নিবেদিতা গেডেসের বাড়ির চিলেকোঠার ঘরে নিভৃতে টেবিলের সামনে বসে স্বামীজির চিঠিটি নিজের সামনে মেলে ধরলেন। বাইরে গভীর রাত নামছে কুয়াশার চাদর জড়িয়ে। টিপটিপ শিশিরবিন্দু পড়ার শব্দ হচ্ছে পাতায়। জানালার কাচে জলজ কষ্ট-গল্পের রেখা গড়িয়ে পড়ছে। দূর থেকে ভেসে আসছে এক অর্কেস্ট্রার অস্পষ্ট সুর। কোথাও কোনও বাড়িতে কেউ হয়তো বাজিয়ে চলেছে নিজের যন্ত্রণার সুর। সামনের জানালা দিয়ে দেখা যাচ্ছে চিনার গাছগুলি যেন ভেজা নর্তকীর দল, যাদের ভেতরের কান্না শুধু একাকীত্বের রাত জানে।
প্যারিস
‌ ২৫ আগস্ট ১৯০০
“প্রিয় নিবেদিতা,
এইমাত্র তোমার চিঠি পেলাম। তোমার সহৃদয় কথাগুলির জন্য তোমাকে অশেষ ধন্যবাদ। আমি মিসেস বুলকে মঠ থেকে টাকা তুলে নেবার সুযোগ দিয়েছিলাম, কিন্তু তিনি ও-বিষয়ে কিছু বললেন না, আর এদিকে ট্রাস্টের দলিলগুলি দস্তখতের জন্য পড়ে ছিল, সুতরাং আমি ব্রিটিশ কনসালের অফিসে গিয়ে সই করে দিয়ে এসেছি। কাগজপত্র এখন ভারতের পথে। এখন আমি স্বাধীন, আর-কোনও বাঁধাবাঁধির ভিতরে নাই, কারণ কার্যব্যাপারে আমার কোনও ক্ষমতা, কর্তৃত্ব বা পদ রাখিনি। রামকৃষ্ণ মিশনের সভাপতির পদও আমি ত্যাগ করেছি।
এখন মঠাদি সব আমি ছাড়া অন্যান্য সাক্ষাৎ শিষ্যদের হাতে গেল। ব্রহ্মানন্দ এখন সভাপতি হলেন, তারপর প্রেমানন্দ ইত্যাদির উপর ক্রমে ক্রমে পড়বে।”

নিবেদিতা তাকালেন সামনে ঝাপসা কাচের ওপাশে রাস্তার দিকে। ঝাপসা হলুদ আলো ছড়াতে পারছে না কুয়াশায়। জমাট বেঁধে আছে। হারিয়েছে তার ঔজ্জ্বল্য এই শীতের রাতে। অকারণ তাকিয়ে থাকলেন। স্বামীজি একে একে ছিন্ন করছেন দায়িত্বভার। মুক্ত করছেন নিজেকে। স্ব-অধীনে যাবার আগে গুছিয়ে তুলছেন। সরে যাচ্ছেন বন্ধন থেকে। সরিয়ে নিচ্ছেন নিজেকে। সবার থেকে। এমনকী…!
ঠোঁটে চেপে নিজেকে শক্ত ও শান্ত করে নিবেদিতা চিঠিটি পড়া শুরু করলেন। নিবেদিতা নিজের কথা লিখেছিলেন চিঠিতে। গেডেসের সঙ্গে কাজ করতে যে মতান্তর হচ্ছে — বলেছিলেন সেই কথা। জগদীশচন্দ্রের আসার কথা, তাঁকে সাহায্য করার কথা। সেই সঙ্গে ব্রাহ্ম হওয়া সত্ত্বেও ওঁদের বন্ধুত্বের আসনে বসানো এবং প্যারিস কংগ্রেসে সাহায্য করা নিয়ে নিজের মনের দ্বন্দ্বের কথাও জানিয়েছিলেন। কিন্তু স্বামীজি তো সেসবের উত্তরের মধ্য দিয়ে গেলেন না! তিনি তো সরিয়ে নিচ্ছেন নিজেকে। আবার ঝুঁকে পড়লেন টেবিলে টুকরো কাগজটির উপর।
“এখন এই ভেবে আমার আনন্দ হচ্ছে যে, আমার মাথা থেকে এক মস্ত বোঝা নেমে গেল! আমি এখন নিজেকে বিশেষ সুখী বোধ করছি।
কুড়িটা বছর রামকৃষ্ণের সেবা করলাম — তা ভুলের ভিতর দিয়েই হোক বা সাফল্যের ভিতর দিয়েই হোক, এখন আমি কাজ থেকে অবসর নিলাম। বাকি জীবন আপনভাবে কাটাব।
আমি এখন আর কারও প্রতিনিধি নই বা কারও কাছে দায়ী নই। বন্ধুদের কাছে আমার একটা অস্বাভাবিক বাধ্যবাধকতার বোধ ছিল। এখন আমি বেশ করে ভেবেচিন্তে দেখলাম — আমি কারও কিছু ধার ধারি না। আমি তো দেখছি, প্রাণ পর্যন্ত পণ করে, আমার সমুদয় শক্তি প্রয়োগ করেছি, পরিবর্তে পেয়েছি ( বন্ধুদের) তর্জন-গর্জন, অনিষ্ট-চেষ্টা ও বিরক্তিকর ঝামেলা।
তোমার পত্র পড়িয়া মনে হইল, তোমার ধারণা — তোমার নূতন বন্ধুদের প্রতি আমি ঈর্ষান্বিত। আমি কিন্তু চিরদিনের মতো জানাইয়া রাখিতেছি, আমার অন্য যে কোনও দোষ আমার থাকুক না কেন, কিন্তু জন্ম হইতেই আমার ভিতর ঈর্ষা, লোভ বা কর্তৃত্বের আকাঙ্ক্ষা নাই।
আমি আগেও কখন তোমাকে কোনও আদেশ করিনি, এখন তো কাজের সঙ্গেই আমার কোনও সম্পর্ক নেই — এখন আর কী তোমাকে আদেশ দেব?
… তুমি যাদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করেছ তাদের সম্বন্ধে আমার কখনও কোনও ঈর্ষা নেই। কোনও কিছুতে মেলামেশা করার জন্য আমি কখনও আমার ভাইদের সমালোচনা করিনি। তবে আমার দৃঢ় বিশ্বাস — পাশ্চাত্যদেশীয় লোকদের এই একটা বিশেষত্ব আছে যে, তারা নিজেরা যেটা ভাল মনে করে, সেটা অন্যের উপর জোর করে চাপাবার চেষ্টা করে, তারা ভুলে যায় যে, একজনের পক্ষে যেটা ভাল, অন্যজনের পক্ষে সেটা ভাল না-ও হতে পারে। আমার ভয়, তোমার নতুন বন্ধুদের সঙ্গে মেশার ফলে তোমার মন যেদিকে ঝুঁকবে, তোমার অন্যের উপর জোর করে সেই ভাব দেবার চেষ্টা করবে। কেবল এই কারণেই আমি কখনও কখনও কোনও বিশেষ প্রভাব থেকে তোমায় দূরে রাখার চেষ্টা করেছিলাম, এর অন্য কোনও কারণ নেই। তুমি তো স্বাধীন, তোমার পছন্দ মতো নিজের কাজ বেছে নাও।”
এই অবধি চিঠিটি পড়েন নিবেদিতা বারবার। পরের ছোট্ট স্তবকটিতে তিনি যে-পরিবার কুড়ি বছর আগে ত্যাগ করেছিলেন তার প্রতি মনোযোগ দেবেন বলে ভাবছেন। নিবেদিতা এই চিঠিটি এতখানি অবধি পড়তে পারেন। আর শেষ বাক্যটি নানা ভাবে মাথায় ঘুরপাক খেতে থাকে। শরণাগত মানে কী? আমি কি আমার? কতখানি আমার? আর কতখানি রামকৃষ্ণ-বিবেকানন্দের? মুক্তি এতই সহজ! মুক্ত হওয়া শুধুই কি একটা কনসেপ্ট? এর বাস্তব রূপ কী? আমি মার্গারেট নোবেল নই, ভারতের নিবেদিতা। আমার ব্রত স্বামীজির কাজকে বয়ে নিয়ে চলা। অন্ধকার দূর করার কাজ। ভারতের অসহায় কালো কালো চোখের তারায় তারায় আলো ফোটাবার দায়িত্ব। ‘তুমি তো স্বাধীন’ — শব্দগুলো কেটে কেটে বসে যাচ্ছে বুকের গভীরে। এই স্বাধীনতা কি চেয়েছি? আজ্ঞা চাইনি কি তাঁর কাছে? আদেশ প্রত্যাশা করিনি কি? নিবেদিতা তাকিয়ে থাকেন পলকহীন জানালা দিয়ে বাইরে। রাত গড়িয়ে পড়ে দিনের কোলে। প্যারিসের গায়ে লেগেছে নতুন দিনের আলো।
আর কয়েকদিন বাদেই শুরু হচ্ছে ৩ সেপ্টেম্বর প্যারিস সম্মেলনের ধর্মীয় ইতিহাস কংগ্রেস অংশটির উদ্বোধন, যেখানে স্বামীজি আমন্ত্রিত বক্তা। স্বামীজি তিন মাস আছেন প্যারিসে। বেশিরভাগ সময়টাই কাটিয়েছেন মিসেস লেগেটের প্রাসাদের মতো বিশাল অট্টালিকায়। তাঁর তত্ত্বাবধানে শিখেছেন ফরাসি ভাষা। তিনি প্যারিস কংগ্রেসে ফরাসি ভাষায় বক্তৃতা করবেন বলেই স্থির করেছেন। ইতিমধ্যে স্বামীজির ফরাসি ভাষায় কথাবার্তা পরিচিতজনের প্রশংসিত হয়েছে বেশ। স্বামীজির অনুরক্ত বেশ কয়েকজনকে প্রায়ই সন্ধ্যায় দেখা যায় মিসেস লেগেটের বাড়িতে সন্ধ্যাকালীন আড্ডায়। সেখানে কবি, সাহিত্যিক, শিল্পী, ভাস্কর, গায়ক-গায়িকা সবার অবারিত দ্বার। তাঁদের মধ্যে কবি-সাহিত্যিক জ্যুল বোয়া এবং ফরাসি বিখ্যাত গায়িকা এমা কালভ্যে স্বামীজিকে পছন্দ করছেন বেশি। জ্যুল বোয়ার সঙ্গে স্বামীজি নানা বিষয়ে কথা বলেন। ভাষা কিছুটা বাধা হলেও স্বামীজি আনন্দ পান। জ্যুল বোয়ার বাড়িতে গিয়ে থাকবেন বলেও কথাবার্তা হয়। সেখানে এত এলাহি ব্যাপার নয়। খুব সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে জ্যুল বোয়া। কবিতা ও দর্শনচর্চা তাঁর ধ্যান-জ্ঞান। একদিন স্বামীজি গিয়ে দেখেও এসেছেন। নিরিবিলি জায়গা। শহরের কোলাহল থেকে দূরে। ঘর বোঝাই নানান বই। স্বামীজির খুব পছন্দ হয়। স্বামীজি শুধু কোলাহল থেকে দূরে যেতে চাইছিলেন না। সেটা অন্যতম কারণ হলেও তিনি চাইছিলেন এমন এক পরিবেশে থাকতে, যেখানে সকাল থেকে রাত তাঁকে ফরাসি ভাষায় কথা বলতেই হবে। জ্যুল বোয়া তেমন এক ফরাসি কবি যিনি ইংরেজি বলতে ও লিখতে পারেন না। ফলে স্বামীজি যা চাইছিলেন, বাধ্যবাধকতায় ফরাসি ভাষাটা বলা সড়গড় হয়ে যাবে এখানে থাকলে। তবে বেশিদিন নয়। দু’-তিনদিন। গত তিন মাসে ফরাসি ভাষাটা বেশ রপ্ত করেছেন। সবাই প্রশংসা করছে। তবুও আগস্টের শেষেই চলে গেলেন জ্যুল বোয়ার বাড়ি।
সকাল সাড়ে আটটা। ঝলমল করছে রাস্তার দু’পাশে সারিবদ্ধ দাঁড়িয়ে থাকা চিনার গাছের পাতা। পাতায় পাতায় রোদ খেলে বেড়াচ্ছে। আলো-ছায়ায় অপূর্ব লাগছে সরর্বন ইউনিভার্সিটি, প্যারিসের অন্যতম শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। পাথর সাজানো বিরাট চত্বর ঘিরে বিশাল গথিক স্ট্রাকচার। বড় থাম, খিলান, সুউচ্চ তোরণ। হলুদ রঙের ছড়ানো বিল্ডিংয়ের দেওয়ালে রোদ পড়ে আরও ঝলমল করে উঠেছে। গত ৩ সেপ্টেম্বর ১৯০০, সকাল সকাল প্রভাতী অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছিল ধর্মেতিহাস সম্মেলন। বিরাট প্রদর্শনীর ক্যাম্পাস। সবকিছুই এক অনাড়ম্বর ভাব গম্ভীর রাজকীয় স্থাপত্যের নিদর্শন। এক ধরনের পবিত্রতা ধারণ করে আছে। এই প্রদর্শনী ক্যাম্পাসের একটি সভাকক্ষ প্যালেস দ্যে কংগ্রেস (Palais des Congres), সেখানেই ধর্মেতিহাস কংগ্রেসের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান। সভাকক্ষের সামনে ছোট্ট একটি জলাশয়, তার মাঝে ভাস্কর্য ঘিরে জলের ফোয়ারা। এই সময় আকাশ নীল আর জলাশয়ের রঙও নীল। সভাকক্ষটি একপ্রকার অ্যাম্ফিথিয়েটার। গ্যালারি উঠে গেছে। কমবেশি দুশো জন বসতে পারে। ধর্মেতিহাস কংগ্রেসের শাখা সভাগুলোর অধিবেশন হচ্ছে ছোট ছোট এক-একটি ক্লাসরুমে। স্বামীজি যে শাখা অধিবেশনে যোগ দেবার নিমন্ত্রণ পেয়েছেন — দূর প্রাচ্যের ধর্ম-ইতিহাস এবং ভারত ও ইরানের ধর্ম-ইতিহাস। মূলত দু’টি ভিন্ন শাখা সভাগুলোর নির্দিষ্ট দিনক্ষণ ছিল নির্ঘণ্ট অনুযায়ী ৩ সেপ্টেম্বর সকালে অধিবেশন, ৪ সেপ্টেম্বর বিকালে, ৫ তারিখ সকাল এইরকম স্থির করা আছে। ৭ সেপ্টেম্বর সকালে স্বামীজির বক্তব্য রাখার সময় নির্ধারণ হয়েছে। সকাল ৯ টায় শুরু।
সবাই জড়ো হয়েছে একটি ছোট ক্লাসরুমে। নিবেদিতা দেখে নিলেন একবার। জনা কুড়ি শ্রোতা এসেছেন। স্বামীজিকে নিয়ে ছ’জন বক্তা বক্তব্য রাখবেন। সভা শুরু হতে হতে বেজে গেল ৯-১৫ মিনিট। মঁসিয়ে সেনার্ট সভাপতি হিসেবে সভা শুরু করেন। সহ-সভাপতি হিসেবে মঁসিয়ে সিলভ্যা লেভি আহ্বান জানান সবাইকে এবং আলোচনা শুরু করার প্রস্তাব দেন প্রথমে মঁসিয়ে জি ওপার্টকে। মঁসিয়ে ওপার্ট শালগ্রাম শিলা নিয়ে বলতে শুরু করেন। শালগ্রাম শিলা একটি জীবাশ্ম যা নেপালের গণ্ডকী নদীতে পাওয়া যায় এবং ভারতীয় আদিবাসীদের কাছে নারীর প্রজনন শক্তির প্রতীক।
রোগা একহারা চেহারার সিলভ্যা লেভি এতক্ষণ তীক্ষ্ণ চোখ দিয়ে তাকিয়ে ছিলেন বক্তার দিকে। তিনি প্রাচ্যবিদ হিসেবে তখনই বেশ নাম করেছেন। সংস্কৃত ভাষা আয়ত্তে এনেছেন তিনি। তিনি ঝকঝকে কামানো গালে হাতের সাপোর্ট দিয়ে বসেছিলেন একটু ঝুঁকে। হাতটা সরিয়ে নিয়ে সপাট প্রশ্ন করলেন, ‘শালগ্রাম শিলা যেখানে পাওয়া যায় সেই জায়গাটা কি চক্রতীর্থ? নেপালের গণ্ডকী নদীর ধারাপথেই কি পাওয়া যায়?’
নিবেদিতা লক্ষ করেছেন স্বামীজি উশখুশ করছেন। বুঝতে পারছেন নিবেদিতা স্বামীজি শালগ্রাম শিলাকে প্রজনন শক্তির প্রতীক হিসেবে ব্যাখ্যা করাটা মেনে নিতে পারেননি।
স্বামীজি একবার ঘাড় ঘুরিয়ে পিছনের সারিতে কোনাকুনি বসে থাকা নিবেদিতাকে দেখে নিলেন। চোখাচোখি হল। চোখের ভাষা বুঝতে পারলেন স্বামীজি — আপনি বলুন হিন্দু ধর্মের প্রাচীনত্বের সাথে শালগ্রাম শিলার যুক্ত থাকার কথাগুলি। স্বামীজি পড়তে ভুল করেননি নিবেদিতার চোখের ভাষা। পাশে সারা বুল বসে আছেন। তিনিও ঝুঁকে কি নিবেদিতার কানে কানে সেই কথাই যেন বলছেন?
স্বামীজি উঠে দাঁড়ালেন। গেরুয়া রঙের সন্ন্যাসীর আলখাল্লার উপর চাপানো লং-কোটটা ঠিক করে নিয়ে স্বামীজি বলা শুরু করলেন গভীর এক কণ্ঠে। প্রথমেই নস্যাৎ করে দেন শালগ্রাম শিলাকে প্রজনন শক্তির প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার বক্তব্যকে। তৈত্তেরীয় উপনিষদের শ্লোক ও তার ভাষ্য এবং ব্রহ্ম সূত্রের শ্লোক ও ভাষ্য উদ্ধৃত করে স্বামীজি দেখান বিষ্ণুর উপাসনায় শালগ্রামের ব্যবহার। পুরাণ থেকে বলেন তুলসীরূপে লক্ষ্মীর আবির্ভাব এবং তুলসীর বিষ্ণুকে পাওয়ার জন্য তপস্যা। শেষাবধি তুলসীর দেহ থেকে লক্ষ্মী নিজেকে বিচ্যুত করে বিষ্ণুর সঙ্গে চলে যায়। তুলসীর ছেড়ে যাওয়া দেহ গণ্ডকী নদীর রূপ নেয় এবং তুলসীর অভিশাপে সেই নদীর অববাহিকায় বিষ্ণু প্রস্তরবৎ হয়ে যায় যা শালগ্রাম শিলা নামে পূজিত হয়। নর্মদার ধারে শিবলিঙ্গ ও বিল্ববৃক্ষের কথা এবং বৌদ্ধ স্তূপ ও অশত্থ বৃক্ষের কথা উল্লেখ করে বক্তব্য শেষ করেন স্বামীজি।
ঝরঝরে ফরাসি ভাষায় বলে গেলেন স্বামীজি। মাঝে মাঝে ছিল পরিষ্কার উচ্চারণে সংস্কৃত শ্লোক।
সভাপতি মঁসিয়ে ওপার্ট এই পর্যায়ে আলোচনার সমাপ্তি ঘোষণা করেন। তিনি স্বামীজির বক্তব্যকে মূল্যবান বলে স্বীকার করেন। বলেন, যেহেতু প্রতীকের সঠিক মূল্যায়ন করা শক্ত তাই এই ধরনের তুলনামূলক আলোচনা খুব গুরুত্বপূর্ণ।
এর পরেই সহ সভাপতি সিলভ্যা লেডি, লিয়ঁ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মঁসিয়ে পি রেগনড-এর লেখা ঋগ্বেদের নবম মণ্ডলের উপর একটি প্রবন্ধ পাঠ করেন।
তারপরেই স্বামীজির বক্তৃতা। স্বামীজি তাঁর বক্তৃতার কোনও লিখিত ‘পেপার’ আনেননি। তিনি স্বতঃস্ফূর্ত বক্তৃতা করলেন ফরাসি ভাষায়। হিন্দুধর্মের শুরু থেকে তার বিকশিত রূপ ব্যাখ্যা করে বলেন, সর্বপ্রাণবাদ ( Animism) এবং প্রকৃতি-উপাসনা (Naturism) নিয়ে। প্রাচীনতম এই দু’টি বিষয় গুরুত্ব সহ বাহিত হচ্ছে আজও চর্চার মধ্য দিয়ে।
সবাই স্বামীজির দিকে তাকিয়ে আছেন। নিবেদিতা দেখছে স্বামীজির গলার স্বর ক্রমশ উচ্চগ্রামে পৌঁছে যাচ্ছে। বিশ্বাসের ভিত্তিভূমি থেকে তিনি উচ্চারণ করছেন পিতৃপুরুষের অর্চনা ও প্রকৃতির প্রতীক উপাসনার বিষয়টি। নিবেদিতা চমকে ওঠেন। মিসেস লেগেট ও সারা বুল নিজেদের মধ্যে দৃষ্টি বিনিময় করে নেন। নিবেদিতা ঘরে উপস্থিত সবার প্রতি দৃষ্টি দেন। সাদা-চামড়ার দেশে এসে, তাঁদের মাঝে এইভাবে তাঁদের আক্রমণ করতে পিছপা নন স্বামীজি।
স্বামীজির বেশ দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, আমি পরিষ্কার করে বলতে চাই, ইউরোপীয়ান কিছু পণ্ডিত তাঁদের ইচ্ছেমতো হিন্দু ধর্মের প্রাচীন শব্দগুলির নব ব্যাখ্যা করে অর্থান্তর ঘটিয়ে নতুন নতুন থিয়োরি তৈরি করছেন। যা বেশিরভাগ ভ্রান্ত শুধু নয়, বিভ্রান্তি সৃষ্টি করছে।
থামলেন একটু তিনি।
তারপর ধীর শান্ত কণ্ঠে বললেন, হিন্দুধর্মের প্রাচীন ধারাবাহিকতা উত্তরোত্তর অনুশীলনের মধ্য দিয়ে নব নব সত্য উদ্‌ঘাটনের দিকে এগিয়ে চলেছে। নব-উত্থান সূচিত হয়েছে আজকের ভারতবর্ষে। উপনিষদের প্রয়োগ ও প্রভাবের ফলে জাগ্রত ভারতের কথা বলে বক্তৃতা শেষ করেন।
সভাপতি ধন্যবাদ জানান স্বামীজিকে এবং অন্যান্য উপস্থিত শ্রোতাদের। সকাল ১১-৩০ নাগাদ সম্মেলন শেষ হয়। নিবেদিতা, সারা বুল, মিসেস লেগেট সহ ছোট্ট দলটি স্বামীজিকে নিয়ে প্রশস্ত পাথরে বাঁধানো লনের উপর দিয়ে হেঁটে আসছে। সরবর্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে বেরিয়ে এলেন সবাই।
‘আপনি খুব সুন্দর বলেছেন স্বামী!’ নিবেদিতা স্বামীজির পাশে হাঁটতে হাঁটতে কথা শুরু করলেন।
‘হুম। খানিক বকবকানি করলুম আর কী! মি. বোসের গবেষণাপত্রের বক্তৃতা কবে আছে যেন? আমি সেখানে উপস্থিত থাকতে চাই।’
‘আমি আপনাকে জানিয়ে দেব।’
মিসেস লেগেট পিছন থেকে প্রশ্ন ছুড়ে দেন, ‘মার্গারেট, তুমি কি এখন সরাসরি আমাদের বাড়িতেই যাবে?’
নিবেদিতা দাঁড়িয়ে যায়, ‘না মিসেস লেগেট! আমাকে এখন মি. গেডেসের কাছে যেতে হবে। মি. বোস আসবেন। তাঁর গবেষণাপত্রের সংক্ষিপ্তসার তৈরি করতে হবে। তোমাদের বাড়ির সান্ধ্য আসরে আজ না হলেও খুব শিগগিরই আমি মি. বোস ও মিসেস বোসকে নিয়ে আসছি।’
নিবেদিতা একবার তাকিয়ে দেখার চেষ্টা করলেন স্বামীজির চোখ। স্বামীজির কোনও ভ্রুক্ষেপ নেই। তিনি লম্বা লম্বা পা ফেলে এগিয়ে চলেছেন।
‘মিসেস লেগেট, ম্যাডাম কালভ্যে কি আপনার ওখানে গানের আসরে আসছেন?’
‘এমা কালভ্যে তো আছেন এখানে! ওঁর অপেরা দেখতে যাবার কথা আছে। তুমিও চলো। স্বামীজি যাবার ইচ্ছে প্রকাশ করেছেন।’ লেগেট খুব সহজ সুরে এই কথা বলে মিসেস বেটির সঙ্গে এগিয়ে গেলেন।
নিবেদিতা চমকে উঠলেন। স্বামীজি যাবেন অপেরায়! দ্রুত পা চালিয়ে স্বামীজির কাছে পৌঁছলেন।
স্বামীজি অনেকটা এগিয়ে এসেছেন বলে একটি চিনার গাছের নীচে দাঁড়িয়ে ছিলেন। নিবেদিতাকে হন্তদন্ত আসতে দেখেও দাঁড়িয়েছেন হয়ত!
‘স্বামী! এ আমি কী শুনলাম?’
‘কী হয়েছে মার্গট? তোমাকে এত উতলা লাগছে!’
নিবেদিতা একটু গুছিয়ে নিলেন নিজেকে, ‘আপনি অপেরায় যাচ্ছেন?’
‘হ্যাঁ, এম্মার পারফরম্যান্স দেখতে যাব ঠিক করেছি। মিসেস লেগেট সব ব্যবস্থা করছে।’
‘একজন মঙ্ক, সন্ন্যাসী হিসেবে আপনি অপেরা দেখতে যাবেন?’
‘হ্যাঁ। যাব।’
‘আপনি অপেরা হাউসে গেলে আপনার দুর্নাম হবে স্বামীজি! আপনি যেতে পারেন না।’
‘ওকে যে বলেছি, আমি যাব।’
‘আপনি বলেছেন?’
‘ওকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, কোন ভূমিকায় তুমি অভিনয় করতে সবচেয়ে বেশি পছন্দ করো! ও বলল, কারমেন। তখন নাকি ও বাঁধন ছেঁড়া উদ্দাম যাযাবর তরুণী হয়ে ওঠে। বলছিল আমাকে। আমি বলেছি, যাব।’ স্বামীজি নিবেদিতার চোখের উপর চোখ রাখলেন।
‘স্বামী, এ হতে পারে না। আপনি অপেরায় গেলে সমালোচনার ঝড় উঠবে, স্বামী। এ আপনি করতে পারেন না!’
স্বামীজি মৃদু হেসে তাকালেন নিবেদিতার দিকে।
‘না স্বামী আপনি যাবেন না অপেরায়।’ নিবেদিতার চোখে আজ্ঞা, আদেশ ও মিনতির মিশ্র অনুভূতি।
‘মার্গট! আমার কোনও বন্ধন নেই, আমার কোনও দায় নেই কারও প্রতি। শিশুর মতো হালকা অনুভব করছি নিজেকে।’ স্বামীজি এগিয়ে চলেন।
‘আপনি যাবেন অপেরায়?’
কোনও উত্তর না দিয়ে স্বামীজি এগিয়ে যান।
হইহই করে দলের সবাই এসে পড়ে।
নিবেদিতা তাকিয়ে থাকেন। তাঁকে যেতে হবে অন্য পথে। সেখানে অপেক্ষা করছেন এক বিজ্ঞানী, যিনি প্রমাণ করবেন বিশ্বের কাছে — সর্বভূতে চৈতন্যের প্রকাশ, যদিদং কিঞ্চ জগৎ প্রাণ এজতি নিঃসৃতং।

বাগবাজার থেকে বেলুড় মঠের দূরত্ব যেন আজ যোজন যোজন পথ বেড়ে গেছে। স্বপ্নের তরী যখন তরতরিয়ে চলে তখন যে-কোনও দূরত্ব অতি কম বলে বোধ হয়। স্বপ্নের যখন মৃত্যু হয় তখন যে দূরত্ব অনতিক্রম্য মনে হয়। শেষ হয় না পথ। নৌকা ধীরে ধীরে ছলাৎ ছলাৎ চলতে থাকে। গোপালের মা হাতের তালুতে থুতনি ভর দিয়ে পাথরের মতো বসে আছে। স্থিরচিত্র যেন দুলছে। তরুণ সন্ন্যাসীও স্থির নৌকায় বসে তাকিয়ে আছেন সামনের দিকে। নিবেদিতার মনের নদীতে ঢেউ অজস্র ঘটনার। যাঁর আহ্বানে সবকিছু ফেলে চলে এসেছিলেন। ধর্ম ত্যাগ করেছেন। হিন্দু ভারতীয় তিনি যাঁর বীজমন্ত্র বুকে নিয়ে। তিনি আজ থেকে শুধুমাত্র অতীত হয়ে গেলেন। কোথায় যাব বলুন হে প্রভু, স্বামী!

তীক্ষ্ণ কাঁপা কাঁপা সুরেলা গলার সঙ্গে বাজনার মূর্ছনা দেওয়াল, গাছপালা, বাগান, গেট ছাপিয়ে রাস্তায় এসে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। কোনও একটি গান বোধহয় শেষ হল। নিবেদিতা ঠিক বুঝতে পারেন না। চিৎকার হাততালি চলল অর্কেস্ট্রার আওয়াজ ছাপিয়ে। নিবেদিতা ধীরে হলঘরে ঢুকলেন। ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসে আছে সব অতিথিরা। সমাজের বিদ্বজ্জনের সমাবেশ। চেনাজানা অনেকেই আছেন। লেগেট দম্পতি উঠে এসে নিয়ে গেলেন নিবেদিতাকে ভেতরে। জ্যুল বোয়া এবং স্বামীজি এক জায়গায় বসেছেন। সেখানেই বসলেন নিবেদিতা। জ্যুল বোয়ার সঙ্গে কুশল বিনিময় করলেন। স্বামীজিকে সুস্থ লাগছে বেশ।

‘মিস্টার বোস এলেন না?’ স্বামীজি মৃদুস্বরে একটু ঝুঁকে প্রশ্নটা করলেন।
‘উনি একটু ব্যস্ত আছেন। এখানে বক্তৃতা দেওয়ার পর ইংল্যান্ডে বক্তৃতা দেবার জন্য খসড়া তৈরি করছেন। চাইছেন ইংল্যান্ডে বলতে। যোগাযোগ হয়েছে।’
‘আমি ওঁর বক্তৃতার দিন থাকব। ভারতবর্ষ থেকে একটি কণ্ঠস্বর শাসন করবে বিশ্বের বিজ্ঞানকে। এই ঐতিহাসিক মুহূর্তের সাক্ষী থাকব আমি।’
‘উনি খুব খুশিই হবেন। মিস্টার বোয়া নিশ্চয়ই থাকবেন?’
মিস্টার বোয়া ঘাড় নেড়ে বলেন, ‘নিশ্চয়ই! আসলে মিস্টার বোস একটা ইউনিভার্সাল বিশ্বাসকে বিজ্ঞান ভিত্তিক প্রমাণ করছেন। ইটস্ মারভেলাস ইনডিড, আই থিঙ্ক ইটস্ মোর ফিলজফিকাল দ্যান সায়েন্টিফিক!’
নিবেদিতা বেশ খুশি হয়ে কিছু বলতে যাচ্ছিলেন। সেই সময় ম্যাডাম কালভ্যে এসে উপস্থিত হলেন।
‘হ্যালো হ্যালো! হাউ আর ইউ অল?’
তিনজনেই অভিবাদন জানায় এম্মা কালভ্যেকে। এম্মা একটি লম্বা সিগারেট ধরিয়ে বসেন স্বামীজির পাশে।
‘তোমার কারমেন খুব ভাল লেগেছে এম্মা।’ স্বামীজি এম্মাকে বলতেই এম্মা কুণ্ঠিত হয়ে ওঠেন।
‘কী যে বলেন স্বামীজি! সেদিন আপনি যখন গ্রীনরুমে গেছিলেন, কী যে বিব্রত হয়েছিলাম আমি! আপনার মতো একজন মানুষ অপেরার এক সোপ্রানোর সঙ্গে দেখা করতে গ্রীনরুমে! কোরাস-গায়িকাদের সে কী কৌতূহল! কে এই ধীর গম্ভীর সৌম্যদর্শন পুরুষ, এম্মা সম্বন্ধে তার এত কৌতূহল! এইসব নানা কথা! খুব খুব অপরাধবোধে ভুগছিলাম!’ এম্মা লম্বা টান দেয় সিগারেটে।
স্বামীজি উত্তর দেন, ‘না না, তাঁকে খারাপ ভেবো না। সেও সত্য! সে তো মিথ্যা বলে না… তার উদ্দামতায় নিজেকেই মেলে ধরে, অনাবৃত করে! কামনার আগুনে দগ্ধ হয়ে মরতে চাওয়া এক মহীয়সী নারী সে!’
নিবেদিতা সংকুচিত বোধ করেন। স্বামীজি তাহলে গিয়েছিলেন অপেরা হাউসে। তারপর আবার গায়িকাদের গ্রীনরুমে গেছিলেন! স্বামীজি এটা কেন করছেন!
শিকাগো থাকাকালীন এম্মা গিয়েছিলেন স্বামীজির কাছে। তখন এম্মা হতাশা ও আত্মগ্লানিতে ছারখার। একমাত্র কন্যা তাঁর বাড়িতে আগুনে পুড়ে মারা যায়। স্বামীজির কাছে গিয়ে কথা বলে সে মানসিক বল ফিরে পায়, ফিরে আসে গানে। ফরাসি দেশে শুধু নয়, ইউরোপে এম্মা একজন প্রতিষ্ঠিত সুগায়িকা।
তখনই মি. লেগেই ঘোষণা করলেন, ‘আজকের সন্ধ্যা আপনাদের কাছে আরও বেশি আকর্ষণীয় করে তুলবে এম্মা ক্যালভ্যের গান। এম্মা এখানে উপস্থিত হয়েছে, তাঁকে সংগীত পরিবেশন করার জন্য আহ্বান করা হচ্ছে।’
‘আমায় একটি গান শোনাবে, এম্মা!’ স্বামীজি তাকালেন এম্মার দিকে।
নিবেদিতা অবাক তাকিয়ে আছেন।
এম্মা সিগারেটটি অ্যাসট্রেতে নেভাতে নেভাতে বললেন, ‘বলুন কোন গানটি শুনতে চান আপনি?’
‘সেদিন অপেরায় অনুষ্ঠানের শেষে সুরের আগুন জ্বালিয়ে তুললে যে-গানে, গেয়ে শোনাবে?’
‘লা মার্সেইয়্যাজ? সে তো যুদ্ধের গান, সমর-সংগীত। কামান গোলাগুলি নিয়ে সৈন্যদের যুদ্ধে এগিয়ে যাবার গান।’
‘আমি গানটি শিখতে চাই এম্মা! ওই গানে নির্ভয়ের আগুন জ্বলে তোমাদের মনে, দেশকে ভালবেসে তার জন্য প্রাণ দিতে প্রেরণা পাও এই গানে, তাই না? কল্পনায় দেখতে পাও? কোন অদৃশ্য শক্তির টানে এই গান শুনে নাগরিকরা মাথা তুলে দাঁড়াল? আমি আমার ছেলেদের গানটি শেখাব।’
দিশেহারা বোধ হয় নিবেদিতার স্বামীজির এমন আচার-আচরণে। বুঝতে পারেন না ঠিক কী তাঁর বলা ও করা উচিত।
এম্মা কালভ্যা তাঁর শরীরে হিল্লোল তুলে গান শুরু করলেন—
Let’s go children of the fatherland
The day of glory has arrived!
Against us tyranny’s
Bloody flag is raised!
In the countryside, do you hear
The roaring of these fierce soldiers?
শেষ দু’টি এবং শেষ লাইনটি উচ্চগ্রামে উচ্চারণ করছেন এম্মা দু’হাত উপরে তুলে। তাঁর অসাধারণ দেহসুষমা বিকশিত হয়ে ওঠে যখন অনাবৃত বাহু দু’টি আকাশের দিকে তুলে ধরেন। তাঁর ক্ষীণ কটি, গুরু বক্ষ ও নিতম্বে হিল্লোল তুলে এম্মা গেয়ে চলেন তাঁর গান।
They come right to our arms
To slit the throats of our sons, our friends!
দর্শকের দিকে হাত প্রসারিত করে এম্মা নেমে আসে ছোট্ট মঞ্চ থেকে।
Grab your weapons citizens!
Grab your weapons
From your battalions!
Let us March! Let us March!
May impure blood
Water our fields!
চূড়ান্ত উত্তেজনার মধ্য দিয়ে সূরের মূর্ছনা শেষ হয়। সুন্দরী এম্মা আরও রাঙা হয়ে ওঠেন। সবাই সমস্বরে অভিবাদন জানায় এম্মাকে। একসময় শান্ত হয় আসর। এম্মা এগিয়ে এসে স্বামীজির পাশের চেয়ারে বসে।
‘কেমন লেগেছে আপনার?’
‘এই গানটির মধ্যে যে স্বাধীনতার বোধ আছে, যে লড়াইয়ের ডাক আছে, এবং তার পরিবেশন এত জোরালো ভাবে করা হয় তা রক্ত চনমন করে তোলে! আমি এই গানটি শিখতে চাই। তুমি আমাকে শেখাবে এম্মা?’
‘অবশ্যই শেখাব স্বামীজি! কতদিন আর পাব আপনাকে আমাদের মধ্যে!’
‘আমার ফেরার সময় এসে গেছে। আমাকে ডাকছে আমার দেশ।’
জুল বোয়া এক পাত্র সুরা নিয়ে চুমুক দিতে দিতে বললেন, ‘আমরা তো পরিকল্পনা করেছি স্বামীজির সঙ্গে মিশর অবধি যাব ঘুরতে ঘুরতে। তারপর স্বামীজি ফিরে যাবেন ভারতে আর আমরাও ফিরে আসব এখানে।’
এম্মা উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠেন হাততালি দিয়ে, ‘ওয়ানডারফুল! আমিও এই দলে থাকতে চাই। স্বামীজির সঙ্গে ঘোরা! আমি স্বপ্নেও ভাবতে পারছি না! আমাকেও সঙ্গে নিয়ো জুল বোয়া!’
‘ঠিক আছে, ঠিক আছে! দল তো বেশ বড়ই হচ্ছে! নিবেদিতা তুমিও আসতে পারো। মিস ম্যাকলয়েড যাবেন বলেছেন। ধীরে সুস্থে নিকট-প্রাচ্য সফর করার পরামর্শ তাঁরই!’ জুল বোয়া নিবেদিতার দিকে তাকিয়ে বললেন কথাগুলো। স্বামীজির মুখে মৃদু হাসি। কিছু বলছেন না। এম্মা এবং জুল বোয়া পরিকল্পনা করছেন বেড়ানোর।
‘প্যারিসের কয়েকজন বিখ্যাত কয়েকজন প্রেততত্ত্ববিদ গুপ্তবিদ্যা সম্প্রদায়ের পান্ডারাও যাবেন বলেছেন এমন ট্যুরে!’ জুল বোয়া কথাগুলো বলে তাকালেন সবার দিকে।
‘নাহ্। এটা হতে পারে না। গুপ্তবিদ্যার ওঁরা গেলে আপত্তি আছে আমার। এমনকী স্বামীজির সেখানে যাওয়াটাও সমীচীন হবে না।’ নিবেদিতা উঠে পড়লেন। স্বামীজি কোনও আপত্তি তুললেন না।
নিবেদিতা হলঘর থেকে বেরিয়ে আসেন লনে। খোলা হাওয়ায় ভাল লাগছে। দমবন্ধ দিশাহারা লাগছিল স্বামীজির ভাব-গতিক দেখে। স্বামীজি এসে সামনে দাঁড়ালেন।
‘আমার খুব কষ্ট হচ্ছে স্বামী!’
‘আত্মোৎসর্গেও এক ধরনের অহং জড়িয়ে থাকে। জড়িয়ে থাকে উদ্দেশ্য।’
নিবেদিতা তাকান। দু’জনেই নীরব কিছুটা সময়।
‘এমন পাঁচমিশেলি দলে থাকলে আপনার দুর্নাম হবে স্বামী!’
‘আমি এখন স্বাধীন, স্বাধীন!… জন্মসূত্রে এই স্বাধীনতা পেয়েছি, এখন যা-কিছু করছি তার কোনওটারই কোনও ভার নেই। আবার যেন শিশু হয়ে গেছি, মার্গট!’
দু’জনে বাগানের রাস্তা দিয়ে হাঁটতে থাকেন বাড়ির গেটের দিকে।
‘আমি ঠিক বুঝতে পারছি না!’
‘দুর্নাম সমালোচনা এইসব নিয়ে মাথা ঘামিয়ো না মার্গট! পায়ের তলায় যে ফুল ফুটেছে তাকে কুড়িয়ে নিতে শেখো। ভাল চোখে দেখো সব কিছুকেই, কাদার ছিটে যদি গায়ে লাগে — তবুও। অখণ্ড মণ্ডলাকারে জগৎ জুড়ে আছেন তিনিই। ভাল-মন্দ বিচার করা আমাদের কাজ নয়।’
‘স্বামী, আপনি আমাকে শিখিয়েছেন ত্যাগের মন্ত্র, আপনি আমাকে শিখিয়েছেন কর্মযোগের কথা, আপনি শিখিয়েছেন সেবাধর্ম! আজ বলছেন, ভাল-মন্দ বিচার করা আমাদের কাজ নয়! আমার ঈশ্বর আপনি! আপনি বলুন!’
নিভন্ত চুল্লিতে যেন আগুনের লেলিহান শিখা দেখা দিয়েছে নিবেদিতার চোখে। অস্থির নিবেদিতা।
স্বামীজি স্থির। শান্ত কণ্ঠে বললেন, ‘তুমি জেদি ও একরোখা, যেমন আমি ছিলাম। স্বাতন্ত্র্যের প্রকাশ সবসময়। নিজেকে সঁপে দাও মার্গট। কী ভাল আর কী মন্দ, তার বেছে নেওয়ার অভিমান রয়েছে তোমার ভেতরে। ভেতরে শক্তি সঞ্চয় করো। সংস্কারের সকল ছাঁচ ভেঙে গুঁড়িয়ে ফেলতে হবে, তবেই কূল ছাপিয়ে ছুটবে আলোর বন্যা। তখনই পূর্ণ হবে সব আয়োজন। যে পাঁকের ছোঁয়ায় হাতে দাগ লাগে আজ, তখন তাই দিয়ে দেখবে প্রতিমা গড়বে, করবে প্রাণের সঞ্চার। তুমি শুধু অবিশ্রান্ত সৃষ্টি করে চলো মার্গট, অবিশ্রাম সৃষ্টি করাই তোমার একমাত্র কাজ। এসো এখন। শান্ত হও। নিজেকে মুক্ত করো। সাবধানে যাও।’
নিবেদিতা পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করলেন। স্বামীজি আশীর্বাদ করলেন মাথায় হাত দিয়ে। নিবেদিতা স্বামীজির চোখের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘তবুও আমি বারণ করব।’
‘এসো। রাত হল।’
স্বামীজি পিছন ফিরে হাঁটা শুরু করলেন প্রাসাদোপম লেগেট দম্পতির বাড়ির দিকে। বিরাট বাড়িটা আলো-আঁধারিতে দাঁড়িয়ে আছে।
নিবেদিতা দাঁড়িয়ে থাকলেন কয়েক পলক। দেখলেন পিছন ফিরে। সটান হেঁটে চলেছেন তিনি। ক্রমশ দূরে দূরে মিলিয়ে যাচ্ছেন। সমস্ত অন্ধকার যেন দৌড়ে এসে জাপটে ধরল নিবেদিতাকে। নিবেদিতা জোরে পা চালিয়ে এক যন্ত্রণাবিদ্ধ মন নিয়ে ফিরে এলেন গেডেসের বাড়ির চিলেকোঠার ঘরে। নিজের আস্তানায়।
ক্ষতবিক্ষত নিবেদিতা। রিক্ততা, ব্যর্থতা, শূন্যতা সবকিছু জল হয়ে নেমে আসছে চোখ ছাপিয়ে। নিজের পরমতম আশ্রয়স্থল সাদা পাতা সামনে নিয়ে বসলেন টেবিলে। নির্ভরতার কলমটি তুলে নিলেন হাতে। আজ ১৩ আগস্ট ১৯০০। নিবেদিতা প্রিয় ওলি বুলকে লিখতে থাকেন মনের দরজা খুলে — “আমরা যেন আলোআঁধারির কণ্টকবনে আটক পড়ে আছি — আমরা সকলেই — বের হওয়ার পথ নেই কোথাও। এই শূন্য প্রান্তরের আলেয়া হল অপরকে সাহায্য করার স্বপ্ন, যা আমাদের নতুনতর প্রহেলিকার দিকে নিয়ে যায়। নরকের মধ্যে আনন্দ কিভাবে সম্ভব? আর যদি আনন্দ না থাকে, সাহায্যই বা থাকে কী করে?… আমরা আমাদের অশক্তি ও নৈরাশ্যের মধ্যেও নিজের প্রেমের বিষয়ে সচেতন। আমাদের সচেতন হতে হবে, এই সমস্ত সীমাবদ্ধতার পারে কী আছে তার বিষয়ে। হয়তো তাই। কিন্তু তার রূপ জানি না। আমি নিজস্বভাবে সেখানে পৌছতে পারব না, যদি না স্বামীজি অলৌকিক শক্তিতে তা আমাকে দেন। সেটা এখন বেশ বুঝতে পারছি… তিনি কি আমাকে দেবেন? হায় সারা! তোমাকে চুপিচুপি বলি — তিনি দিতে পারেন না। আমি যে তাঁকে দিতে চেষ্টা করতে দেখেছি আগে। যদি পারতেন, আগেই দিয়ে দিতেন। কিন্তু তাঁর আছে — এই দেবার শক্তি আছে। কিন্তু পাওয়ার ব্যাপারে অনেকখানি যে নিজের শক্তির উপরে নির্ভর করে। তা যে আমার নেই — সত্যি নেই।”
এই গাঢ় অন্ধকার রাতে নিবেদিতা নিজের অন্তরের অক্ষরমালার উপর কান্নায় ভেঙে পড়লেন।

সহযোগিতার হাত বাড়াতে ওপরের ছবিতে ক্লিক করুন

[পর্বঃ ৯]

[পরম্পরা ওয়েবজিন, ফেব্রুয়ারি ২৫, সূচিপত্র – এখানে ক্লিক করুন]