“My five years’ old daughter Mini cannot live without chattering. I really believe that in all her life she has not wasted a minute in silence. Her mother is often vexed at this, and would stop her prattle, but I cannot feel so. To see Mini quiet is so unnatural that I cannot bear it long. And so my own conversation with her is always animated.
One morning, for instance, when I was in the midst of the seventeenth chapter of my new novel, my little Mini stole into the room, and putting her hand into mine, said…”

নিবেদিতা থামলেন। একটু হেসে ফেললেন আপন মনে। রবিবাবু আশ্চর্য এক ছোটদের মনের জগতে ঢুকে গেছেন। নিবেদিতা বারবার পড়ছেন— “বাবা, রামদয়াল দরোয়ান কাককে কৌয়া বলছিল, সে কিছু জানে না, না?”
আবার পড়লেন— “সকালবেলায় আমার নভেলের সপ্তদশ পরিচ্ছেদে হাত দিয়াছি এমন সময় মিনি আসিয়াই আরম্ভ করিয়া দিল, ‘বাবা, রামদয়াল দরোয়ান কাককে কৌয়া বলছিল, সে কিছু জানে না, না?” ছোট্ট মিনির সংলাপ পড়ে হাসছেন নিবেদিতা। এমন মিনিকে তো দেখেছেন বাগবাজারে। খুব সুন্দর। কিন্তু মিনির সংলাপের অনুবাদে সেই মজার সারল্য আনতে হবে যে! আবার পড়লেন। মুশকিলে পড়েছেন ‘কাককে কৌয়া বলছিল’ এই অংশটি নিয়ে। নাঃ, লিখে ফেলতে হবে। লিখলেন — “Father! Ramdayal the door-keeper calls a crow a krow! He doesn’t know anything, does he?”
Before I could explain to her the differences of language in this world, she was embarked on the full tide of another subject. “What do you think, Father? Bhola says there is an elephant in the clouds, blowing water out of his trunk, and that is why it rains!”

নিবেদিতা


“মাগো, ভোলা এত মিছিমিছি বকতে পারে! কেবল বকে, দিন রাত বকে!”
নিবেদিতা হেসে ফেলেন সংলাপের গঠনে। রবিবাবুর সৃষ্ট মিনি তার বকবকানি নিয়ে জীবন্ত হয়ে ওঠে বাংলার কোনও গৃহস্থের ঘরে। কিন্তু এটা কি খুব প্রয়োজনীয় বিদেশিদের কাছে? অনুবাদে এই ব্যঞ্জনা আনা কি আদৌ সম্ভব! নিবেদিতা পরের প্যারাগ্রাফে মন দিলেন। ধীরে ধীরে ঢুকে পড়েছেন মিনির চরিত্রের ভেতরে। কাবুলিওয়ালা রহমতের বলশালী বুকের গভীরে লুকিয়ে রাখা ব্যথা স্পর্শ করতে পারেন নিবেদিতা। খেয়াল থাকে না অনুবাদ করতে করতে রাত গভীর হয়। রবিবাবুর গল্পগুলো আন্তর্জাতিক পাঠকের কাছে পৌঁছে দিতে হলে ইংরেজি ভাষায় অনূদিত হওয়া জরুরি। এই জরুরি কাজটিই নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছেন নিবেদিতা। জগদীশচন্দ্রের মাথায় প্রথম আসে যে, কবিবন্ধুটির লেখনী প্রতিভার স্ফুরণ বিশ্বের দরবারে প্রকাশ করা দরকার। নিবেদিতার কাছে প্রস্তাব দেন তিনি। আলোচনাও করেন দু’জনে। জগদীশচন্দ্র লিখেছিলেন তাঁর বন্ধু রবীন্দ্রনাথকে, “তুমি পল্লীগ্রামে লুক্কায়িত থাকিবে, আমি তাহা হইতে দিব না। তুমি তোমার কবিতাগুলি কেন এরূপ ভাষায় লিখ যাহাতে অন্য কোন ভাষায় প্রকাশ করা অসম্ভব? কিন্তু তোমার গল্পগুলি আমি এদেশে প্রকাশ করিব। লোকে তাহা হইলে কতক বুঝিতে পারিবে। আর ভাবিয়া দেখিও, তুমি সার্ব্বভৌমিক। এদেশের অনেকের সহিত তোমার লেখা লইয়া কথা হইয়াছিল। একজনের সহিত কথা আছে (শীঘ্রই তিনি চলিয়া যাইবেন) যদি তোমার গল্প ইতিমধ্যে আসে তবে তাহা প্রকাশ করিব। Mrs. Knight-কে অন্য একটি দিব। প্রথমোক্ত বন্ধুর দ্বারা লিখাইতে পারিলে অতি সুন্দর হইবে।”
মিসেস মিরিয়াম সিঙ্গলটোন নাইট এর আগে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘বিষবৃক্ষ’ এবং প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়ের গল্প সংকলন অনুবাদ করেছেন। জগদীশচন্দ্র তাঁর প্রিয় কবিবন্ধুর কাছে মিসেস নাইটের নাম উল্লেখ করলেও আরেকজনের কথা অনুল্লেখ রেখে গেলেন ২ নভেম্বর, ১৯০০ সালের এই চিঠিতে। তিনি ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন, “প্রথমোক্ত বন্ধুর দ্বারা লিখাইতে পারিলে অতি সুন্দর হইবে।” রবীন্দ্রনাথের কাছে নিবেদিতার নাম উহ্য রাখলেন কেন জগদীশচন্দ্র? কবিবন্ধুর পছন্দ না করার কোনও কারণ থাকতে পারে? এক সময়ের ব্রাহ্ম বিরোধিতার ফল? না কি পরবর্তীতে নাম প্রকাশ করে বিস্মিত করবেন কবিবন্ধুকে? নিবেদিতাও সম্ভবত জানতেন না যে তাঁর প্রিয় ‘বেয়ার্ন’ কবিবন্ধুকে লিখেছেন গল্প অনুবাদের কথা। নিবেদিতার প্রয়োজন ব্রিটিশদের অধীনে থাকা ভারতবর্ষের প্রতিভাগুলি বিশ্বের দরবারে পৌঁছে দেওয়া। আর তাঁরা যদি হন একজন কবি ও অপরজন বিজ্ঞানী, যাঁদের প্রতিভাকে তিনি শ্রদ্ধা করেন, তাহলে শত পরিশ্রমেও তিনি পিছপা নন।
জগদীশচন্দ্রের চিঠি পাওয়ার প্রায় দেড় মাস পর উত্তর দিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। তখন তিনি ভীষণ ব্যস্ত। কলকাতায় ‘বিসর্জন’ নাটক মঞ্চস্থ হবে, তার প্রস্তুতি চলছে। তারই ফাঁকে লিখলেন, “আমার রচনা-লক্ষ্মীকে তুমি জগৎ-সমক্ষে বাহির করিতে উদ্যত হইয়াছ — কিন্তু তাহার বাঙ্গলা-ভাষা-বস্ত্রখানি টানিয়া লইলে দ্রৌপদীর মত সভাসমক্ষে তাহার অপমান হইবে না? সাহিত্যের ঐ বড় মুস্কিল ভাষার অন্তঃপুরে আত্মীয়-পরিজনের কাছে সে যেভাবে প্রকাশমান, বাহিরে টানিয়া আনিতে গেলেই তাহার ভাবান্তর উপস্থিত হয়।”
তার পরেই কবিবন্ধু তাঁর বৈজ্ঞানিক বন্ধুর বিদেশে বসে কাজ চালিয়ে যাওয়ার সঙ্গতি নিয়ে আশ্বাস দেন। এক পরম বন্ধুর মতো ভরসার স্থল হয়ে ওঠেন জগদীশচন্দ্রের বিজ্ঞান সাধনায়। রবীন্দ্রনাথ লিখছেন ওই একই চিঠির শেষাংশে, “গবর্ন্মেন্ট যদি তোমাকে ছুটি দিতে সম্মত না হয়, তুমি কি বিনা বেতনে ছুটি লইতে অধিকারী নও? যদি সে-সম্ভাবনা থাকে তবে তোমার সেই ক্ষতিপূরণের জন্য আমরা বিশেষ চেষ্টা করিতে পারি। যেমন করিয়া হোক তোমার কার্য্য অসম্পন্ন রাখিয়া ফিরিয়া আসিও না। তুমি তোমার কর্মের ক্ষতি করিও না, যাহাতে তোমার অর্থের ক্ষতি না হয় সে ভার আমি লইব।”
যুক্তি, বুদ্ধি, লজিকের উপর দাঁড়িয়ে থাকা একজন বিজ্ঞানী কিন্তু সবচেয়ে আগে একজন আবেগপ্রবণ মানুষ। চিঠিটির দিকে তাকিয়ে থাকেন। বন্ধু, সুহৃদ, প্রিয়…এতখানি বিশ্বাস, প্রত্যয়, আস্থা! এখন শরীর কিছুটা ভাল। ডাক্তারের পরামর্শ, ওষুধ ও পথ্য মেনে চলায় মন-মেজাজ ঠিক আছে। কঠিনতম বাধা অতিক্রম করতে করতে চলেছেন জগদীশচন্দ্র। বিজ্ঞানীদের মধ্যে একটা দল চূড়ান্তভাবে বাধা তৈরি করছে প্রতি পদে। এমনকি জগদীশচন্দ্রের মৌল গবেষণার বিষয় চুরি করে পাবলিশ হয়ে গেছে। চরম হতাশাগ্রস্ত অবস্থা থেকে উঠে এসেছেন জগদীশচন্দ্র তিনজনের সাহচর্যে — অবলা, মার্গারেট নোবেল ও সারা বুল। অবলা ও মার্গারেট যেন আগলে রেখে দিয়েছেন তাঁকে। আর ঠিক এই সময়েই কবিবন্ধুর এমন ভরসা জাগানো চিঠি।
চিঠির শেষে কবি দিলেন অনুবাদের অনুমোদন, “আমার গল্পের অনুবাদ ছাপাইয়া কিছু যে লাভ হইবে, ইহা আমি আশা করি না — যদি লাভ হয় আমি তাহাতে কোনো দাবি রাখিতে চাহি না। তুমি যাহাকে খুশি দিয়ো। বিসর্জন নাটকের রিহার্সাল আমাকে তাগিদ করিতেছে — অতএব বিদায়।”

গভীর রাত উইম্বলডনে। নিবেদিতাদের বাড়ির ডাইনিং রুমটা জগদীশচন্দ্র ছোটখাটো ল্যাবরেটরি বানিয়ে ফেলেছেন। সেখানেই কাজ করে চলেছেন তিনি একমনে। নিমগ্ন। ঝুঁকে আছেন তাঁর তৈরি যন্ত্রের উপর। নিবেদিতা একবার তাকিয়ে দেখলেন। কপালের উপর কোঁকড়া চুলের গুচ্ছ। মাঝখানে সিঁথি করা চুল একটু এলোমেলো। নাকের উপর চশমা। চশমার সরু গোল্ডেন রিমে আলো ঠিকরোচ্ছে। ফ্যাশনে, চশমার সঙ্গে বাঁধা সিল্কের সুতো ঝুলছে ফ্রেমের প্রান্তে। স্থির দৃষ্টি। শান্ত চোখে তাপসের গভীরতা। নিবেদিতা তাকিয়ে থাকেন প্রিয় বন্ধুটির দিকে। বিজ্ঞান-তাপস। অনেক ঝঞ্ঝা ঝড় এই দেশে এসে সহ্য করতে হয়েছে। নিজের দেশেও। হতাশায় ডুবে থাকার বদলে তিনি ঘুরে দাঁড়িয়েছেন অসুস্থ শরীর নিয়েও। ব্রাডফোর্ডে ব্রিটিশ অ্যাসোসিয়েশনের পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের ডাকে বক্তৃতা দেওয়ার পরে-পরেই শরীর খারাপ হয় জগদীশচন্দ্রের। শরীরের অবস্থা এমন যে, সারা বুলের সাহায্য নিয়ে ডা. ক্রমবিকে দেখাতে হয়। অপারেশন করা ছাড়া অন্য উপায় নেই। ডিসেম্বর নাগাদ অপারেশন করার কথা শরীরের অবস্থা বুঝে। সেই ব্রাডফোর্ডের বক্তৃতা ছিল বিরুদ্ধমতাবলম্বীদের সামনে। জগদীশচন্দ্র অত্যন্ত পরিশ্রম করেছিলেন এই বক্তৃতা নিয়ে।

বিজ্ঞানী উইলিয়াম থমসন ব্যারন কেলভিন

উত্তেজিত জগদীশচন্দ্র লক্ষ করেছেন বিজ্ঞানী অলিভার লজ বসে আছেন অন্যান্য বিজ্ঞানীদের মাঝে। জগদীশচন্দ্র দেখেছেন। ১৮৯৬ সালে তিনি যখন প্রথম আসেন ইউরোপ সফরে এটা প্রমাণ করতে যে, পাঁচ মিলিমিটার তরঙ্গ দৈর্ঘ্যের বিদ্যুৎচৌম্বকীয় তরঙ্গ অদৃশ্য আলোক ইট-পাটকেল, ঘরবাড়ি ভেদ করে অনায়াসে সমধর্মী হয়েই চলতে পারে বাধাহীন। তাঁর পরীক্ষা প্রমাণ করার জন্য নিজের তৈরি ছোট্ট একটি যন্ত্র এনেছিলেন, পৃথিবীর প্রথম মাইক্রোওয়েভ। ২১ সেপ্টেম্বর ১৮৯৬ সালে গ্লাসগো ব্রিটিশ অ্যাসোসিয়েশনের বিজ্ঞান সভায় তাঁর প্রথম বিদেশে বক্তৃতার দিন উপস্থিত ছিলেন স্যার জে.জে. টমসন, লর্ড কেলভিন এবং বিজ্ঞানী অলিভার লজ। লর্ড কেলভিন উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করলেও অলিভার লজ তুলেছিলেন নানা প্রশ্ন। পরবর্তী কালে একটি বিজ্ঞান পত্রিকায় জগদীশচন্দ্রের আবিষ্কার ও বৈজ্ঞানিক চিন্তা ভাবনার প্রশংসা করলেও ওই একই পত্রিকায় একই সংখ্যায় অলিভার লজের আবিষ্কার নিয়ে অপ্রশংসিত আলোচনা হয়। অলিভার লজ খুব ভাল ভাবে মেনে নেননি বিষয়টি। সেই অলিভার লজ চার বছর পর আবার জগদীশচন্দ্রের বক্তৃতা শুনতে এসেছেন ব্রাডফোর্ড ব্রিটিশ অ্যাসোসিয়েশনের বিজ্ঞান সভায়। জগদীশচন্দ্র তখন বিনা তারেই সংবাদ সম্প্রচার করার আবিষ্কার নিয়ে তোলপাড় ফেলেছিলেন। আর আজ জীব ও জড়ের উত্তেজনা ও সাড়া নিয়ে গবেষণায় নিবিষ্ট তিনি। এই উত্তেজনায় সাড়া দেবার বিষয়টি তিনি দেখাতে চাইছেন উদ্ভিদের মধ্যেও। ফিজিক্স থেকে ফিজিয়োলজি হয়ে উদ্ভিদতত্ত্ব — এক অখণ্ড প্রাণের সংযোগ দেখার সম্ভাবনা। জগদীশচন্দ্র আবার সেই সেপ্টেম্বর মাসে উপস্থিত চার বছর পর (১৯০০) ইংল্যান্ডে। ব্রাডফোর্ড ব্রিটিশ অ্যাসোসিয়েশনের ডাকে বলতে উঠেছেন। হলভর্তি লোক। জন বুলের মতো পরিচিত বিজ্ঞানীরা সবাই অলিভার লজের দিকে একবার দেখছিল, একবার জগদীশচন্দ্রের দিকে। জগদীশচন্দ্র শুরু করলেন তাঁর প্রবন্ধ পাঠ — The Response of Inorganic Matter to Mechanical and Electrical Stimulus. হলের সবাই স্তব্ধ। বিষয়ের অভিনবত্বে এবং গবেষণা-পত্রের যুক্তি ও তথ্য পরিবেশনের সূক্ষ্মতায় আকৃষ্ট শ্রোতৃমণ্ডলী। একসময় শেষ হয় জগদীশচন্দ্রের বক্তৃতা প্রবল হাততালির মধ্য দিয়ে। অলিভার লজ উঠে দাঁড়ালেন। আস্তে আস্তে এগিয়ে এলেন অবলা বসুর দিকে। জগদীশচন্দ্র দেখেছেন প্রফেসর লজ এগিয়ে এসেছেন। অবলা আকাশ-রঙের মসলিন শাড়ির উপর গাঢ় নীল লং-কোট পরেছেন, যার উপর সোনালি সুতো দিয়ে জমাট কাশ্মীরী কাজ। অবলা যেন একটু শঙ্কিত। প্রফেসর লজ কাছে আসতেই উঠে দাঁড়িয়ে নমস্কার করলেন তিনি। কিন্তু এ কী শুনছেন তিনি! একবার জগদীশের দিকে তাকালেন। জগদীশচন্দ্রও শুনতে পাচ্ছেন। লজ বেশ গলা তুলেই বলছেন, ‘Let me heartily congratulate you on your husband’s splendid work!’ জগদীশচন্দ্র শুনতে পেয়েছেন কথাগুলো। বিজ্ঞানী লজ হঠাৎ এইসব বলছেন সমালোচনা না করে! হলটা কী? অবলা মাথা নামিয়ে হাতজোড় করে বারবার থ্যাঙ্কস থ্যাঙ্কস জানাচ্ছেন। তারপরেই অলিভার লজ এগিয়ে এলেন জগদীশচন্দ্রের কাছে। জগদীশচন্দ্রের ডানহাত নিজের দু’হাতের মধ্যে নিয়ে সামান্য ঝুঁকে উচ্ছ্বসিত, ‘You have a very fine research in hand, go on with it.’
‘Thank you Mr. Lodge, I’m honoured.’
‘Are you a man of plenty of means? All these are very expensive and you have many years before you. Your work will give rise to many others —all very important.’

নিবেদিতা রবিবাবুর ‘কাবুলিওয়ালা’ গল্পের অনুবাদ করতে করতে একবার দেখে নিলেন জগদীশচন্দ্রের দিকে। এবার তাঁর শুয়ে পড়া উচিত। অনেকটা রাত গড়িয়ে গেছে। রয়্যাল সোসাইটির বক্তৃতার জন্য তিনি তৈরি করছেন এক নতুন যন্ত্র — কৃত্রিম চোখ। নিবেদিতা আস্তে আস্তে উঠে এসে জগদীশচন্দ্রের পাশে দাঁড়ান, ‘বেয়ার্ন, এবার তোমার শুয়ে পড়া উচিত। এত পরিশ্রম শরীর গ্রহণ করতে পারবে না।’
জগদীশচন্দ্র একবার মাথা তুলে তাকালেন, ‘এ কী? তুমি এখনও ঘুমোওনি! আমার কাজ হয়ে গেছে আজকের মতো। বুঝলে মার্গট, এই যে ছোট্ট যন্ত্রটি দেখো! এটাই পৃথিবীর সবচেয়ে ছোট্ট ‘গ্যালেনা ডিটেক্টর’, তুমি বলতেই পারো ‘নকল রেটিনা’। এই দেখো এটা আমার তৈরি ক্ষুদ্রতম কনডেনসার, এর মাপ মাত্র ১৫ সেন্টিমিটার লম্বা, ১২ সেন্টিমিটার চওড়া আর ৭ সেন্টিমিটার উচ্চতা। আর এই টানেলটি হল কালেকটিং ফানেল।’
নিবেদিতা আবার বললেন, ‘বো অনেকক্ষণ বলে গেছেন, তুমি শুতে যাও, অনেক রাত হয়ে গেছে বেয়ার্ন।’
‘যাচ্ছি, যাচ্ছি। রয়্যাল সোসাইটির বক্তৃতায় বুঝলে এই যন্ত্রটি দেখিয়ে শুরু করব প্রথমেই — I can only say that it has been possible to construct an artificial retina, so I believe it may not be impossible to imitate also other organs of sense. কী বুঝলে? This is what I construct an artificial retina! ‘
‘It’s an amazing Dr. Bose, but you have to take sufficient rest for your health.’ নিবেদিতা ফিরে আসতে যান নিজের ঘরে, ঠিক তখনই অবলা আসেন।
‘আমি তোমাদের জন্য গরম কফি এনেছি। এসো একসঙ্গে কফি শেষ করে সবাই ঘুমোতে যাই।’ অবলা টেবিলে জায়গা করে কফির ট্রে রাখে।
‘দ্যাখো দ্যাখো, আমি আর্টিফিসিয়াল রেটিনা বানিয়ে ফেলেছি!’ জগদীশচন্দ্র কফির কাপ তুলে নেয়।
‘এখন আর ওই বিষয়ে কথা চিন্তা কিচ্ছু নয়! আমরা কাল সকালেই সাইকেল নিয়ে বেড়াতে বেরুব। তুমি, আমি আর নিবেদিতা।’
‘আমি তো ঠিক অতটা সাইকেল চালানোয় দক্ষ নই, বো! আমাকে ছেড়ে দাও।’ নিবেদিতা কফির কাপে চুমুক দেয়।
‘কোনও কথা শুনব না। কাল ভোরে সাইকেলে নদীর ধারে। Let’s call it a day. Good night Nibedita.’
‘মার্গারেট, শুভ রাত্রি। আগামী কাল আমার পেপারের লেখা অংশটি শুনব। আর রবিবাবুর গল্পটির অনুবাদ।’ জগদীশচন্দ্র উঠে পড়েন টেবিল ছেড়ে।
‘শুনলাম প্রিন্স ক্রপটকিন আসার কথা!’ অবলা তাকায় নিবেদিতার দিকে।
জগদীশ উত্তর দেয়, ‘আমার ইচ্ছে রবিবাবুর গল্পের ইংরেজি অনুবাদ ওঁদের শোনানোর।’
‘সে আমি রেডি করে ফেলেছি, বেয়ার্ন! গুড নাইট।’

আশ্চর্য এক বৈজ্ঞানিক শিশুর মতো ধীরে ধীরে চলে যাচ্ছেন ঘুমোতে। মাস কয়েক আগে যে বিজ্ঞানী প্যারিস বিজ্ঞান কংগ্রেসে বলেছেন On the similarity of effect of Electrical Stimulus on Inorganic and living substance বিষয়ে। সেই বিজ্ঞানী কয়েক মাসের মধ্যে আরেক বিজ্ঞান সভায় বলবেন The Response of Inorganic Matter to Mechanical and Electrical Stimulus বিষয়ে। এই পেপারের ফাইনাল ড্রাফট তৈরি করছেন নিবেদিতা। ‌পরের চিন্তা একটি বই প্রকাশ করা।
একদিকে জগদীশচন্দ্র বিজ্ঞানের মধ্য দিয়ে পৌঁছে যেতে চাইছেন জগৎময় চৈতন্যের অস্তিত্বে আর অপরদিকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর স্পর্শ করতে চাইছেন বিশ্বময় এক মানব-আত্মার যোগসূত্র। স্বামীজি কি একই জায়গায় পৌঁছতে চাইছেন না? এক পরম সৃষ্টিশীলতার দোলায় দুলছেন নিবেদিতা। এক অস্পষ্ট সাঁকো দুলে উঠছে। মহাশূন্য থেকে ভেসে আসা অস্পষ্ট সাঁকো দুলে দুলে উঠছে খুব ধীরে ধীরে। নিবেদিতা ভাসতে ভাসতে চলেছেন সেই সাঁকোর দিকে। এক স্বর্গীয় অনুভূতির ভেতরে তলিয়ে গেলেন। সাঁকোটা দুলছে…
অবলার ডাকে ঘুম ভাঙল নিবেদিতার।

পিটার ক্রপটকিন

নৌকায় চোখ বুজে বসে থাকলে এক আশ্চর্য দুলুনির অনুভব হয়। মনে হয় শূন্যে বসে আছে। চারপাশে কিছু নেই। মহাশূন্যে একা। দুলছে। খুব ভয় হয়। চারপাশের দৃশ্যসম্বন্ধীয় পরিপ্রেক্ষিত দরকার হয়। নাহলেই নিরালম্ব ভাসমান অনুভব চেপে ধরে। নিবেদিতা চোখ খোলে। ঘোলাটে মেঘ সরিয়ে সূর্য তেজমান হয়ে উঠেছে। সরাসরি চোখে পড়ছে। গোপালের মা মাথা নামিয়ে বসে আছেন সেই থেকে। কান্না একসময় গভীর স্তব্ধতায় ডুবে যায়। তরুণ সন্ন্যাসীও স্থির বসে আছে। নৌকা এগিয়ে চলে স্রোত কাটিয়ে কাটিয়ে বেলুড়ের দিকে। ওইখানে শায়িত আছেন ধর্ম ও বিজ্ঞানকে একাসনে রাখতে চাওয়ার স্বপ্নসন্ধানী এক বীর। ধর্মের মূল সত্য বিজ্ঞানের দ্বারা পরীক্ষিত সত্য রূপে গৃহীত হবে — এই ছিল স্বামীজির চিন্তন। নিবেদিতার ভেতরে ছবির মতো ভেসে আসে জামশেদজি টাটার বিজ্ঞান গবেষণা কেন্দ্র গড়ে তোলার জন্য স্বামীজির প্রবল আগ্রহ। জগদীশচন্দ্রের গবেষণা যখন পদার্থ বিজ্ঞানের গণ্ডি অতিক্রম করে জড় ও জীবের মধ্যে অখণ্ড সত্যের আভাস পেতে শুরু করেছে, তখন তিনি উচ্ছ্বসিত হয়েছেন। তাঁর অদ্বৈতবাদী মনন কৃতজ্ঞতায় ভরে উঠেছে। পুলকিত হয়েছিলেন তিনি। সেই অদ্বৈতবাদী সন্ন্যাসী কায়মনোবাক্যে চেয়েছিলেন আধুনিক বিজ্ঞান গবেষণাগার তৈরি হোক ভারতে। বাংলার স্পষ্ট উচ্চারণ, উচ্ছ্বসিত উপস্থিতি দেখতে চাইছেন বিজ্ঞানের বিশ্ব-মানচিত্রে। সব স্বপ্ন আর কিছুক্ষণ বাদেই ভস্ম হয়ে ভেসে যাবে। এই গঙ্গায় মিলিয়ে যাবে, এই বাতাসে মিশে যাবে স্বপ্নময় প্রাণবায়ু। যায় কি? প্রবাহের মধ্যে থেকে যায়। বাহিত হয় প্রাণ থেকে প্রাণে। নিবেদিতা তাকিয়ে থাকেন গঙ্গার প্রবাহের দিকে।

জামশেদজি টাটাকে আজ আরও বেশি তরতাজা লাগছে। সারা বুল তাঁর প্রভাব খাটিয়ে এই দুপুরের আহার ও মিটিংয়ের ব্যবস্থা করেছেন। মিটিংয়ের মধ্যমণি এখনও আসেননি। তিনি হলেন ভারতের শিক্ষা সম্পর্কিত যাবতীয় সিদ্ধান্তের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা স্যার জর্জ বার্ডউড । তাঁরই জন্য অপেক্ষায় সবাই। মাত্র চারজনের এই সাক্ষাৎকার। জামশেদজি টাটা, সারা বুল, নিবেদিতা এবং জর্জ বার্ডউড। সপ্রতিভ নিবেদিতা। তিনি জানেন তাঁর প্রিয় বৈজ্ঞানিক বন্ধু দেশে ফেরার পর বিদেশি কর্মকর্তা এবং সহকর্মীরা হাজার জটিলতা সৃষ্টি করে জীবন দুর্বিসহ করে তুলবে। আলোচনা চলছে নানাবিধ সৌজন্যমূলক। আর অপেক্ষা করা যাচ্ছে না! নিবেদিতা ভেতরে ভেতরে নানা কথার পর কথা সাজিয়ে রেখেছেন। সেগুলো ভেতরে নিয়ে উলটপালট করছেন। যদি ব্রিটিশ সরকার রাজি হয়ে যায় এবং প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক দায়িত্ব দেশীয় শিক্ষাবিদদের না দিয়ে নিজেদের হাতে রাখেন! তাহলে তো সমস্ত পরিকল্পনা ব্যর্থ। জামশেদজি টাটা অবশ্য সেক্ষেত্রে অর্থ ব্যয় করবেন না। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা দেশীয় শিক্ষাবিদদের তথা গবেষকদের হাতে থাকলেই মি.টাটা এগিয়ে আসবেন। সেই প্রস্তাব নিয়ে তিনজন অপেক্ষা করছেন লাঞ্চে জর্জ বার্ডউডের জন্য।
জামশেদজি টাটা ৩০ লক্ষ টাকা ব্যয়ে ভারতবর্ষে, বিশেষ করে কলকাতায়, গড়ে তুলতে চান আধুনিক বিজ্ঞান শিক্ষাকেন্দ্র সহ গবেষণাগার। সেই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শীর্ষে থাকবে মেধাভিত্তিক অগ্রাধিকারে ভারতীয়দের প্রাধান্য। অর্থাৎ মোদ্দা কথা দেশীয় অর্থে দেশীয় উচ্চতর বিজ্ঞান শিক্ষাকেন্দ্র। সুতরাং ব্রিটিশ শাসককে বোঝাতে পারলে জগদীশচন্দ্র তাঁর নিজের দেশে নিজে স্বাধীনভাবে বিজ্ঞান গবেষণা চালিয়ে যেতে তো পারবেনই, একই সঙ্গে ভবিষ্যতের গবেষকদের তৈরি করতে পারবেন। স্বামীজির বহুদিনের স্বপ্ন পূরণ হবার সূচনা কর্ম হিসেবে এই বিজ্ঞানের উচ্চশিক্ষা কেন্দ্র গড়ে উঠতে পারে। নিবেদিতা তাই সারা বুলের স্মরণাপন্ন হয়েছেন। পার্সী ব্যবসায়ী জামশেদজি টাটা আছেন এখন ইংল্যান্ডেই। তাঁর সঙ্গে আছেন বারজোরজি পাদশা। জামশেদজি টাটার দক্ষিণ হস্ত এই পাদশা ভদ্রলোক। বিশেষ করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সংক্রান্ত বিষয়ে মি. টাটার মূল উপদেষ্টা মি. পাদশা। নিবেদিতার বেশ প্রিয় এই ভদ্রলোক। আলাপ হয়েছিল ১৮৯৯ সালের মাঝামাঝি সময়ে। মি. পাদশা ও তাঁর বোন এসেছিলেন স্বামীজির কাছে শিক্ষা নিয়েই আলোচনা করতে এবং উপদেশ নিতে। স্বামীজিকে চিঠি লিখেছিলেন মি. টাটা ১৮৯৮ সালের ২৩ নভেম্বর — “ভারতে বৈজ্ঞানিক গবেষণাগার স্থাপন সম্বন্ধে আমার পরিকল্পনার কথা আপনি নিশ্চয় শুনেছেন বা পড়েছেন। এই প্রসঙ্গে আপনার চিন্তা ও ভাবরাজির কথা আমি স্মরণ করছি। মনে হয়, যদি ত্যাগব্রতী মানুষেরা আশ্রমজাতীয় আবাসিক স্থানে অনাড়ম্বর জীবন যাপন করে প্রাকৃতিক ও মানবিক বিজ্ঞানের চর্চায় জীবন উৎসর্গ করে — তাহলে তার অপেক্ষা ত্যাগাদর্শের শ্রেষ্ঠতর প্রয়োগ আর কিছু হতে পারে না। আমার ধারণা, এই জাতীয় ধর্মযুদ্ধের দায়িত্ব কোনও যোগ্য নেতা গ্রহণ করলে তার দ্বারা ধর্মের ও বিজ্ঞানের উন্নতি হবে, এবং দেশের সুনাম বৃদ্ধি পাবে। আর এই অভিযানে বিবেকানন্দের তুল্য মহানায়ক কে হতে পারেন! আপনি কি এই পথে আমাদের জাতীয় ঐতিহ্যকে নবজীবন দান করবার জন্য আত্মনিয়োগ করবেন? বোধহয় শুরুতে এ-ব্যাপারে জনসাধারণকে উদ্দীপিত করবার জন্য অগ্নিময় বাণী সম্বলিত একটি পুস্তিকা প্রচার করলেই ভাল করবেন। প্রকাশের সমস্ত ব্যয়ভার আমি সানন্দে বহন করব। শ্রদ্ধানত, হে প্রিয় স্বামীজি, আপনার বিশ্বস্ত, জামশেদজি এন টাটা।”
জামশেদজি টাটার এই চিঠির কয়েকমাস পরেই ১৮৯৯ সালের এপ্রিল সংখ্যায় ‘প্রবুদ্ধ ভারত’ পত্রিকায় লেখা হল, “ভারতের মঙ্গলের জন্য এ-পর্যন্ত যত পরিকল্পনা করা হয়েছে, তাদের মধ্যে মি. টাটার পোস্ট গ্রাজুয়েট ইউনিভার্সিটি পরিকল্পনার অপেক্ষা সময়োচিত ও সুদূরপ্রসারী ফলপ্রদ আর কিছু হয়েছে কি না সন্দেহ। পরিকল্পনাটি আমাদের জাতীয় উন্নতির ক্ষেত্রে ঠিক দুর্বল জায়গাটি কোথায় তা পরিষ্কার অনুধাবন ক’রে, তার দূরীকরণে যে-প্রকার স্বচ্ছ দৃষ্টি, সুনির্দিষ্ট বুদ্ধি দেখিয়েছে, তার অনুরূপ শ্রেষ্ঠত্ব একমাত্র দেখা গেছে ওই পরিকল্পনার সহগামী বিপুল বদান্যতার মধ্যে।… যদি ভারতকে বাঁচতে ও উন্নতি করতে হয়, যদি পৃথিবীর মহান জাতিসমূহের মধ্যে ভারতীয় জাতিকে স্থানলাভ করতে হয়, তাহলে প্রথমেই খাদ্যসমস্যার সমাধান করতে হবে আর এই তীব্র প্রতিযোগিতার দিনে ওই সমস্যার সমাধান একমাত্র হতে পারে — মানবজাতির প্রধান দুই অন্নদাতা — কৃষি ও বাণিজ্যের অন্ধিসন্ধিতে আধুনিক বিজ্ঞানের অনুপ্রবেশের দ্বারা।… পুনর্বার বলছি : আধুনিক ভারতে জাতির মঙ্গল-সম্ভাবনায় আকীর্ণ এই ধরনের আর কোনও পরিকল্পনা উপস্থিত করা হয়নি। সুতরাং সমস্ত জাতি যেন শ্রেণী ও সম্প্রদায়গত ক্ষুদ্র স্বার্থের উপরে উঠে পরিকল্পনাটিকে সফল করবার জন্য আত্মনিয়োগ করেন।”
নিবেদিতা গুছিয়ে নিচ্ছেন নিজেকে। মাঝে মাঝে সারা বুল এবং জামশেদজি টাটার সঙ্গে কথা বলে জাগ্রত রাখছেন মন। এই পরিকল্পনা সফল হলে স্বামীজির দীর্ঘদিনের ঘোষিত আকাঙ্ক্ষার বাস্তবায়ন হবে। এবং একই সঙ্গে জগদীশচন্দ্রের দেশে ফিরে যথার্থ কাজের জায়গা তৈরি হয়ে থাকবে। সারা বুল হঠাৎ উঠে এগিয়ে যেতেই মি. টাটা উঠলেন, সঙ্গে সঙ্গে নিবেদিতা উঠে তাকালেন। সারা বুল এগিয়ে গিয়ে অভিবাদন করে নিয়ে এলেন জর্জ বারউডকে। প্রাথমিক আলাপ ও পারস্পরিক সম্ভাষণের পর সবাই লাঞ্চ টেবিলে বসলেন। কথাবার্তা শুরু করলেন সারা বুল। জামশেদজি টাটা পরিষ্কার করে বোঝালেন তিনি ৩০ লক্ষ টাকা দান করতে চান এই ধরনের স্নাতকোত্তর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জন্য। নিবেদিতা জানতে চান ব্রিটিশ সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি কী এই বিষয়ে!
‘এটা কি একটি ভাল পরিকল্পনা নয় শিক্ষার প্রসারের ক্ষেত্রে?’ সারা বুল সরাসরি প্রশ্নটি রাখেন জর্জ বারউডের কাছে।
‘হুম। প্রাথমিকভাবে পরিকল্পনাটি ভাল, সরকারি কোষাগার থেকে যখন খরচা হচ্ছে না। তবে প্রশাসনিক জায়গাটি দেখে নেওয়া দরকার।’ মি. বারউড সায় দিলেন।
নিবেদিতা অধৈর্য হয়ে ওঠেন, ‘শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নিয়োগের বিষয়টি জানতে চাইছি। মানে সরকার যখন শিক্ষক ও গবেষকদের নিয়োগ করবে, তখন নিশ্চয়ই আবেদনকারীর বৈজ্ঞানিক পারদর্শিতার নিরিখেই সেটা হবে?’
‘সে অসম্ভব। এই বিষয়টি নিয়ে ভারত সচিবের সাথে আমার মত বিনিময় হয়েছে। তিনি চাইছেন একটি পরীক্ষা নেওয়া হবে বলে কাগজে কাগজে বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হবে। সেই পরীক্ষার ফলাফল অনুযায়ী নিয়োগপত্রের তালিকা তৈরি হবে।’ উত্তর দিলেন জর্জ বারউড।
‘আপনার মনে হয় না এইরকম পদ্ধতিতে নিয়োগ হলে বিপদের সম্ভাবনা প্রবল বাড়বে?’ নিবেদিতা তাকালেন স্থির চোখে।
সারা বুল নিবেদিতার দিকে তাকায়, ‘তুমি কি বলছ ভারতবাসীর অসন্তোষের কথা?’
জর্জ বারউড কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলে, ‘থাকতে পারে সে সম্ভাবনা! তবে আমি মনে করি না যে, এমন সম্ভাবনা বাস্তবিকই আছে। ভারতবাসীরা কখনও আমাদের বিরুদ্ধে মাথা তুলবে না। শাক-সবজি খায়, গোবেচারা ওরা!’

বিজ্ঞানী অলিভার লজ

“And do you not think that such a state of things involves the gravest danger?” I asked.
“It ought to do so…” replied Sir G.B., “but I do not for one moment believe that it does. The people of India will never rise against us. They are all vegetarians.”
“I was thinking of dangers to India — not to ourselves” – I replied – and here – if I am not mistaken – he carelessly acquiesced.

All through this part of the lunch, the meanest notes were continually struck …
The sweets arrived before Mr Tata spoke the word “University.” By these time I was in despair – seeing that if I left the battle to the others, we could not force Sir George Birdwood to make any statement. I determined to break my pledge of silence – and I asked him at once. ( ১৯০০ সালের ৫ নভেম্বরের চিঠিতে নিবেদিতা অবলা ও জগদীশচন্দ্র বসুকে জর্জ বারউডের সঙ্গে আলোচনার অনুপুঙ্খ বর্ণনা দিয়েছেন।)
“মি. টাটা যে স্নাতকোত্তর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রস্তাব করেছেন তাতে অধ্যাপক পদে ভারতীয়দের নিয়োগের ক্ষেত্রে কী ধরনের বিধান চালু করার প্রস্তাব করছেন স্যার জর্জ?” নিবেদিতা সরাসরি প্রশ্নটি ছুড়ে দিলেন শিক্ষা সচিবের সামনে।
মি. জর্জ বিব্রত বোধ করেন আচমকা সরাসরি প্রশ্নে – “I would propose nothing. It would be suicidal to the interest of Science to do anything of the sort. The Post Graduate University must stand for the interests of SCIENCE – and that is a world question – not an Indian problem at all. It must be open to all the world.”
“And how would you make it open to all the world?”
“By throwing the whole thing, as I keep saying to Mr Tata, unreservedly into the hands of Government authority .”
কিন্তু নিবেদিতা সহজে কোনও বিষয় ছাড়েন না।
“How do you propose then that candidates should be nominated ( I do not mean appointments made) in order to secure that the P.G.U. [ Post Graduate University ] serve the Science of the world?”
“By constituting advisers in all the universities of the world”.
“- including Calcutta, Madras and Bombay?”
“Certainly not. The Indian universities are already deteriorating – and Calcutta is the worst.”
“But they are completely in Government control!”
“Yes – but they are deteriorating. They would not be safe advisers.”
নিবেদিতা মি. টাটার দিকে ফিরে ঝড়ের মতো বলে গেলেন, “মি. টাটা, আমি এটা বলতে পারি না যে, স্যার জর্জ বারউড আমাদের ইউনিভার্সিটির বিপক্ষে যথেষ্ট যুক্তি সংগত কারণ দেখাতে পেরেছেন! সেক্ষেত্রে আপনি ভাববেন আপনার টাকা সেই প্রশাসকের হাতে তুলে দেবেন কি না, যাদের অদক্ষতা সর্বসমক্ষে প্রমাণিত হয়েছে!”

বেশ কিছুক্ষণ বিতর্কের পর যখন গবেষণার ক্ষেত্রে প্রতিভা ও দক্ষতার প্রসঙ্গ উঠল, নিবেদিতা জ্বলে উঠলেন, “আর কয়েক মাস পড়েই এই ইংল্যান্ডে বিজ্ঞানের নতুন দিকে আলোকপাত করতে চলেছেন এক ভারতীয় বৈজ্ঞানিক।” তাছাড়াও তিনি বললেন, বিজ্ঞান, সাহিত্য, চিকিৎসাশাস্ত্র, আইনশাস্ত্র, শিল্প সহ শিক্ষার সমস্ত ক্ষেত্রে প্রতিভার অভাব নেই ভারতবর্ষে। প্রতিনিধি-স্থানীয় তালিকা পাঠিয়ে দেবেন বলেও জানিয়ে দেন নিবেদিতা।

সেদিনই সন্ধ্যায় সেই চিঠি এসে পৌঁছে গেল জগদীশচন্দ্রের হাতে। সেই চিঠিতে নিবেদিতা সমস্ত আলোচনা তুলে দিয়ে নির্দেশ দিয়েছেন, “তোমরা দু’জন এক্ষুনি আমাকে ভারতীয়দের নামের তালিকা পাঠাও, যাঁরা সত্যিকার গুণী-জ্ঞানী, অথচ বিলাতি বিশ্ববিদ্যালয়ে অবহেলায় গড়াগড়ি যাচ্ছেন। বৈজ্ঞানিক, আইনজীবী, ডাক্তার, ভাষাতত্ত্ববিদ তাঁদেরও নাম দাও। আমি সবারই পক্ষ নেব।”

নিবেদিতা মনোনিবেশ করলেন জগদীশচন্দ্রের আসন্ন রয়্যাল সোসাইটির বক্তৃতার উপর। তাঁর গবেষণা ও স্বাস্থ্যের উপর। প্রাণান্তকর পরিশ্রম করছেন এক তপোব্রত বিজ্ঞানী। তাঁকে বিব্রত করা ঠিক হয়নি। তবে নিবেদিতা বলেছেন, অত ডিটেইলসে চিঠিতে লেখার কারণ হল একটা ডকুমেন্টস থেকে যাওয়া। চিঠি তো ডকুমেন্টস! এই সময়ে যোগাযোগ করছেন নিবেদিতা রয়্যাল সোসাইটির বক্তৃতার জন্য বিভিন্ন জায়গায়। নিবেদিতা ও সারা বুল জানেন যে বিরোধিতা আসতে পারে বিভিন্ন বিজ্ঞানীদের থেকেই। তাই সারা বুল তাঁর প্রভাব খাটিয়ে নজর রেখেছিলেন বিরুদ্ধাচরণের দিকে। নজর ছিল নিবেদিতারও। লিখে চলেছেন দ্রুত জগদীশচন্দ্রের পেপার তৈরির সহায়তামূলক লেখাগুলি। অনুবাদ করে চলেছেন দ্রুত কবিবন্ধুর ছোটগল্প।

…he put his hand inside his big loose robe, and brought out a small and dirty piece of paper. With great care he unfolded this, and smoothed it out with both hands on my table. It bore the impression of a little hand. Not a photograph. Not a drawing. The impression of an ink-smeared hand laid flat on the paper. This touch of his own little daughter had been always on his heart as he had come year after year to Calcutta, to sell his wear in the streets.
Tears come to my eyes. I forgot that he was a poor Cabuli fruit-seller, while I was – but no, what was I more than he? He also was a father.
That impression of the hand of his little Parbati in her distant mountain home reminded me of my own little Mini.
নিবেদিতা একটু থামলেন। সামনে টি-টেবিলে গ্লাসে রাখা জল খেলেন। নিস্তব্ধ ঘর। সবাই চুপ। ক্রপটকিন চশমা খুলে চোখের কোণে জমে থাকা জল মুছলেন। তাকালেন।
‘কী নাম বললেন গল্পকারের?’ ক্রপটকিন ধীরে প্রশ্নটি করলেন।
‘রবীন্দ্রনাথ টেগোর। উনি অসাধারণ এক কবি!’ নিবেদিতা ক্রপটকিনের দিকে তাকায়।
‘মারভেলাস! লেটস্ ফিনিশ দ্য স্টোরি ফার্স্ট।’ ক্রপটকিন নিজেকে গুছিয়ে নিয়ে বসেন সোফায়। জগদীশচন্দ্রের চোখেমুখে আনন্দের ঝিলিক। অবলার সঙ্গে একবার চোখাচোখি হয়। সারা স্থির বসে আছেন। গল্পের অভিঘাত তাঁর গভীরে।
নিবেদিতা পড়া শুরু করলেন —
“আমি তৎক্ষণাৎ তাহাকে অন্তঃপুর হইতে ডাকাইয়া পাঠাইলাম। …রাঙা চেলি পরা, কপালে চন্দন আঁকা, বধূবেশিনী মিনি সলজ্জ ভঙ্গিতে আমার কাছে আসিয়া দাঁড়াইল।
তাহাকে দেখিয়া কাবুলিওয়ালা প্রথমটা থতমত খাইয়া গেল, তাহাদের পুরাতন আলাপ জমাইতে পারিল না। অবশেষে হাসিয়া কহিল, ‘খোঁখী তোমি সোসুরবাড়ি যাবিস্?

মিনি এখন শ্বশুরবাড়ির অর্থ বোঝে, এখন আর সে পূর্বের মতো উত্তর দিতে পারিল না— রহমতের প্রশ্ন শুনিয়া লজ্জায় আরক্ত হইয়া মুখ ফিরাইয়া দাঁড়াইল। কাবুলিওয়ালার সহিত মিনির যেদিন প্রথম সাক্ষাৎ হইয়াছিল আমার সেইদিনের কথা মনে পড়িল। মনটা কেমন ব্যথিত হইয়া উঠিল।
মিনি চলিয়া গেলে একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিয়া রহমত মাটিতে বসিয়া পড়িল। সে হঠাৎ স্পষ্ট বুঝিতে পারিল, তাহার মেয়েটিও ইতিমধ্যে এইরূপ বড় হইয়াছে, তাহার সঙ্গেও আবার নতুন আলাপ করিতে হইবে — তাহাকে আর পূর্বের মতন তেমনটি আর পাইবে না। এই আট বৎসরে তাহার কী হইয়াছে তাই বা কে জানে।
The marriage -pipes sounded, and the mild autumn sun streamed round us. But Rahmud sat in the little Calcutta lane, and saw before him the barren mountains of Afghanistan.
ধীরে ধীরে গল্পটি পড়া শেষ করেন নিবেদিতা — But to me the wedding feast was all the brighter for the thought that in a distant land a long lost father had met again with his only child.

মনীষী ও বিপ্লবী ক্রপটকিন প্রাথমিক বিমূঢ়তা কাটিয়ে বললেন, ‘আমি এমন দুঃখের গল্প পড়িনি, আমাদের দেশের শ্রেষ্ঠ গল্পকারদের গল্পেও নয়। এমন বিশ্বজনীন আবেদন খুব কম গল্পেই পাওয়া যায়।’
‘ব্রিটিশ সরকার এই ভারতীয় প্রতিভাসম্পন্ন মেধার বিকাশ ঘটাতে দিতে চায় না। বিশ্বের কাছে আসতে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।’ নিবেদিতা বলে ওঠে।
ক্রপটকিন শান্ত, ‘ভারতীয়দের জাতিসত্তা গড়ে তোলা প্রয়োজন, nationhood, স্বাধীনতা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে স্বতন্ত্র জাতি হিসেবে স্বাধীন সত্তা নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে।’
‘আপনার Mutual Aids পড়েছি। মানুষের মুক্তি সংগ্রামের মধ্যে, স্ট্রাগল ফর এক্সিসটেন্স…।’
অবলা এগিয়ে আসে কফির ট্রে নিয়ে, ‘মার্গারেট তো আপনার একটি বক্তৃতাও মিস করে না, শুনতে যাবেই, ও বলে আপনি নাকি ‘King of modern day Sociologists!’
সবাই হেসে ওঠে। নিবেদিতা একটু লজ্জা পান। যদিও তাঁর সঙ্গে ক্রপটকিনের বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছে বেশ ভাল। নানা বিষয়ে আলোচনা হয়। এই মুহূর্তে নিবেদিতা সেই সুযোগ ছাড়েন না, ‘আপনি সংগ্রাম ও ঐক্যের কথা বলেন… ভারতবর্ষের ক্ষেত্রে…’
ক্রপটকিন তাঁর বড় বড় দাড়িতে হাত বুলিয়ে নেন একবার, ‘ক্রমাগত রাষ্ট্রীয় শোষণের বিরুদ্ধে লড়াই। ভারতবর্ষকে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকতার বিরুদ্ধে লড়াই করে স্বাধীন দেশ হিসেবে উঠে দাঁড়াতে হবে, সংগ্রাম ও ঐক্যের তাৎপর্য বুঝতে হবে।’
‘ডারউনিইজম থেকে স্যোসালইজমের দিকে মানব-যাত্রার কথা বলেন আপনি!’ নিবেদিতা কথা এগিয়ে নিয়ে যেতে চান।
‘জীবন ধারণের অনিবার্য প্রাথমিক শর্ত সংগ্রাম। উৎপাদনের বণ্টন নিয়ে সংগ্রাম অনিবার্য সমাজ ব্যবস্থায়। ভারতবর্ষকে ঐক্যবদ্ধ এক জাতি হিসেবে সংগ্রাম করতে হবে ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে।’
‘সে তো রাজনৈতিক সংগ্রাম!’ নিবেদিতা তাকালেন ক্রপটকিনের দিকে।
ক্রপটকিন দাড়ি-গোঁফের আড়াল থেকে সম্মতিসূচক হাসলেন।
রাতের ডিনারের পর ক্রপটকিন বিদায় নিলেন। অসাধারণ এক বিশ্ব-মানবতার গল্প অনুবাদ করার জন্য ধন্যবাদ জানালেন নিবেদিতাকে। ‘মি. টেগর’-এর আরও গল্প অনুবাদের অনুরোধ করে গেলেন।

নিবেদিতা এসে বসলেন নিজের ঘরে। জানালা দিয়ে তাকিয়ে থাকলেন বাইরে। নির্জন উইম্বলডনের রাস্তা সোজা গিয়ে নানা দিকে বাঁক নিয়েছে। বিভিন্ন পথিক নিজেদের গন্তব্য অনুযায়ী নির্দিষ্ট দিকে বেঁকে যাচ্ছে। ন্যাশানালিটি, জাতীয়তা বোধ, জাতিসত্তা, সংগ্রাম ইত্যাদি ইত্যাদি নানা শব্দ মাথায় কিলবিল করছে। এক জাতি, এক দেশ — বিবিধের মাঝে ঐক্য। দেশমাতা— এই অনুভব তৈরি করা। বিবেকানন্দ হেঁটে চলেছেন ভারতবর্ষের পথে, ভারতবাসীকে ভ্রাতৃত্ববোধে জাগিয়ে তোলার কথা বলছেন। স্বামীজি চিনিয়েছেন দেশ ভারতবর্ষ। ভারতবর্ষকে বেদান্তের সুতোয় বাঁধতে চান। সেও ন্যাশানালিটির প্র্যাকটিস। কিন্তু সেই গভীরতায় কোন ভারতবর্ষ সাড়া দেবে! নিরন্ন, অত্যাচারিত, অভুক্ত, দরিদ্র ভারতবর্ষের মানুষ সেই বৌদ্ধিক আন্দোলনের কতটুকু গ্রহণ করতে পারবে! নিবেদিতা এক গভীর ভাবনায় ডুব দেন। সামনে ভারতবর্ষ নামক দেশের মানচিত্র দুলে দুলে ওঠে — “The whole task now is to give the word ‘nationality’ to India, in all its breadth and meaning.” একদিন যা লিখবেন আজ এই রাতে তার খসড়া তৈরি হতে থাকে — “the one essential fact is realisation of its own nationality by the Nation.” জাতীয়তাবাদী ভারতবর্ষের মানচিত্র উঠে আসে গভীর অন্ধকার থেকে। এক জাতি, এক দেশ, এক পতাকা, এক আওয়াজ, এক দাবি — স্বাধীনতা, মুক্তির সংগ্রাম।

সহযোগিতার হাত বাড়াতে ওপরের ছবিতে ক্লিক করুন

[পর্ব-১১]

[পরম্পরা ওয়েবজিন, মার্চ ২৫, সূচিপত্র – এখানে ক্লিক করুন]

5 1 ভোট
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
4 Comments
Oldest
Newest Most Voted
পংক্তির ভেতর মন্তব্য
সব মন্তব্য
Ivy Chattopadhyay
Ivy Chattopadhyay
1 day ago

অসাধারণ l পড়তে পড়তে হারিয়ে গেছিলাম ইতিহাসের সময়ে l লেখার শেষে এসে চোখ ভিজে এল l অসাধারণ লেখা l

Rajat Chakraborti
Rajat Chakraborti
1 day ago

ধন্যবাদ আপনাকে। সে এক আশ্চর্য সময়, সে অত্যাশ্চার্য সজ্ঞাতীত দর্শন যাত্রা।

শিপ্রা ভৌমিক
শিপ্রা ভৌমিক
1 day ago

স্বামীজি-নিবেদিতা-রবীন্দ্রনাথ- জগদীশচন্দ্র-এই চতু্র্ভুজ তৈরির সময়টাকে দেখতে পাচ্ছি!রবীন্দ্রনাথের নোবেল প্রাপ্তিরও বীজ বপন হচ্ছে!সাঁকো পেরোতে কোনো অসুবিধে হচ্ছে না!

Rajat Chakraborti
Rajat Chakraborti
1 day ago

সঙ্গে থাকুন। কতদূর ওনারা নিয়ে যান দেখা যাক।