আমরা অচিন্তবাবুর সঙ্গে দেখা করলাম কয়েকজন ৷
স্যার অনেকক্ষণ চুপ করে শুনলেন ৷ তারপর মুচকি হেসে বললেন – দাঁড়া তোদের নম্বরটা দেখাই ৷
লিস্ট দেখলাম আমরা প্রত্যেকেই ৮৫-৯০ শতাংশ নম্বর পেয়েছি ৷
স্যার টেবিলের দিকে দেখিয়ে বললেন এই কাঁচটার বয়স জানিস ? ওই কোণে যে হেয়ার ক্রাকটা হয়েছে সেটা যদি সারিয়ে দিতে পারিস সবাইকে পুরো নম্বর দিয়ে দেবো ৷ এখন চলে যা ৷
সেই মুহূর্তে আমার মনে হচ্ছিল মুখটা একটা হিংস্র শ্বাপদের মুখ ৷
পরে আমি ঠিক করেছিলাম আর পড়াশোনা করে লাভ নেই ৷ কিন্তু হঠাৎ একদিন সন্ধ্যায় দেখলাম বাবা বসে আছেন , দু’চোখ দিয়ে জল নেমে আসছে ৷
আমি জিজ্ঞেস করলাম – কি হয়েছে বাবা ? তুমি কাঁদছো কেন ?
হাতের ইশারায় আমায় ঘর থেকে চলে যেতে বললেন ৷ আমি মা কে গিয়ে বললাম – বাবা কাঁদছে কেন ?
মা অবাক হয়ে এসে বাবাকে জিজ্ঞাসা করতেই বাবা বললেন – আমাদের পরিবারে সব্বাই কমপক্ষে পোস্ট গ্র্যাজুয়েট ৷ আমার একটাই ছেলে ননগ্র্যাজুয়েট ! এটা দেখে পৃথিবী থেকে যেতে হবে আমায় ৷আমি আর দাঁড়ালাম না ৷ সোজা বাড়ি থেকে বেরিয়ে হাঁটা দিলাম গঙ্গার ঘাটের দিকে ৷

ফাঁকা কলেজঘাটটায় এসে বসে ভাবতে লাগলাম কি করা যায় ৷ পাশের চেয়ারে দুটো ছেলেমেয়ে ঘনিষ্ঠ হয়ে বসে আছে ৷ চাঁদের আলো তাদের স্নান করিয়ে দিচ্ছে ৷ আমি একটু নেমে জলের কাছে দাঁড়িয়ে ভাবলাম কি করা যায় ৷ কতক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিলাম মনে নেই ৷ যখন উঠে আসছি দেখলাম তারা তখনও ঠিক সেই ভাবেই বসে আছে ৷ সিদ্ধান্ত নিলাম রেকটর গোবিন্দবাবুর সঙ্গে কথা বলতে হবে ৷ দুজনের বন্ধুত্ব গভীর ৷
যেমন ভাবা তেমনই কাজ ৷ পরদিন গোবিন্দবাবুর দরবারে গিয়ে সব বললাম ৷ স্যার সব শুনে বললেন – উঃ অচিন্তটাকে নিয়ে আর পারি না ৷ আচ্ছা তুই এখন বাড়ি যা পরশু তুই ওর সঙ্গে দেখা করিস ৷ তোকে একবার ইউনিভার্সিটিতে যেতে হবে ৷ সেসব পরে বলে দেবো আমি ৷
একদিন বাদ দিয়ে গেলাম অচিন্তবাবুর কাছে ৷ বললাম – আমি তো বিনা দোষে বড় শাস্তি পেলাম ৷

  • হুম ডাকাতদের সঙ্গে থাকলে তুমিও ডাকাত ৷ সে নিজে হাতে কিছু নি করলেও ৷ সাতদিন পরে একবার ইউনিভার্সিটিতে যাবে ৷ যাও এখন বাড়ি যাও ৷
  • বাড়ি এসে শুনলাম বাবার বেশ জ্বর এসেছে ৷ ১০৩.৫ ৷ ইস্কুলে মাথা ঘুরে পড়ে গিয়েছিল ৷ জ্বরের ঘোরে বলছে – একটা ছেলে আমার ৷ সেও ননগ্র্যাজুয়েট রয়ে গেল এই লজ্জ্বা রাখবো কোথায় ৷
  • আমি চুপ করে ঠাকুর ঘরে এসে কাঁদলাম ৷ মনে মনে বাবার উদ্দ্যেশ্যে বললাম – আমায় যদি বাংলাটা নিয়ে পড়তে দিতে তাহলে এই সমস্যা হত না ৷
  • সন্ধেবেলায় ডাঃ তারাপদ ভট্টাচার্য এলেন ৷ দেখে বললেন মানসিক চাপ থেকে হয়েছে ৷ প্রেসারটাও হাই হয়েছে ৷ এক সপ্তাহ বেড রেস্ট ৷
    অবশেষে বিশ্ববিদ্যালয়ে গেলাম ৷

  • উত্তীর্ণ রেজাল্ট হাতে পেলাম ৷ ওখানেই জানলাম যেহেতু আমার একটা গ্র্যাজুয়েশন আছে তাই আমি ডাইরেক্ট বিএ অনার্স ভর্তি হতে পারবো কলেজেই ৷
    বাড়ি এসে বাবাকে প্রণাম করে রেজাল্ট দেখিয়ে জানালাম আমি গ্র্যাজুয়েট ৷ বাবা একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেললেন ৷ যা আমায় নাড়িয়ে দিয়ে গেল ৷
    এরপর কলেজে এসে আগে গোবিন্দবাবুকে প্রণাম করলাম ৷ বললাম আমি বাংলা অনার্স পড়তে চাই ৷ বললেন সুশান্তকে বল গিয়ে ৷
    সুশান্তবাবু সব শুনে বললেন আজ শুক্রবার , তুই মঙ্গলবার আয় দেখছি কি করা যায় ৷
    যাই হোক অবশেষে অনেক কাঠখড় ভস্ম করে অনার্স পেলাম ৷ অনার্স গ্রাজুয়েট হলাম ৷
    চির ঋণ থেকে গেল সুশান্তবাবু , উমাদি আর গোবিন্দবাবুর কাছে ৷

ক্রমশঃ

সহযোগিতার হাত বাড়াতে ওপরের ছবিতে ক্লিক করুন

[লেখকের পূর্ব রচনা]

[পরম্পরা ওয়েবজিন, মার্চ ২৬, সূচিপত্র – এখানে ক্লিক করুন]

0 0 ভোট
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
পংক্তির ভেতর মন্তব্য
সব মন্তব্য