
অনাহত

[দুঃস্বপ্নের রোজনামচা, যা আমরা কিছুদিন আগে পার হয়ে এসেছি। কোভিড সময়ে, যখন বিশ্বজুড়ে মৃত্যুর ভয়াল বিভীষিকা আমাদের তাড়া করে ফিরেছে, সেই প্রতিদ্বন্দ্বী কালখন্ডের এক টুকরো দলিল।
পূর্বানুবৃত্তিঃ শুরু হয়ে গেল লক-ডাউন। রেশন দোকানে লম্বা লাইন। গগন তিয়াসা-র মধ্যেকার রসায়ন নতুন করে ধরা দেয়। গগনের বেতন কমে গেল। সনতের পুত্র আদিত্য আর পুত্রবধূ ধৃতি আলাদা হয়ে রয়েছে। বিল্টুবাবুর কাছে কথা বলতে আসে গগন। পথে এক বৃদ্ধকে অকারণ মার খেতে দেখে। রাতে ন’মিনিটের ব্ল্যাক আউটের পর অকাল দীপাবলি। বন্ধু বিকাশ আত্মশক্তির ওপর নির্ভর করতে বলে। বুঝতে পারেনা কোথায় সেই শক্তি পাবে? বিকাশের কথায় জোর পায়, ঠিক করে একদিন ওর আশ্রমে যাবে। ছোট্ট নুরুল ভাবে ঈদের ছুটিতে বাড়ি যাবে। তা আর হয়না। ওর চাচা মুম্বাই থেকে বাড়ি ফিরতে পুলিশের হাতে মার খায়। ভাবে হেঁটেই ফিরবে!]
পর্ব ৭ – ভয়
গভীর হতাশার ভেতর মানুষ আশার আলোর দিকে তাকিয়ে বেঁচে থাকে। তীব্র খরার দহনে কোথাও যখন কিছু নেই, একটুকরো জল ভরা মেঘ চাষার মনে এনে দেয়, সোনালী ফসলের ঘ্রাণ।
লোকজন অপেক্ষায় ছিল, হয়তো লকডাউন উঠে যাবে! মৃত্যু মিছিল সব ওলোট পালোট করে দিচ্ছে। লকডাউন দীর্ঘায়িত ঘোষণা হবার পর, গগনদের আবাসনের ভেতর লোকজনের ভয়টা, আরও খানিকটা বেড়েছে। এতদিন মৃত্যু সংবাদগুলো দূরে দূরে ভেসে ভেসে পার হচ্ছিল। এখন যেন গা ঘেঁষে যাচ্ছে। যেকোন দিন আবাসনের ভেতরেই হানা দিতে পারে। পরিচারিকাদের আসা বন্ধ হয়েছে, সেই প্রথমদিন থেকেই। এখন দুধওয়ালা, কাগজওয়ালাদেরও আসা যাওয়া বন্ধ হল। যে ছেলেগুলো ফুল দিতে আসে, কিম্বা যারা নিয়মিত গাড়ি ধুয়ে দেয়, তারাও এখন গেট পার করতে পারছে না। গাড়িগুলোতে ধুলো পড়ে যাচ্ছে। বেরতে হচ্ছে না তাই ওদের প্রসাধনীও যেন বন্ধ।

বড় গেটের বাইরে কয়েকটি ঠেলাতে করে, সবজি, মাছ, ফল, ফুল নিয়ে কয়েকজন বসছে। দুধ পাঁউরুটি বিস্কুট, সে সবও মিলছে। তবে পরিমাণে অল্প। গগন সকাল বেলা মুখে মুখোশ লাগিয়ে গেট অবধি আসে, কিছু মিছু সওদা করে। যদিও দুজনের জন্য চাহিদা খুবই কম। সনৎবাবুও খুব একটা নিচে নামছেন না। বিশেষ করে বয়স্ক মানুষদের বাইরে বেরতে খুব করে বারণ করা হচ্ছে। তবে ফোনের বিরাম নেই। গগনের সাথে খোশগল্প ফোনেই সারছেন ভদ্রলোক। গেট থেকে দুধ নিয়ে ফেরার পথে সনতের ফোন, কিম্বা দুপুরে খাওয়ার পর, কখনও সন্ধ্যায় বা রাতে। “তুমি খবর শুনেছো?”
গগন প্রত্যুত্তর দেয়, “কী ব্যাপারে বলুন তো?”
“আরে সারা দেশে সতেরো হাজার পার হয়ে গেলো আমার আমাদের রাজ্যে তিনশো উনচল্লিশ।”
“ও তাই নাকি? তবে অনুরোধ করব, এভাবে রাতদিন খবর দেখবেন না।”
“কেন বল তো?”
“আমি বলছি না। চিকিৎসকরা বলছেন।”
“কী করব বল? বাড়িতে বসে আর তো কোন কাজ নেই?”
“এই যে খেলার স্কোর দেখার মতো মৃতের সংখ্যা গুণছেন, এতে নিজের ভেতরই চাপ তৈরী করছেন।”
“সবই বুঝি, তাও পারি না। জানো তো, দুর্যোধন শ্রীকৃষ্ণকে বলেছিল- জানামি ধর্মং ন চ মে প্রবৃত্তি:। জানাম্যধর্মং ন চ মে নিবৃত্তিঃ।। অর্থ বুঝলে?”
গগন হেসে বলে, “না মানে, এতো সংস্কৃত!”
সনৎ বুঝিয়ে দেওয়ার চোষ্টা করে, “অর্থাৎ, দুর্যোধন বলছে, আমি জানি ধর্ম কী, কিন্তু তাতে আমার প্রবৃত্তি হয় না, আবার আমি জানি অধর্ম কী, কিন্তু কিছুতেই নিজেকে নিবৃত্ত করতে পারি না। সোজা কথায়, বেশি জ্ঞান দেবেন না। আসলে, আমরা সবাই জ্ঞানপাপী। বুঝলে কিছু?”
“বাঃ আপনি তো অনেক চর্চা করেন। এইসব নিয়ে থাকুন না। খামোখা মহামারী না অতিমারী নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছেন কেন?”
“মাথা কী এমনি ঘামাই? একমাত্র সন্তান কোন বিদেশে পড়ে আছে।”
“সে কী শুধু আপনার একার? সকলেরই কেউ না কেউ বাইরে, ঘরে ফিরতে পারছে না। আমার এক দাদার ছেলেও তো ব্যাঙ্গালোরে পড়ে রইল। আনতে পারলো না।”
ঘরে ফিরে একপ্রস্থ বাসন মেজে, ঘর ঝাঁট দিয়ে গগন থিতু হয়। তিয়াসা চা নিয়ে আসে। “দাদা ফোন করেছে?”
গগন প্রশ্ন শুনে অবাক হয়ে তাকায়, “আমায় জিজ্ঞেস করছো কেন? তোমার কথা বলতে ইচ্ছে করলে, সরাসরি আকাশকে ফোন করে নাও।”
“আচ্ছা যা হোক, ভাই ভাই-তে এত আড়ি কীসের?”
“আড়ি কেন হবে?”
“দাদার ছেলেটা ওখানে একা একা পড়ে রইল, খোঁজ নেবে না?”
“সকালবেলা তুমি ঝগড়া শুরু করলে? ফোন নাও, এখনই ধরো।”
“আমি পারবো না। তুমি কর।”
অবশেষে, গগন নিজের ফোন থেকেই ভাইপো আকাশকে ধরার চেষ্টা করে। দুবার বেজে বেজে থেমে গেল। স্বামী স্ত্রী বেশ উদ্বিগ্ন। শেষে কেউ একজন ফোন ধরে, ইংরাজিতে বলে, “আকাশ এখনও ঘুমচ্ছে। জেগে উঠলে, জানিয়ে দেবে।”
তিয়াসা অবাক হয়, “এত বেলা অবধি শুয়ে কেন? শরীর খারাপ হল নাকি?”
গগন স্ত্রীকে বলে, “শোনো, এত দূরের থেকে আমরা কিছু করতে পারব না। শুধু শুধু চিন্তা করে শরীর খারাপ কোরো না। ওর বাবা মা নিশ্চয়ই নিয়মিত খোঁজ নিচ্ছে।”
তিয়াসা ভাসুরের ছেলের জন্য আন্তরিক ভাবে চিন্তিত হয়, “তোমার তো সব কিছু শুধু শুধু মনে হয়। ছেলেটা কী খাচ্ছে? কী পরছে? চিন্তা হবে না?”
গগন আর কথা বাড়ায় না। ওর আপিসের সময় হয়ে গেছে। এখনই ইন্টারনেটে কল শুরু হয়ে যাবে। ল্যাপটপ খুলে বসে। এখন কোম্পানির টাকা পয়সার হিসেব নিয়ে কঠিন মিটিং আছে। একদিকে অনেক প্রজেক্ট বন্ধ হয়ে গেছে, পাশাপাশি যে কয়েকটি হাতে গোণা প্রজেক্ট চালু রয়েছে, তাদেরও টাকা বাকী পড়েছে। অনেক ক্লায়ন্ট আবার বিলের টাকা মুকুব করার জন্য চিঠি দিয়েছে। এইরকম বেশ কিছু প্রজেক্ট আছে, যেগুলোর দেখাশোনার ভার গগনের ওপর।
চিফ ফাইন্যান্স অফিসার, সি-এফ-ও মনীষা গর্গ, গগনের চেয়ে বয়সে ছোট। কিন্তু খুব উদ্ধত। প্রত্যেক আধিকারিকদের সাথে ধমক দিয়ে কথা বলে। অদ্ভুত ভাবে কোম্পানির বড় সাহেব ওকে প্রশ্রয় দেয়। হতে পারে, কোম্পানির এই দুর্দিনে খুব শক্ত হাতে টাকা পয়সার হাল ধরতে হবে। কিন্তু তাই বলে তো, বর্ষীয়ান আধিকারিকদের অপমান করে কথা বলা, সাজে না। প্রত্যেকেই জানে গোটা দেশ কী ভাবে চলছে, ক্লায়েন্টদেরও ব্যবসা নেই। ক্যাশ-ফ্লো তলানিতে। ফ্যাক্টরিতে লোক নেই। অনলাইনে কারখানা চলতে পারে না। সেখানে ঘাম রক্তের প্রয়োজন। সেই সব কোম্পানি বিল মুকুবের আর্জি কেন জানাচ্ছে? সে কারণে গগন সহ এই মিটিঙে আরও যেসব আধিকারিক ছিল, সবার ওপর মনীষা ভীষণ চোটপাট করে। গগনকে বলে, “আপনার সবকটা ক্ল্যায়েন্ট মিলে মোট আউটস্ট্যাডিং সাড়ে পাঁচ কোটি টাকা হয়েছে। তার মধ্যে তিন কোটি টাকা এজ অ্যানালিসিসে সবচেয়ে বেশি। এই মাসের মধ্যে যদি এই টাকা উদ্ধার না হয়, আপনার এ মাসের বেতন হবে না।”
কথাটা শুনে অবধি মাথা ভোঁ ভোঁ করতে থাকে। পরের পর অন্য সবকটা প্রজেক্ট নিয়ে অন্যান্য আধিকারিককেও সি-এফ-ও ধমক দেয়। কল শেষ হয়ে যাওয়ার পরেও শব্দগুলো মাথার ভেতর ঘুরতে থাকে। অপমানটা হজম করতে পারছিল না। এমন তো নয়, যে টাকা-টা ওর জন্য আটকে আছে। ক্লায়েন্ট যদি টাকা না দেয়, ওর কী করার থাকতে পারে। তার জন্য যদি বেতন আটকে যায়, সে চাকরি করার থেকে, না করা ভালো। আর একই মালিকের চাকরি গগন, মনীষা সহ সবাই করছে। সেখানে কারো বেতন বন্ধ করে দেওয়ার অধিকার মনীষার থাকতে পারে না। সকলের সামনে এভাবে বলল! যদিও ভার্চুয়াল মিটিং, তাও বড় কুন্ঠিত লাগে।

কিন্তু এই অবস্থায় চাকরি ছাড়ার কথা ভাবতে পারে না। ফ্ল্যাট বা গাড়ির ই-এম-আই চলছে। গগনের মতো প্রায় প্রত্যেকের এমন অবস্থা। অনেকের সন্তানেরা এখনও পড়াশোনা শেষ করেনি। আত্মসম্মান বাঁচাতে কোম্পানি ছাড়তেও পারছে না। ল্যাপটপ বন্ধ করে চুপ করে বসে থাকে।
তিয়াসা ঘরে ঢুকে দেখে, টেবিলের ওপর মাথা রেখে গগন চোখ বুঁজে আছে। বুকটা হঠাৎ ছ্যাঁৎ করে ওঠে। অসুখ বিসুখ হলে আরেক বিপদ। এখন কোন হাসপাতালে যাওয়া যাচ্ছে না আর পাড়ার ডাক্তারের চেম্বারটাও বন্ধ হয়ে রয়েছে। গায়ে হাত দিয়ে বোঝার চেষ্টা করে, তাপ বাড়লো কিনা? হাত দিয়ে উষ্ণতা বোঝা গেল না। কিন্তু হাতের স্পর্শে গগনের সাড়াও পেল না তিয়াসা। ঘুমিয়ে পড়েছে। হাল্কা করে ডাকে, “চা খাবে?”
এবার গগন সাড়া দেয়, “ঘুমিয়ে পড়েছিলাম?”
“তাই তো মনে হচ্ছে। চা দেবো?”
“তাই দাও।”
চা খেতে খেতে তিয়াসা জিজ্ঞেস করে, “কোন সমস্যা?”
“সমস্যা কি একটা? অজস্র। একের পর এক কাজ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। বন্ধ হয়ে যাওয়া প্রজেক্টের বাড়তি কর্মচারীদের কতদিন বসিয়ে বেতন দেবে? যে কটা প্রজেক্ট চলছে, তাদের পেমেন্ট ঢুকছে না। পঁচিশ লক্ষ টাকা বিল হয়েছে, ক্লায়েন্ট চার লক্ষ টাকা দিয়ে বলছে, বাকীটা কবে দেবে জানে না। এতে হয়তো ওই প্রজেক্টের ছেলেদের চাকরি যাবে না, তবে বেতনও হবে না। সবার ভাঁড়ে মা ভবানী। তার মধ্যে ক্লায়েন্টের রক্তচক্ষু আর ম্যনেজমেন্টের গালি। আর পারছি না। চাকরি করতেও পারছি না, এমন কিছু বিকল্প অর্থবল নেই, যে চাকরি ছেড়ে দেবো। কোনদিকে যে যাবো বুঝতে পারছি না।”
এইসব কথার মধ্যে সনৎবাবু ফোন আসে, “গগন, খবর শুনছো?”
“কী খবর? আমি তো টিভি দেখার সুযোগ পাই না।”
“আরে টিভির খবর নয়, আমাদের আবাসনের। ডঃ তরুণ ব্যানার্জির করোনা ধরা পড়েছে। আরে আমি তো দুদিন আগেও ওর কাছে গেছিলাম পরামর্শ করতে।”
“ওর ফ্ল্যাটে গিয়েছিলেন?”
“ভাগ্যিস ফ্ল্যাট অবধি যেতে হয়নি। গেটের মুখেই দেখা হয়ে গেল। তখনই বলছিলাম। কদিন ধরে পেট পরিস্কার হচ্ছে না। এটা আবার কোরনার লক্ষণ কিনা কে জানে?”
“এখন উনি কোথায়?”
সনৎ বলে, “মিউনিসিপ্যালিটি থেকে নিয়ে গেছে। আর ঘর সিল করে দিয়েছে। বাড়ির লোকের যা প্রয়োজন, সোসাইটি থেকে দেবে বলেছে। বুঝলে তো? রোগ আর বাইরে বাইরে নেই। এবার একেবারে আমাদের অন্দরে ঢুকে গেছে।”
গগন কথা বলতে বলতে বাইরে তাকায়। বৈশাখের তাপ বেশ প্রবল। রাস্তায় লোকজন নেই। এত রোদের মধ্যেও সব যেন কালো হয়ে আছে। মৃত্যুর আবহে ভয়টা চেপে বসছে।
তিয়াসা এসে বলে, “তখন থেকে থম মেরে বসে আছো। যাও স্নান সেরে এসো। আমি রান্নঘরের কাজ মিটিয়ে দেবো।”
গগন জিজ্ঞেস করে, “আকাশ কি আর ফোন করে ছিল?”
“হ্যাঁ করেছে। তুমি ঘুমোচ্ছিলে বলে, আর ডাকিনি।”
“কী বলল?”
“বলছে, হোস্টেল সিল করে দিয়েছে। বাইরের কাউকে ঢুকতে দিচ্ছে না। ভিতরের কাউকে বেরতেও দিচ্ছে না।”
“এতে কিচ্ছু হবে না।”
“মানে?”
গগন, সেদিন তিয়াসার বলা কথাটা এবার ফিরিয়ে দেয়, “লখীন্দরকে বাঁচানোর জন্য লোহার বাসর তৈরী হয়েছিল। কিন্তু তাকে কি শেষ রক্ষা হয়েছে? এ ও তেমনি। মানুষ ভাবছে, কেমন লোহার বাসর তৈরী করে রোগ আটকাবে। ভাইরাস ঠিক পথ করে নেবে।”
“কী সব অলুক্ষুণে কথা বল, তা ঠিক নেই।”
“বাস্তব! দুদিন আগে তুমিই বলেছো। এখনও তো কিছুই হয়নি। ভারতবর্ষ যখন মাঠে নামবে, তখন সবার ওপরে থাকবে।”
“কীসে সবার ওপরে?”
“সংক্রমনে”
“তোমার যত নেগেটিভ চিন্তা। আমি যাই। তুমি স্নান সেরে এসো।”
খাওয়ার সময় তিয়াসা বলে, “সুভদ্রা ফোন করেছিল।”
গগন জিজ্ঞাসু চোখে তাকায়, সুভদ্রা ওদের ফ্ল্যাটের পরিচারিকা, তিয়াসার সহকারী। আবাসনের গেট ওদের জন্য বন্ধ। যদিও মাস শেষের মাইনে গেটের বাইরে থেকে এসে নিয়ে যাচ্ছে। তিয়াসা বলে চলে, “ওর মেয়েটার বাচ্চা হবে। কিছু টাকা চেয়েছে।”
গগন চমকে ওঠে, “সেকী? এই বলল পড়াশুনা করাচ্ছে!”
“শোন, গরীবের ঘরের মেয়ে পালিয়ে গিয়ে বিয়ে করেছে। তার কারণ তো থাকবে। সারাদিন সুভদ্রা লোকের বাড়ির খিদমৎ খাটে। বাড়িতে পাহারা দেওয়ার কোন অভিভাবক নেই। যা হওয়ার তাই ঘটেছে। আশ্চর্য্য হবার কিছু নেই।”
গগন কথা বলে না। এসব ব্যাপারে তেমন করে কিছু বলার নেই। যতটা পারে সাহায্য করে। এখন যদিও নিজের রোজগার টলমল করছে। আলগোছে জিজ্ঞেস করে, “কোথায় দেখাচ্ছে?”
“সদর হাসপাতালেই হবে। ওরা কি আর প্রাইভেট নার্সিং হোমে যেতে পারে?”
“এখন যাচ্ছে কী করে?”
“আমি অতশত জানিনা। ওকে পেলে সামনা সামনি জেনে নিও।”
খাওয়ার পর গগন আবার নিজের ল্যাপটপ খুলে বসে। সকালের মিটিঙের পর মনটা তিতকুটে হয়ে আছে। পাশের ঘরে তিয়াসা দুপুরের কাজ সেরে খানিক বিশ্রাম করে। বহুদিন পর এতটা সময় বাড়ি থাকছে। সাত বছরের বিবাহিত জীবনে এমন নিরবিচ্ছিন্ন ভাবে স্বামী স্ত্রী কতদিন থেকেছে মনে পড়ে না। ল্যাপটপ ছেড়ে উঠে পড়ে। পায়ে পায়ে ঘরের দিকে যায়। তিয়াসা পাশ ফিরে কারো সাথে ফোনে কথা বলছে। পরিধান উঠে গিয়ে পায়ের অনেকটা দৃশ্যমান। গগন সন্তর্পনে এগিয়ে অনাবৃত পায়ের গোছে ঠোঁট রাখে। চমকে ওঠে তিয়াসা। ভরাট গড়ন। হাত থেকে ফোন খসে বালিশে পড়ে। “একটু পরে ফোন করছি” বলে ফোন রেখে গগনের দিকে ফেরে, “কী হল?”
গগন এবার ঘন সান্নিধ্যে এসে বলে, “কিছু না, এমনিই।”
তিয়াসার চমকের সাথে একটা অন্য ভয় কাজ করে। গগন সারাদিন আপিসে থাকতো। তিয়াসা আজ বেশ কিছুদিন, সংসারের কাজ সেরে, একটা ব্যক্তিগত বৃত্ত তৈরী করেছে। সেখানে ফোন, হোয়াটস্যাপ, ফেসবুক এই সব ঘিরে গড়ে উঠেছে চেনা জানার নতুন গন্ডী। আলাপ হওয়া বন্ধুদের সাথে এই দুপুরটাই অন্তরঙ্গ হওয়ার সুযোগ হয়। লকডাউন হওয়ার পর থেকে, সেই আবডালটা থাকছে না। এটা তিয়াসার মতো ওর বন্ধুদের প্রত্যেকের জন্য সত্যি। সবার বাড়িতেই, এখন সবাই রয়েছে। সবাই মানে, যারা প্রতিদিন আপিসে বা স্কুলে যেত, এখন তারা যেতে পারছে না।
কান থেকে ফোনটা খসে গেলেও, শব্দগুলো মন থেকে খসে না। ভাবতে থাকে, গগন কতটা আঁচ পেয়েছে? শেষদিকের কথাগুলো কি কানে গিয়েছিল? এরমধ্যে যদি আবার ফোন এসে যায়?
তখন গগন তিয়াসার শরীর ঘিরে নিজেকে আবৃত করতে মগ্ন। আপিস থেকে প্রাপ্ত সমস্ত অপমানের গ্লানি, গগন তিয়াসার শরীরী আশ্রয়ে মুছে ফেলতে চায়। চারিদিক থেকে এক অসম্ভব ক্ষয় আর ভয়, গগনকে চেপে ধরতে চাইছে। এখন তিয়াসার মধ্যেই ভয়মুক্তির সেই আশ্রয় খুঁজছে।

একের পর এক সংক্রমিত অজানা রোগ থেকে একটা নিরাপত্তাহীনতা গ্রাস করছে সবাইকে। সেই ভয়ের আবহে গগনের সাথে তিয়াসাও মিশে যেতে থাকে। বাইরে তখন বৈশাখের তাপ, মানুষকে বশীভূত করার জন্য হাত বাড়িয়েছে। দুটো মানুষ দুরকম ভয়ে ভীত হয় পরস্পরের প্রতি লগ্ন হয়। গগনের আর্থিক অবলম্বন খসে যাওয়ার ভয়, অন্য দিকে তিয়াসার পারিবারিক সম্ভ্রম খসে যাওয়ার ভয়।

[লেখকের পরম্পরায় প্রকাশিত রচনা]
- ভারতবর্ষ – ছোট গল্প
- শোক – ছোট গল্প
- বিষধর – ছোট গল্প
- বিলু শকুন – ছোট গল্প
- গল্পঃ ঘুড়ি
- ছোটদের গল্প: পুজো আসছে
- শাড়ি
- গয়না – ছোট গল্প
- পূর্বাভাস
- অভিযোগ
- জঙ্গলের প্রতিশোধ
- মানুষ
- আরও গল্প
- বাংলা লাইভে প্রকাশিত গল্প
[পরম্পরা ওয়েবজিন, সেপ্টেম্বর ২৬, সূচিপত্র – এখানে ক্লিক করুন]
