সেইই প্রথম আনন্দবাজার অফিসে যাওয়া ৷ সেই প্রাচীন আনন্দবাজার অফিস , তখনও গায়ে কর্পোরেট রঙ লাগে নি ৷ একতলায় স্লিপ নিয়ে সোজা তিনতলায় গিয়ে ৷ একজনকে জিজ্ঞাসা করলাম – রমাপ্রসাদবাবুর ঘরটা ?
তিনি দেখিয়ে দিলেন ৷ ঘরের দরোজায় গিয়ে দাঁড়িয়ে দেখলাম আঙুলে সিগারেট নিয়ে মনে দিয়ে কিছু লিখছেন ৷ আমি জিজ্ঞাসা করলাম আসবো ?
মাথা তুলে গম্ভীর গলায় উত্তর দিলেন – এসেই তো পড়েছো ৷ এবার বলো কি বলবে ৷
আমি খুব আস্তে আস্তে বললাম – আমার নাম রামকিশোর ভট্টাচার্য ৷ আপনাদের অফিস থেকে আমায় দেখা করতে বলে ফোন করেছিলেন ৷
এবার আমায় চোখ দিয়ে মেপে নিয়ে বললেন – তুমি রামকিশোর ! আমি তো ভেবেছিলাম বেশ বয়স্ক মানুষ ৷ যাই হোক তা বাবা তুমি যে আমাদের কাগজে লিখছ ৷ টাকাটা নাওনা কেন ?
আমার উত্তর – আমি তো জানিনা টাকা কিভাবে এখান থেকে পাওয়া যায় ৷ সাপ্তাহিক আনন্দমেলাতেও লিখি টাকা নেওয়া হয় নি (আজ বুঝতে পারি সেদিন কি ভীষণ ইডিয়েটের মতো উত্তর দিয়েছিলাম)৷
রমানাথদা এবার বললেন – বসো ৷ কি করো ?
আমি বললাম – শ্রীরামপুর কলেজে পড়ি ৷
— সোমনাথ মুখুজ্জেকে চেনো ?
— হুম সোমনাথদা তো প্রায় নিয়মিতই আমাদের বাড়ি আসে ৷
এর মধ্যে একজন কাপে চা দিয়ে গেলেন ৷ আমি বললাম –চা খাবো না ৷
–কেন চা খাও না ?
–হুম খাই ৷ তবে এখন..
–খেয়ে নাও খেয়ে নাও হে ৷ বিড়ি সিগারেট খাও ?
— না
— মদ খাও ?
— না খাই না ৷
— যাঃ তাহলে তোমার আর লেখক হওয়া হলই না হে ৷

বলতে বলতেই একজন এসে একটা কাগজ রমানাথদার হাতে দিয়ে গেলেন ৷ রমানাথদা দেখে বললেন — টাকাটা কি করবে ?
— বই কিনবো ৷ রবীন্দ্র রচনাবলী আমার নেই ৷ দু’এক খন্ড কিনে নিয়ে যাবো ৷
শুনে খানিক্ষণ তাকিয়ে রইলেন আমার দিকে ৷ তারপর ফোন তুলে ডায়াল করলেন একজন কাউকে ৷ ওপাশ থেকে যিনি ধরলেন তাঁকে বললেন – আমি রমানাথ চৌধুরী বলছি ৷ রবীন্দ্ররচনাবলী সব খন্ড আছে ?
ওপাশ থেকে কিছু একটা উত্তর এলো
এবার রমানাথদা বললেন — বেশ আমার নামে সবকটা খন্ড অচলিত খন্ডসহ রেডি রাখুন আমি একজনকে পাঠাচ্ছি দিয়ে দেবেন ৷ কত দাম হচ্ছে ?
একটু চুপ , তারপর বললেন — বেশ আমার নামে রাখুন ৷

এরপর যিনি হিসেব দিয়ে গিয়েছিলেন তাঁকে বললেন – এখান থেকে বিশ্বভারতীকে বইয়ের দামটা দিয়ে দেবে ৷ আর রামকিশোরকে ৩০টা টাকা দিয়ে দাও ৷
এবার আমায় বললেন – তুমি আনন্দমেলায় পব-র কাছে ঘুরে এসো ৷ আমার ড্রাইভার তোমায় নিয়ে যাবে ৷ সব বই নিয়ে হাওড়া স্টেশনে পৌঁছে দেবে ৷ তারপর নিজ দায়িত্বে নিয়ে যাবে ৷ আর একটা কথা শোন হে পব মানে পার্থ বসুর সঙ্গে কথা বলবে বেশ সাবধানে ৷ ও কিন্তু তোমায় আদরটাদর করতে পারে ৷ যাও ঘুরে এসো ৷

আমি ওনার ঘর থেকে বেরিয়ে একটু এগিয়েই দেখলাম কাঁচের ঘরে সুনিল গঙ্গোপাধ্যায় বসে আছেন ৷ ভিতরে ভিতরে একটা ভীষণ রোমাঞ্চ ৷ মনেহয় স্বর্গে আছি ৷ তাঁর পাশেই শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় বসে আছেন ৷ আর একজন বয়স্ক বসে আছেন ৷ পরে জেনেছিলাম তিনি সুনীল বসু ৷ সঙ্গে একটা কবিতা নিয়েই গিয়েছিলাম ৷ সুনীলদার ঘরে ঢুকে সুনীলদাকে বললাম – আমি দেশ পত্রিকার জন্যে একটা কবিতা জমা দেবো ৷
সুনীলদা বললেন –কি নাম ?

নাম বললাম ৷ বললেন – ওই আর এক সুনীল আছেন ৷ সুনীল বসু ওঁর কাছে জমা দিয়ে যাও ৷
জমা দিয়ে হাজির হলাম পার্থ বসুর ঘরে ৷ তখন প্রতি সোমবার অানন্দবাজারের শেষের পাতায় সাপ্তাহিক “আনন্দমেলা” প্রকাশিত হত ৷ তাতে আমার লেখা ছড়া আর ফিচারও প্রকাশিত হয়েছিল বেশ কয়েকটি ৷ পার্থ বসু ছদ্মনাম ছিল পব ৷ দানবীয় চেহারা ৷ পরে জেনেছি কৃষ্ণবর্ণের মানুষটি হোমো বা সমকামী ছিলেন ৷ তবে সৌভাগ্য বশতঃ আমার দু’একবার গাল টিপে দেওয়া ছাড়া বাড়াবাড়ি কিছু করেননি তিনি ৷
বরং আমায় তিনি আনন্দবাজার লাইব্রেরীতে বসে লেখার সুযোগ করে একটা কার্ড করেও দিয়েছিলেন ৷ যাতে নিয়মিত যাতায়াত করতে পারি ৷ সেই থেকে আনন্দবাজার অফিসে আমার নিয়মিত যাতায়াত ছিল ৷
সেই সময় আনন্দবাজারের লাইব্রেরীর লাইব্রেরীয়ান ছিলেন একজন পন্ডিত মানুষ ৷ ভারি সুন্দর ব্যবহার ৷ বেঁটে খাটো , ধুতি পাঞ্জাবী পরা মানুষটির একটা পায়ে একটু অসুবিধে ছিল ৷ নাম চিত্তরঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় ৷ আমি অনেক লেখায় তাঁর সহযোগিতা পেয়েছি ৷ কত কিছু শিখেছি তাঁর থেকে ৷ সেই প্রথম সেখানেই দেখেছিলাম আনন্দবাজার আর্কাইভ ৷ বড় বড় ফাইলে বাঁধানো আছে প্রাচীন আনন্দবাজার পত্রিকা ৷

যাই হোক সেদিন সাপ্তাহিক আনন্দমেলায় লেখার জন্যে প্রাপ্য আশি টাকা নিয়ে ফিরে এলাম রমাপদদার কাছে ৷ আসার পথে দেখলাম কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায় ঢুকছেন সুনুলদার ঘরে ৷
সন্ধে নেমেছে রাস্তায় ৷ রমাপদদা তাঁর ড্রাইভারকে ডেকে যা বলার বলে দিলেন ৷ সে আমায় নিয়ে এলো বিশ্বভারতীর অফিসে ৷ লাল রেক্সিন মোড়া সোনালী রঙে লেখা ২৬ খণ্ড রবীন্দ্ররচনাবলী সঙ্গে একটা আলাদা সূচিপত্রের বই নিয়ে দুটি ব্যাগ সমেত ড্রাইভার ভদ্রলোক আমায় হাওড়া স্টেশনে পৌঁছে দিলেন ৷ সে সময় যতদূর মনে আছে ৭.১৫ তে একটা শ্রীরামপুর লোকাল ছিল ৷ সেদিন শনিবার থাকায় ফাঁকা ছিল ট্রেন ৷ তাতেই বাড়ি ফিরলাম মনে মনে এমন ভাবে যেন আনন্দপুরস্কার নিয়ে বাড়ি ঢুকছি ৷

এরপর বহুবার আনন্দবাজার অফিসে গিয়েছি ৷ নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী আনন্দমেলার সম্পাদক তখন ৷ ১৯৭৯ সালে আনন্দমেলা অফিসেই পরিচয় কবি শ্যামলকান্তি দাশের সঙ্গে ৷ ঘন শ্যামবর্ণ মেদিনীপুরের মানুষ শ্যামলদা ৷ তখন কবিতার একটা লিটল ম্যাগাজিনও করত শ্যামলদা এই লেখা লিখতে লিখতে অাজ মনে হচ্ছিল মানুষটির সঙ্গে পরিচয়ের ৪৬ বছর পূর্ণ হয়ে গেল ৷ আর একজন কবির সঙ্গে সেই আনন্দমেলা অফিসেই পরিচয় হয়েছিল আমার সেটা ১৯৮৩-৮৪ হবে সে রতনতনু ঘাটী ৷ রতনদা সম্ভবত ১৯৮১ তে আনন্দবাজারে যোগ দিয়েছিল ৷ পরবর্তীকালে আর একজন কবির সঙ্গে প্রায়ই গল্প করতে যেতাম সেখানে সে প্রমোদ বসু ৷ অপূর্ব কন্ঠস্বর ৷ ভারি ভালো মানুষ ৷ বেশ কয়েকবার তার বাড়িতেও গিয়েছি ৷ বৌদি ভালো গান গাইতেন ৷ পরে বৌদির সঙ্গে তীব্র অশান্তি আর মতভেদের কারনে প্রমোদদা আলাদা হয়ে যায় এবং আত্মহত্যা করে ৷
এখানে একটা গল্পের কথা বলি ৷ সেই সময়ে একবার কবি সোমনাথ মুখোপাধ্যায়ের আমন্ত্রণে শ্যামলদা আর রতনদা শ্রীরামপুরে এসেছিল ৷ রাতে তরুণ কবি মৃদুল দাশগুপ্ত তাদের বাড়ি নিয়ে যেতে চাইলে সোমনাথদা যেতে না দিয়ে নিজের বাড়ি নিয়ে যায় ৷ সোমনাথদার আর্থিক পরিস্থিতি তখন খুব খারাপ ৷ দু’জনকে দেখে বৌদি খুব রেগে গেলে সেদিন রাতে আক্ষরিক অর্থে জল খেয়েই কাটিয়ে সকালে যখন ওরা চলে আসবে ভাবছে তখন সোমনাথদা ওদের দু’জনকে স্টেশনে একটা দোকানে খাওয়াবে বলে ৷ পরোটা তরকারী চা অর্ডার দিয়ে সোমনাথদা শ্যামলদাদের বলে – তোরা খা , আমি একমিনিট আসছি ৷ বলেই উধাও হয়ে যায় দুজনের পকেটে যা ছিল তাই দিয়ে কোনও রকমে টাকা মিটিয়ে কবি সুনীল মিত্রর বাড়িতে দেখা করতে এসে দ্যাখে সোমনাথদা সেখানে বসে আছে ৷ ওদের দেখে সোমনাথদা বলে ওঠে – আমি যাচ্ছিলাম তো , তোরা চলে এলি !!
শ্যামলদার মুখেই এই ঘটনাটি শুনে প্রথমে খুব খারাপ লেগেছিল আমার ৷ পরে বুঝেছিলাম ইচ্ছেটা থাকলেও সামর্থ ছিলনা সোমনাথদার ৷ অর্থনৈতিক পরিস্থিতি মানুষটাকে এইরকম করে দিয়েছিল ৷
আকাশবাণী আর আনন্দবাজারের বর্তমান পরিস্থিতি অনেক বদলে গিয়েছে ৷

ক্রমশ

সহযোগিতার হাত বাড়াতে ওপরের ছবিতে ক্লিক করুন

[লেখকের পূর্ব রচনা]

[পরম্পরা ওয়েবজিন, জুলাই ২৬, সূচিপত্র – এখানে ক্লিক করুন]

0 0 ভোট
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
পংক্তির ভেতর মন্তব্য
সব মন্তব্য