
আমার আটপৌরে দিন যাপন ছোটোবেলার দিন – ২
মকর সংক্রান্তি
আজ আমি পুরীর সমুদ্র সৈকতে পৌঁছেছিলাম বেশ ভোরে, আলো ফোটেনি, চারিদিকে অন্ধকার, যদিও সৈকত জুড়ে হাজার মানুষের সমাগম। ধর্মীয় মতে, আজ মকর সংক্রান্তির পূণ্য স্নান।
একটু ফাঁকা জায়গায় সমুদ্রের দিকে মুখ রেখে চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিলাম। না, নৈঃশব্দ্য ছাপিয়ে বহু কলরবে আমি আলোড়িত ছিলাম। “লহরীর পরে লহরী তুলিয়া” আমার মন ছিল উদভ্রান্ত, আমি বলতে চাইছিলাম, ” দে দোল দোল, দে দোল দোল /… এ মহাসাগরে তুফান তোল/ বধুকে আবার পেয়েছি আজিকে ভরেছে কোল/ প্রিয়ার আমার জাগায়ে তুলেছে প্রলয় রোল” , আমি দূরের নৌকার মাঝিকে চিৎকার করে বলেছি, ” ওগো তুমি কোথা যাও, কোন বিদেশে… বারেক ভিড়াও তরী কূলে তে এসে” … মাঝি শুনতে পায়নি।
বাবার কথা মনে পড়ছিল, ছোটবেলা থেকে দেখেছি, প্রতিটি মকর সংক্রান্তির ঊষালগ্নে বাবা গঙ্গাস্নান করতেন নিজের বিশ্বাসে, স্নান সেরে ফিরে বাবা আমাদের মাথায় জলের ছিটে দিতেন, সমস্ত ঘরদোরে সংক্রান্তির গঙ্গাজল ছিটিয়ে দিতেন।
হিন্দু দর্শন অনুসারে, মকর সংক্রান্তির দিন গঙ্গার মত পবিত্র নদীতে স্নান করলে, সূর্যকে প্রণাম ও পুজো করলে
ভক্তদের ভাগ্য শক্তিশালী হয়, সূর্যদেবের কৃপা পেলে কর্মজীবনেও বড় সাফল্য অর্জত হয়।

বাবা এসব বিশ্বাস নিজের মধ্যেই রাখতেন, কোনো দিন এসব নিয়ে কাওকে বাধ্য করেননি, তর্ক করেননি, কোনো সিদ্ধান্ত কখনো কারও ওপর চাপিয়ে দেননি।
“কী জানি কী হলো আজি, জাগিয়া উঠিল প্রাণ, দূর হতে শুনি যেন মহাসাগরের গান “
এই সমুদ্র সৈকতে, বাবার কথা মনে পড়ছে… মেয়ে সোহিনী, নাতনী আরাত্রিকা হাজির, আমার পাশে।
আমি দেখছি, কত মনুষ পূণ্য স্নান করছেন, স্থানীয় কত কূলবধু নিষ্ঠা ভরে বালির ওপর কাল্পনিক আলপনা আঁকছেন, প্রদীপ, ফুল আর উলুধ্বনি তে সূর্য প্রণাম করছেন… বহু মানুষ দূর হতে জোড় হাতে নমস্কার করছেন সূর্যকে।
আমি মন্ত্রমুগ্ধের মত সমুদ্রের জল নিজের মাথায়, সোহিনী- আরাত্রিকার মাথায় ছেটালাম। খালি জলের বোতলে খানিকটা জল নিয়ে হোটেলে ঢুকলাম। আমার নিজের বলতে কাছেই যারা ছিল, দিদি, জামাতা, বেয়াই-বেয়ান সকলের মাথায় জল ছিটালাম এবং ঘরের এদিক-সেদিক… আমার নাতনী মেহুলীকে খুব মনে পড়ছিল… ওর হয়ে, সকলের হয়ে পূণ্য জল মাখলাম নিজের মাথায়…
বাবার কথা আজ খুব মনে পড়ছিল-সেই স্থিতধী মানুষ টির কথা, যিনি নীরবে আমাদের জন্য বিলিয়ে দিতেন পূণ্য…
আমার লেখা দুটো পুরোনো লাইন, মনে পড়লো,
“দু এক জনা বৃদ্ধ কেবল গঙ্গাস্নানে / পাপ কাটাতে, ফুল ফোটাতে আজোও ছোটে”

