শ্রীরামপুর কলেজে পড়তে পড়তে কয়েন আর কারেন্সিও জমানো শুরু করেছিলাম ৷ সেটি অবশ্য থিওলজির দুই বন্ধুর উৎসাহে ৷ তবে একদিন তারাই আমার বিরুদ্ধে চলে গিয়েছিল ৷
ঘটনাটা বলি ৷
একদিন দানিকেনের “দেবতা কি গ্রহান্তরের মানুষ” পড়তে পড়তে দেখলাম কাশ্মীরে বিখ্যাত এরিয়েলের মন্দিরটি নাকি যীশুর সমাধি ৷ অবাক হলাম ৷ পরে জানলাম একজন রাশিয়ান ভদ্রলোক তিব্বতের বৌদ্ধ গুম্ফা থেকে এই তথ্য পেয়েছেন যে যীশুর একেশ্বরবাদ ধর্ম শিক্ষা ভারতবর্ষে নাথ যোগীদের কাছে এবং যোগশিক্ষাও ভারতবর্ষে তাঁর কৈশোরকালের একটা দীর্ঘ সময় ওল্ড টেস্টামেন্টে নেই ওই সময়টা তিনি ভারতে ছিলেন এবং ক্রুসিফিকেসনের পর সাবাথ ডে’ তে তাকে নামিয়ে চিকিৎসার পর তিনি যখন তাঁর পরম পিতার কাছে চলে যাচ্ছেন বলে পাহাড়ে উঠে গেলেন তারপর তিনি সেই পুরাতন পথে কাশ্মীরে আসেন এবং সেখানেই মারা যান ৷ এই তথ্য পেয়ে আমি পরম উৎসাহে তৎকালীন ইউ এস এস আর এম্বাসীর লাইব্রেরীতে বইটির ইংরেজী অনুবাদ পড়ার জন্যে যোগাযোগ করলে তাঁরা বইটির বিষয়ে অস্বীকার করেন ৷ আমার তখন এক রাশিয়ান পরমাসুন্দরী কলম-বান্ধবী ছিল মস্কোয় ৷ নাম তানিস্লোভা মার্কেনকোভা ৷ তার কাছে প্রস্তাব পাঠালে সে আমাকে সমস্ত সহযোগিতা করে ৷ তখন ইউ এস এস আর লাইব্রেরির লাইব্রেরিয়ান ভদ্রমহিলা আমায় দু’দিন সুযোগ দেন তাঁর ঘরে বসে ব্যান্ডেড বইটি নিভৃতে পড়ার জন্যে ৷ সেখান থেকে তথ্য নিয়ে ” সংকেত ” নামক একটি বামমতবাদী পত্রিকায় প্রবন্ধ লিখেছিলাম ” ভারতীয় দর্শনে শিক্ষিত যীশু ” ৷ সেই জন্য থিওলজির কয়েকজন ছাত্র আমার বাড়ি এসেছিল প্রতিবাদ জানাতে ৷ তাদের সঙ্গে ওই বন্ধু দু’জনও ছিল ৷ যাই হোক তারা সব তথ্য দেখেও বেশ অসন্তোষ নিয়েই চলে গিয়েছিল ৷ কলেজে আমার সঙ্গে আর কথা বলতো না ৷ বেশ কিছুদিন কেটে গেলে আবার কথাবার্তা মুচকি হাসি শুরু হয়েছিল ৷

পেন ফ্রেন্ড অর্থাৎ কলম বন্ধুর কথা যখন এলো তখন বলি এগারো ক্লাস থেকেই আমার চার কলমবান্ধবী ছিল ৷ আমেরিকার মিনেসোটায় ভিকি লিচ স্টাউট , রাশিয়ার মস্কোয় স্তানিশ্লোভা মার্কেনকোভা , জাপানে মিকাকো নাকাও আর আতসুকো মাসিয়ামা ৷ এদের মধ্যে ভিকি আর মিকাকোর সঙ্গে আমার সবচেয়ে গভীর বন্ধুত্ব তৈরি হয়েছিল ৷ ভিকির সঙ্গে প্রৈম বললে অত্যুক্তি হয় না ৷


সে সময় ভিকির বাবা ছিলেন গভর্নর অফ মিনেসোটা ৷ ভিকি আমায় এতটাই ভালোবাসতো যে আমার থেকে সে বাংলা লেখা ও বলা শিখছিল অনেকটাই ৷ এখন আমরা যেমন মোবাইলে ইংরাজি অক্ষরে বাংলা লিখি সে সময় আমি তাকে সেভাবেই বাংলা শিখিয়ে ছিলাম ৷ বাংলা অক্ষরও লিখতে পারতো ৷ ওর ঘরে মাথার কাছে আমার তৎকালের ছবিও রেখেছিল ৷ পরবর্তী কালে ভিকি হিস্ট্রি আর এনসিয়েন্ট ইন্ডিয়ান ফিলোজফি নিয়ে গবেষণা করেছিল ৷ ওর ভারত প্রেমের পিছনে আমার প্রতি ভালোবাসাও কাজ করেছে বলে ও স্বীকার করেছিল ৷ ওর দুটো ভাই বোন ছিল ৷ ওর বাবা আর এক প্রফেসর ভদ্র মহিলাকে বিয়ে করেছিলেন ওর মাও একজন ব্যবসায়ীকে বিয়ে করে চলে যান ৷ ফলে ওর ভাই বোনেরা অনেক ছোট থাকায় দিদিমার কাছে মানুষ হয় ৷ ভিকির বাবা ভিকিকে একটা ছোট্ট বাড়ি করে দিয়েছিলেন সেখানেই থাকতো আর একটা এনজিও তে কাজ করে নিজেই নিজের রোজগার করতো ৷ ইংলিস স্প্যানিস জার্মান তিনটে ভাষা জানতো ৷ বাংলাটাও শিখে নিচ্ছিল ভালোই ৷
ও আমায় প্রস্তাব দিয়েছিল হাইস্কুল পাশ করার পর মিনেসোটায় চলে যেতে ৷ ওর বাবা সব ব্যবস্থা করে দেবেন ৷ কিন্তু সে গুড়ে বালি দিলেন আমার পিতৃদেব ৷ তিনি বললেন -তুমি আমার এক ছেলে মৃত্যুর পর তোমার হাতের আগুনটি ছাড়া আমরা দুজন আর কিছু চাই না ৷ তুমি লিখে দাও বাবা বলেছেন যেদিন নিজের টাকায় যেতে পারব সেদিনই যাবো ৷
তাতে অবশ্য ভিকি বলেছিল – এই জন্যেই আমি বাঙালিকে রেসপেক্ট করি ৷
এরপর ভিকি তার এনজিওর কাজে দিল্লী এসে আমার সঙ্গে দেখা করতে শ্রীরামপুরে আসতে চেয়েছিল ৷ বাবা খুব দূরদর্শী ও কনজারভেটিব ছিলেন ৷ তিনি বুঝে ছিলেন আমার আর ভিকির মধ্যে একটা মানসিক বন্ধন দৃঢ় হচ্ছে , ফলে তাঁর আপত্তিতে সুন্দরী বান্ধবী ভিকি লিচ স্টাউটের আর আমার অতি মধ্যবিত্তের দু’কামরার একতলার বাসা বাড়িতেও আসা হয়নি ৷
তবে দীর্ঘদিন তার সঙ্গে যোগাযোগ ছিল ৷ তার নাম লেখা একটি ডলার আজো আছে আমার কাছে ৷ হয়তো খুঁজলে তার চিঠিও খুঁজে পেতে পারি ৷ সম্পর্ক ছিন্ন হল আমার বিবাহের পর ৷ আমার বিয়ের খবর শুনে ও খুব আঘাত পেয়েছিল ৷ কিন্তু শুভেচ্ছা জানিয়ে লিখেছিল ইওর ওয়াইফ ইজ টু লাকি ৷ বিকজ সি ইজ এন ইন্ডিয়ান লেডি ৷ এটলাস্ট সি গট ইউ , উইন ইউ ডিয়ার রাম ৷ এরপর দু’একটা চিঠি আসার পর হঠাৎ সে হারিয়ে গিয়েছিল ৷ আমার পাঠানো চিঠি ওর ঠিকানায় পৌঁছায়নি ৷ ফিরে এসেছে ৷ বহুদিন পরে হঠাৎ একটা চিঠি এসেছিল অসলো থেকে ভিকি একজন বাংলাদেশের হিন্দু ছেলেকেই বিয়ে করে এতই হতাশ হয়েছিল যে চার মাসের মধ্যে সেপারেশন হয়ে যায় ৷

প্রমিস করে আর বিয়ে করবে না ৷ খুব রসিকতা করে ইংরেজীতেই লিখেছিল তোমার ছবিটিকেই আমি লাইফটাইম পার্টনার করলাম ৷ নান ক্যান টেক দ্য প্লেস ডিয়ার ৷ আজ পর্যন্ত আর যোগাযোগ হয়নি ৷ হবেও না সেই বিগত প্রেমকালের সঙ্গে ৷ ভিকি আমার প্রথম প্রেম আজও স্মৃতিতে উজ্জ্বল ৷

জাপানের মিকাকো নাকাও একটি ডলপুতুলের মতো মেয়ে ৷ কবিতা লিখতো খুব সুন্দর ৷ রেডিও এন এইচ কে জাপানের বাংলা বিভাগের এসিসটেনন্ট ডিরেকটর ছিল ৷ আমায় অনেক রকমের উপহার পাঠিয়েছিল ৷ শ্রীরামপুরে আসবে বলেও ইচ্ছে প্রকাশ করেছিল ৷ কিন্তু সেই একই গল্প ৷ বাবার আপত্তির ফলে তা সম্ভব হয়নি ৷ তবে আতসুকো মাসিয়ামার সঙ্গে বন্ধুত্ব ততটা গভীর হয়নি ৷ বছর দু’য়েক পরেই যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায় ৷

তানিশ্লোভা মার্কেনকোভা লেলিনগ্রাদে থাকতো ৷ সিনেমার নায়িকা ছিল ৷ তখন ইউনাইটেড সোভিয়েত রাশিয়া ৷ ব্রেজনেভ সে দেশের প্রধান ৷ ওকে খুব স্নেহ করতেন ৷ কিন্তু সুযোগের সদব্যবহার করতে পারি নি ৷

শুধুমাত্র এক কনজারভেটিভ পরিবারে একছেলে এবং তিন ভাইবোনের মধ্যে সবার বড় হবার কারনে ৷

সহযোগিতার হাত বাড়াতে ওপরের ছবিতে ক্লিক করুন

[লেখকের পূর্ব রচনা]

[পরম্পরা ওয়েবজিন, সেপ্টেম্বর ২৬, সূচিপত্র – এখানে ক্লিক করুন]

0 0 ভোট
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
পংক্তির ভেতর মন্তব্য
সব মন্তব্য