
আত্মঘাতী!
অমলেন্দু’র কথার উত্তরে ওর মা এসে তড়িঘড়ি জবাব দিল ‘ আগুন নিয়ে খেলা করিস না অমু, কী ঘটতে কী ঘটবে কেউ বলতে পারে না। মুহূর্তেই ঘটে যাবে এমন বিস্ফোরণ যার আগাম আভাস পেতে গেলে কালঘাম ছুটে যাবে।’ অমলেন্দুর ভাবনায় এলো না, মা ওকে শুনিয়ে এমন কথা বলল কেন! কোনও নতুন সময়ের ইঙ্গিত হলেও হতে পারে। সময়টা যে অভিনব অমলেন্দুর বুঝতে অসুবিধে হয় না। এই তো কাল কথা নেই বার্তা নেই, লোকগুলো এমন করে তেড়ে এলো, আর একটু হলেই কিল ঘুষি চড় মেরে মাটিতে শুইয়ে দিত। বলার মধ্যে বলেছিল, ‘মুখে যা নয় তাই বলে যাবেন, স্থান কাল পাত্র থাকবে না।’ তা-ও আবার সেই বিতর্কিত প্রশ্ন – স্বাধীনতা কার হাত ধরে এসেছিল, এক দল বললো ‘নেতাজি’, আর এক দল চেঁচিয়ে উঠলো ‘না মশাই ‘গান্ধীজি’। এক বৃত্তের মধ্যে আরও অনেক ছোট ছোট বৃত্ত তৈরি হলো। কথার পিঠে কথা বসালো – ‘দেশটা যে ভেঙে দূ’টুকরো হলো সেই খেয়াল আছে। থাকবে না আবার: পদ্মার ইলিশ নিয়ে এত কাড়াকাড়ি তো হতো না। গোটা বাঙালি জাতটা বেঁধে বেঁধে থাকত। হুশ করে শিয়ালদহ থেকে রানাঘাট গেদে দর্শনা হয়ে গোয়ালন্দ ঘাট থেকে স্টিমারে চড়ে পায়ে হেঁটে নিজের ঘর। মনের সুখে কত আরাম’।‘স্বপ্ন দেখা ভালো, দুঃস্বপ্নে স্বাস্থ্যহানি হয়, মনের অসুখ বাড়ে।’ অমলেন্দু ক্ষণেক চুপ মেরে থেকে বলে, ‘অত মায়াকান্না কাঁদবেন না। ওই আপনাদের এক দোষ, সাতাত্তর বছর পার হয়ে গেল এক পল দুই পল করে, এখনও মনটা ওপারের জন্য আকুলি বিকুলি করে, পাছায় লাথি মেরে খেঁদিয়ে তাড়িয়েছে, তবুও উচিত শিক্ষা হয় না।’ আর একজন খোঁচা মারতে ছাড়ল না – ‘বলি কী আর সাধে, হোগলা বন, কচু বন সাফসুতরো করে জবরদখলি জমিতে কলোনি বানিয়েছে কিনা বাপ ঠাকুরদারা।’ অমলেন্দুর মাথায় গিজগিজ করে কত শত কথা। মা-ই আগ বাড়িয়ে বললো, ‘শুনছিস লোকে কী বলে বেড়াচ্ছে, এপারের হিন্দু বাঙালিদেরও ভিটে ছাড়া হতে আর বেশি দেরি নেই!’ অমলেন্দু কথাটা শুনেও যেন না-শোনার ভান করে। ওর পড়ার টেবিলের উল্টো দিকের রেকে থরে থরে সাজানো কত বই। এত বইয়ের মধ্যেও তিন দশক পরেও কিছুতেই এক তিলও সরে নি – নীহাররঞ্জন রায়-এর ‘বাঙ্গালীর ইতিহাস।’ আর নীরদচন্দ্র চৌধুরী’র ‘আত্মঘাতী বাঙালী,’ বড্ড মায়া পড়ে গেছে কিনা। এই টান কীসের টান, নিজের সঙ্গেই নিজেই যেন প্রশ্ন করতে গিয়েও থমকে যায়। ‘এর উত্তর খুঁজবি বলে নিজের চুল নিজে ছিঁড়ছিস, তোর বদভ্যাসটা আর কোনোকালেও যাবে না। যদি বাঁচতে চাস তো, মানিয়ে নিতে শিখ।’ মা সাবধান করলেও নিজের অপদার্থতার প্রশ্নটা সামনে শিখণ্ডীর মতো দাঁড়িয়ে যায়।
(২)
অমলেন্দু চেয়ারে বসে ল্যাপটপের কীবোর্ডে হাত বুলাতে থাকে। মনোসংযোগে কেন যে ব্যাঘাত ঘটছে একটা নতুন শব্দেরও জন্ম হচ্ছে না। বড় দুঃসময় এখন, নিজেকেই নিজে যেন আগলে রাখতে হয়। কারও উপর ভরসা করলে সে যে ছুরি মেরে দেবে না তার কী কোনো গ্যারান্টি আছে। সময়কে নিয়ে নিংড়ালেও কোনো রসকষ নেই। অগত্যা নিজের সঙ্গে নিজের লড়াইটা চালাতেই থাকে। রমেন বাবু অধ্যাপক মানুষ, কথায় কথায় জ্ঞান দেয়। বলতে ছাড়ে না – অমল, ভুলেও কখনও নিজের সঙ্গে নিজের লড়াইটা ছেড়ো না যদি বাঁচার মতো বাঁচতে চাও। অমলেন্দু কথাটা সেই যে মাথার মধ্যে ঢুকিয়ে নিয়েছে, আজও সুযোগ মতো বের করে নিয়ে আসে। খবরের কাগজের পাতা ওল্টাতে গিয়ে বুঝতে পারে অক্ষরগুলো কিছুতেই মনের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারছে না। প্রতি পদে পদেই মনে হয় ওর দেখা জগৎটা কেমন পাল্টে যাচ্ছে। মানুষের স্বর ও সুরে খালি ঘোরাফেরা করে কখন যা কিছু আছে সব তছনচ করে দেবে। ও ছুটে যায় অনেক আশা ভরসা করে কিন্তু কোথায় কী যা ভেবেছিল তা তো নয়, শুধুমাত্র ভণ্ডামি আর ছক কষা। নেই কোনও আশ্রয়, নেই কোনো সমাধান। না কেউই যেন ঠিকঠাক কথা বলছে না। ছোট ভাই সজলের আচার আচরণ পাতে দেবার মতো নয়। কথায় ও কাজে দূরত্বটা নিজেই যেন বাড়িয়ে তুলছে। কথার পিঠে কথা রেখে বলতে ছাড়ে না – তোমাদের পথ আর আমার পথ আলাদা। অমলেন্দু ভেবে কুল পায় না কী এমন নতুন পথ ও খুঁজে পেয়েছে? কথার বাঁধনে আলগা আলগা ভাব, বলতে চেয়েও সবটুকু বলে না। কোন পথে হাঁটছে, আদৌ সেই পথটা হাঁটার মতো কিনা, সেই পথে রক্তগঙ্গা বইছে কিনা, কে বলবে। না হয়, মাকে ও প্রস্তাবটা দেয় কী করে – আমার অংশটা ভাগ-বাটোয়ারা করে দাও, আমি চলব, ফিরব, আমার মতো করে আমার জীবনটা ভোগ করার অধিকার আছে কি নেই। মা পাল্টা জবাব দেয়, ‘তোর বাবা না হয় ছেড়ে চলে গেছে, উপযুক্ত বড় ভাই রয়েছে, কথা কাটাকাটি হোক, কথা বন্ধ করবি কেন!’ অমলেন্দু আজকাল অনেককেই চিনতে পারে, বুঝতে পারে না। নিজে যেচে বলার মধ্যেও রয়েছে অনেক হ্যাপা। রঞ্জনাকেও বলার কথা বলতে গিয়ে গলায় আটকে যায়। তাহলে এমন ভাবা ভুল হবে না, ও নিজেই বোধ হয় দিনে দিনে অনেকের কাছেই দূর্বোধ্য হয়ে উঠছে। এমনও তো হতে পারে ও নিজে পাল্টাচ্ছে, বাকিরা নিজের জায়গায় দিব্যি নিজে দাঁড়িয়ে আছে। একী তাহলে বাঁচার এক নতুন সমীকরণ! না ভাবলে তো চলবে না এমন নয়, ওরা কী ভঙ্গিতে বলছে সেটাও বুঝে নিতে হবে। কে বলতে পারে ওর চেনা গণ্ডির মানুষগুলো অন্য কোথাও বসবাসের জায়গা খুঁজে নিতে চাইছে, হয়তো অমলেন্দু ওই ভূমিতে অপাঙক্তেয়। ভাঙনটা ঘটছে না এমন তো নয়, একটু একটু করে ভাঙছে, কোন এক ছায়ান্ধকার বিকালে পুরো ঘর বাড়ি সহ পুরোটাই তলিয়ে যাবে। তাই তো অনায়াসে মাকে সাক্ষী রেখে বলেছে ‘ সজল, ভাই আমার আর একটু ভাব।’ উত্তরে ও বলেছিল, ‘তুমি বড্ড বেশি ফ্যাচফ্যাচ করো বলেই তো রঞ্জনাদি তোমার কথাগুলো তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেয়, সে কী আর আমি জানি না। তুমি বালিশে মুখ গুঁজে পড়ে থাকো, বেশি জ্ঞান দেওয়ার চেষ্টা করো না, মা, তোমার ছেলেকে বারণ করো যেন দাদাগিরি ফলাতে না আসে, করে তো প্যারা টিচারের চাকরি, মুখে বড় বড় কথা। দেখে নিও, আকাশটাকে আমিই ছোঁব, সেই যেমন করে হোক। তোমার ছেলে ঘরই চেনে না, সমাজ চিনবে কেমন করে!’

(৩)
অমলেন্দুর জানালাটা ফটাস করে খুলে গেল। পাল্লা দুটো দুপাশে এমন জোরে ধাক্কা খেল, বাইরের বাতাসটা দোল খেল ওর শরীরে কিছুক্ষণ। নিজেকে স্থির রাখার সকল প্রতিজ্ঞাই ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। পরিস্থিতি এমন হলো গলি দিয়ে হেঁটে যাওয়া মানুষগুলো অস্পষ্ট হয়ে গেল চোখের পলকে। সজলের কথাগুলোর প্রতিধ্বনি শোনা গেল নরমে গরমে। এই সময় নিজেকে চেনাও দুষ্কর হয়। বেমানান লাগে। সকলের তালে তাল মেলানো কি সময়ের দাবি, নাকি মানুষই সময়কে দুমড়েমুচড়ে নিজেদের মনের মতো করে নিতে চায়। অমলেন্দু বুঝতে চায় মানুষকে এই নিয়ন্ত্রণের শক্তির উৎস কোথায়। রক্তিম ওকে বলেছিল, ‘তোর এই টানাপোড়েনই তোকে একদিন খাদের কিনারায় নিয়ে আসবে, তখন আর পিছনের পথ খুঁজে পাবি না।’ কথাটা খুব ভেবেচিন্তেই বলেছে। না হয় দু’পাক ঘুরে আসলেই এতটা ক্লান্তি আসে কেন, রাস্তাগুলো পার হয়ে আসলেই মনে হয় বুক ধড়ফড় করে, শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। প্রশ্ন জেগেছিল মন জুড়ে হৃদয় ওলটপালট করে – জীবন কাকে বলে, কেনইবা মহাজীবন? জীবনের কুয়োতে গোপনে ছুটে যাচ্ছে আলো থেকে সকল অন্ধকার। আলোকে টপাটপ গিলে নিচ্ছে যার যেমন খুশি। রঞ্জনা ওকে এই পথ খুঁজতে নিষেধ করেছিল। কিন্তু সেই নিষেধ মানে কে! ওর স্বপ্নের জালে জড়িয়ে যায় আরও কত কী। ঘর ভাগাভাগির কথা উঠলেই দুনিয়ার যত ভাগাভাগি মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে, কিছুতেই তাড়াতে পারে না – সবকিছু এত ছোট ছোট লাগে কেন? রেষারেষি কূটকচালি মগজে ছোবল মারে দিনরাত – ওরা বলে, ধর্ম আগে, এরা বলে, দেশ আগে। ধুত্তরি কা, মানুষ আগে। অমলেন্দু মাথার চুল ছিঁড়ে খুঁজতেই থাকে, অন্য পথ ধরে হেঁটে চলে যায়। সহজ হতে গিয়ে হারিয়ে ফেলতে থাকে কী সকল আড়াল আবডাল! ‘রেটোরিক’ শব্দটা ওর ঘুমের ঘোর কাটিয়ে তুলছে। শব্দটা ইংরেজি কিন্তু এমন করে গেঁথে আছে যেন নড়তে চড়তে চায় না। রঞ্জনা আবার ব্যঙ্গ করে নাম দিয়েছিল ‘শতাব্দীর শব্দ’। বড় আজব কথা বলেছে তো শব্দ আবার শত বছরের পরিচয়কে ধরে রাখে! ‘থাকে থাকে, উহ্য থেকে যায়, ধরা ছোঁয়া যায় না। নিজেকেই নিজে গিলে খাবে, এমন কী মুখের কথা, দেখছ না এমন ডুব মারছে, আর উঠছেই না, গভীরতার মাপই জানে না। রঞ্জনা যে কখনও ওর মনের কথা এত সহজে ধরে ফেলবে অমলেন্দু ভাবতেই পারে নি। এমন হয়েছে নিজেকেই নিজে প্রশ্ন করে বসছে – কাকে বলে ঘাতক, কেইবা বহন করে তার উত্তরাধিকার?
(৪)
শব্দটা যে পড়েই এমন ভেঙেচুরে যাবে, এঘর থেকে বারান্দা রান্নাঘর টপকে বাথরুম ছুঁয়ে ওঘরের পাশ কাটিয়ে অমলেন্দু’র চেয়ার টেবিলে এসে ঘুরপাক খাবে কে জানত। তবে কি মা ভয় পেয়েছে? এই সময় এত ভয় ঘরের মধ্যে তেড়ে আসবে কে জানত। তবে কী অমলেন্দু যা ভেবেছে ঠিক তাই। এইরকম একটা ইঙ্গিত ও পাচ্ছিল বটে। রঞ্জনাকে বলতে গিয়েও বলতে পারে নি পাছে ও হেসে উড়িয়ে দেয় কিম্বা এমনও বলতে পারে ‘চল, তোমাকে সাইকিয়াট্রিস্টের কাছে নিয়ে যায়।’ ভয়টা যে অমূলক নয় ওরা এবার নিশ্চয়ই টের পাবে। মায়ের ডাকটা’র মধ্যে এমন এক আশ্চর্য অনুভূতি ছিল যা চলে যাবার আগের মুহূর্তের নয় বরঞ্চ ভয়টাকে তিলে তিলে হজম করার অবস্থা ছিল। কিন্তু কেন এমনটা হলো? বোন রমলা তো ধীরে ধীরে সাইকোথেরাপি করে সেরেও উঠছিল। সজলের প্রাইভেট ব্যাঙ্কের চাকরিটাও তো এমন মজবুত নয়, তাহলে অমলেন্দু’র চালচলন কথাবার্তা মা’র মনঃপুত হয় নি, কোনটা! কিন্তু বলার কথাগুলো তো বলে ফেলতেই হবে, না বলে তো থেমে থাকা যাবে না। যা কিছু ঘটে চলেছে, যেরকম ঘটতে পারত অথচ পরিবর্তনের গুমোট বাতাসটা ঢুকছে একটু একটু করে সুভদ্রা টের পাচ্ছিল সন্তানদের মনে বাসা বাঁধছে। আতঙ্কের বৃত্তটা বড় হলে বলেই ফেলে, ‘তোরা নিজেদের বাঁচিয়ে চলিস বাবা। আমার ভয় ভয় লাগে কখন কী ঘটে যায়। আর তো বাঁচা যাবে না। সবটাই তো গোলমেলে।’ মা যে এমন করে কাবু হয়ে যাবে কে জানত। এত জোরে বলে উঠবে ‘ অমল, অমু মু মু মু মু আয় তোরা আয়, দেয়াল জুড়ে এত বিদঘুটে কালো ছায়া তো জন্মে দেখি নি, তুই যে বলছিলি হুবহু এক…’ । অমলেন্দু ভাবলো ও ঠিক শুনেছে তো – মায়ের কন্ঠস্বর তো, না কি অন্য কারও !
