রাতের শহরে যানবাহন কম। নাইট শিফ্ট শেষ করে কর্মচারীদের বাড়ি পৌঁছৈ দিতে কয়েকটা কল সেন্টারের গাড়িকে দেখা যায়। এমনই একটা গাড়ি কাজ সেরে ফিরছে, ব্রিজে ওঠার ঠিক আগে পুলিশ আটকায়। কাগজপত্র নিয়ে চালক গাড়ি থেকে নেমে যায়। পরপর অনেকগুলো গাড়ি দাঁড়িয়ে, বোঝ যায় বেশ ধরপাকড় চলছে। কয়েকটা গাড়ি ছাড়া পেয়ে এগিয়ে যায়।

রাত নামলে পাড়া ঘুমোয়। কিন্তু সব পাড়াতে ঘুম থাকে না। আপিস পাড়ায় রাত নামে। খালি বাড়িগুলো চোখ বোজে। সেখানেও ব্যতিক্রম রয়েছে। বি-পি-ও আর কে-পি-ও পাড়ায় কেউ ঘুমোয় না। পৃথিবীর বিভিন্ন সময়ভাগে তখন সূর্য আলো ঢালছে। সেখানকার মানুষকে পরিষেবা দিতে, এই শহরের বি-পি-ও বাড়ি জেগে থাকে। সেই সঙ্গে জেগে থাকে বার, রেঁস্তোরা, সিনামা হল।

সার দিয়ে ছোট বড় নানা মাপের গাড়ি ঢুকছে বেরচ্ছে বিপিও পাড়ায়। ডিউটি অনুযায়ী কর্মীদের বাড়ি পৌঁছে দিচ্ছে বা নিয়ে আসছে। শিফ্ট বদলের সময় ভীষণ ব্যস্ততা। এমনই এক কোম্পানি ‘গ্লোব টাচ’-এর রাতের শিফ্টের গাড়িগুলো থামছে। একে একে ছেলে মেয়েরা নেমে আসে। সূর্য তাদের মধ্যে একজন। বয়স আঠাশ, লম্বা সুঠাম চেহারা। ওকে ঢুকতে দেখে, রিসেপশনে থাকা অরিন্দম জিজ্ঞেস করে, “তোর নাম কে যে সূর্য রেখেছিল? কে জানে?”
“কেন আমার বাবা দিয়েছে!”
“বাবা-র মর্যাদা রাখলি না।”
“কেন?”
“রোজ রোজ নাইট ডিউটি করে গেলি। কোনদিন সূর্য দেখেছিস?”
সূর্য হেসে ফেলে, “কী করব গুরু? নাইটে দুটো পয়সা বেশি হয়। গরীবের উপকার হলে, তোমার কী অসুবিধা?”
“আমার আর কী অসুবিধা? শরীর খারাপ হলে, তোরই হবে। টানা এমন ভাবে নাইট করলে, সব ঘেঁটে যাবে।”
“তুমিও তো নাইট করছো?”
“তোর মতো রোজ করি না।”
“অভ্যাস হয়ে গেছে।”
“শুধু অভ্যাস? লোকজন বলছে অন্য কারণ।” রিসেপশানের অরিন্দম একটা রহস্যের হাসি দেয়।

সূর্য আর কথা বাড়ায় না। কাচের দরজায় গলার আইডি-কার্ড ছোঁয়ায়। পিক করে শব্দ হয়, ছোট লাল আলো জ্বলে দরজাটা খুলে যায়। বাইরের অন্ধকারের সঙ্গে এই আপিসের অভ্যন্তরের কোন তুলনা চলে না। ঝকঝকে আলোতে ফ্লোর ভেসে যায়। দিন কি রাত বোঝা যায় না। ঝকঝকে দিনের আলোর মতো পরিবেশ, সূর্যর মন মুহূর্তে তাজা হয়ে যায়। নিজের কাজটা ওর ভালো লাগে, সিটে বসে ওয়ার্কস্টেশনে লগ-ইন করে।
কিউব-এ পাশাপাশি আটটা করে সিট। সুদৃশ ঘেরাটোপের ওপরে ছোট ছোট পতাকা লাগানো, যে দেশের যে কোম্পানির কাজ করছে, তাদের পতাকা, তাদের লোগো কিম্বা কোন প্রজেক্টের নাম লেখা। এতে কর্মীরা একাত্মবোধ করে। ওদের ভাষায় কথোপকথনে সুবিধা হয়। নামও পাল্টে যায়, সূর্যর নাম যেমন সানি। এই নামেই ওর ক্লায়েন্টদের সঙ্গে কাজ করে।

নিজের ওয়ার্কস্টেশনে লগ-ইন করতে করতে উশখুস করে, এখনও দলবীর ঢোকেনি। দিন কয়েক হল ওদের টিমে দলবীর যোগ দিয়েছে। ট্রেনিং শেষে এটাই প্রথম কাজ। সূর্যের কাছে কাজের খুটিনাটি বুঝে নিতে চায়। হঠাৎ করে এমন একজন ডাকসাইটে সুন্দরীকে পাশে পেয়ে সূর্যের উৎসাহ বেড়ে গেছে, তবে কাউকে বুঝতে দেয়না। দলবীর ওরফে ‘ডল’-এর কলগুলো নিজেই নিচ্ছে।

সূর্যের ওয়ার্কস্টেশনের আলো বিপ করতে থাকে। হেডফোনটা কানে লাগিয়ে চোস্ত আমেরিকান উচ্চারণে বলে ওঠে, “ভেরি গুড মর্নিং, সানি দিস সাইড, হাউ ক্যান আই হেল্প ইউ?”
অন্যদিকে বেশ ভারি গলায় উত্তর আসে, “ওয়ান্ট টু টক উইথ ডল। ক্যান ইউ কানেক্ট হার, প্লিজ?”
সূর্য চমকে ওঠে, সরাসরি ওপারেটরদের নাম করে কেউ কখনও কাউকে চায় না। কারণ ওদের প্রত্যেকেই কোম্পানিকে প্রতিনিধিত্ব করে, নিজেদের সত্তাকে নয়। “আমি দুঃখিত! উনি এখন অন্য কাজে আছেন, আপনি আমাকে আপনার সমস্যার কথা বলতে পারেন।”
“ওটাই আমার সমস্যা। আচ্ছা পরে ফোন করব।” ফোনটা কেটে যায়। সূর্য পরের কল নেওয়ার আগে একটু দম নেয়। হেডফোন খুলে একটু জল খায়। ওর এত বছরের অভিজ্ঞতায় এমন ঘটনা, এই প্রথম। বেশ বিরক্তি ফুটে ওঠে চোখে মুখে।
পরের দুটো কল, একদম কেজো কথাবার্তা। সূর্য প্রথম কলের কথা প্রায় ভুলেই গিয়েছে, ঠিক তখন একটা বিশেষ ঘ্রাণ ওর মস্তিষ্ক স্পর্শ করল। ডানপাশে না তাকিয়েও সূর্য বুঝতে পারে, দলবীর এসে ওর চেয়ারে বসেছে। এই বিশেষ ঐশ্বরিক গন্ধওয়ালা পরফিউমটা এই আপিসে একমাত্র একজনই ব্যবহার করে।
“সরি সানি দা, আজ একটু দেরী হয়ে গেল। একটুর জন্য বাসটা মিস করলাম।”
সানির দুই ভুরুর মাঝখানে কিছুক্ষণ আগে ফুটে ওঠা বিরক্তিটা, দলবীরের কন্ঠস্বরে গলতে শুরু করে।
“অফিসের ক্যাব-এ নাম লেখালেই তো সময়ে আসতে পারো।”
“তা পারি, ফেরার সময় বড্ড ঘুরপথে যায়, বাড়ি পৌঁছতে অনেক সময় লাগে।”
“কী করা যাবে? কোম্পানি তো একা তোমার জন্য গাড়ি দিচ্ছে না। সবাইকে নিয়ে রুট অপটিমাইজ করে।”

দুজনের ওয়ার্কস্টেশনেই ইনকামিং কলের সঙ্কেত ফুটে ওঠে। নিজেদের কাজে ডুবে যায়। রাত কি দিন? কোন গোলার্ধে কে রয়েছে? সে সবের হিসেব থাকে না। ভুবনায়নের চক্করে সব মিশে যেতে থাকে। আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থার পিঠে ভর করে, কোন দূরত্ব আর ভৌগলিক থাকে না। অথচ সূর্যর মাঝে মাঝেই মনে হয়, ঠিক পাশে বসা দলবীরের সঙ্গে ওর যেন গ্রহান্তরের ব্যবধান।
টানা অনেকক্ষণ কল নেওয়ার পর বিরতি নেয় সূর্য। কাফেটারিয়াতে যায়, একটু কফি আর হাল্কা কিছু মুখে দেয়। যদিও ডিনার খেয়েই বাড়ি থেকে বেরিয়েছে, তবু রাত জাগলে, কেন যেন খিদে পেয়ে যায়। কিছুমিছু মুখে দিতে ইচ্ছে করে।

ক্যাফেতে এসে দেখে দলবীরও সেখানে রয়েছে। সূর্য এগিয়ে এসে বলে, “ডল, তুমি আসার আগে একজন তোমাকে কল করেছিল। আমি সি-এল-আই নোট করে রেখেছি।”
দলবীর অর্থপূর্ণ চোখে সূর্যের দিকে তাকিয়ে বলে, “অ্যাম নট ডল, বাট দলবীর।”
সূর্যের উত্তর দেওয়ার আগে ও বেরিয়ে যায়। সূর্য কফি হাতে একটা টেবিলের কাছে আসে।
অরিন্দমও এসেছে কফি নিতে, “চেষ্টা চালিয়ে যা।”
ধরা পড়া চোখে হাসে সূর্য, “ভ্যাট!”
“শুধু সাবধানে খেলিস, ওরা কৃপাণ নিয়ে ঘোরে কিন্তু।”

অরিন্দমকে কাটিয়ে পরের টেবিলে এগিয়ে যায় সূর্য। সেখানে টেবিলে মাথা রেখে ঘুমিয়ে রয়েছে পঙ্কজ, ওদের কোম্পানির গাড়ি চালায়। ওকে ঘুমোতে দেখে সন্তর্পনে সরে আসে সূর্য, তখন পঙ্কজ বলে ওঠে “স্যার, বসবেন?”
“তুমি বিশ্রাম করছো, আমি অন্য টেবিলে বসছি।”
পঙ্কজের চোখদুটো লাল হয়ে রয়েছে। কত রাত ঘুমোয়নি কে জানে? “তুমি ঘুমাও।”
পঙ্কজ হাসে, “আমাদের অভ্যেস হয়ে গেছে।”
“সে তো আমারও।”
“আপনার তো দিনের বেলায় ছুটি, আমার সেটাও নেই।”
“সেকি? দিনে তো আমাদের ক্যাব দেয় না।”
“আপনাদের কোম্পানি নয়, ওপাশের বড় বাড়িতে ডিউটি থাকে।”
“তুমি ডিউটি নাও কেন? না, বলতে পারো না? একদিনে দুটো ডিউটি করবে কেন?”
“ধূস! তাই হয় নাকি? হরকিষণ ছেড়ে দেবে নাকি?”
হরকিষণ গাড়ি কোম্পানির মালিক। এই আপিস পাড়ায় ওর প্রায় পঞ্চাশটা গাড়ি খাটে।
পঙ্কজ আবার হেসে নিয়ে বলে, “হরকিষণ, দরকার হলে আরও দুটো বেশি গাড়ি কিনবে, কিন্তু ড্রাইভার বাড়াবে না। ও তো জানে দুটো পয়সার জন্য, এক্সট্রা ডিউটি-তে, কেউ না করবে না। এতে সবার লাভ।”
সূর্য আর এ নিয়ে কথা বাড়ায় না। বুঝতেই পারছে, এই অতিরিক্ত শ্রমের বিনিময় যে অতিরিক্ত উপার্জন, সেটা সকলেরই প্রয়োজন। সেখানে সূর্য বা পঙ্কজে কোন বিভেদ নেই। হঠাৎ কী মনে করে, জিজ্ঞেস করে, “আচ্ছা, তোমাদের সকাল ছ’টা নাগাদ কোন গাড়ি আছে? যেটা সরাসরি ব্রিজ পার করে। কদমতলা ঘুরে যায় না। বেশিরভাগ গাড়ি কদমতলা ঘুরে যায়, বড্ড দেরী হয়ে যায় ফিরতে।”
পঙ্কজ খানিক ভেবে বলে, “একটু খোঁজ নিয়ে জানাচ্ছি।”

সংগ্রহ করতে ওপরের ছবিতে ক্লিক করুন

কাজ শেষে সূর্য যখন আপিসের ক্যাবের লাইনে দাঁড়িয়ে, লক্ষ করে দলবীর বাসস্ট্যান্ডের দিকে চলে যাচ্ছে। অল্প মন-কেমন করে ওঠে। এতক্ষণ পাশাপাশি বসে কাজ করল, দুজনে একই অঞ্চলের বাসিন্দা, ফেরার পথটুকুও একসঙ্গে যেতে পারলে ভালো হতো।

আপিসের কিউবিক্ল থেকে বেরিয়ে এসে সূর্য বাস্তবের পৃথিবীতে এসে দাঁড়ায়, তখনও ওর মনের ভিতর ঘুরে বেড়ায় ওর চোস্ত বিদেশি ভাষার কথোপকথন, গোলার্ধের অন্যদিকে থাকা লোকগুলোর চেহারা আর জীবনযাত্রা, সেখানে এই শহর কলকাতার ধুলো ধোঁয়া বড্ড অকেজো আর অবাস্তব মনে হয়। সূর্যের কাছে রাতের ‘সানি’-র পৃথিবীটাই ভীষণ সত্যি। কোন রকমে গাড়িতে উঠে চোখ বন্ধ করে, ফিরে যায় সেই জগতে। সব ক’জন যাত্রীরা উঠে পড়লে পঙ্কজ গাড়ি ছাড়ে।

সবার শেষে সূর্যর গন্তব্য। পঙ্কজ গায়ে ঠেলা দিয়ে ডেকে তোলে। সূর্য ধড়মড় করে বলে ওঠে, “সানি দিস সাইড।” তারপর একটু থেমে বুঝতে পারে কোথায় আছে, “এসে গেছে?”
“আপনার জন্য খবর আছে। বড় বাড়ি থেকে একটা গাড়ি রিলিজ করছে। ওটা বসে যাবে। এখন আপনি যদি আপনার অ্যাডমিনকে বলেন, ওটা চালানো যাবে। তাহলে সরাসরি ব্রিজ পার করে এদিকে চলে আসব, কদমতলা ঘুরে আসতে হবে না।
সূর্য চমকে ওঠে! “বাহ! একদিনের মধ্যে ব্যবস্থা হয়ে গেল? তুমি তো জিনিয়াস!”
“সে সব কিছু না, ওটা পেলে, আমিও তাড়াতাড়ি বাড়ি পৌঁছে, একটু ঘুমোতে পারবো।”
সানি, পঙ্কজ, অরিন্দম সকলের জীবনে ‘ঘুম’ এক মহার্ঘ্য দ্রব্য!
গাড়ির খবরটা পেয়ে সূর্য বলে, “বেশ, আমি অ্যাডমিনকে জানাচ্ছি।”
বাড়িতে ফিরে দুই পাক নেচে নিল। মা দেখে অবাক! “কীরে? কী হল? শরীর খারাপ?”
সূর্য নিজেকে সংযত করে বলে, “না না কিছু না।”

সূর্য সঙ্গে সঙ্গে অ্যাডমিনকে একটা মেইল করে রাখে। আবার রাতে, ও যখন ডিউটি ধরবে, তখন কর্তাব্যক্তিরা কেউ থাকবে না। তারপর দলবীরকে ফোন করে, কিন্তু পায় না। হয়তো নাইট করে ঘুমোচ্ছে। সূর্যও স্নান করে খেয়ে শুতে চলে যায়। এই সময় ফোন নিঃশব্দ রাখে।

ঘুম ডিঙোতে দুপুর গড়িয়ে যায়। দুপুরের খাওয়া সেরে নিজের অন্য কাজ করে। প্রতিদিন এই তার নিয়ম। শারীরবৃত্তীয় ঘড়ি পাল্টে গেছে। সূর্যাস্ত হলে, যেন ওর মধ্যে শক্তি সঞ্চার ঘটে। তখন জিমে যায়, বাড়ির জন্য বাজার করে, পাড়ায় দুয়েকজন বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দেয়। শেষে, রাতের খাবার খেয়ে অপেক্ষা করে পঙ্কজ বা অন্য কারও, যে ওকে ‘গ্লোব-টাচ’-এর আপিসে পৌঁছে দেবে।

আপিসে পৌঁছতেই রিসেপশানের অরিন্দম বলে, “তোদের জন্য ডাইরেক্ট রুটের গাড়ি হয়েছে। গাড়ি নম্বর মেইলে দিয়ে দেব। আজ তো জ্যাকপট!”
“কেন?”
“তোর সঙ্গে তোর পার্টনারও আছে।”
“কে আবার পার্টনার?”
“ওহ! জানে না যেন? তুইই তো ডল-কে রেকোমেন্ড করেছিলি।”
সূর্যের মনে খুশি উছলায়, মুখে কিছু বলে না।

ফেরার পথে, তখনও আলো ফোটেনি, ব্রিজে ওঠার ঠিক আগে পুলিশ গাড়ি আটকায়। কাগজপত্র নিয়ে পঙ্কজ এগিয়ে যায়। গাড়ির ভিতর দলবীর সূর্য সহ আরও কয়েকজন। পরপর অনেকগুলো গাড়ি দাঁড়িয়ে, বোঝা যায় বেশ ধরপাকড় চলছে। সূর্য নেমে, সমস্যা বোঝার চেষ্টা করে। সার্জেন্ট বলে, “আপনাদের গাড়ির রোড ট্যাক্স ফেল আছে। লাখ টাকার ওপর পেনাল্টি, গাড়ি আমরা সিজ করছি। আপনারা একটু অপেক্ষা করুন, আমাদের গাড়িতে আপনাদের পৌঁছনোর ব্যবস্থা করছি।”
পঙ্কজ গলা নামিয়ে সূর্যকে বলে, “এই জন্য বড় বাড়ি, এই গাড়িটাকে বসিয়ে দিয়েছে।”
“সেটা তুমি জেনেও আমাদের কোম্পানিকে বলোনি?”
“হরকিষণের সব গাড়ির রেশন কার্ড করা আছে, তাই এসবে পরোয়া করে না।”
“রেশন কার্ড?”
“সার্জেন্টদের মাসোহারা।”

সংগ্রহ করতে ওপরের ছবিতে ক্লিক করুন

দলবীরের সঙ্গে প্রথমদিন গাড়িতে আসার সুখ, সূর্যের কপালে সইল না। সার দিয়ে অন্তত দশ বারোটা গাড়ি দাঁড়িয়ে, সবই ওদের মতো কল সেন্টারের গাড়ি। এদের প্রত্যেককে পৌঁছতে দুপুর গড়িয়ে যাবে। অন্য সহযাত্রীরা গাড়িতেই বসেছিল। সূর্য ফিরে এসে দলবীরকে জানায়। সব শুনে দলবীর বলে, “আমরা তো এসেই গেছি। চল, এক সঙ্গে ব্রিজ পার হয়ে যাই। আমার বাড়ি তো সামনেই।”

এক রাতের মধ্যেই এতটা সুযোগ পাবে, সূর্য ভাবেইনি। শুক্রবার পার করে শনিবারের ভোরের আলো ফুটতে তখনও কিছুক্ষণ বাকি। দুজনে পায়ে হেঁটে নদীর ওপর নির্মিত আধুনিক সেতু পার হয়ে যায়। সূর্য ভাবতে থাকে এই সেতুসঞ্চার যেন দলবীরের মনের কাছে নিয়ে যায়। ফুটপাথে এলোমেলো কিছু পাথর ছড়ানো। দলবীর একটু হোঁচট খায়, সূর্য আলগোছে হাত বাড়াতে, দলবীর নিঃসঙ্কোচে হাত ধরে। সেতুর ওপর বড় বড় হলুদ আলো কেমন মায়াময় করে রেখেছে। সেই অসম্ভব অলীক সময়ে মাখামাখি হয়ে সূর্য হেঁটে যায় নতুন ভোরের দিকে। দলবীরকে খুব বলতে ইচ্ছে করছিল, “ডল, নদীর পাড়ে গিয়ে কিছুক্ষণ বসি?”
সারারাত কাজ করার পর দুজনেই ক্লান্ত, তাই মুখফুটে দলবীরকে কথাটা বলা হল না।

বাড়ি ফিরে স্নান খাওয়া করে, সূর্যের আজ কিছুতেই ঘুম আসেনা। শনিবার ছুটির দিন, তাই আবার রাত জাগার চাপটাও নেই। বেরিয়ে পড়ে সূর্য। ব্রিজের ধারে দলবীরদের পাড়ার মুখেই বড় গুরুদ্বার আছে। সূর্যর আজ সেখানেই যেতে ইচ্ছে করে। মাথায় রুমাল বেঁধে গুরুগ্রন্থসাহিবের সামনে মাথা ঠেকায়। দুজন সুর করে পাঠ করছেন। সব মিলিয়ে মনটা শান্ত হয়ে আসে। হঠাৎ একটা পরিচিত ঘ্রাণ পেয়ে পাশ ফিরতে দেখে দলবীর দাঁড়িয়ে। সূর্যর হৃদপিন্ডটা গলার কাছে চলে আসে। বুকের ধুকধুক দলবীর কি শুনতে পেয়ে গেল? দলবীর চোখের ইশারায় হলঘরের দিকে আসতে বলে। সেখানে সকলে সারি দিয়ে বসে প্রসাদ খাচ্ছে। ওরাও পাশাপাশি বসে। প্রসাদের এমন স্বর্গীয় স্বাদ সূর্য কখনও পায়নি। এই পাড়া দিয়ে কতবার যাতায়াত করেছে, কিন্তু এখানেই যে সূর্যের গন্তব্য স্থির করা রয়েছে, এতদিনে টের পেল। মনে মনে ভাবতে থাকে দাড়ি আর পাগড়িতে ওকেও মন্দ লাগবে না।

ততক্ষণে খাওয়া শেষ। দলবীর সূর্যের হাত থেকে থালা কেড়ে নিয়ে ধুতে চলে গেল। সূর্য যেন মাটির প্রায় একহাত ওপর দিয়ে ভাসতে ভাসতে বাইরে এল, “থ্যাঙ্কু ডল।”
দলবীর অবাক হয়, “হঠাৎ থ্যাঙ্কু কেন? আর আয়াম দলবীর, নট ডল।”
সূর্য আর কিছু বলতে পারে না, কথা গুলিয়ে যেতে থাকে।

সোমবার রাতে আপিস যাওয়ার জন্য, সূর্য একটু তাড়াতাড়িই প্রস্তুত হয়ে রাস্তায় এল। কেন যে মাঝখানে রবিবার ছিল? শনিবার গুরুদ্বার থেকে ফিরে অনেকবার দলবীরকে ফোন করতে চেয়েছে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত পারেনি। পঙ্কজের নির্দিষ্ট পুরোন রঙচটা গাড়ির বদলে, একটা ঝাঁ চকচকে নতুন গাড়ি এসে, ওর সামনে দাঁড়ালো। চালকের আসনের পাশে দলবীরকে না দেখলে, অচেনা গাড়ি ভেবে দূরে সরেই থাকত। জানলা নামিয়ে দলবীর বলে, “উঠে এসো।”
গাড়িতে উঠতেই চালকের আসন থেকে হরকিষণ আলাপ করে। ওদের আপিস পাড়ায় যার গাড়ির ব্যবসা। সুদর্শন চেহারা, মাথায় পোশাকের সঙ্গে মিলিয়ে জামরঙা পাগড়ি সুন্দর করে বাঁধা। হেসে বলে, “পঙ্কজের গাড়িটা পুলিশ তুলে নিয়েছে, তাই ক’দিন কষ্ট করে আমার সঙ্গেই আপনাদের যেতে হবে।”
হরকিষণের পেশাদরিত্ব আর কর্তব্যবোধ দেখে সূর্য মুগ্ধ হয়। কর্মচারীকে না পাঠিয়ে নিজেই খেসারত দিতে চলে এসেছে।

প্রায় সপ্তাহখানেক লাগল, পঙ্কজের গাড়ি পুনর্বহাল হতে। এই ক’দিনের মধ্যে সূর্য দাড়ি কাটেনি। রোজ আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে হিসেব করে, সর্দারের মতো দাড়ি হতে আর কতদিন লাগতে পারে।

কিন্তু পরের শনিবার গুরুদ্বারে পৌঁছৈ, দলবীরকে পায়নি। কী হল? একবার কল করে দেখবে কিনা, ভাবতে ভাবতে ফোনের ভেতর একটা ছোট্ট একটা ইমেল সূর্যর ইনবক্সে এসে পৌঁছল। খুলে দেখে, একটা বিয়ের কার্ড। হরকিষণ আর দলবীর, সঙ্গে দুটো লাইন, “সানি-দা, আবার কবে অফিসে যেতে পারব, জানিনা। তাই মেইল করেই নিমন্ত্রণ করলাম। এসো কিন্তু।” মেইলটা পেয়েই সূর্য দলবীরকে ফোন করে, “ডল, এটা কী? ডল?”
“সরি সানি দা, আমি ডল নই, দলবীর। তুমি সূর্য না হয়ে, সানি হতে পারো, আমি কিন্তু দলবীর। আর হ্যাঁ, ওইদিন এসো, প্লিজ।”

সহযোগিতার হাত বাড়াতে ওপরের ছবিতে ক্লিক করুন

[লেখকের অন্য রচনা]

[পরম্পরা ওয়েবজিন, মার্চ ২৫, সূচিপত্র – এখানে ক্লিক করুন]