে আধখানা আলাপ হয়েছিল। তুলতুলিদিই আলাপ করিয়ে দিয়েছিল। বলেছিল, আমাদের অফিসের সবচেয়ে ভাল ছেলে। হৃদয়পুরে থাকে, তবে এখনও কাউকে হৃদয় দিয়ে উঠতে পারে নি।
ওমা ! কী সুন্দর নাম। আমি তো নাম শুনেই প্রেমে পড়ে গেলাম – খিলখিল করে হেসে বলে উঠেছিল অনুত্তমা।
তুলতুলিদির বোনের এমন আগ্রাসী কথা শুনে কান মাথা গরম হয়ে ওখানে দাঁড়িয়ে থাকতে অসুবিধাই হচ্ছিল বিবেকের। কিন্তু তারপরেই ওকে কিসমিসের মত চুপসে দিয়ে অনুত্তমা বলে উঠেছিল – ভাববেন না যে আপনার প্রেমে পড়ে গেলাম, আমি আসলে আপনি যেখানে থাকেন, সেই হৃদয়পুর নামটার প্রেমে পড়ে গেছি।
তবে সেদিন ব্যাপারটা তালেগোলে থেমে গেলেও অনুত্তমা যে হৃদয়পুরের বাসিন্দাকে কিছুটা হৃদয় দিয়েই ফেলেছে তা মাঝেমধ্যেই কথা – বার্তায় শুনিয়ে দেয় তুলতুলিদি। তবে বিষয়টাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে সাহস পায়না বিবেক নিজেই। অনুত্তমার মত যৌবনের অপর্ণা সেন মার্কা মেয়েকে সে গোটা জীবন কীভাবে সামলাবে সেটাও একটা ভাবনায় বিষয়।
আজ সেই অনুত্তমাকে সঙ্গে নিয়েই ট্রেনের অপেক্ষায় বিবেক। তুলতুলিদির সুন্দরী মাসতুতো এই বোন থাকে চেতলায়। বাপের জন্মে নাকি ট্রেনে চড়ে নি। তাই তুলতুলিদিই জোর করে বিবেককে দমদম থেকে বালির দিকে যাওয়ার লোকাল ট্রেন ধরিয়ে দেওয়ার দায়িত্ব দিয়েছে। যদি দুইয়ে – দুইয়ে কিছু একটা হয়। বলেছে কোথাকার ট্রেন কোথায় চলে যায় কে জানে, তুই বাপু দায়িত্বটা নে।
আগে থেকে ফোনে হয়ে যাওয়া কথা মতই সুন্দর শাড়ি পরে ঝলমলে নারী হয়ে হাজির হয়েছে অনুত্তমা। সে যাবে বালিতে বান্ধবীর বিয়েতে। আজ আর ফিরবে না। সেখানেই রাত কাটিয়ে দেবে। যতক্ষণ না ডানকুনি যাওয়ার দিকের ট্রেন আসে সেইটুকু সময়ের জন্যই অনুত্তমা তার হেফাজতে। পট্যাটো চিপস্ আর দু – ভাঁড় চা নিয়ে সামান্য কথা বলতে না বলতেই অ্যাঁ … অ্যাঁ… করে হাত বাড়িয়ে ভিক্ষে চেয়ে বসল ভিখিরিটা। শালা সেয়ানা আছে। প্রতিদিন বিবেকের সঙ্গে চোখাচুখি হয় ভিখিরিটার। এত বছর ধরে এ লাইনে যাতায়াত করে কোনও দিন এক নয়া পয়সাও ভিক্ষেও দেয় নি ওকে। সে যে ওকে ভিক্ষে দেয় না সে কথা বিলক্ষণ জানেও ভিখিরিটা, চায়ও না। কিন্তু সাজগোজ করা অনুত্তমাকে পাশে দেখেই আমদানির স্কোপটা ছাড়তে চায় নি ব্যাটা।
অনুত্তমা ভিক্ষে দেওয়ার জন্য ব্যাগ খুলে পয়সা বের করতে উদ্যত হতেই তাকে থামাল বিবেক। হঠাৎই বুক পকেট থেকে একটা ২০ টাকার নোট বের করে ফেলে দিল সামনে রাখা স্টিলের থালাটায়। বিবেকের এমন কাজে অবাক হয়ে গেল ভিখিরিটা। অনুত্তমা বলল, এ কী করছেন ? ২০ টাকার নোট দিয়ে দিলেন? তারপর একটু কায়দা করে বলল, হৃদয়পুরের বাসিন্দার বিবেক নামটা সার্থকই হয়েছে দেখছি। বিবেক কাঁধটা একটু নাচিয়ে, মুখে হাসি ঝুলিয়ে হালকা করে বলল, ও ঠিক আছে। গরীব মানুষ!

সুন্দরী অনুত্তমা পাশে দাঁড়ানো পুরুষটির অন্তরে কতটা বিবেকের বার্তা দেখতে পেল তা জানা গেলেও ঘোষণা মত ঝমঝম করে ঢুকে পড়ল বারুইপাড়া লোকাল। এতে করেই বালি চলে যেতে পারবে অনুত্তমা। ‘ওকে’ – ‘ঠিক আছে’ – ‘সি ইউ’ ইত্যদি পর্ব মিটিয়ে ট্রেনটা চলে যেতেই ভিক্ষের ২০টা টাকা বিবেকের মনের মধ্যে একটা খিচখিচ ভাব এনে দিল। ভিক্ষে দেওয়া ওর ধাতে নেই। পরিস্থিতির জেরে, অনুত্তমার সামনে কী যেন একটা হওয়ায় বেশি টাকাই গলে গেছে।
দীর্ঘদিন ওখানে দাড়িয়ে থাকতে থাকতেই সে দেখেছে অনেকেই ভিক্ষে দিতে গিয়ে টাকা খুচরো করে নেয়। পাঁচ টাকার নোট দিয়ে চারটে এক টাকার কয়েন তুলে নেয়। এ ব্যবস্থা মেনে নেয় ভিখিরিরাও। ট্রেনটা চলে যেতে এই সব সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতেই প্রায় ছোঁ মেরে ওই স্টিলের থালা থেকে ১৫ টাকার খুচরো কয়েন তুলে নিল ও। বিবেক ২০ টাকা দেওয়ায় যতটা না ঘাবড়ে গিয়েছিল এই ঘটনায় তার চেয়েও বেশি বিস্মিত হল ভিখিরিটা। নিজের ট্রেন ধরতে জোর কদমে বিবেক কিছুটা এগোতেই শুনতে পেল ওর উদ্দেশ্যে কাঁচা কাঁচা খিস্তি দিচ্ছে বোবা ভিখারিটা।

