

[পূর্বানুবৃত্তিঃ শুরু হয়ে গেল লক-ডাউন। রেশন দোকানে লম্বা লাইন। গগন তিয়াসা-র মধ্যেকার রসায়ন নতুন করে ধরা দেয়। গগনের বেতন কমে গেল। এক বৃদ্ধকে অকারণ মার খেতে দেখে। রাতে ন’মিনিটের ব্ল্যাক আউটের পর অকাল দীপাবলি। বন্ধু বিকাশ আত্মশক্তির ওপর নির্ভর করতে বলে। বুঝতে পারেনা কোথায় সেই শক্তি পাবে? বিকাশের কথায় জোর পায়, ঠিক করে একদিন ওর আশ্রমে যাবে। ছোট্ট নুরুল ভাবে ঈদের ছুটিতে বাড়ি যাবে। তা আর হয়না। ওর চাচা মুম্বাই থেকে বাড়ি ফিরতে পুলিশের হাতে মার খায়। ভাবে হেঁটেই ফিরবে! রেভেনিউ টার্গেটের চাপে গগন দিশেহারা, তিয়াসার শরীরে আশ্রয় খোঁজে। তিয়াসার মনের ভেতর দ্বন্দ্ব চলতে থাকে। নতুন করে তিয়াসাকে আবিষ্কার করে সোমনাথ, কিন্তু তার পরেও যেন নাগাল পায়না। অনেকদিন পর আমনদীঘিতে যায়। মৃত্যুমিছিলে ক্লান্ত হয়ে পড়ে। অন্যদিকে বীথিকেও নিজের করে পায় না। ভয়ঙ্কর পরিস্থিতিতে ক্রমান্বয়ে হাবুডুবু খেতেই থাকে।]
পর্ব ৯- অনিকেত
সনৎ আগে নিয়মিত সকালবেলায় হাঁটতে বের হতো। কয়েকদিন যাবৎ ভয়টা এত চেপে বসেছে, যে হাঁটতেও বেরয় নি। আজ অনেক চেষ্টা করে মনে জোর আনে। ঘরে তখনও মানসী ঘুমচ্ছে, অন্য ঘরে বৌমা ধৃতি আর স্পন্দনেরও কোন সাড় নেই। আজ মন শক্ত করে বেরিয়ে পড়ে। রাস্তায় লোক চলাচল নেই বললেই চলে। আবাসনের বাইরে একটু এগোলে বড় রাস্তা। এক সময় এখানেই গনগন করে চলত গাড়ি বাস মোটর সাইকেল। আজ একেবারে শুনশান। দুয়েকটা সাইকেল যাচ্ছে, বোধহয় দুধ বা খবরের কাগজ। অনেকেই কাগজ নেওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। সনতের কাগজ না পড়লে বাহ্য হয় না। বাড়ির লোকের চাপে এখন কাগজ নিচ্ছে না। তাছাড়া, ওদের আবাসনে কাগজওয়ালাদের ঢুকতেই দিচ্ছে না। সনৎ হাঁটতে হাঁটতে বড় রাস্তায় আসে। মুখে মুখোশ, মাথায় একটা ক্যাপ, হাতে গ্লাভস, পকেটে স্যানিটাইজার। কিছুদূরে এসে একটা বাসস্ট্যান্ড। সেখানে একটা মানুষ শুয়ে আছে। ধুলোধূসরিত চেহারায় বোঝা যাচ্ছে ঘরবাড়িহীন কোন ভবঘুরে। সনতের মনটা খারাপ হয়ে গেল। কার বাড়ির লোক, কোথা থেকে এসেছে কে জানে? এই তালাচাবি মারা সময়ে কোথা থেকে খাবার পাবে? পৃথিবীতে মানুষের বড় ভার! তার যাওয়ার জায়গা ফুরিয়ে আসছে যেন! সনৎ আর বেশি দেরি করে না, ফিরে যায়।
ঘরে ফিরে টিভি চালাতেই একরাশ খারাপ খবর ঝাঁপিয়ে পড়ে। আরও দুজন চিকিৎসকের মৃত্যুর খবর। প্রশাসন থেকে জানানো হচ্ছে, লকডাউনের সীমানা আরও বাড়বে। একই সাথে জেলায় জেলায় কন্টেনমেন্ট জোন তৈরী হচ্ছে। কলকাতা আর সংলগ্ন জেলাতেই প্রায় দুশোটি অঞ্চল চিহ্নিত করা হয়েছে। মানুষ নিজের কৃতকর্মে নিজেই আজ বন্দী। সনৎ মানসীকে এসে বলে, “রাতের দুটো রুটি আর একটু তরকারি আলাদা করে রেখে দিও। আমি ভোরবেলা নিয়ে বেরবো।”

মানসী অবাক হয়ে তাকায়। সনৎ সকালের অভিজ্ঞতার কথা বলে। মানসী শুনে বলে, “লোকটা আজ ছিল, কাল তো নাও থাকতে পারে।”
“গাড়ি ঘোড়া নেই। কোথায় যাবে? আর যদি না দেখা পাই ফেরত নিয়ে আসব বা পথে অন্য কাউকে দিয়ে দেবো।”
মানসী এই কথায় বিরক্ত হয়, “বাঃ আজ দেখেছো, কালকে খেতে দেবে? দিতে চাইলে এখন নিয়ে যাও।”
কথাটা সনতের মনে ধরে। একটা থলিতে করে দুটো রুটি আর তরকারি নিয়ে আবার পথে বেরয়। বেরনোর সময় মানসী বলে দেয়, “বেশি আদিখ্যেতা করে কাছে যেও না। কী না কী রোগ আছে, জানা নেই।”
বাসস্ট্যান্ডে পৌঁছে দেখে, লোকটি সেই একই ভঙ্গীতে শুয়ে। এখন বাস চলছে না, তাই জায়গাটা নিরুপদ্রব। সনৎ লোকটিকে ডাকে। লোকটি ঘুরে তাকায় কিন্তু উত্তর করে না। কিছু খেয়েছে কিনা সনৎ ইশারায় জিজ্ঞাসা করে। ভাবলেশহীন মুখ করে লোকটি তাকিয়ে থাকে। সনৎ এগিয়ে গিয়ে ঠোঙাটা রাখে। ইঙ্গিতে খেয়ে নিতে বলে। বেশি কাছে যেতেও ভয় করে, মানসীর সাবধান বাণী মনে পড়ে। সত্যিই তো যা ছোঁয়াচে রোগ এসেছে, কাউকে বিশ্বাস নেই।
আজ প্রায় এক মাস হতে চলল। এই প্রথম সনতের এতো ভালো লাগল। ফিরে এসে নাতিকে গল্প শোনায়। মানুষের কষ্টে এগিয়ে আসার চেয়ে বড় তৃপ্তি আর কিছুতেই নেই। “কাল তোমায় নিয়ে যাবো।” কথাটা শুনে দূর থেকে মানসী বলে, “থাক না। নিজে বীরত্ব দেখিয়ে বেরচ্ছো, ওকে সেখানে নাই বা নিলে।”
এরপর প্রতিদিনই নিয়ম করে, সনৎ লোকটির জন্য খাবার নিয়ে যায়।

একদিন রাস্তায় বিল্টুবাবুর সাথে দেখা। বিল্টুবাবু জিজ্ঞেস করে, “কী ব্যাপার সনৎ বাবু?”
“এইখানে একটা লোক থাকে, তাকে অল্প কিছু খেতে দিতে আসি।”
“ও তাই নাকি? আমিও দিতে পারি। প্রতিদিন আমার কিচেন থেকে প্রায় একশো জনের খাওয়ার ব্যাবস্থা করা হয়। কী?”
বিল্টুর এই কাজের কথা সনতের জানা ছিল না। শুনে বলে, “বাঃ খুব ভালো।”
বিল্টুবাবু বলে, “আপনার তো বাড়ি কাছেই, আপনি বরং রাতের খাবারটা দিন। আমার ছেলেরা ওকে সকালে খাইয়ে যাবে। আর হ্যাঁ, আপনার নাতির অনুষ্ঠান কিন্তু হবে। কী?”
সনৎ যেন একটু হাঁফ ছাড়ে। “কিন্তু ওর জন্মদিনের তারিখটা হয়তো পেরিয়ে যাবে।”
“দেখুন, রমজান মাস শুরু হয়েছে। আমার কারিগরেরা বাড়ি চলে যাচ্ছে। ওরা না ফেরা পর্যন্ত কিছু করা যাবে না। আর ততদিনে দেখুন সরকার যদি নিয়ম শিথিল করে, কী?”
“সে তো অনেক দেরী?”
“আপনাকে আমি টাকা ফিরিয়ে দিচ্ছি, চিন্তা করবেন না। তারিখ যখন আবার ঠিক হবে, আমায় ডাকবেন। আমায় আপনার ব্যাঙ্কের ডিটেল হোয়াটসঅ্যাপে পাঠিয়ে দেবেন। কী?”
সনৎ টাকার কথায় একটু লজ্জা পেল। “না না ঠিক আছে, আমায় তো অনুষ্ঠান করতেই হবে। সে আজ বা কাল যখনই হোক?”
যদিও গগন ফিরে এসে বিল্টুবাবুর সাথে যা কথা হয়েছিল, সনৎকে সব জানিয়েছিল। তবে তারপরে আর সনতের সাথে বিল্টুবাবুর কথা হয়নি।
বিল্টুবাবু চলে যায়। সনৎও ফিরে আসে। এরপর থেকে সনৎ সন্ধ্যার পর আসে লোকটিকে খাবার দিতে। সেদিন সনতের সাথে আরেকটি ভদ্রলোকের দেখা হল। তিনি গঙ্গার ওপার থেকে আসেন, রাস্তায় যত এমন মানুষ আছে তাদের খেতে দেন। ওনাদের একটা সমাজসেবার সংস্থা রয়েছে।
সনতের ভালো লাগে। সত্যি! এই দুর্যোগে কত মানুষ এগিয়ে এসেছে। যে যার নিজের মতো করে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। সত্যকারের মানুষের পরিচয়। দুপুরে গগনকে দেখলো, আবাসনের বাগানে একা বসে আছে। কাছে এসে জিজ্ঞেস করে, “কী খবর? অনেকদিন দেখা নেই। সব ঠিক আছে তো?”
গগন একটু ম্লান মুখে হাসে, “ঠিক না থাকলেও চলতে হচ্ছে।”
“কেন গো, আপিসে এখনও সমস্যা চলছে বুঝি?”
“হ্যাঁ সমস্যা তো আছেই। কাজ কমে গেছে, রেভেনিউ আসছে না। যেটুকু আছে, তারাও সময় মতো পেমেন্ট দিচ্ছে না। সব মিলিয়ে খুব করুণ অবস্থা।”

বাইরে রোদের তাপ থাকলেও এদিকে একটা বড় গাছের ছায়াতে বাগানের চেয়ারটি ঢাকা রয়েছে, তাই দুজনের বসতে অসুবিধা হয় না। সনৎ বুঝতে পারে, গগনের মধ্যে আগের মতো চনমনে ব্যাপারটা নেই। তাল কেটে গেছে। সকলের সব অঙ্ক উল্টে দিয়ে মড়ক চলেছে তার ডঙ্কা বাজিয়ে। নিজের বাড়িতেও অনুভব করতে পারে, বৌমা ধৃতি-র সারাদিন বাড়িতে থাকাতে, সব ফাটলগুলো যেন বেরিয়ে পড়ছে। আগে ও আপিস যেতো, আদিত্য মাসে একবার ঘুরে যেত, তখন ওপর ওপর আড়াল ছিল। সব মিলিয়ে, নিঃশ্বাস নেওয়ার জায়গা কমে যাচ্ছে। গগনকে স্তোক দেওয়ার মতো বলে, “চিন্তা কোরো না। সময়টা সত্যিই খারাপ! একটু মাথা গুঁজে থাকো, নিশ্চই কেটে যাবে। বুদ্ধ কী বলে গেছেন জানো?”
গগন জিজ্ঞাসু চোখে তাকিয়ে বলে, “কোন বুদ্ধ? বুদ্ধ ভট্টাচার্য?”
সনৎ হেসে বলে, “না না, আমি গৌতম বুদ্ধের কথা বলছি।”
গগন বুঝতে পেরে বলে, “কী বলেছেন?”
“দুঃখম দুঃখম সর্বং দুঃখম, ক্ষণিকম ক্ষণিকম সর্বং ক্ষণিকম, শূন্যম শূন্যম সর্বং শূন্যম। অর্থাৎ দুঃখই স্বাভাবিক। আর আমরা যে ভাবি, এই আমাদের গোটা জীবন বা আমাদের এই কাজের পাহাড়। এ সবই কিছু মুহূর্তের সারি। একটা মুহূর্ত কাটতে কত সময়ইবা লাগে? মুহূর্তগুলো জুড়েই তো এই সময়, অথবা গোটা জীবন, যা বলবে। আর সব শেষে পড়ে থাকে শূন্য। তাই মন খারাপ করে সময় নষ্ট।”
গগন চমকে উঠে বলে, “বাঃ রে! এ সব শূন্য? এই যে মানুষের এত পরিশ্রম! প্রজন্মের পর প্রজন্ম জুড়ে এই মেধা চর্চার ফসল, এই সভ্যতা। সেদিনের গুহাবাসী মানুষ, পৃথিবী ছাড়িয়ে আজ অন্তরীক্ষে বিচরণ করছে। সব শূন্য? তা কী করে হয়?”
সনৎ জবাব দেয়, “এটা তুমি কী চোখে দেখছো, তার ওপর নির্ভর করে। যেমন সনাতন দর্শন অনুযায়ী এটাকেই বলে পূর্ণ। ওঁ পূর্ণমদঃ পূর্ণমিদং পূর্ণাৎ পূর্ণমুদচ্যতে। পূর্ণস্য পূর্ণমাদায় পূর্ণমেবাবশিষ্যতে। পূর্ণ পরম ব্রহ্ম, পূর্ণ থেকে পূর্ণ উদ্গত হয় আবার পূর্ণ থেকে পূর্ণ সরিয়ে নিলে, পূর্ণই পড়ে থাকে।”
“এ তো অঙ্কের ইনফিনিটির কথা।”
সনৎ বলে, “অঙ্ক আর দর্শন তো এক হয়ে যায়। তাই তুমি যাকে ভাবছো ফাঁকা, কিছু নেই, সেখানেই থাকে সম্ভবনার বীজ, যা ক্রমে মহীরূহ হয়ে ওঠে। তাই ছোট ছোট অপ্রাপ্তিগুলো নিয়ে তেমনভাবে বিব্রত হয়ো না।”
গগনের ভালো লাগে। অনেকদিন বাদে, সনৎ মৃত্যু আর আক্রান্তের পরিসংখ্যানের বাইরে গিয়ে কথা বলছে। সনৎ বোধহয় গগনের প্রশ্ন বুঝতে পারে, “আসলে আমিও খুব বিষিয়ে যাচ্ছিলাম। গত কয়েকদিন ধরে, নিজেকে সজীব রাখার একটা অদ্ভুত উপায় পেয়েছি।” এই বলে, ওই ভবঘুরে মানুষটির কথা শোনায়, তাকে খেতে দিতে যাওয়ার গল্প, বিল্টুবাবু সহ আরও অনেক মানুষের কথা যারা রাস্তায় ঘুরে ঘুরে আর্তমানুষের সেবা করছে। সব শুনে গগন বলল, “বাঃ আমিও যাব।”
“বেশ তো যাবে। তুমি মতে মানুষের জীবনের লক্ষ্য আর উদ্দেশ্য কী?”
গগন অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে, “কী?”
“তোমার কী মনে হয়?”
“একেকজনের কাছে একেক রকম।”
“তা হয়তো বাহ্যিক। কিন্তু একটা প্রাথমিক চাহিদা কিন্তু সকলেরই এক।”
“সেটা কী অন্ন বস্ত্র বাসস্থান?”
সনৎ বলে, “ওটাও তো বাহ্যিক। প্রত্যেক মানুষের প্রাথমিক এবং অন্তিম চাহিদা হল, সুখ। সকলেই আমরা সুখের খোঁজে চলেছি। লক্ষ্য করে দেখো এই রোজগার, পরিশ্রম, সবই নিজের বা নিজের আপনজনের জন্য সুখের ব্যবস্থা করতেই করা।”
গগন বলে, “সেটাই তো হওয়া উচিত।”
“বেশ, তাই না হয় হল। কিন্তু সুখ মানে সকলের কাছে সমান নয়। কেউ একপ্লেট রসগোল্লা খেয়ে সুখী হয়, কেউ মাঠে খেলতে গিয়ে, বা অঙ্ক করতে পেলে সুখী হয়। এই সুখগুলো কিন্তু, একটা সময়ের পর কমে যায়। প্রথম রসগোল্লা খেয়ে তোমার যত সুখ হয়, দ্বিতীয়, তৃতীয় বা চতুর্থটি খাওয়ার সময় সেই সুখ তুমি পাবে না। তারপরেও যদি কেউ তোমায় রসগোল্লা দিতে চায়, তখন তুমি সেটা নিতেই চাইবে না। কিন্তু তুমি যদি কখনও অন্যের জন্য কোন কাজ কর, মানে নিঃস্বার্থভাবে অন্যের সুখের জন্য, সেই সুখ কখনও শেষ হয় না।”

গগন চোখ বড় করে বলে, “ও বাবা! আপনি তো আজ সাংঘাতিক কথা বলছেন।”
শুনে সনৎ বলে, “আমরা তো সাংসারিক মানুষ, সব জানলেও জীবনে মেনে চলতে পারিনা। বিচ্যুতি হয়, তার জন্য কষ্টও পাই। তবে কয়েকদিন ধরে আমার সেই সুখের রাস্তা যেন খুলে গেছে। ওই ভবঘুরে লোকটি আমায় সেই সুযোগ করে দিয়েছে।”
গগন বলে, “বেশ তাহলে আমিও আপনার সাথে যাবো।”
সেদিন সন্ধ্যায় গগনও সনতের সাথে খাবার দিতে গেল। বাসস্ট্যান্ডে পৌঁছে দেখে, লোকটি কেমন নিঃসাড় হয়ে শুয়ে আছে আর তার পাশে সারি দিয়ে খাবারের প্যাকেট। সনৎ লক্ষ্য করে বোঝে, গতরাত থেকেই লোকটি কিছু খায় নি। মরে গেল নাকি? একটু কাছে গিয়ে দেখে, তা নয়। বোধহয় খুব অসুস্থ। খুব অসহায় হয়ে গগনের দিকে তাকায়, “কিছু করা যাবে? লোকটি খুব অসুস্থ মনে হচ্ছে।”
গগন কী মনে করে বিল্টুবাবুকে ফোন করে। সব শুনে বিল্টু বাবু বলে, আমি লোকাল থানাকে বলছি, কিছু করতে। কিছুক্ষণ পর বিল্টুবাবু ফোন করে বলে, লোকাল থানা বলেছে, এই ব্যাপারে সাহায্য করতে পারবে না। থানা থেকে স্বাস্থ্য ভবনের ফোন নম্বর দিয়েছে। গগন ফোন নম্বর নিয়ে সেখানে ফোন করে। স্বাস্থ্য ভবনের হেল্প লাইনের ভদ্রলোক শুনে বললেন, “আপনি লোকটিকে হাসপাতালে নিয়ে আসুন, আমরা চিকিৎসার ব্যবস্থা করে দেবো।”
গগন আর সনৎ দুজনেই খুব সমস্যায় পড়ে। এই রাতে ওকে কী করে নিয়ে যাবে? লোকটি তো সামান্য নড়ে বসে খেতেই পারে নি। আবার বিল্টুবাবুকে ফোন করে গগন। শুনে বিল্টুবাবু বলে, “দেখুন এমন অসুখ, নিজের গাড়িতে নিয়ে যাওয়া যাবে না। আমি চেষ্টা করছি অ্যাম্বুলেন্সের। মনে হয় না সকালের আগে কিছু হবে।”
একরাশ মন খারাপ নিয়ে দুজনে আবাসনে ফিরে আসে।
পরদিন সকাল হতে না হতেই বিল্টুবাবুর ফোন আসে, “বাসস্ট্যান্ডের লোকটি এক্সপায়ার করেছে। আমি পুলিশকে দিয়ে বডি পাঠিয়ে দিয়েছি। কী? সবাই পিপিই কিট পরে এসেছিল। কী?”
কথাটা শুনে গগন আর উত্তর দিতে পারে না। তিয়াসা অবাক হয়ে গগনকে দেখছিল। গগন বলে, “একটু বেরচ্ছি, এসে সব বলব।”
সনৎকে নিয়ে খুব তাড়াতাড়ি দুজনে বাসস্ট্যান্ডে পৌঁছয়। এসে দেখে দমকলের লোকজন বড় হোস দিয়ে পুরো জায়গাটার শুদ্ধিকরণ করছে। গতকাল, পরের পর ফোন করে প্রশাসনের কাউকে পায়নি, আর আজ সব বিভাগের লোক কাজ করতে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। সনৎ ছেলেমানুষের মতো গগনকে ধরে কাঁদতে থাকে। গগন বুঝতে পারে না কীভাবে সান্ত্বনা দেবে?

চারিদিক জলে ভরে গেছে। রাসায়নিক মিশ্রিত জল বাসস্ট্যান্ড ছাপিয়ে রাস্তার ধুলো, কাদা করে দিচ্ছে, যা খানিক পর আবার শুকিয়ে যাবে। মানুষটার সম্পূর্ণ উপস্থিতি এই পৃথিবীর মাটি থেকে মুছে যাচ্ছে। কোথাকার মানুষ, কীভাবে এলো কেউ জানবে না। ওর বাড়ির লোক, আপনারজন কেউ তো থাকবে? গগন বা
সনৎ কিছুই বুঝতে পারে না। বিশ্বব্যাপী মড়কের পরিসংখ্যানের শুধু একটা সংখ্যামাত্র হয়ে, লোকটি নিজের উপস্থিতি রেখে গেল।

