আমার বাবা (দেবপ্রসাদ চক্রবর্তী) পাঁচের দশকের কমিউনিস্ট। জিজ্ঞেস করলে বলতেন, আপনিই কমিউনিস্ট হয়ে গেছিলাম, সেই সময়ের জল-হাওয়ায় ছিল বামপন্থার সুর। কথাটা ভেবে দেখার মতো। পাঁচ ও ছয়ের দশকের নতুন পৃথিবীর স্বপ্নদেখা তরুণ মানেই বামপন্থী। পশ্চিমবঙ্গ তখন খাদ্য আন্দোলনে কাঁপছে। উদ্বাস্তু মানুষ পুনর্বাসন ও নাগরিক অধিকারের জন্যে সরকার-বিরোধী আন্দোলন জোরদার করে চলেছে। ভিয়েতনামে এগিয়ে চলেছে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী মুক্তি সংগ্রাম। কিউবার বিপ্লব (১৯৫৯) ঘটে গেছে। চিনে শুরু হয়েছে সাংস্কৃতিক বিপ্লব। রাজ্যে ষাটের দশকে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যুক্তফ্রন্ট সরকার। সরকারের সমর্থন নিয়ে বামপন্থী দলগুলি শুরু করেছে বেনামি জমি দখলের আন্দোলন। জোতদার ও বড়ো জমির মালিকদের থেকে গ্রামাঞ্চলে ক্ষমতার ভারসাম্য চলে আসছে সাধারণ কৃষকদের হাতে। নকশালবাড়ির কৃষক অভ্যুত্থানে অনুপ্রাণিত হয়ে একদল যুবক ডাক দিয়েছে সশস্ত্র কৃষক বিপ্লবের — ‘গ্রাম দিয়ে শহর ঘেরা’-র। কংগ্রেসি ‘প্রতিক্রিয়াশীল’ শাসনের রাশ আলগা হচ্ছে। মানুষ স্বপ্ন দেখছে, আজ নয় কাল সুদিন আসবেই। লালকেল্লায় উড়বে লাল পতাকা। আর বেকারত্ব থাকবে না, দারিদ্র্য থাকবে না। সে হবে এক ‘সব পেয়েছি-র দেশ’। ১৯৭৭-এ তৈরি হল বামফ্রন্ট সরকার। বামপন্থী বহু মানুষ ও কর্মী উজ্জীবিত হয়ে উঠেছিল এই পরিবর্তনে। ১৯৮০ সালে বামফ্রন্টের সমর্থক বাবার এক বন্ধুকে অধৈর্য হয়ে বলতে শুনেছি—’দেবু, বিপ্লব কবে হবে বল তো?’

সংগ্রহ করতে বইমেলায় আসুন

আর আজ? এই প্রশ্ন করার মতো কেউ আর বেঁচে নেই। স্বপ্নটি এখন অবান্তর হয়ে গেছে। এই সময়ের ‘জল-হাওয়া’-য় অ-বাম চিন্তাচেতনা ও সংস্কৃতিরই দাপট। পশ্চিমবঙ্গের একটি গ্রামের কলেজে পড়াই আমি। চল্লিশ কিলোমিটার বাস জার্নি করে কর্মস্থলে পৌঁছোতে হয়। জীবন-যন্ত্রণায় ক্ষতবিক্ষত হতে হতে কত সাধারণ মানুষ বাসে ওঠে, নামে। তাদের সঙ্গে কথাবার্তা হয়। কলেজের ছাত্রছাত্রী ও অভিভাবকদের সঙ্গেও কথা হয়। বেশিরভাগ সময়ই শুনি তাদের কথা। বলি না। বোঝার চেষ্টা করি তাদের মন, মনের ভেতর ওদের কোন ধরনের ভাবনাচিন্তাগুলো ঘুরপাক খায়। ক্লাসের ছাত্রছাত্রীদের প্রশ্ন করেছিলাম, লেনিন কে ছিলেন? অধিকাংশেই ফ্যালফাল করে চেয়েছিল, নাম শোনেনি। কেউ বা বলল, নাম শুনেছি, কিন্তু কে জানি না। মনে মনে ভাবছিলাম, এরা গোপীবল্লভপুর অঞ্চলের ছাত্র, নকশাল আন্দোলনের সূত্রে যে অঞ্চল সারা দেশে পরিচিতি পেয়ে উঠেছিল। নকশাল নেতা অসীম চট্টোপাধ্যায়, সন্তোষ রানা-র মতো মানুষ এখানে সক্রিয় ছিলেন। চৌত্রিশ বছর ধরে একটি বামপন্থী সরকার এখানে শাসন করেছে। অথচ এখানকার ছাত্রছাত্রীরা লেনিনের নাম শোনেনি। গল্পের ছলে কখনও কখনও ছাত্রছাত্রীদের জিজ্ঞেস করি, এখানে লাল পতাকার পার্টি নেই? ‘আগে আমাদের গ্রামটা সিপিএম ছিল স্যার। এখন আর নেই। এখন সবাই তৃণমূল। আমরা খুব ভালো আছি। গ্রামের মধ্যে খুব ইউনিটি, দলাদলি নেই’, এক ছাত্রী গল্পে গল্পে বলে। তাদের ‘ভালো থাকা’-র নমুনা বোঝার চেষ্টা করি। ছাত্রীটি বলে, ‘এখন গ্রামে পুজোর সময় খুব মজা হয়। একসাথে খাওয়া-দাওয়া হয়। কোনো বিভাজন নেই’। রাস্তায় আসতে-যেতে প্রায়ই দেখি বিভিন্ন গ্রামে হরিনাম ও কীর্তনের আসর বসেছে। পাঁচ-সাতদিন ধরে চলে। গাড়ি থামিয়ে ছোটো ছোটো ছেলেরা চাঁদা তোলে তার জন্যে। দুর্গা, কার্তিক, শনি, গণেশ, সন্তোষীমা-র পুজোও ঘটা করে হয়। ডি-জে বাজিয়ে উন্মত্ত ছেলেপুলেদের দল জগঝম্প নাচে রাস্তা জুড়ে। মাথায় ফেট্টিবাঁধা রক্তচক্ষু ছেলেদের ‘জয় শ্রী রাম’ ধ্বনিতে রাম নবমীর আকাশ-বাতাস মুখরিত হয়। আমি দেখি ‘আমরা ভালো আছি ও ভালো নেই’-এর আশ্চর্য যুগলবন্দি।

সংগ্রহ করতে বইমেলায় আসুন

এই পরিবর্তনের সবটাই কি নিছক ‘সময়ের বদল’? বামপন্থী রাজনৈতিক কর্মীদের, চৌত্রিশ বছর ক্ষমতায় থাকা একটি বামপন্থী রাজনৈতিক দলের, কোনও দায় নেই? ভাবার চেষ্টা করি। কোনো একতরফা সরল উত্তর আসে না। এই সমাজ বদল তো শুধু বিচ্ছিন্নভাবে বাংলায় ঘটে-যাওয়া কোনো পরিবর্তন নয়। আটের দশক থেকে দুনিয়া জুড়েই দক্ষিণপন্থার উত্থান। পুঁজিবাদ নিজেকে নতুন ভাবে পুনর্গঠিত করে কমিউনিজমকে কোণঠাসা করেছে এই সময়ে। খোলা-বাজার অর্থনীতির জয়গান গেয়ে তৃতীয় বিশ্বের ক্ষমতাসীন রাষ্ট্রনেতাদের বশে এনেছে ‘সাম্রাজ্যবাদী’ পশ্চিম। পুঁজির নির্বাধ সর্বত্রগমন, যাকে আমরা ‘নব্য উদারবাদী বিশ্বায়ন’ বলে চিনি, তার দাপটে নেশন স্টেট বিলুপ্ত হয়নি, হয়েছে পুঁজির সেবাদাস। পুঁজির অবাধ ও লাভজনক চলাচল নিশ্চিত করতেই এখন তার যাবতীয় সক্রিয়তা। রাষ্ট্রশক্তির প্রশ্রয় নিয়ে বহুজাতিক পুঁজি গড়ে-পিটে নিতে শুরু করেছে মানুষের মন। মিডিয়া এখন পুরোপুরি কর্পোরেট পুঁজিশাসিত। চব্বিশ ঘন্টা অবিরাম তা বুঝিয়ে চলেছে মানুষের ভালোমন্দ। বিনোদনের আফিমে অবশ হয়ে যাচ্ছে মানুষের মননের সক্রিয়তা, চৈতন্যের অনুশীলন।

নয়ের দশকে পৃথিবীজোড়া এই প্রক্রিয়া যখন শুরু হয়েছে, এ-রাজ্যে তখন সরকারি ক্ষমতায় বামফ্রন্ট সরকার। যারা একটি অঙ্গরাজ্যে বিপ্লব সঙ্ঘটিত করার জন্যে ক্ষমতায় আসেনি। ‘আমাদের কর্মসূচীর লক্ষ্য গ্রামীণ ও নাগরিক জনসাধারণের যন্ত্রণার লাঘব এবং তাদের অবস্থার কিছুটা উন্নতি মাত্র। আমরা তার বেশি কিছু দাবি করছি না, কারণ আমরা জানি আর্থসামাজিক কাঠামোর পরিবর্তন ছাড়া জনসাধারণের অবস্থার মৌল পরিবর্তন সম্ভব নয়’, এ-কথা এই সরকারের নেতৃবৃন্দ ঘোষিতভাবেই স্বীকার করে নিয়েছিলেন প্রথম থেকে। কিন্তু সরকারের কর্তব্য ও কমিউনিস্ট পার্টির লক্ষ্য তো এক নয়। কমিউনিস্ট পার্টির কাজ আর্থসামাজিক কাঠামোর পরিবর্তনের লক্ষ্যে শ্রেণি-সচেতনতা ও শ্রেণি-আন্দোলনের বিকাশ। ভাবা গিয়েছিল, যুক্তফ্রন্ট সরকারের সময়কালের মতো সেই কাজে উত্তরোত্তর মনোনিবেশ করবেন কমিউনিস্ট কর্মীরা। কিন্তু ক্রমশ দেখা গেল, প্রতিষ্ঠান-বিরোধী বামেরা হয়ে উঠছেন প্রাতিষ্ঠানিক। আর্থসামাজিক কাঠামোর বদলের সংগ্রাম বদলে যাচ্ছে কেবল ভোটের রাজনীতিতে। নির্বাচনের সময়গুলিতে রাজনৈতিক অতি-সক্রিয়তা, বাকি সময় জুড়ে অদ্ভুত আলস্য—সেই রাজনীতির বৈশিষ্ট্য। এমনকি ভোটে জিততে কখনও কখনও কোথাও কোথাও অগণতান্ত্রিক পদ্ধতির আশ্রয় নিতেও তাদের দেখা গেছে—যেন ভোটে জেতাই কমিউনিস্ট পার্টির মোক্ষ, মানুষের হৃদয়জয় ও গণ-আন্দোলনের বিকাশ নয়।

মোদ্দা কথা, সি-পি-আই-এম প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে লড়াইটা ক্রমশ ‘রাজনৈতিক লড়াই’-এ সীমাবদ্ধ করে ফেলেছিল, আর সেই ‘রাজনৈতিক লড়াই’-ও রূপান্তরিত হয়েছিল সংকীর্ণ ভোটের লড়াই-এ। ফলে শ্রেণি-আন্দোলনের বিকাশের দিকটি ক্রমশ উপেক্ষিত হতে থাকল। এ-ক্ষেত্রে প্রতিবেশের পরিবর্তনটাও অবশ্য খেয়ালে রাখা দরকার। ছয়-সাতের দশকে শ্রেণি-আন্দোলনকে সজীব রাখা ছিল তুলনামূলকভাবে সহজ। তখনও জোতদার ও বেনামি জমির মালিকরা পশ্চিমবঙ্গের আর্থসামাজিক কাঠামোর একটি স্পষ্টগ্রাহ্য বাস্তবতা। ভূমিসংস্কারের সাফল্যের পর সেই ‘শ্রেণিশত্রু’ আর সরাসরি দৃশ্যমান নয়। বামফ্রন্ট আমলের শুরুর দিকের বছরগুলিতে পঞ্চায়েত রাজের সফল প্রয়োগের সূত্রে এক ভিন্ন ধরনের রাজনৈতিক বাস্তবতার সূচনা ও উত্তরোত্তর প্রসার ঘটেছিল। শ্রেণিসংগ্রামের পরিবর্তে প্রাধান্য পেতে শুরু করেছিল দলভিত্তিক রেষারেষি ও ক্ষমতাদ্বন্দ্ব। অর্থাৎ সেখানে এ-পার্টি ও-পার্টি দ্বন্দ্বটাই প্রধান, শ্রেণিপ্রশ্নটি নয়। ইতিমধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত্ব কারখানাগুলির সংকোচন সংগঠিত ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনের সামগ্রিক শক্তিকে দুর্বল করে দিয়েছে। অসংগঠিত শ্রমিক, ছোটো ছোটো জোতে বিভক্ত কৃষক, চাষি পরিবারগুলি থেকে জন্ম নেওয়া শিক্ষিত তরুণ প্রজন্মের কাছে কমিউনিস্ট পার্টির মতাদর্শ ও কর্মসূচিকে কী-ভাবে প্রাসঙ্গিক করে পৌঁছে দেওয়া যায় — এ সব নিয়ে নতুনভাবে ভাবা ও সেই অনুযায়ী পার্টিকে পুনর্গঠিত করার দরকার ছিল। সরকারি ক্ষমতার প্রশ্রয় পেয়ে বহু জায়গাতেই পার্টির ‘সংগঠন’ বিস্তৃত হয়েছিল, যেখানে গণ-আন্দোলনের পূর্ব ঐতিহ্য ছিল না। ‘সংগঠন’-এর প্রসার ঘটেছিল কিন্তু কমিউনিস্ট কর্মীবাহিনীর মধ্যে কমিউনিস্টসুলভ চিন্তা-চৈতন্যের প্রসার ঘটেনি। চিন্তাচৈতন্যহীন ‘সংগঠন’ পেশিশক্তি বা সরকারি ক্ষমতা দিয়ে পার্টির প্রভাব বাড়াতে পারে, তাদের দাপট দেখে কখনও কখনও মনে হতে পারে, “আহ্‌, আমাদের পার্টি কী শক্তিশালী”, কিন্তু আসলে তো ক্ষয়িত ও রক্তশূন্য। ২০০০-পরবর্তী পশ্চিমবঙ্গের বহু জায়গায় এই ছিল বাস্তবতা। ফলে এই পার্টিসংগঠনের পক্ষে বিশ্বায়ন-পরবর্তী পুঁজিবাদের বর্ধিত সামাজিক-সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা সম্ভব ছিল না। এর ফলে সৃষ্টি হয় এক বৈপরীত্ব। সরকারে বামেরা আসীন, কিন্তু মানুষের চিন্তাচৈতন্যে অবাম মানসিকতা ও মূল্যবোধের ক্রমবর্ধমান দাপট। এই বৈপরীত্ব বেশিদিন চলে না, চলেনি। বামবিরোধী একটি সরকার ক্ষমতাসীন হয়ে এই বৈপরীত্বের অবসান ঘটিয়েছে।

দুর্ভাগ্যের হল এই যে, সরকারি ক্ষমতা থেকে সরে যাবার পর বাম কর্মী ও সমর্থকেরা তুল্যমূল্য কোনো প্রতিরোধ গড়ে তুলতেই পারেনি। অবশ্যই এ-ক্ষেত্রে রাজ্যের ক্ষমতাসীন দলের কর্তৃত্ববাদী ও নিপীড়নমূলক রাজনীতির একটা ভূমিকা আছে। কিন্তু কমিউনিস্টরা তো শাসকের ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে নিজের অক্ষমতাকে প্রামাণ্য করে তুলতে পারে না। শাসকের বদান্যতায় কোন কালে ‘বিপ্লবপ্রেমী’ কমিউনিস্টরা রাজনীতি করেছে? তাই দায়টি শেষ পর্যন্ত ঘুরেফিরে তাদের ঘাড়ে এসেই পড়বে। নানাভাবে তারা ঘুরে-দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে ঠিকই, কিন্তু এখনও পর্যন্ত এই কাজে তারা বিন্দুমাত্র সফলতা পায়নি। এর একটা বড়ো কারণ বামেদের ফিরে-আসার লড়াই এখনও পর্যন্ত ভোট-রাজনীতির সংকীর্ণ পরিসরেই সীমাবদ্ধ। সেই লড়াই বৃহত্তর সামাজিক-সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ ও চর্চার অঙ্গ হয়ে উঠছে না। যে সামাজিক-সাংস্কৃতিক পরিবেশ ও চৈতন্য থেকে বামপন্থী মানুষ তৈরি হয়, সেটা তো রাষ্ট্র বা মিডিয়া তৈরি করে দেবে না। আমরা মিডিয়াকে দোষারোপ করতে পারি, কিন্তু বিকল্প রণনীতিটা শেষ পর্যন্ত বামেদেরই বানাতে হবে।

সংগ্রহ করতে বইমেলায় আসুন

এই কারণেই বলছি, আজকের পরিবর্তিত দুনিয়ায় কেউ ‘স্বতঃস্ফূর্ত’ প্রক্রিয়ায় বামপন্থী হয়ে ওঠে না। এখনকার জল-হাওয়ায় বামপন্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মূল্যবোধ-সংস্কৃতির অস্তিত্ব নেই। কথাটাকে এলিটিস্ট লাগতে পারে। কারও মনে হতে পারে, সমাজ থেকে কি শোষণ, দারিদ্র্য, বঞ্চনা মুছে গেছে? জনগণ, শোষিত মানুষ, তার জীবন-সংগ্রামের অভিজ্ঞতা থেকে কি নিজেই স্বতঃস্ফূর্তভাবে বামপন্থী হয়ে উঠতে পারে না? পুথি-পড়া কিছু ‘মধ্যবিত্ত’ (বা আজকালকার চালু ভাষায় ‘ভদ্রবিত্ত’) বামপন্থী পার্টিকর্মীরাই কেবল তাদের বামপন্থী চেতনায় দীক্ষা দিতে পারে? আমি বলছি কিন্তু ভিন্ন কথা। শোষণ-বঞ্চনা এবং তার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ-বিদ্রোহ মানুষের মজ্জাগত। মানব সভ্যতার শুরু থেকেই সেই প্রতিরোধের নানা নজির আছে। কিন্তু ব্যক্তিগত স্তরে শোষণ-বঞ্চনার শিকার হওয়া থেকে সমষ্টিগত ভাবে সেই শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিরোধে জোটবদ্ধ হওয়া একটি রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার অংশ। অভিন্ন শত্রুর বিরুদ্ধে সংগ্রামের ময়দানে যৌথ লড়াইয়ের অভিজ্ঞতা থেকে এই চৈতন্য উদ্ভূত হয়, ক্রমশ বিকশিত হয়ে ওঠে। এই সংগ্রাম কোনো নির্দিষ্ট পার্টির নেতৃত্বে না হতেও পারে, কিন্তু যৌথতার একটি বোধ ও সংঘবদ্ধতা এ-ক্ষেত্রে জরুরি। নানা কারণে সেই যৌথতার বোধ ও শ্রেণিসংহতির উপলব্ধি এখন বিপন্ন। বহুক্ষেত্রেই শোষিত মানুষ শত্রু-মিত্র চিনে নিতে অক্ষম। জীবনসংগ্রামের তীব্রতা সে রোজ উপলব্ধি করে, কিন্তু কার বিরুদ্ধে তার লড়াই – এই বোধ তার কাছে স্পষ্ট নয়। শ্রেণিসমাবেশ (class mobilization)-এর বিকল্প নানা ‘গোষ্ঠীবদ্ধতা’-র মতবাদে তাদের প্রলুব্ধ করে দক্ষিণপন্থী বিভিন্ন রাজনৈতিক দল। কখনও তা ধর্মমোহকে ব্যবহার করে সাম্প্রদায়িক সত্তার নির্মাণ, কখনও বা উগ্র দেশপ্রেমের বিশেষ ভাষ্য দিয়ে শাসকশ্রেণির সঙ্গে একাত্মতা নির্মাণের রাজনীতি। দক্ষিণপন্থী নেতারা জনদরদী শাসকের ভূমিকায় উপস্থাপিত করে জনগণের কাছ থেকে দাবি করেন পূর্ণ আনুগত্য, যা পরোক্ষভাবে বলে—অধিকার’ চেও না, ‘দয়া’ চাও। কিংবা, ‘ত্রাণ’ নাও, কিন্তু আর্থসামাজিক বাস্তবতার বদল চেও না। ভোট দাও, কিন্তু ‘রাজনীতি’ নিয়ে ভেবো না। পুজো-উৎসব-ক্রিকেট নিয়ে মেতে থাকো। দেশকে ভালোবাসো, দেশের সীমান্তকে ভালোবাসো, কিন্তু দেশের মানুষের দুর্দশার প্রতিবিধান নিয়ে চিন্তা করো না। সেটা আমাদের হাতে ছেড়ে দাও।

সংগ্রহ করতে বইমেলায় আসুন

এ-হেন পরিস্থিতিতে বামপন্থী রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মীদের কাজটি নিঃসন্দেহে আগের চেয়ে অনেক কঠিন। পাঁচ, ছয় ও সাতের দশকে রাষ্ট্র ও পুঁজিপরিচালিত মিডিয়া প্রত্যন্ত গ্রামে ঢুকে মানুষের চৈতন্যের এতটা দখল নিতে পারেনি। তখনও সে নিজের লোকজ সংস্কৃতি ও প্রাত্যহিক জীবনসংগ্রাম থেকে জাত সংস্কৃতি ও মূল্যবোধকে আগলে রাখতে পেরেছিল। সে মূল্যবোধের মধ্যে নিশ্চয়ই ছিল যুগসঞ্চিত সামন্ততান্ত্রিক মূল্যবোধের অনেক গ্লানি, যার বিরুদ্ধে ‘মাটির সঙ্গে মিশে যাওয়া’ বামপন্থী কর্মী-সংগঠকরা প্রশ্ন তুলতে শিখিয়েছিলেন। এই বামপন্থী-সংগঠকেরা ভোটের রাজনীতির মরসুমি কর্মী ছিলেন না, শ্রমিক-কৃষকের যাপনের তাঁরা অংশ হয়ে গিয়েছিলেন। উভয়ের মধ্যে তৈরি হয়েছিল নিত্যদিনের হৃদয়ের সংযোগ। সংগ্রামরত শ্রমিক-কৃষক অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তো আর ‘পুথি’ পড়ে বামপন্থায় ও মার্ক্সবাদে দীক্ষা নেননি। কমিউনিস্ট কর্মীদের সাদামাঠা নিঃস্বার্থ জীবনযাপন ‘পাঠ’ করেই অধিকাংশজন জেনে নিয়েছিলেন কে তার আপন আর কে তার পর। গনসঙ্গীত-গণনাট্য-র মতো সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড থেকে শিখে নিয়েছিলেন মার্কসবাদের অনেক শিক্ষা। এখন পরিস্থিতির আমূল বদল ঘটে গেছে। প্রত্যন্ত গ্রামেও পৌঁছে গেছে রাষ্ট্র — রাষ্ট্রের ও পুঁজির মদতপুষ্ট সংস্কৃতি ও বিনোদন। সোশ্যাল মিডিয়ার দৌলতে মানুষ হয়ে যাচ্ছে আরও একা ও ঘরবন্দি। এ-হেন প্রতিকূলতার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে মানুষের চৈতন্যে যৌথতার মূল্যবোধ ও ভাবনাচিন্তার প্রসার ঘটানো নিঃসন্দেহে দুরূহ, দীর্ঘমেয়াদি ও শ্রমনিবিড় কাজ। সে-কাজে গাফিলতি করে শুধুমাত্র ‘ভোটযুদ্ধ’ লড়ে বামপন্থার পালে হাওয়া তোলা সম্ভবপর নয়, বলাই বাহুল্য।

সহযোগিতার হাত বাড়াতে ওপরের ছবিতে ক্লিক করুন

[লেখকের অন্য রচনা]

[পরম্পরা ওয়েবজিন, ফেব্রুয়ারি ২৫, সূচিপত্র – এখানে ক্লিক করুন]