নিবেদিতা ঝড়ের মতো লিখে চলেছেন। কান্নাভেজা শব্দের শরীর মুচড়ে মুচড়ে উঠে আসছে কলমের আঁচড়ে। আগস্ট- সেপ্টেম্বর মাস জুড়ে এক তীব্র প্রত্যাখ্যান বোধ তৈরি হচ্ছে নিবেদিতার গভীরে। তাঁর প্রিয়তম পিতা, স্বামী, চলে যাচ্ছেন দূরে — এক যন্ত্রণাবিদ্ধ বোধ। প্রিয়জন দুর্বোধ্য হয়ে যাওয়ার মতো যন্ত্রণাদায়ক আর কিছু হতে পারে না। স্বামীজি নিবেদিতার কাছ থেকে দূরে সরে সরে যাচ্ছেন। নিবেদিতাকে ছিটকে সরিয়ে দিচ্ছেন। অসহ্য এ যন্ত্রণা! পুঞ্জীভূত ধোঁয়ার মতো যন্ত্রণার বিস্ফোরণ ঘটেছে সেদিন, যেদিন জ্যুল বোয়া ও এম্মা কালভ্যের প্রস্তাব ছিল কনস্টান্টিনোপল, মিশর ঘুরতে যাবে সবাই এবং স্বামীজিকে সঙ্গে নিয়ে যাবে। জ্যুল বোয়াকে পছন্দ হয় না নিবেদিতার প্রথম থেকেই। কবি ও দার্শনিক হতেই পারে। কিন্তু মন যে স্বচ্ছ নয়, তা প্রথম দেখেই মনে হয়েছিল। কেমন একটা লাগছে, কিন্তু ঠিক প্রকাশ করা যাচ্ছে না। তার আচার আচরণে নৈতিকতার কোনও ছাপ পাওয়া যায় না। বরং প্ররোচনামূলক মনে হয় মাঝে মাঝে। মিস ম্যাকলয়েড বোয়াকে একদম পছন্দ করতেন না। মিস ম্যাকলয়েড সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন যে, জ্যুল বোয়াই ম্যাডাম কালভ্যেকে প্ররোচিত করেছিল স্বামীজির প্রতি। সব কথা বলা যায় না। বলতে পারেনি নিবেদিতা। আর স্বামীজি নৈর্ব্যক্তিক এক উদার দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে চলেছেন। বুঝতেই চাইছেন না বা পারছেন না। তাঁর কাছে সবকিছুই যেন বাস্তবতার বাইরে! নিবেদিতার রাগ, অভিমান, ক্ষোভ, যন্ত্রণা জল হয়ে নেমে আসছে দু’গাল বেয়ে। ঝুঁকে পড়লেন টেবিলের উপর। কলম নিলেন। সারা বুলকে বলবেন অন্তরের কথা। সারা বুলকেই স্বামীজি দিয়েছিলেন গেরুয়া কাপড় ও সন্ন্যাসিনীর পোশাক। তাঁকেই বলবেন মনের কথা।

জগদীশচন্দ্র ও অবলা। ১৯০০ সালের ইংল্যান্ডে


My cell: 19 Rue De Marignan,
Thursday, Morning,
13.8.1900
My dearest S. Sara
…. I suppose I don’t love Swami’s attack and think them the truest and wittiest things I ever heard because I love him so much more. Is that it?
…বুদ্ধ বলেছিলেন, জীবন তার মূল স্বভাবে নরক। জীবনের অনেকখানি পথ না মাড়িয়ে মানুষ কেন একথা উপলব্ধি করে না, তা বুঝতে পারি না। যৌবনে কেন আশার সোনার স্বপ্ন সব কিছু আচ্ছন্ন করে রাখে! বহু বহু দিন আগে কি বুঝতে পারা যায়নি যে, সহসা বিস্মিত করে দিয়ে ওই জ্ঞান বর্ষিত হবে! ব্যক্তিগত কষ্টের জন্য জীবনের রূপকে ভয়ংকর বলছি না — সে কষ্ট আমার কিছুই নেই। ভয়ংকর হল, প্রতি পদক্ষেপে মানুষকে মানুষের জীবন চূর্ণ করতে হয়।
নিবেদিতা টুকরো টুকরো হয়ে পড়ছেন। শতধা। ঝাপসা চোখে দেখছেন নিজের টুকরো টুকরো ছায়া। কিন্তু তাঁকে লিখে যেতেই হবে। প্রিয়তম সারা বুলকে বলে যেতে হবে।
And then, this is all talk. Deep deep deep in us, through and through one’s being, twine the roots of Desire. Is Death like Life? I used to think I thought it was! I thought it was quite easy! But it is not. Pain and pleasure, even, are not the same. The degree that one can endure is so small.
শুধু কি একটি স্বপ্ন ভাঙতে হবে? হাজার হাজার স্বপ্ন! পর্দার পর পর্দা সরাই — তার পিছনে উদ্‌ঘাটিত হয় দৃশ্যের পর দৃশ্য। শক্তির লোভ জেগে থাকে দূরতম দিগন্তে। সত্যে মানুষ পৌঁছবে কী করে?
The vanity, the meddlesomeness, the self- assertion, the pride and contempt and impatience for others that are never dead! They are less mean perhaps than the love of comfort but they are 20000 times more impossible to slay.
Why do I think all this? I don’t know. But I must talk it out.
থামলেন নিবেদিতা। উঠে গিয়ে জলের জাগ থেকে জল গ্লাসে ঢেলে খেলেন ধীরে ধীরে। মিস্টার বোসের গবেষণা-পত্রের জন্য যে সারসংক্ষেপ করা বাকি আছে, সেই কাগজটির দিকে তাকালেন। লেখাটি শেষ করতে হবে। ইংল্যান্ডে বক্তৃতা দেবেন মি. বোস। সেসব কথাবার্তা ঠিক হয়ে আছে। সেখানে বক্তৃতার একটি সারসংক্ষেপ পাঠানোর কথা। নিবেদিতা যেচেই কাজটি নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছেন। আর আজকেই চূড়ান্ত মানসিক উত্তাল অবস্থা। সারাকে সব বলে একটু হালকা হতে হবে। চিঠিটি দ্রুত শেষ করছেন। করতেই হবে মনকে শান্ত করার জন্য।
আমরা যেন আলোআঁধারির কণ্টক বনে আটক পড়ে আছি — আমরা সকলেই — বের হওয়ার পথ নেই কোথাও। এই শূন্য প্রান্তরের আলেয়া হল অপরকে সাহায্য করার স্বপ্ন, যা আমাদের নূতনতর প্রহেলিকার দিকে নিয়ে যায়। নরকের মধ্যে আনন্দ কিভাবে সম্ভব? And if no joy, then certainly no Help. One does not desire to receive ( at least in one’s hypocrisy one believes one does not!) but the dream of giving dies hard. Well, there is no giving then. But at least one can suffer! কী তুচ্ছ এই পরিকল্পনা! কিন্তু অন্যের জন্য সহনের আকাঙ্ক্ষা যে আছে, তা অনুভব করতে হবে। বিরাট একটা কিছু আছে। আমরা আমাদের অশক্তি ও নৈরাশ্যের মধ্যেও নিজের প্রেমের বিষয়ে সচেতন। আমাদের সচেতন হতে হবে, এই সমস্ত সীমাবদ্ধতার পারে কী আছে, তার বিষয়ে। হয়তো তাই। কিন্তু রূপ জানি না। আমি নিজস্বভাবে সেখানে পৌছতে পারব না, unless Swami will give it by miracle. That is what I have come to now. A mere universe and him — and sullen tolerance of things. Will he give it? Will he give it? Alas — dear Saint Sara, but I tell you this in a whisper — he can not. তোমাকে চুপিচুপি বলি — তিনি দিতে পারেন না। আমি যে তাঁকে দিতে চেষ্টা করতে দেখেছি আগে। যদি পারতেন, আগেই দিয়ে দিতেন। কিন্তু তাঁর আছে — এই দেবার শক্তি আছে। কিন্তু পাওয়ার ব্যাপারে অনেকখানি যে নিজের শক্তির উপরে নির্ভর করে। তা যে আমার নেই — সত্যই নেই। এমন দারুণভাবে কি আমি পেতে চেয়েছি যার জন্য সব কিছু হারাতে প্রস্তুত? আমি কি মনপ্রাণ, সর্ব স্বাচ্ছন্দ্য ( আসল স্বাচ্ছন্দ্য; বহিরঙ্গ স্বাচ্ছন্দ্য ভিন্ন জিনিস; বিছানা নরম হোক বা শক্ত হোক, নিদ্রাই আসল জিনিস — সেটাই স্বাচ্ছন্দ্য), স্নেহ মমতা এর জন্য বিসর্জন দিয়েছি? আর ওঁরা — শ্রীরামকৃষ্ণ ও স্বামীজি — কি ত্যাগ করেছেন! কী না ত্যাগ করেছেন!
নিবেদিতা কলম থামালেন। একনাগাড়ে যা মনে এসেছে ঝড়ের বেগে লিখে চলেছেন। চোখের জল শুকিয়ে গেছে। সারাকে সব উজাড় করে বলে যাবেন তিনি। ভীষণ একা মনে হচ্ছে তাঁর। স্বামীজি সরিয়ে দিয়েছেন। সে শক্তি নিবেদিতার নেই যে তিনি গ্রহণ করতে পারবেন এই মুক্তিচেতনা! ত্যাগ করতে পারেননি কি? নিজেকে কি আকাঙ্ক্ষামুক্ত করতে পারেননি? জানেন না নিবেদিতা। তাঁর কাছে প্রশ্নমালা আছে শুধু। উত্তরহীন। শুধু এই মুহূর্তে দ্রুত বলে যেতে হবে কথাগুলি।
He told me himself that the desire for realisation came upon him “like a fever” and wherever he was he would struggle for it — sitting in one place 24 hours at a stretch without moving. When has one even desired like this?
How easy it is to say — but I don’t want. Salvation in any form — I prefer to help, to be a sacrifice. When there is no help — and there no needs to sacrifice — one might as well try for salvation.
Don’t say anything about this letter. I don’t see why I send it at all.

Your loving grandchild

Margot

You are just as much my Granny as anyone ever was. These things are all real as well as all unreal — are they not?

স্বামীজি ও মিসেস ওলে বুল

নৌকার পাশ দিয়ে ভেসে চলেছে গুচ্ছ গুচ্ছ কচুরিপানা। ক্ষতবিক্ষত সেদিনের নিবেদিতা আজ ভাবতে থাকেন। আজ, সমস্ত কিছুর পরিসমাপ্তির দিন। আলমোড়ায় স্বামীজির নিবেদিতাকে এড়িয়ে চলা, গুরুত্ব না দেওয়া — কষ্ট পেয়েছিলেন নিবেদিতা। কেঁদেছিলেন স্বামীজির ব্যবহারে। অস্তিত্বহীনতায় ভুগেছেন। দেড় বছর নানা ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে রামকৃষ্ণ ভাবান্দোলনের একজন সৈনিক হয়ে উঠেছেন যখন, তখন প্যারিসে স্বামীজির আশ্চর্য নিস্পৃহ আচরণে বিধ্বস্ত হয়ে পড়েছিলেন। ভাবছেন নিবেদিতা। নিজেকে আত্মধিক্কারে ক্ষতবিক্ষত করছেন —’নির্বোধ, যে-আগাছার জঞ্জালে দম আটকে আসছে তা উপড়ে ফেলতে পারো না?’
স্বামী, পিতা, গুরু তিনি বারবার অনিবার্য সংঘাতের মধ্য দিয়েই নিয়ে গেছেন। কোথায় নিয়ে যেতে চেয়েছেন? কোন পথে? আজ রক্তাপ্লুত তিনি। সে পথে হাঁটার শক্তির উৎস — নিবেদিতা চোখ বোজেন — অন্ধকার। নৌকা এগিয়ে চলে। দুলে ওঠে নৌকা, দুলে ওঠে দূরের তীরভূমি, স্থল, অন্তস্তল।

সারা বুল বুঝতে পারছিলেন নিবেদিতার খুব ভেতরে তোলপাড় করা ঝড়ের আভাস। সারা বুল জানেন স্বাধীনচেতা নিবেদিতার এই সমর্পণ তাঁকে ছিন্নভিন্ন করছে বারবার। নিবেদিতার কিছুদিন একা নির্জন প্রকৃতির মাঝে থাকা প্রয়োজন। একার সঙ্গে একা। নিজের সঙ্গে নিজের কথা বলা জরুরি। প্যারিস কংগ্রেসের কাজ, গেডেসের কাজ, জগদীশচন্দ্রের কাজ, তার ওপর স্বামীজির চিন্তনের সঙ্গে দ্বন্দ্ব। নিবেদিতার চোখের কোণে ছায়াপথ গাঢ় হচ্ছে। সারা বুল নিবেদিতাকে সমুদ্রের ধারে পেরোগাইরেক গ্রামে তাঁদের খামারবাড়িতে ঘুরে আসতে বললেন। ব্রিটানি এর লানিয়ঁ থেকে মাত্র ছ’কিলোমিটার দূরে সুন্দর সবুজ এক গ্রাম। নীল আকাশের ছায়া নিয়ে নীল সমুদ্রের পাশে উদার উন্মুক্ত সবুজ গ্রাম। সহজ সাধারণ মানুষ আর পাখপাখালির কলরব। সব ব্যবস্থা করে ফেলেন নিবেদিতার প্রিয় ‘গ্র্যানি’। নিবেদিতা রোদ-ঝলমলে সেপ্টেম্বর মাসে ব্যাগপত্তর নিয়ে চলে গেলেন পেরোগাইরেক গ্রামে একা। একটু নীরবতা দরকার। প্যারিসের কাজ আপাতত শেষ। ভেতরে ভাঙনের শব্দ শুনতে পাচ্ছেন নিবেদিতা। সে শব্দকে কাজের বোঝার সামনে ফেলে এড়িয়ে গেলে হবে না। শুনতে হবে মন দিয়ে। একা এবং একা।
প্যারিসের ঔজ্জ্বল্য এবং নক্ষত্রসম মানুষের ঘেরাটোপের বাইরে এসে আশ্চর্য এক বিরামবোধ নিবেদিতাকে জাপটে ধরল। চারিপাশে কৃষিজমি। সাধারণ কৃষক পরিবারের সবাই নিয়মমাফিক সকাল-সন্ধ্যা পরিশ্রম করছে। সরল কোমল তাদের মুখের হাসি। এত কঠোর পরিশ্রমের মধ্যেও কী অকৃত্রিম তাদের ব্যবহার! সমুদ্র ও আকাশ তাদের সঙ্গী আর সেই ঔদার্যের বাতাস বুক ভরে টেনে নিচ্ছেন নিবেদিতা। সমুদ্রের ধারে বসে আছেন নিবেদিতা।
“স্বামীজি আমাকে ছেড়ে গেছেন, ভালই করেছেন। এ আমার পাওনা ছিল। তাঁর ভেতরের মানুষটিকে স্বচ্ছন্দচিত্তে গ্রহণ করার যোগ্যতা বা প্রস্তুতি আমার ছিল না।”
আকাশ লাল হয়ে সূর্য অস্ত যাচ্ছে। আকাশের সঙ্গে সঙ্গেই সমুদ্রের রং আশ্চর্য মায়াবী হয়ে উঠল। নিবেদিতার প্রিয় সময় এই দিন-রাতের সন্ধিক্ষণ। আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকেন।
“কিন্তু আজ তাঁকে চিঠিও লিখতে পারছি না, আমার খবরও দিতে পারছি না। আমার দিগন্ত থেকে তিনি মিলিয়ে গেছেন। আমি শুধু মায়ের কাজে প্রাণপাত করব, এছাড়া আমার বাঁচার আর কোনও অর্থ নেই।”
অলস পায়ে বালিতে পায়ের ছাপ ফেলতে ফেলতে নিবেদিতা গ্রামের পথ ধরে ফিরে আসেন বাড়িতে। ঘরে কাজের লোকেরা আলো জ্বালিয়ে রেখে গেছে। আলো ঘিরে ছোট ছোট পোকারা উড়ছে। ওরা জানে না আলোর খুব কাছে গেলে পুড়ে যেতে পারে ডানা। স্তব্ধ হতে পারে জীবন। তবুও তো আলোর দিকে প্রবল বেগে যাওয়াই জীবনের মোক্ষ! সমাপ্তি!
নিবেদিতা তাকিয়ে থাকেন একদৃষ্টে কাচের লন্ঠনের আলোর দিকে। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর শুধু আগুনের শিখাটি দেখতে পাচ্ছেন। নৃত্যরত আগুনের শিখা। যেন প্রলয়ঙ্কর নটরাজ দুলে দুলে উঠছে। নিবেদিতা স্থির। দৃষ্টি নিবদ্ধ। একসময় নৃত্য থেমে যায়। শুধু আগুনের শিখার ভেতরের রঙের বিন্যাস। শিখার তিনটি স্তর – বাইরে লাল লেলিহান বলয়, তার পরে কেন্দ্রের দিকে হলুদ বলয় আর একদম কেন্দ্রস্থলে নীল ছোট্ট বলয়। নীল হল সাত্ত্বিক ভাবের প্রতীক। অর্থাৎ প্রজ্জ্বলিত প্রদীপের কেন্দ্র থেকে পরিধির বিস্তারে দেখা যায়, সাত্ত্বিক ভাবের প্রকাশ ঘটে চেতনায়, চেতন বা চৈতন্য আনে তেজ বা শক্তি যা পুড়িয়ে দিতে পারে সমস্ত কলুষতা। নিবেদিতা স্থির। বীজমন্ত্র জপ করেন।
স্বামীজি কিছুতেই তাঁকে সন্ন্যাসিনীর শিক্ষা দেননি। চেয়েছিলেন তিনি।
‘স্বামীজি, সন্ন্যাসজীবনের যোগ্যতা লাভের জন্য আমাকে কী করতে হবে?’
‘তুমি যেমন আছো তেমনই থাকো।’ স্বামীজির সংক্ষিপ্ত উত্তর ছিল সেদিন। ১৮৯৯ সালের এপ্রিল মাসের গরমে মঠের মাঠে নদীর ধারে বসে নিবেদিতা জানতে চেয়েছিলেন। উত্তর পাননি সেদিন স্বামীজির কাছ থেকে। নৈষ্ঠিক ব্রহ্মচারিণীর ত্যাগ ব্রতে দীক্ষা দিয়েছিলেন। তপস্যার জীবন নিবেদিতার নয়। নিবেদিতা কর্মী, কর্ম তাঁর সাধনা, শক্তির উপাসক, মহামায়া শক্তিরূপিণী তাঁকে পরিচালনা করবেন — স্বামীজি কি এমন ভেবেছিলেন?
আজ এই প্রত্যন্ত নির্জনতায় নিবেদিতা উপলব্ধি করতে পারছেন যেন, কেন স্বামীজি তাঁকে স্বাধীনতা দিয়ে দূরে সরিয়ে দিচ্ছেন! সামনে কর্ম-সমুদ্র। সেই কর্ম-সমুদ্রে যেন ঠেলে দিচ্ছেন স্বামীজি। কর্ম মাত্রই বন্ধন। কর্মই প্রকৃত সত্য। একমাত্র কর্মী অপরের বেদনায় সহানুভূতিশীল হয়ে উঠতে পারে। বিরামহীন সংগ্রাম তাঁর সামনে। অন্ধকারাচ্ছন্ন দরিদ্র লাঞ্ছিত অপমানিত ভারতবাসীর অযুত কালো কালো মুখগুলোর প্রতিনিধি আজ বিশ্বের দরবারে নিজেদের প্রতিভার বিচ্ছুরণ দেখাবে। তাঁদের পাশে দাঁড়িয়ে কাজ করার সংকল্প নিয়েছেন তিনি। কর্মবিমুক্ত সন্ন্যাসিনীর জীবন তাঁর নয়। চোখ দিয়ে জলের ধারা নেমে এল নিবেদিতার। পদ্মাসনে বসে আছেন। বীজমন্ত্র জপের পরেও বসে আছেন স্থির। করজোড়ে প্রণাম করলেন চোখ বুজে তাঁর পিতার পায়ে, তাঁর গুরুর পায়ে, তাঁর স্বামীর পায়ে।
সেজবাতির আলোয় থুতনিতে গড়িয়ে নামা চোখের জলের বিন্দু মুক্তো হয়ে ঝরে পড়ল তাঁর কোলে।
সকাল হতেই সোনাঝরা রোদ নিয়ে হইহই করে গাড়িটা এসে থামল বাড়ির গেটের সামনে। নিবেদিতা বেরিয়ে আসার আগেই সারা বুলের হাঁকডাক শুনতে পেলেন। দ্রুত বাইরে আসতেই চমক। সারা বুল, মিসেস ম্যাকলয়েডের সঙ্গে কথা বলতে বলতে ঢুকছেন স্বামীজি। নিবেদিতার ভেতর থেকে এক ধরনের আড়ষ্টতা যেন লতার মতো জড়িয়ে জড়িয়ে উঠে আসছে গলার কাছে। মাথার ভেতর থেকে আনন্দের বার্তা তাঁর চোখের তারায় তিরতির। নিবেদিতা নেমে এলেন ছোট্ট সিঁড়ি দিয়ে বাগানের রাস্তায়। সারা জড়িয়ে ধরে আদর করলেন। জো-এর সঙ্গে কুশল বিনিময়ের পরে স্বামীজির সামনে দাঁড়ালেন। স্বামীজির পা ছুঁয়ে প্রণাম করলেন। নিবেদিতার মাথায় হাত রেখে আশীর্বাদ করলেন স্বামীজি। অত্যাশ্চর্য আলোয় উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে চারপাশ। গাছে গাছে পাতারা দুলে দুলে উঠল। ছোট ছোট ঘাসফুল ও ড্যাফোডিলস ফুলগুলি খুশিতে মাথা নাড়াতে শুরু করেছে। কাঠবেড়ালি ছোটাছুটি শুরু করেছে। পাখিদের ডাকাডাকি শুরু হয়েছে।
নিবেদিতা উঠে দাঁড়ালেন।
তাকালেন।
তাঁর চোখের সেই অবিচল তরঙ্গায়িত স্নেহধারা নিবেদিতার ভেতরে গড়ে ওঠা পাথর-ভার দ্রবীভূত করতে থাকে। জলের ছলাৎ ধ্বনি শুনতে পায় নিবেদিতা ভেতরে ভেতরে।
‘কর্মে জয়ী হও, মার্গট। শক্তির উপাসিকা হয়ে ওঠো।’


নিবেদিতা হাতজোড় করে দাঁড়িয়ে থাকেন, ‘স্বামী, আশীর্বাদ করুন আমি আপনার কাজকে যেন এগিয়ে নিয়ে যেতে পারি!’
‘আমার কাজ বলে কিছু নেই মার্গট, মায়ের নির্দেশে তুমি কাজ করবে। তুমি স্বাধীন।’
‘স্বামী, আমি আপনার আজ্ঞাবহ, আপনার দেখানো পথে…।’
‘মার্গট, শান্ত করো নিজেকে, নিয়ন্ত্রণ করো, নিবেদনে যে অহং জড়িয়ে থাকে তাকে ধ্বংস করতে দরকার কর্ম। যাও মার্গট, তুমি তোমার মতো করে কর্মের পথ তৈরি করো।’ স্বামীজি তাকিয়ে থাকলেন নিবেদিতার চোখের দিকে। পাঠ করার চেষ্টা করছেন পরিবর্তনের ভাষা। দীর্ঘদিন স্বদেশে থাকার ফলে কিছু পরিবর্তন অবশ্যম্ভাবী। নিবেদিতার ভেতরে যে বিপ্লব শুরু হয়েছে তার খোঁজ কি লক্ষ করেছেন স্বামীজি চোখের তারায়!
‘আমি ভারতবর্ষে কাজ করব। ফিরে গিয়ে মেয়েদের স্কুল আবার খুলতে হবে। আমি এখান থেকে ইংল্যান্ডে যাব, সেখানে কিছু অর্থ-সাহায্য সংগ্রহ করার কাজ আছে। তারপর আমার কর্মভূমি ভারতে পৌঁছাব।’
স্বামীজি চুপ থাকেন।
‘আমি জানি, আপনি ভিয়েনা, হাঙ্গেরি, সার্বিয়া ঘুরে শেষে কায়রো থেকে চলে যাবেন ভারতে আর আপনার সঙ্গীরা ফিরে আসবে প্যারিসে।’
স্বামীজি চুপ থাকেন।
নিবেদিতা দিশাহারা তাকিয়ে থাকেন।
‘আমাকে পথ দেখাবেন না স্বামীজি! আশীর্বাদ করুন যেন সঠিক পথে কর্মে নিজেকে সঁপে দিতে পারি।’
নিবেদিতার মাথায় হাত রাখলেন স্বামীজি, ‘যদি আমি তোমাকে সৃষ্টি করে থাকি তবে বিনষ্ট হও। আর যদি মহামায়া তোমাকে সৃষ্টি করে থাকেন, সার্থক হোক।’ স্বামীজি একটি খাম জোব্বার পকেট থেকে বার করলেন। নিবেদিতা তাকিয়ে আছেন বিস্ময়ে। কী বলছেন স্বামীজি, বুঝতে পারছেন না।
‘এটাই আমার আশীর্বাণী, এই নাও।’ নিবেদিতা হাত বাড়িয়ে নিলেন খুব ধীরে। চোখ তাঁর স্বামীজির চোখের তারায়। এত নির্লিপ্ত চোখ! এত স্বচ্ছতা! এত প্রশান্তি কোনও চোখের! চোখের ভাষা এত পবিত্র!
স্বামীজি দ্রুত পিছন ফিরে হাঁটা শুরু করলেন বাগান-পথ দিয়ে। পিছন ফিরে দেখলেনও না একবারও। নিবেদিতা দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে হাঁটু মুড়ে বসে পড়লেন বৃক্ষের নীচে। চোখের জল গড়িয়ে গড়িয়ে ভেজাল মাটি, শিকড়ে শিকড়ে শিকর-সংবাদ বয়ে গেল তিরতির। পাতায় পাতায় শাখে শাখে বাতাসে বাতাসে ভেসে ভেসে ছড়িয়ে গেল জলকণা রাতের আকাশে। ঘরের টেবিলের সামনে বসলেন নিবেদিতা। গাউনের পকেট থেকে খামটি বার করলেন। খামের ভেতর হ্যান্ডমেড সাদা কাগজের উপর নীল কালিতে উজ্জ্বল হাতের লেখা

The mother’s heart, the heroes will,
The sweetness of the southern breeze
The Sacred charm and strength that dwell
On Aryan altars flaming free:
All these be yours, and many more
No ancient soul could dream before.

Be thou to India’s future son
The mistress, servant and friend in one.

বারবার পড়ছেন নিবেদিতা। ধীরে ধীরে উঠে আসছে বার্তা। স্বামীজির আদেশ, নির্দেশ, আজ্ঞা সব সবকিছু।

মায়ের মমতা আর বীরের হৃদয়,
দখিনের সমীরণে যে মাধুরী বয়,
বীর্যময় পুণ্যকান্তি যে অনল জ্বলে
অবন্ধন শিখা মেলি আর্য-বেদীতলে:
এসব তোমারই হোক, আরও ইহা ছাড়া
অতীতের কল্পনায় ভাসে নাই যারা।

ভারতের ভবিষ্যৎ সন্তানের তরে
সেবিকা, বান্ধবী, গুরু — তুমি একাধারে।
(অনু: নারায়ণী দেবী)

কুয়াশায় ঢাকা ভোর। কাচের জানালার ওপাশে ঘোলাটে পথ, ঝাপসা আলো। সূর্য উঠি-উঠি করেও থমকে আছে। নিবেদিতা নিজের ব্যাগপত্তর নিয়ে দরজা খুলে বেরিয়ে এলেন। হালকা লাগছে নিজেকে। পরিষ্কার নির্দেশ পেয়েছেন পিতার। ছোট্ট কয়েকটি পঙ্‌ক্তিতে পরিষ্কার। গতকাল রাতেই সারা বুল আর ম্যাকলয়েডকে বিদায় সম্ভাষণ জানানো হয়ে গেছে। তাঁরা বোধহয় এখনও ওঠেননি ঘুম থেকে। সারা বুল চাকর, গাড়োয়ানদের গত রাতেই ডেকে বলে দিয়েছেন নিবেদিতার ভোরবেলা যাবার কথা। এই গ্রামের পথে সহজে যানবাহন পাওয়া যায় না। তাঁর উপর এই কাকভোরে পাওয়া সম্ভব নয়। এক কৃষকের গাধায় টানা শস্য বোঝাই গাড়ি এখন রওনা দেবে শহরের দিকে। নিবেদিতা এই গাড়িতেই যাবেন শহরে। এইরকমই ব্যবস্থা করা আছে। শহরে পৌঁছানোর সহজতম পদ্ধতি এটাই। তারপর ইংল্যান্ডের পথে। আবার ইংল্যান্ড, উইম্বলডন! দেখা হবে জগদীশ বোস ও অবলা বোসের সঙ্গে। প্রিয় ‘বেয়ার্ন’ ও ‘বো’।
লম্বা লম্বা পা ফেলে কুয়াশা ছিঁড়ে এগিয়ে আসছেন এক গেরুয়া পোশাকের সন্ন্যাসী। একি! এত ভোরে তিনি! কুয়াশা ফালাফালা করে দ্রুত এগিয়ে আসছেন উজ্জ্বল আলোর মতন। নিবেদিতা ব্যাগ মাটিতে নামিয়ে ছুটে গেলেন কাছে। নতজানু হয়ে প্রণাম করলেন।
‘প্রভু আমার!’
‘যাও মার্গট, কর্মে ঝাঁপ দাও।’ স্বামীজি মাথায় হাত রাখলেন।
নিবেদিতা মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছেন। পিতার করুণা তিলমাত্র কমেনি তাঁর প্রতি! তিনি এখনও তাঁরই। নিবেদিতার সঙ্গে ধীরে ধীরে নির্বাক হেঁটে এলেন বাড়ির বাইরে তিনি। দু’জনেই চুপ। নিবেদিতা শস্য বোঝাই খোলা গাড়িতে উঠে বসলেন। গাড়োয়ান গাড়ি ছেড়ে দিল — হুড়ড়ড়ড় হুড়ড়ড়ড় হট্ হট্।
গাড়ি এগিয়ে গেল। নিবেদিতা পিছন ফিরে তাকিয়ে আছেন। স্বামীজি কুয়াশায় দু’হাত তুলে আশীর্বাদের ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছেন। চারিদিক ভাসিয়ে সূর্য দেখা দিল। কুয়াশা সরে গেল দ্রুত। নিবেদিতা দেখছেন তখনও স্বামীজি দাঁড়িয়ে আছেন হাত তুলে। ওই ওই তাঁর আশীর্বাণী রেণু-রেণু হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে চারদিকে। নিবেদিতা মাটির গন্ধ মেখে শস্যের গন্ধ নিয়ে ভেসে চললেন কর্তব্য ও কর্মে।

সামনে দূরে বাঁদিকের তীরভূমে দেখা যাচ্ছে লোকজন জমায়েত হচ্ছে। যদিও অস্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। তবে লোক চলাচল দেখা যাচ্ছে। নিবেদিতা তাকিয়ে থাকেন। কী অবস্থায় দেখবেন তাঁকে? শায়িত! কোনও দিন আর জাগবেন না। গতকাল রাতেই সেই দুঃস্বপ্ন দেখেছিলেন নিবেদিতা। মাঝরাত। গুমোট গরম। স্বপ্নের মধ্যে দেখলেন রামকৃষ্ণ অমৃতলোকে যাত্রা করছেন। বুকের ভেতর চাপা কষ্ট হচ্ছিল। ঘুম ভেঙে গেল। উঠে বসে মাটির ঘড়া থেকে গড়িয়ে জল খেলেন। বসে থাকলেন কিছুক্ষণ। ধীরে ধীরে অন্ধকার পরিষ্কার হয়ে ভোর আসছে। আর সেই সময় দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ। আর সেই অমোঘ সংবাদ-বাহক চিঠি। হুড়মুড় করে পাড় ভাঙার শব্দ। দু’কূল ছাপিয়ে জলোচ্ছ্বাস। শান্ত স্রোতে ভাসতে ভাসতে চলেছে নৌকা নিবেদিতাকে নিয়ে। সকাল হয়েছে। জেগে উঠেছে দুই পাড়ের মানুষ। তাঁরা কি খবর পেয়ে গেছে? এই দু’পাশের জেগে ওঠা মানুষ, গাছ, গাছের ফুল-ফল-পাখি, বাতাস, আকাশ, সবাই কি চলেছে সেখানেই, যেখানে তিনি চিরঘুমে শুয়ে আছেন? নিবেদিতা তাকিয়ে থাকেন শূন্যতা নিয়ে।

‘শুয়ে পড়ুন। কবে থেকে সমস্যার শুরু?’ ডা. ক্রমবি স্টেথোস্কোপের নলটা বুকের নানা জায়গায় চেপে চেপে ধরছেন। তারপর কোটের ভেতরের বুকপকেট থেকে বার করলেন সোনালি চেন দেওয়া সুন্দর গোল্ডেন ঘড়ি। বাঁহাতে তুলে ধরলেন জগদীশচন্দ্রের ডানহাতের কব্জি। গভীর চিন্তায় নাড়ি ধরে বসে থাকলেন কিছুক্ষণ। চোখ ঘড়ির দিকে। জিভ দেখলেন। চোখের পাতা আঙুল দিয়ে টেনে দেখলেন। এবার পেটের এক-একটি জায়গায় টিপতে শুরু করলেন। জগদীশচন্দ্রের মুখ-চোখ মাঝে মাঝেই কুঁচকে উঠছিল ব্যথায়।
অবলা আর নিবেদিতা বসে আছেন। অবলার চোখে চিন্তার কৃষ্ণছায়া। নিবেদিতা অতি ধীরে অবলার হাতটা তুলে নিজের কোলে নিয়ে চেপে ধরলেন। এই স্পর্শ-ভাষা ছড়িয়ে পড়ে ভরসার বার্তা নিয়ে অবলার মজ্জায়। অবলার সম্বিত ফেরে। ডাক্তার ক্রমবি জগদীশচন্দ্রকে বিছানা থেকে উঠতে বলে গম্ভীর মুখে চেয়ারে এসে বসলেন। তাঁর টেবিলের সামনে তখন উৎকণ্ঠায় ঝুঁকে পড়েছেন দু’জন — অবলা ও নিবেদিতা।
‘একটা অপারেশন করতে হবে। তবে তার আগে বেশ কিছুদিন ওষুধ খেতে হবে। দরকার বিশ্রাম, ড. বোস।’
‘কিন্তু…’। জগদীশচন্দ্র কথা শেষ করতে পারেন না।
নিবেদিতাই বলে দেন, ‘বুঝতেই পারছেন তাঁর গবেষণার কাজ আছে এবং বিভিন্ন বিজ্ঞান মহলে বক্তৃতা দেওয়ারও কথা। তাহলে?’
‘অপারেশনের আগে মাস দুই এবং পরে মাস দুই — এই চারমাস সময় দিতেই হবে। রেস্ট্রিক্টেড লং জার্নি, নিয়ম করে থাকা, উদ্বিগ্নতা কমানো, নিয়ম করে খাওয়া দাওয়া এবং রিল্যাক্সড থাকা — এগুলো মানতে হবে।’ ডা. ক্রমবি একবার নিবেদিতা এবং একবার জগদীশের দিকে তাকিয়ে মন দিলেন প্রেসক্রিপশন শেষ করায়। অবলা এগিয়ে এসে জগদীশের পাশে দাঁড়ায়। ঘন চোখে চিন্তার ঘোর। অপারেশন! বিদেশ-বিভুঁই জায়গা!
ফিরে এলেন তিনজন। গাড়ি চলেছে। তিনজন চুপ। বিষণ্ণ বিকেল। কুয়াশা ঢেকে ফেলছে। শীতে অস্বচ্ছ শহর। ঝাপসা পথঘাট। অক্টোবর মাসের প্রথম সপ্তাহ। আজ ৫ অক্টোবর ১৯০০। গাড়ির কাচের জানালায় মাথা ঠেকিয়ে বসে আছেন নিবেদিতা। ইংল্যান্ডে তাঁর প্রচুর কাজ। সারা বুলকে জানাতে হবে জগদীশের অসুস্থতার কথা। যখন ইংল্যান্ডের বেশ কিছু বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্রের সামনে বাধা তৈরি করছে, তারা যখন বলতে শুরু করেছে যে, জগদীশ বোসের গবেষণা যতটা না বিজ্ঞান তার চেয়েও বেশি কল্পনা, এর উত্তর দেবার জন্য পরীক্ষা ও গবেষণা-পত্রকে আরও সুসংহত করার প্রয়োজন। দরকার চূড়ান্ত মনোনিবেশ ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা। কিন্তু জগদীশ এই সময়ে অসুস্থ। জগদীশচন্দ্র বেশ মুষড়ে পড়েছেন। অবলাও চিন্তিত। নিবেদিতা পাশ ফিরে ওঁদের দিকে তাকিয়ে দেখলেন একবার। মনে মনে ঠিক করলেন ওঁদের চারপাশে এক অনুকূল পরিবেশ তৈরি করতে হবে। স্বাভাবিক এক আবহাওয়া গড়ে তুলতে হবে সর্বক্ষণের জন্য। থাকতে হবে ওঁদের সঙ্গে সর্বক্ষণ। সারা বুলের সাহায্য নিতে হবে। জগদীশচন্দ্রের লেখালেখির কাজে নিজেকে সঁপে দিতে হবে। শেষ অবধি ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে এক ভারতীয়ের সংগ্রাম — ভারতীয় বিজ্ঞান প্রতিভার জয়ধ্বজা তুলে ধরার লড়াই। নিবেদিতার চোয়াল শক্ত হয়ে ওঠে। সমর সামনে।
বিকেলের দিকে হালকা বরফ পেঁজা তুলোর মতো ছড়িয়ে পড়ল রাস্তায়, বাড়ির ছাদে, কার্নিশে, জানালায়, গাছের পাতায় পাতায়, ঘাসের ডগায়। ফায়ার প্লেসের সামনে বসে আছেন তিনজন। হাতে গরম কফির পেয়ালা। ডাক্তারের কাছ থেকে ফিরে জগদীশচন্দ্র একটু মনমরা হয়ে পড়েছিলেন। সারা দুপুর নিজের ঘরে কাটিয়েছেন। এখন তিনি বেশ আয়েশ করে বসেছেন। হাতে একটি কাগজ। সারা দুপুর লিখেছেন মনে হচ্ছে।
‘মনে হচ্ছে বন্ধুকে সব জানিয়ে চিঠি লেখা হয়েছে!’ অবলা সহজ করে তুলল পরিবেশ। ‘আমরা কি শুনতে পারি?’
‘ঠিকই ধরেছ! তোমাদের চোখে ধুলো দেওয়া শক্ত। কবিকে চিঠি লিখে সব জানালাম। তোমাদের শোনাবো বলেই তো হাতে নিয়ে বসলাম।’ জগদীশচন্দ্র চশমাটা নাকের ডগায় তুলে নিলেন।
“সুহৃৎ,
অনেককাল আপনার পত্র পাই নাই। চিঠি না পাইলে কি লিখিতে নাই?
আমি কিরকম ব্যস্ত আছি বুঝিতে পারেন। আমার অনেক নূতন বিষয় সংগ্রহ হইয়াছে। কি করিয়া লিখিয়া উঠিব, স্থির করিতে পারি না। আমি যা বলিয়াছি, তাহাতেই সকলে অত্যন্ত আশ্চর্য হইয়ছেন। কিন্তু আরও যাহা বলিবার আছে, তাহা আরও বিস্ময়জনক। একটা সু-খবর এই যে, আমি প্রথম প্রথম ভয় করিয়াছিলাম যে, কেহ বিশ্বাস করিবে না, কিন্তু সৌভাগ্যক্রমে আমার কার্যের উপর লোকের বিশ্বাস জন্মিয়াছে, কিন্তু তা বলিয়া অতি সাবধানে একটু একটু করিয়া অনেক নূতন Experiment দিয়া আমার পথ প্রস্তুত করিতে হইবে। আমি যখন Paris-এ বলি, তখন কাহারও মনে একটু আধটু সন্দেহ হইয়াছিল। তারপর Secretary যখন ৪ দিন সমস্ত শুনিলেন, তখন বলিলেন যে, সব সত্য, কিন্তু লোকের বুঝিতে সময় লাগিবে; একেবারে বলিতে গেলে অবিশ্বাস হইবে; আপনি জানেন এদেশে Crank-এর সংখ্যা অতি বেশি। এরূপ লোকের সহিত সাক্ষাৎ হইয়াছে, সুতরাং লোকের যে সন্দেহ হইতে পারে, তাহার জন্য সাবধান হইতে হইবে।”
জগদীশচন্দ্র পড়ে চলেছেন। ইউরোপীয় বিজ্ঞানীদের মধ্যে ফিজিক্স, কেমিস্ট্রি ও ফিজিয়োলজি নিয়ে, বিজ্ঞানের বিভাগ নিয়ে ছুৎমার্গ প্রকট।
নিবেদিতা তাকিয়ে আছেন জগদীশচন্দ্রের দিকে। চশমার কাচে ফায়ার প্লেসের আগুনের ছায়া নড়েচড়ে উঠছে। মুখে আগুনের আভা। জগদীশচন্দ্র পড়ে যাচ্ছেন তাঁর প্রিয় কবিবন্ধুকে লেখা চিঠি। অবলা গালে হাত দিয়ে শুনে যাচ্ছেন। প্রতিটি শব্দের প্রতি তাঁর নজর। তাকিয়ে আছেন নিবেদিতা জগদীশচন্দ্রের চোখের দিকে। সেই ঔজ্জ্বল্য! সেই বিস্ফার যা তিনি দেখেছিলেন প্যারিস সম্মেলনে। নিবেদিতা যেন পৌঁছে গেছেন প্যারিস সম্মেলনের সরবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই কক্ষে, যেখানে দর্শকাসনে বিভিন্ন বৈজ্ঞানিকদের সঙ্গেই বসে আছেন অবলা বসু, জোসেফাইন ম্যাকলয়েড, সারা বুল এবং বিবেকানন্দ। জগদীশচন্দ্র উদাত্ত কণ্ঠে বলে চলেছেন — “জীব ও জড়ের মধ্যে যে প্রাণধর্মের লীলা চলছে, কোথাও তার ছেদ নেই। দুয়ের মধ্যে কোনও স্পষ্ট সীমা নির্দেশ করা কঠিন — কোথায় জড়-প্রকৃতির শেষ, কোথায় জীবনধর্মের শুরু। অবশ্য যেমন মনগড়া অসংখ্য সীমারেখা টানা যায়। কোনও একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতেও তেমনি জীব ও জড়-প্রকৃতির আপাত ব্যতিক্রমকে ব্যাখ্যা করা চলে। বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্যের সন্ধানে বিজ্ঞানের যে স্বাভাবিক প্রবণতা, তাকেই শেষোক্ত দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গত কারণ হিসেবে উপস্থিত করা যায়।”
নিবেদিতা তাকিয়ে আছেন কিন্তু তাঁর দৃষ্টি চলে গেছে প্যারিস কংগ্রেসের সেই সভায়।
“সন্ধ্যা নয়টা বাজিলে দ্বার উন্মুক্ত হইল এবং বসুজায়াকে লইয়া সভাপতি সভায় প্রবেশ করিলেন। সমস্ত শ্রোতৃমণ্ডলী অধ্যাপকপত্নীকে সাদরে অভ্যর্থনা করিল। তিনি অবগুণ্ঠনাবৃতা এবং শাড়ি ও ভারতবর্ষীয় অলঙ্কারে সুশোভনা। তাঁহার পশ্চাতে যশস্বী লোকের দল, এবং সর্বপশ্চাতে আচার্য বসু নিজে। তিনি শান্ত নেত্রে একবার সমস্ত সভার প্রতি দৃষ্টিপাত করিলেন এবং অতি স্বচ্ছন্দ সমাহিতভাবে বলিতে প্রবৃত্ত হইলেন।
তাঁহার পশ্চাতে রেখাঙ্কন-চিত্রিত বড় বড় পট টাঙানো রহিয়াছে। তাহাতে বিষপ্রয়োগে, শ্রান্তির অবস্থায়, ধনুষ্টংকার প্রভৃতি আক্ষেপে, উত্তাপের ভিন্ন ভিন্ন মাত্রায় স্নায়ু ও পেশীর এবং তাহার সহিত তুলনীয় ধাতুপদার্থের স্পন্দনরেখা অঙ্কিত রহিয়াছে। তাঁহার সম্মুখের টেবিলে যন্ত্রোপকরণ সজ্জিত।”
I have shown you this evening the autographic records of the history of stress and strain in both the living and non-living. How similar are the two sets of writings, so similar indeed that you cannot tell them one from the other! They show you the waxing and waning pulsations of life – the climax due to stimulants, the gradual decline of fatigue, the rapid setting in of death-rigor from the toxic effect of poison.
নিবেদিতা এখনও যেন শুনছেন সেদিনের সেই শান্ত উচ্চারণ এক বৈজ্ঞানিকের বিশ্বাস থেকে উৎসারিত শব্দমালা। ছবি দুলছে তাঁর চোখের সামনে। জগদীশচন্দ্র যেন প্যারিস কংগ্রেসের সভায় বলে চলেছেন। কখনও কখনও গাম্ভীর্য ধরা পড়ছে তাঁর উচ্চারণে। কখনও কখনও সহাস্যে পরিহাস সহ বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখা-প্রশাখার ভেদরেখা যুক্তির সাহায্যে মুছে দিচ্ছেন অনায়াসে। যখন বললেন, যাহার মৃত্যু সম্ভব তাহাই জীবিত, তখন সমস্ত শ্রোতা নিশ্চুপ। তিনি বলে চলেছেন অনেকটাই চ্যালেঞ্জের সুরে — এক টুকরো টিনের পাশে দাঁড় করিয়ে টিনের মৃত্যুদশা দেখিয়ে দেবার জন্য তিনি প্রস্তুত। এমনকী বিষ প্রয়োগে অন্তিম দশায় চলে যাওয়া টিনের টুকরোকে ওষুধ প্রয়োগ করে পুনরায় সুস্থ করে তুলতে পারেন।
জগদীশচন্দ্র এরপর মঞ্চে তাঁর তৈরি ‘কৃত্রিম চোখ’ যন্ত্রটি দেখালেন এবং বললেন এই কৃত্রিম চোখ আমাদের চোখের চেয়েও শক্তিশালী।
নিবেদিতার মন চলে গিয়েছিল প্যারিসে সম্মেলনে জগদীশের বক্তৃতায়। হঠাৎ সম্বিত ফেরে। জগদীশচন্দ্র তখনও চিঠিটি পড়ে চলেছেন।

“এখানকার বৈজ্ঞানিকেরা নানা বিভাগে বিভক্ত। Chemist and Physicist-এর মধ্যে ঘোরতর সংগ্রাম, Physiologistsরাও সেইরূপ।… Chemist প্রবর উঠিয়া বলিলেন, “আমাদের ঝগড়া করিবার ইচ্ছা নাই, কিন্তু আপনাদের J.J. Thomson সেদিন বলিয়াছেন যে, Atom অবিভাজ্য নহে, তাহা অপেক্ষাও ক্ষুদ্র অণু আছে। যাহারা আমাদের atom-এর উপর হাত তোলে, তাহাদিগের সহিত আমাদের চির সংগ্রাম, There will be trouble if you lay your hands on our invisible and inviolate atom.
তারপর একজন Physiologist-এর সহিত দেখা হয়। তিনি আমার কার্যের বিশেষ প্রশংসা করিলেন এবং বলিলেন, “আশা করি আপনি অন্যান্য Physicist-এর ন্যায় আমাদের সুবৃহৎ Physiology-কে Physics-এর শাখা বলিয়া উড়াইয়া দিতে চাহেন না। একটা formula দিয়া সব explain করা, এ কী চালাকি? দেখুন আমি আজ দশ বৎসর যাবৎ নানা curve সংগ্রহ করিতেছি।
সুতরাং বুঝিতে পারিতেছিন, আমাকে কীরূপ সন্তর্পণে জীবনযাত্রা নির্ব্বাহ করিতে হইতেছে।
… Lodge লিখিয়াছেন, ‘Many congratulations on your very important and suggestive experiments. But go slowly, establish point by point and restrain inspiration.’ Lodge এবং Rayleigh-এর নিকট সব কথা খুলিয়া বলিতে সময় হয় নাই।”
জগদীশচন্দ্র থামলেন। নিবেদিতা ছোট টি-টেবিলের উপর এক গ্লাস জল ঢাকা দিয়ে রেখেছিলেন। জগদীশচন্দ্র খেলেন এক চুমুক। আবার শুরু করলেন।
“জীবনের কথা কেহ বলিতে পারে না; নতুবা ইচ্ছা ছিল, ভারতবর্ষ হইতে এক নূতন School of Workers হইতে এক সম্পূর্ণ নূতন বিষয় প্রকাশিত হইবে। আপনারা কেন এই কার্যক্ষেত্র প্রস্তুত করিলেন না? তাহা হইলে এক বিষয়ের কলঙ্ক চিরকালের জন্য মুছিয়া যাইত। জীবন অনিত্য বলিয়াই আমাকে তাড়াতাড়ি প্রকাশ করিতে হইতেছে। আমি দেশ হইতে আসিবার সময়েও জানিতাম না, যে, কী বিশাল ও অনন্ত বিষয় আমার হাতে পড়িয়াছে। সম্পূর্ণ না ভাবিয়া যে থিওরি প্রতিপন্ন করিবার চেষ্টা করিয়াছি, তাহার অর্ধপরিস্ফুটিত প্রতি কথায় কী আশ্চর্য ব্যাপার নিহিত আছে, প্রথমে বুঝি নাই। এখন সব কথার অর্থ করিতে যাইয়া দেখি যে, ঘোর অন্ধকারে জ্যোতির আবির্ভাব হইয়াছে। যেদিকে দেখি, সেদিকেই অনন্ত আলোক-রেখা। জন্ম-জন্মান্তরেও আমি ইহার শেষ করিতে পারিব না। আমি কোনটা ছাড়িয়া কোনটা ধরিব, তাহা স্থির করিতে পারিতেছি না। আবার এদিকে আমার এখনকার সময়ও ফুরাইয়া আসিতেছে।”

নিবেদিতা শুনতে শুনতে তাকালেন জগদীশচন্দ্রের দিকে। খুব ধীরে বললেন, ‘এই কথাটার ঠিক অর্থ বুঝতে পারলাম না বেয়ার্ন।’
‘কোন কথাটা?’ জগদীশচন্দ্র চশমার উপর দিয়ে তাকালেন সরসরি নিবেদিতার দিকে। তীক্ষ্ণ ও গভীর সে দৃষ্টি।
‘এখানকার সময় ফুরিয়ে আসছে, মানে! তোমাকে এখানে থেকেই তোমার কাজকে সম্পূর্ণ করে যেতে হবে বেয়ার্ন!’
‘জীবনটা কল্পনা নয় মার্গারেট!’ জগদীশচন্দ্র তাকালেন নিবেদিতার দিকে।
‘কিন্তু আমরা সবাই তোমার পাশে আছি। রবিবাবু তো আছেন পাশেই, রমেশচন্দ্র দত্ত আছেন, সারা বুল আছেন। তোমাকে কাজটা যতদূর পর্যন্ত করতে হয় এখানে থেকেই করতে হবে তো!’ কথা শেষ করে অবলার দিকে তাকালেন নিবেদিতা।
অবলা এতক্ষণে কথা বললেন, ‘তোমার এখন শরীর খারাপ। তোমাকে এখন অত কিছু ভাবতে হবে না। তুমি যতটুকু পারবে করো, আমি আর মার্গারেট সবকিছু তোমার গুছিয়ে দেব।’
অবলার কথায় নিবেদিতা প্রায় লাফিয়ে উঠলেন, ‘এটাই আমি বলতে চাইছিলাম, আমি তোমার পাশে পাশে থেকে সমস্ত লেখাগুলো তৈরি করে দেব। আর রোজ সকালে হাঁটতে বেরিয়ে পড়ব পাইনের বনে আর বিকেলে নদীর ধারে সাইকেল চালাব তিনজনে। আর মাঝেমধ্যে সিনেমা দেখতে যাব। যাবে তো ‘বো’!’
‘অবশ্যই। আমাদের তিনজনকেই একসঙ্গে এই কঠিন সময়টা অতিক্রম করতে হবে। এখন চিঠিটা পড়া শেষ করো। বাদবাকিটা শুনে আমি স্যুপ করতে যাব।’ অবলা জগদীশের দিকে তাকিয়ে বুঝলেন জগদীশ গভীর কিছু ভাবছে।
উঠে এলেন জগদীশের কাছে। ‘কিচ্ছু ভেবো না। আমরা আছি। বিজয়তিলক তোমার কপালে উজ্জ্বল — আমি দেখতে পাচ্ছি।’
‘অবলা, আমি অনেক দূর অবধি দেখতে পাচ্ছি। এত বাধা পাচ্ছি! এই পৃথিবীতে যা কিছু আছে তা প্রাণময়, জড় ও জীব, আমার সামনে প্রমাণ হিসেবে উঠে আসছে একে একে চিন্তাস্রোত!’
অবলা জগদীশের কোঁকড়ানো চুলে হাত বোলাতে বোলাতে বললেন, ‘তুমি পারবে। পারতেই হবে। আর আমরা তো সবাই আছি! মার্গারেটের মা তাঁর বাড়িতে থাকার সব ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। আগামী কয়েকদিনের মধ্যেই আমরা সেখানে চলে যাব। মার্গারেট, মার্গারেটের মা, সারা বুল তোমাকে যত্নে রাখবে। নাও, এবার তোমার কবিবন্ধুকে লেখা চিঠিটা পড়া শেষ করো! তিনি তো আবার তোমার সংবাদের জন্য অধীর আগ্রহে বসে আছেন জোড়াসাঁকোয়।’
সবাই হেসে উঠল।
‘এই কথাটা তো ঠিক যে অমন এক বন্ধু আছে বলেই না আজ আমি এখানে নিশ্চিন্ত থাকতে পারছি! ক’জন এমন হিতৈষী বন্ধু পায়?’ জগদীশচন্দ্রের চোখে গর্বের ঝলক দেখতে পায় নিবেদিতা। ভাল লাগে।
‘তা বটে! রবিবাবুর বন্ধু ত্রিপুরার মহারাজা রাধাকিশোর দেবমাণিক্যও নাকি অপেক্ষা করে থাকেন আপনার সংবাদের জন্য?’ নিবেদিতা উচ্ছ্বসিত।
‘যখন আমরা বিদেশে পাড়ি দেবার ব্যবস্থা করছি, তখন তো এগিয়ে এসেছিলেন টাকা নিয়ে। পনেরো হাজার টাকার চেক রবিবাবুর হাতে দিয়ে বলেছিলেন— আমার ভাবি বধূমাতার দু-একটি গয়না কম কেনা হলে কোনও ক্ষতি হবে না, কিন্তু বাঙালি তথা ভারতবর্ষের নামোজ্জ্বল করবেন যে বৈজ্ঞানিক, তাঁর সাহায্যে আসতে পারলে ধন্য হব।
উনি তো রবিবাবুর থেকে সব সংবাদ নেন এবং সাহায্য করতে চান।’ অবলা বলেন।
নিবেদিতা জগদীশচন্দ্রের সামনে এসে বসে, ‘তাহলেই বোঝো তুমি একা নও, কত মানুষ তোমার সঙ্গে আছেন। নাও এবার চিঠিটা চট করে পড়ে ফেলো তো। এরপর আবার রয়্যাল সোসাইটির জন্য বক্তৃতার খসড়া চূড়ান্ত করতে হবে। কতগুলো জরুরি চিঠি লেখা বাকি। আলড্যুয়াক্স হাক্সলের সঙ্গে কবে দেখা হচ্ছে? আমি কিন্তু ক্রপটকিনের বক্তৃতা শুনতে যাব একদিন। নাও শুরু করো।’
জগদীশচন্দ্র টেবিলের উপরে রাখা গ্লাস থেকে জল খেলেন এক ঢোক।
‘আমি সত্যিই ভাগ্যবান। মাঝে মাঝেই মনে হয় হতভাগ্য এক পরাধীন দেশে জন্মেছি বলেই এত অপমান এত বাধাগ্রস্ত হচ্ছি। কিন্তু তার পরক্ষণেই আমাকে ঘিরে থাকা বন্ধুদের জন্য জেগে উঠি। ভেতরে তেজ ক্রিয়া করে। আমাকে প্রমাণ করতেই হবে…’
অবলা শান্ত করে, ‘ঠিক আছে। সব হবে। এবার চিঠিটা পড়া শেষ করো তো!’
‘হ্যাঁ, কত অবধি পড়লাম?’
‘ওই তো এদিকে আমার দিন ফুরাইয়া আসিতেছে।’ অবলা দ্রুত বলে উঠে।
‘বাব্বা! তুমি তো শ্রুতিধর। একবার শুনেই…’
জগদীশচন্দ্র পড়া শুরু করে।
“মনে করিয়াছিলাম যে, Royal Institute -এ কতদিন experiment করিব এবং সেজন্য কতকগুলি নূতন কল প্রস্তুত করিতেছিলাম। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে আমার শারীরিক অসুস্থতার জন্য তাহাতে বাধা পড়িয়াছে। এখানে আসিয়া Dr. Crombie -র সহিত দেখা করিয়াছিলাম। তিনি বলিলেন, যে, আভ্যন্তরিক কী গোলমাল হইয়াছে, শীঘ্র চিকিৎসা না করিলে আশঙ্কার কারণ। কঠিন operation আবশ্যক, তাহাতে বিশেষ ভয় নাই, তবে প্রায় ৫ সপ্তাহ শয্যাগত থাকিতে হইবে। সুতরাং আমার কার্য্যে বড় বাধা পড়িল। এখন experiment করার আশা ছাড়িয়া দিতে হইল। যদি আমার যে-সব কার্য্য হইয়া গিয়াছে, তাহা লিখিয়া যাইতে পারিতাম, তবে কিছুই ভাবিলাম না। আমি লিখিতে চেষ্টা করিতেছি, কিন্তু বেশী লিখিতে পারি না। আর ৪টি নূতন বিষয়ে লেখা আবশ্যক, তাহার জন্য দেরী হইতেছে। দেরী করাও ভাল নয়।
উপরোক্ত বিষয়টি কেবল দু-এক বন্ধুকে জানাইবেন। বৃথা চিন্তা বৃদ্ধি করিবার আবশ্যক নাই।
সর্বদা পত্র লিখিবেন।
আপনার
জগদীশ।”

‘কবিবন্ধুকে সব উজাড় করে বলে শান্তি পেয়েছ তো! এবার একটু বিশ্রাম নাও। আমি স্যুপ তৈরি করে আনছি।’ অবলা রান্নাঘরের দিকে যায়।
‘কাল থেকে আমার প্রতিদিনের কাজ হল তোমার লেখাগুলো গুছিয়ে লিখে তোমাকে দিয়ে সংশোধন করে নেওয়া। ঠিক আছে ‘বেয়ার্ন’?’
‘তুমি এত সময় পাবে?’
‘আমি রাতদিন এক করে তোমার লেখা লিখে যাব ‘বেয়ার্ন’। তুমি সম্মতি দিলে কাল থেকেই…’
‘সম্মতি! আমি কী বলে যে…’
‘ভারতবর্ষ তাকিয়ে আছে তোমার বিজয়মালার দিকে ‘বেয়ার্ন’!’
‘ডাইনিং-এ চলে এসো, স্যুপ রেডি!’ অবলা বসুর ডাকে জগদীশচন্দ্র ও নিবেদিতা এগিয়ে গেল ডাইনিং-এর দিকে।

নৌকা এগিয়ে চলেছে বেলুড়ের দিকে। নিবেদিতার চোখের সামনে ভেসে উঠছে সেইসব রাতের কথা। জগদীশচন্দ্রের চশমার আড়ালে উজ্জ্বল চোখে মাঝে মাঝেই ঝিলিক দিচ্ছে নতুন নতুন ভাবনার ঝলক। ঝুঁকে পড়ছেন নিজের তৈরি করা যন্ত্রের উপর। হাতে তুলে নিচ্ছেন ভুষি কালিতে কাগজের উপর আঁচড় কাটা জড় ও জীবনের গ্রাফ। মেঝেতে টেবিলে ছড়িয়ে ফেলছেন জীবনের প্রতিলিপি। নিবেদিতাকে বলছেন প্রাণের উন্মাদনার কথা । নিবেদিতা লিখে চলেছেন দিনের পর দিন। রাত গভীর হচ্ছে। বাইরে হিমশীতল তুষারপাত। ঢেকে যাচ্ছে পৃথিবী নিষ্প্রাণ সাদা বরফের চাদরে। আর একটি ছোট্ট ঘরে দু’টি প্রাণ পরম উত্তেজনায় বিশ্বের কাছে প্রমাণ করতে মরিয়া — সর্বভূতে চৈতন্য বিরাজমান, এক প্রাণময় জগৎ আমাদের ঘিরে আছে। ছবির পর ছবি দুলে দুলে উঠছে। নিবেদিতা স্থির তাকিয়ে আছেন গঙ্গার স্রোতের দিকে। জগদীশচন্দ্র এখনও ফেরেননি। উনি তো জানতে পারেননি! নিবেদিতার চোখে আবার জলের ধারা। জানতে পারেননি এখনও প্রিয় ‘বেয়ার্ন’ ও ‘বো’ যে, তাঁদের প্রিয় মার্গারেট আজ এই মুহূর্তে পিতৃহীন, গুরুহীন! একা।

সহযোগিতার হাত বাড়াতে ওপরের ছবিতে ক্লিক করুন

[পর্ব-১০]

[পরম্পরা ওয়েবজিন, মার্চ ২৫, সূচিপত্র – এখানে ক্লিক করুন]

5 1 ভোট
Article Rating
8 Comments
Oldest
Newest Most Voted
পংক্তির ভেতর মন্তব্য
সব মন্তব্য
শিপ্রা ভৌমিক
শিপ্রা ভৌমিক
1 month ago

জগদীশচন্দ্র ও নিবেদিতার সম্পর্ক বিষয়ে অনেক তথ্য জেনে সমৃদ্ধ হচ্ছি!ইতিহাস সজীব হচ্ছে এই লেখনীতে! পরবর্তী পাঠের অপেক্ষায় রইলাম।

Rajat Chakraborti
Rajat Chakraborti
1 month ago

সঙ্গে আছেন। থাকুন সঙ্গে 🌷

Oindrila Ghosal
Oindrila Ghosal
1 month ago

Eto informative ebang saras lekha mantramugdha hoye pare challi ami.

Rajat Chakraborti
Rajat Chakraborti
1 month ago

পাঠক পাঠিকার মন্তব্য উৎসাহ দেয় 🌷

Piyali Mukherjee
Piyali Mukherjee
27 days ago

এক এজানা জগৎ খুলে যাচ্ছে চোখের সামনে,পরতের পর পরতে।জড় ও জীবনের এই মারাত্মক এক্সপেরিমেন্টের কথা এত গভীরভাবে জানতাম না,আরো জানার আগ্রহ বাড়াচ্ছে,আর অন্যদিকে নিবেদিতার মনস্বত্বের অসাধারণ বিশ্লেষণ।
লেখক কে অসং্খ্য ধন্যবাদ এমিন লেখার জন্য।চলুক।আমরা সঙ্গে আছি।

RAJAT KANTI CHAKRABORTI
RAJAT KANTI CHAKRABORTI
11 days ago

দেখা যাক কতদূর নিয়ে যান ওনারা।

Sumi Dattagupta
Sumi Dattagupta
26 days ago

এগিয়ে চলেছি কোথায় জানি না,মন্ত্রমুগ্ধের মত।

RAJAT KANTI CHAKRABORTI
RAJAT KANTI CHAKRABORTI
11 days ago

চলুন। আমিও চলেছি আপনিদের সাথে সাথে।