(১)
আমার সামান্য দেরি হয়ে গেল পৌঁছতে। টাউনের পুরোন পাড়ায় কানা গলির শেষ বাড়িটা। গলির মুখ থেকেই দেখা যাচ্ছিল, সব দরজা জানলা বন্ধ।অন্ধকার। অন্ধকারটা এত বিষাদগ্রস্ত , বুঝতেই পারছিলাম বাড়ির শেষ প্রাণবিন্দুটুকুও আর অবশিষ্ট নেই কোথাও। ধীর পায়ে পৌঁছেছিলাম দরজা অব্দি। কাঠের সবুজ দরজায় তালা। সচরাচর এদিক ওদিক গেলে বৌমা যেমন দুটো কড়া এক করে মাঝারি মাপের গডরেজ লাগিয়ে যায় , এ তেমন নয়। পাল্লার ওপর দিকে একটা লকিং ছিটকিনি। কবে লাগাল? সেখানে বড় মাপের শক্ত তালা একটা। আর দরজার গায়ে ছোট রুপোলি গোল চাকতির মতো গা- তালা। প্রথমেই যে কথাটা মনে এল, এতগুলো চাবি সামলাতে পারবে বৌমা? সাধারণ করে পরা শাড়ির আঁচলে বরাবর ঝুলত চাবির রিং। পুরোন হয়ে আলগা হয়ে গিয়েছিল রিং। মাঝে মাঝেই চাবি পড়ে হারিয়ে যেত। সকলে মিলে খুঁজে ঠিক বের করে ফেলতাম। চাবি ফের পুরোন রিং এ ঢুকিয়ে সাঁড়াশি দিয়ে চেপে টাইট করতে করতে বলত, এই চাবিটা ছবির বাক্সের। তোদের দাদু ঠাকুমার বিয়ের ছবি থেকে শুরু করে আমার অন্নপ্রাশণের ছবি পর্যন্ত সব ঐ বাক্সে। আসছে পূর্ণিমায় গোপালের একটা পুজো দিয়ে দেব। আমি আর কদিন। ছবিগুলো-ই তো থেকে যাবে।
তালাবন্ধ একতলা ছোট বাড়িটা গলির শেষে চুপচাপ দাঁড়িয়েছিল। দু এক জন প্রতিবেশীকে টুকটাক জিজ্ঞাসা করতে হয় তাই করা। কয়েকদিন থেকে নাকি বৌমাকে দেখেননি কেউ।- কদিন মানে দু দিন , না পাঁচ দিন , এক সপ্তাহ, অথবা আরও বেশি? কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারলেন না কিছু। উত্তর দিতে না পেরে তাঁরা রেগে উঠছিলেন, আমাকেই দু কথা শুনিয়ে দিলেন রেগে গিয়ে – বয়স্ক মানুষটাকে একা রেখে চলে গেলে সকলে, মাসে দুমাসে একবার করে এসে নিয়মরক্ষা কটা বিস্কুটের প্যাকেট আর হরলিক্স দিয়ে কর্তব্য করছ….
বাড়ির উল্টোদিকে টাইম কল ঘিরে জটলা। স্নান সেরে , বালতিতে ধোয়া কাপড়, মগ, সাবানদানি গুছিয়ে যাওয়ার পথে দাঁড়িয়ে পড়ে মাঝবয়সী দুলেকাকা বলে গেলেন , ঐ যে পাটকিলে আর কালো কুকুর দুটো বসে, সিঁড়ির কাছে, ওরা জানে সব। জিগ্যেস করে দেখ কিছু বলে কিনা। মাসিমা দুবেলা খেতে দিতেন তো, উপোসী বাচ্চা দুটোকে আমরাই এখন যা পারি ভাত, দুধ, বিস্কুট…. আট দশ দিন তো হবেই। ভাবলাম হয়তো বা তোমাদেরই কারও বাড়ি টাড়ি। শান্তিপুরে খোঁজ করেছ? দাদারা তো এখনও আছেন শুনেছি। দু’পা গিয়ে আবার ফিরে এসে বললেন, কোন খবর পেলে , ভাল মন্দ যাই হোক , একটু জানিও বুবু। নম্বরটা আছে তো, নাহয় একটা মিসড কল দিয়ে রাখ, ঘরে গিয়ে সেভ করে রাখছি। কোন খবর পেলে জানিয়ে দেব আমিও।


(২)
বৌমা আজকাল মাঝে মাঝে বলত, সারাটা জীবনই তো বলতে গেলে একাই কাটিয়ে দিলাম। তবু একাকীত্ব কাকে বলে বুঝিনি। বিয়ে হয়ে তোদের ঘরে এসেছিলাম যখন চোদ্দ পেরিয়ে পনেরোয় পড়েছি। তোদের জেঠু বত্রিশ। তখনকার দিনে ঐরকমই বিয়ে হত। উনি চলে গেলেন বিয়ের তিন বছরের মাথায়। রোগ ধরা পড়েছিল অনেক দেরিতে। আর তখন ও রোগের কি ই বা চিকিৎসা ছিল? ওষুধের থেকেও জরুরি ছিল পথ্য। সকাল থেকে রাত অব্দি আমি এই ফল কাটছি তো এই মাংসের সুপ বানাচ্ছি। ডিম, দুধ, মেটে। যা খেত সব বমি হয়ে বেরিয়ে যেত। ফের রান্না, খাওয়া, বমি।
আমার বাপের বাড়ির জোর ছিলনা। বিয়ের পর থেকে, চোদ্দ থেকে সতেরো, বড় হয়ে ওঠার এই সময়কালে এটাই আমার বাড়ি বল, সংসার বল, সবকিছু। আরও একটা কথা মনে হত, তোদের জেঠু চলে গেল বলে আমার যেমন বুকটা শূণ্য হয়ে গেল, সেরকম লোকগুলো তো এখানেই। দেড় বেলার পথ পেরিয়ে, ট্রেন, নৌকো, বাসে করে যেখানে যাব, তারা কেউ তো আমার মনের হাহাকার বুঝবেনা। তোদের বাবা-কাকারা, তাদের সত্যেনদাকে কোনদিন, নিজের দাদা ভিন্ন আর কিছু তো ভাবেনি। তোর মা তোদের দুই যমজ ভাই বোন কোলে আঁতুড় থেকে বেরিয়ে আমার কোলেই তুলে দিল।
ওষুধ পথ্যি চলত। সকলে বলত একবার যদি আমিনুল হেকিমের ওষুধ পেত ছেলেটা…. । শহর আর গাঁয়ের মাঝে পড়া গঞ্জ শহরে যেমন হয়, সকলে এসে শুনিয়ে যেত, কার কত পুরোন কর্কট রোগ সেরে গেছে তো কার যক্ষ্মা। আমার শাশুড়ি কখনও নিজেই ছুটে যেত, দূরের পথ হলে লোক পাঠাত সেই আশ্চর্য হেকিমের সন্ধানে। যেদিন কেউ যেত, আমি সমস্তদিন ধরে অপেক্ষা করে থাকতাম। ফাঁক পেলেই বারান্দায় এসে দেখে যেতাম। দূর থেকে কেউ আসছে দেখলেই বুকের মধ্যে তোলপাড় শুরু হত, ঐ বুঝি কালীদা আসছে, হাতের থলির মধ্যে তার সঞ্জীবনী। কাছে আসতে দেখতাম সে নয় অন্য কেউ। আর যখন সত্যি সে ফিরত, তার ভাঙাচোরা মুখটা দেখেই বুঝে যেতাম, সবই বিফলে গেছে। থলি হাতড়ে কালীদা ফুল, প্রসাদের চুবড়ি বার করে আমার হাতে দিয়ে বলতেন, বৌমা ধণ্বন্তরী মন্দিরে পুজো দিয়ে এলাম বড় খোকার নাম করে। কাল স্নানের পর খোকার মাথায় ঠেকিয়ে দিও। আসছে মাসের ষোল তারিখে শবেবরাতের পরব পড়েছে , ঐ সময়ে আসতে পারে হেকিম। আমি এক হপ্তা আগে থেকে গিয়ে বসে থাকব, অতিথিশালায়। কথা কয়ে এসেছি। কালীদার মুখে আবার আলো ফুটে ওঠে। সবাই তাকে ঘিরে বসে শুনি কেরমানি বাবার অলৌকিক সব মহিমার কথা। – পাঁচ-পাঁচশো বছরের পুরোন দরগা। কেরমানিবাবার জন্ম কোথায় জান, সেই ইরানে। কিন্তু চলে এলেন আমাদের দেশে, এখানেই গুরু পেলেন। সেই সদগুরু তাঁকে দিয়েছিলেন একটা দাঁত খুচোনোর খড়কে কাঠি। আর বলেছিলেন সন্ধান করতে হবে এমন এক স্থানের, যেখানে সেই শুকনো কাঠি সবুজ আর সতেজ হয়ে উঠবে। কত না জায়গায় ঘুরলেন সে ফকির, তারপর পৌঁছলেন ইলামবাজার। একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখলেন, শুকনো কাঠিতে প্রাণ এসেছে। পুঁতে দিলেন এই মাটিতে। বিরাট গাছ এখন, নিজের চোখে দেখে এলাম। আর বৌমা, সত্যি বলতে, সে গাছের তলায় বসে মনটায় শান্তি জুড়ে এল। ওরাই বলল পীরবাবা আমিনুল হয়তো আসবেন শবেবরাতের মেলায়। ভরোসা রাখো বৌমা। নিজের হাতে ঐ গাছের ছোট একটা ডাল ভেঙে, কি পাতা দুখানা দেন যদি তিনি নিজের হাতে, একশো বছর পরমায়ু পাবে সত্যেন।
শবেবরাত এল, সত্যেনদার সংগে তোর বাবাও গেল। তখন তো ফোন টোন কিছু ছিলনা। আমরা হাপিত্যেশ করে বসে রইলাম। সাত দিন গেল, আটদিন, দশদিন। খালিহাতে ফিরে এল ওরা।
ব্যাপারটা কেমন ছিল জানিস বুবু, তোদের বড় জেঠুর রোগ নিয়ে আতঙ্কটা আমাদের কাটিয়ে দিয়েছিল আমিনুল মণ্ডল হাকিম। আমার স্বামীর মৃত্যুর আশঙ্কা পিছু হটে গিয়েছিল। পিছু হটতে হটতে অনেক দূরে সরে গিয়ে আবছা হয়ে গিয়েছিল। আমি, আর বাড়ির আর সকলে শুধু অপেক্ষা করে গেছি একটা যাদু ওষধির। হাতে করে আমাদের তুলে দেবে যে মানুষটা শুধু তার সন্ধানটুকু পেতে হবে। তোর জেঠুকে বালিশের ওপর বালিশ চাপিয়ে, হেলান দিয়ে বসিয়ে, বুকের কাছে কাচা গামছা ভাঁজ করে সূপ খাওয়াচ্ছি, গলাভাত চটকে মণ্ড করে খাওয়াচ্ছি, আর বলছি এই তো আসছে মাসে মহরমের মাস, আমাদের বৈশাখ মাসে যেমন বছরের শুরু, ওদের মহরমের মাস তেমনই। আমি নিজে যাব ঠাকুরপো’র সঙ্গে। আমার মন বলছে মুরশীদের দেখা পাবো-ই এবার। ওনার হাতগুলো কাঠির মতো রোগা হয়ে গিয়েছিল, আমার হাতদুটো জড়িয়ে ধরে বলল, ঠিক আনবে তো ওষুধ। চোখের কোণ দিয়ে জলের ধারা নেমে আসত। শেষের দিকে খালি চোখের জল ফেলত, তোমার ওপর এত বড় অন্যায় হল বুবু।
সত্যি বলছি, আমার মনেও মেঘ ঘনিয়েছে, রাগ হয়েছে তোদের বাড়ির সকলের ওপর, আমার বাবা, দাদাদের ওপরেও। কিন্তু তোর জেঠুর ঐ অসহায় অবস্থা উড়িয়ে দিয়েছে যাবৎ সংশয়। আমাদের দাম্পত্য বলতে শুধু অজস্র মায়া। আর এই মায়াই হল সব। প্রেম বল, কি আর যা কিছু স্বামী- স্ত্রীর মধ্যে, সকলই হার মানবে এই মায়ার টানের কাছে।
আমার শাশুড়ি আমাকে বৌমা বলত, তোদের সকলকে ঐ ডাক শিখিয়েছিল। কি মজার ডাক বল তো বুবু, না আমি সে অর্থে কারও বউ, না পেটের সন্তানের মা, অথচ দুটো জুড়ে গিয়ে কি অপূর্ব একটা পরিচয় আমার তৈরি করে দিল তোর ঠাকুমা।

(৩)
বাবারা বলত বড়দা, আমরা বড় জেঠু। হিসেবমতো বাবা যদিও ঠাকুমার প্রথম সন্তান – বাবাকে সকলে মেজদা বলত। বৌমা সে হিসেবে বড় জেঠি, আমাদের সব আব্দার তার কাছেই। বড় হলাম যখন, বৌমা বন্ধু হয়ে উঠল। স্কুল শেষ করে কলকাতার কলেজ, হস্টেল। রওনা হবার দিন বৌমা আমার হাতে গোপনে একটা চিরকুট গুঁজে দিয়েছিল। বলেছিল, তোদের কলেজ তো শুনছি মুসলমান পাড়ায়। সময় পেলে খোঁজ করিস তো। কার সন্ধান করতে হবে আমি জানতাম। চিরকুটের ভাঁজ খুলে দেখার দরকার ছিলনা।
অনেক খোঁজ করেছি। শুক্রবারের নামাজের পর ভীড় একটু হাল্কা হলে শবনম বা রোশেনারা কাউকে সঙ্গে নিয়ে জিগ্যেস করেছি প্রার্থনা শেষে ঘরে ফেরা মানুষজনকে। কেউ বলেছে, নাম তো শুনেছি, অব্যর্থ দাওয়া দেন, কত না গল্পকথা ফের তাঁরাও বলেছেন। কবে যেন চিরকুটের লেখা হাল্কা হয়ে গিয়েছে। আর দিনে দিনে গাঢ় হয়েছে মনের মধ্যে তৈরি হয়ে যাওয়া অন্ধ বিশ্বাস।
বৌমা আমার ঘরে ফেরার পথ চেয়ে বসে থাকত। আমি রাতে বৌমার পাশে শুয়ে শুয়ে গল্প বলতাম ষোল আনা মসজিদের গল্প, তালিখোলা মসজিদ, লাল মসজিদ। সব গল্প শেষ হলে বৌমা শুধু একটাই কথা বলত, কেউ লোকটার সন্ধান দিতে পারেনা কেন বুবু?
কালীদা এসেছিল হস্টেলে, আমাকে বাড়ি নিয়ে যেতে। এই ছোটগলিতে তিলধারণের স্থান ছিলনা। বৌমা পাথরের মূর্তির মতো স্থির বসেছিল বড়জেঠুর পাশে। আমাকে বলেছিল, কাঁদিসনা বুবু। সুকান্ত গেছে ইলামবাজার। আমার মন বলছে আজই হয়তো আমিনুল বাবা এসেছে, হাতে করে মন্ত্রপূত গাছের পাতা দিয়ে সুকান্তকে বলছে জলদি যা বেটা। ছেলেটার গায়ে মাথায় বুলিয়ে দে এই পাতা, কেরমানিবাবার চমৎকারি দেখবি তখন। একটা মরা খড়কে কাঠিকে যে মহীরূহ করে দিতে পারে, সে আমার স্বামীর দেহে প্রাণ ফিরিয়ে দিতে পারেনা? বৌমা সাদা শাড়ি পরেনি কোনদিন। একাদ্শীতে ঠাকুমানিজের হাতে মাছের ঝোল দিয়ে ভাত মেখে খাইয়ে দিয়েছে বৌমাকে। আর বৌমা প্রতি শবেবরাতে রাত জেগেছে। সারাদিন উপোস করে সারা রাত ঠাকুরঘরে পুজো করেছে নিজের মতো।
আমিনুলের সন্ধান করে যাওয়া সে অবধি আমার ভবিতব্য। ইলামবাজারের পাঁচ পাঁচশো বছরের পুরোন মসজিদের সামনেটা জুড়ে গাছের ছায়া। আমি পৌঁছে দেখব বৃদ্ধ এক ফকিরের পায়ের কাছে বসে আছে বৌমা। আমি গিয়ে দাঁড়াতেই বলবে, এই দেখ বুবু, বাবা নিজের হাতে করে তুলে দিয়েছেন এই মরা গাছের ডাল। মাটি পেলেই জীবন ফিরে পাবে।
তার আগে অব্দি যাওয়া আর আসা। সাবন মাসে শবেবরাতের পরবের আগে হোক বা অন্য কোনদিন, যেদিন মন টানবে পৌঁছে যাব পীরের মাজারে। ফেরার পথে বলে আসব , আমিনুল মণ্ডল হেকিম বাবা এলে বলে দেবেন প্রতীতি এসেছিল, বুবু আমার ডাক নাম, সন্ধান করে যাচ্ছে সেই কবে থেকে।

সহযোগিতার হাত বাড়াতে ওপরের ছবিতে ক্লিক করুন

[পরম্পরা ওয়েবজিন, এপ্রিল ২৫, সূচিপত্র – এখানে ক্লিক করুন]

5 1 ভোট
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
2 Comments
Oldest
Newest Most Voted
পংক্তির ভেতর মন্তব্য
সব মন্তব্য
ইন্দ্রাণী
ইন্দ্রাণী
2 days ago

খড়কে কাঠি যে ভূমিতে মহীরুহ হয়, সে আশ্চর্য জমিনের নিরন্তর সন্ধান মানুষের ভবিতব্য। মৃতজন প্রাণ পাবে, অন্ধজন আলো।
এই দর্শন গল্পটির আত্মা। এতটুকু প্রকট নয় অথচ। ইশারাময়তা আর মায়ায় বোনা গল্পের বহিরঙ্গ; সেই সুতো ধরে গল্পের প্রাণকে ছোঁয়ার সুখ। বহুদিন পরে একটি ছোট গল্পপাঠে এই আনন্দ।
লেখনীকে নমস্কার করি।

Dr Dipak Banerjee
Dr Dipak Banerjee
2 days ago

বাঃ, ভারী সুন্দর লিখেছেন। মন ভরে গেল।
অভিনন্দন।