
নুড়ি পাথরের সঙ্গে চলতে চলতে (২১)
শ্রীরামপুর কলেজের দিন শেষ করে সবে চাকরীর চেষ্টা শুরু করছি ৷ বাড়িতে ইলেভেন থেকেই দুজনকে পড়াতাম ৷ প্রতি মাসে পাঁচ টাকা মাইনে ৷ ক্লাস ফাইভ আর সিক্স ৷ তারা পরবর্তী কালে এইট নাইনে উঠে ছেড়ে দিলেও ৷ নতুন দু’তিনজন করে যুক্ত হয়েছে ৷ মাসে ৩০ টাকা রোজগার হয় ৷ অনেকদিন আগে পৈতের পর স্টেশনের কাছে ইউনাইটেড ব্যাঙ্কের শ্রীরামপুর শাখায় বাবা পাঁচটাকা দিয়ে একটা বাবার সঙ্গে জয়েন্ট একাউন্ট করে দিয়েছিলেন ৷ সেখানেই জমানো ছিল পৈতের পাওয়া টাকা ৷ টিউসনের টাকা থেকে সামান্য কিছু টাকা হাতে রেখে বাকি টাকাটা ওখানেই জমাতাম ৷

হঠাৎ “ওলি ” সেন্টের এজেন্সি তে চাকরি পেলাম ৷ হুগলি জেলার নির্দিষ্ট কয়েকটি শহরের দোকানে দোকানে সাপ্লাই দিতে হবে ৷ প্রতি সপ্তাহে ৩৫ টাকা দেবে ৷ একটা এটাচি ব্যাগ হাতে খুবই উৎসাহ নিয়ে কাজ শুরু করলাম ৷ কোম্পানী বললেন – প্রতি সপ্তাহে মাল সাপ্লাই দিয়ে পরের সপ্তাহে টাকা তুলে আনতে হবে ৷ সে প্রায় তিন চার হাজার টাকা ৷ সেই সময় অনুযায়ী অনেক টাকা ৷ বাবা শুনে খুবই অখুশী হলেন ৷ দু’তিন সপ্তাহ পরেই বুঝলাম সে কাজ আমার নয় ৷ ছেড়ে দিলাম যখন ঠিক তখনই বাবার এক বন্ধু বাবার কাছে প্রস্তাব দিলেন আপনার ছেলেকে আমার কাছে আসতে বলুন , আমি তাকে এল.আই.সি এবং পিয়ারলেসের এজেন্ট করে নেবো ৷ ভবিষ্যত স্ট্রং হয়ে যাবে ৷ বাবার নির্দেশে গেলাম তাঁর কাছে ৷ এল.আই.সির বেশ বড় অফিসার ৷ তাঁর স্ত্রী মেনকাবৌদির আন্ডারে আমি এজেন্ট হলাম ৷ তিনচার দিন ক্লাস হল কিভাবে লোককে কনভিন্স করিয়ে পলিসী করাতে হবে সেই নিয়ে ৷ অনেক কষ্টে দু’একটা পলিসি করালাম ৷ ভালো টাকাও পেলাম ৷ পরে বুঝলাম সে কাজটিও আমার দ্বারা হবে না ৷
এর মধ্যে আকাশবাণীর যুববাণীতে অনুষ্ঠান করছি ৷ ক্যাজুয়াল এনাউন্সার ও হয়েছি ৷
একদিন হঠাৎ শোয়ার ঘরের বাইরের বারান্দা থেকে শুনলাম বাবা তাঁর সেতারের ছাত্রী যোগমায়া পিসীকে বলছেন – জানেন দিদি আমি একটা ব্যাপারে নিশ্চিন্ত শ্রীমাণ টাকা ওড়াবে না ৷ ওই ডাকটিকিট জমানো ছাড়া আর কোনও নেশা নেই ওর ৷ জমানো হ্যাবিটটা তৈরী হয়ে গিয়েছে ৷
শুনে খুব আত্মতৃপ্তি লাভ করেছিলিম ৷ যদিও বাবা সব সময় আমায় একটা গালাগাল দিতেন “গট্টাকশাল”৷ যদিও আজ অবধি কোনও অভিধানে শব্দটির হদিশ পাইনি ৷ অনেক পরে বাবা অবশ্যি বলেছিলেন – গট্টাকশাল মানে ” গুড ফর নাথিং ” ৷ তাই আজ বারবার মনে হয় বাবা আমায় ঠিক কথাই বলতেন ৷
যাই হোক এল. আই. সি বা পিয়ারলেসের কোনও এজেন্সির কাজই আমার দ্বারা হল না ৷ মেনকা বৌদি বা অলোকদা নিজেরা বেশ কয়েকটা ক্লায়েন্ট এর সঙ্গে আমায় যোগাযোগ করিয়ে দিয়ে উৎসাহিত করার চেষ্টা করেছিলেন ৷ কিন্তু “গট্টাকশাল” আমার পক্ষে সে এজেন্সি করাও হল না ৷
তারপর শুধু কলকাতায় চাঁদপাল ঘাটে নেমে মাসে তিন চারদিন আকাশবাণী ভবন ছাড়া আর যাওয়া নেই কোথাও ৷
মাঝে মাঝে জিপিওতে যেতাম ৷ সেই যে এগারো বছর বয়েসে আমাদের শহরের ভূমিপুত্র তৎকালীন মন্ত্রী ডা. গোপাল দাস নাগ একটা নেশা ধরিয়ে দিয়েছিলেন ৷ সে নেশা থেকে তো বাইরে আসতে পারিনি আজও ৷ মদ বিড়ি গাঁজা চরস আর যা যা সব নেশা বস্তু তার কাছে আজ আমার বাচ্ছা মনে হয় ৷

নেশার নাম “ডাকটিকিট সংগ্রহ ” ৷ বর্তমানে যার পরিমান আমার কাছে এক লক্ষ বিশ হাজারের কিছু বেশি ৷ প্রতি শনিবার বহু সংগ্রাহকের ভিড় হত জিপিওর ফিলাটেলি বিভাগের সামনে ৷ কত রকমের দেশবিদেশের ডাকটিকিট কয়েনস ৷ সেসব বড় নেশার ব্যাপার ৷

