যখনই আমি মেয়ের কাছে আসি আমেরিকায়, প্রাতঃ ভ্রমণ আমার নেশা। নির্দিষ্ট রাস্তায় ফুটপাত ধরে হাঁটি, ছবির মতন সাজানো শহর দেখি, অনুভব করি চারপাশ।
এখানে ক্যালিফোর্নিয়ার San Jose, Santa clara অঞ্চলে দেখেছি রাস্তায় মানুষ নেই, মাঝে মাঝে পোষ্য কুকুরh নিয়ে হাঁটে — এরা কথা বলে না, আমার মতো যেচে আলাপ পছন্দ করে না, টুকটাক হাই, হ্যালো, থ্যাংকস। অগত্যা নিজের মনেই হাঁটি।
আমি ঠিক করেছিলাম আজ ভোরে Zanker Road ধরে পূর্ব, পূর্ব-দক্ষিণ বরাবর হাঁটবো। বাধ সাধলো তাপমাত্রা। ভোরে 0°C – 1°C, এ অবস্থায় মেয়ে- জামাই ছাড়বে না অল্পবয়সী বাবাকে। বেলা বাড়লো, তারপর বেরোলাম।
আমার একটা child ego আছে, রাস্তার ক্রসিং এ নির্দিষ্ট button টিপবো চতুর্দিকে ধাবমান গাড়ি সব থেমে যাবে, আর আমি “কলকাতার যীশু” হেঁটে যাবো এপার থেকে ওপারে। খুব আনন্দ হয়। যারা বড় শহরে ঘোরেন, তারা জানেন, এ ব্যবস্থা। সবাই জানে,হাসবেন, কিন্তু আমার যে সেখানেই আনন্দ, বয়স বাড়ে না।
ফুটপাত ধরে হাঁটছি, চারদিকে নিয়ম করে গাছের সারি। সারি সারি পাইন গাছ…. আমার স্বপ্নের পাইন…. সবুজ গালিচায় খুঁজছিলাম দু একটা পাইন ফুল, পছন্দসই পেলাম না। শান্ত পাইনের সারি, এক হিম শীতল ছায়া নীরবতা দিচ্ছে। মনে হলো ওরা কথা বলছে। কী বলছে জানি না, তবে বুঝতে পেরেছি আমাকে পেয়ে ওরা পুলকিত।
চোখে পড়লো, সবুজ গাছ জুড়ে ছোটো ছোটো রক্তবর্ণ- লাল ফল নিয়ে দাঁড়িয়ে পরপর কয়েকটি Toyon Berry । গাছের সঙ্গে দাঁড়ালাম কিছুক্ষণ। চিনতে পেরেছি, এই ফল খায় পাখীরা। পরিযায়ী পাখীর দল ঝাঁকে ঝাঁকে আসে। এদের আগে দেখেছি Ulistac Natural Area তে, Stanford University র আশে পাশে। Berry র অনুরোধে তাকে নিয়েই Selfie ছবি। আমার এবং গাছেদের মহা আনন্দ।
হাঁটছি, ফুটপাতের ধারে সার দিয়ে কত রকম ফুলের বাহার। সাদা, গোলাপী, বেগুনী, লাল। সবাইয়ের নাম জানি না। তারা শুধু সুন্দর। ধীরে ধীরে এগিয়ে চলেছি, মনে হলো একটু দূরেই ছোটো খাটো সবুজ অরণ্য।


কাছে গিয়ে দেখি ওমা! এ তো কমলালেবুর বাগান! চোখের আন্দাজে মনে হলো কয়েক বিঘা বিস্তৃত। কী তার শোভা। থরে থরে লেবু ঝুলছে গাছে। ঘন সবুজের আবহে কমলা রঙ্ , সে এক নৈসর্গিক দৃশ্য। প্রচুর মানুষ আছেন, প্রচুর ভ্রমণ করেন, তাঁদের কাছে দেশে বিদেশে দেখা এ এক সাধারণ ঘটনা। কিন্তু আমি অবাক বিস্ময়ে ভালবাসা নিয়ে গাছেদের সামনে। একবার স্পর্শ করলাম, উফ্ সে এক শিহরণ। কোথাও কোনো মানুষ নেই।
কোনো বেড়া নেই, প্রাচীর নেই —- আমি কাকে জিজ্ঞাসা করবো, আমাকে একটা লেবু দেবেন ? আমি মাটি থেকেও তুলিনি। শুধু গাছেদের অকথিত অনুরোধে কয়েকটি ছবি তুললাম।
আমি বরাবরই একটু ভীতু সম্প্রদায়ের। চলে এলাম। পরে জেনেছি, আপাত মনুষ্য হীন এসব বাগানে ক্যামেরার কড়া প্রহরা থাকে । সেক্ষেত্রে সাহসী দের বিপদ অনিবার্য।
চলে আসছি, হঠাৎ বাগানের সামনে চোখে পড়লো প্রচুর ফনি মনসার ঝোপ ( Prickly pear বা pear cactus ), কারও মাথায় সুদৃশ্য লাল লাল ফুল। আমি জানি এদের প্রচুর ওষধি গুণ আছে। সে যাই হোক, তা ফনি মনসা এই বনে কেন ? এরা কি বাগানের অঘোষিত পাহারাদার?
না কি কোনো শঙ্খচূড় লুকিয়ে আছে ক্যাকটাসের জঙ্গলে , কমলারাণীর দেখভাল করার জন্য। সবই কাল্পনিক কথন আমার।
আমি একই পথে ফিরলাম। কিছু কিছু টুকরো প্রাতঃভ্রমণ, প্রচুর ভালোলাগা নিয়ে আসে। শীতের সকালে আজকের ভ্রমণ —- টয়ন বেরি, পাইন, ক্যাকটাসের ভীড় ছুঁয়ে ছুঁয়ে কমলা রঙ আমাকে আচ্ছন্ন করলো।

সহযোগিতার হাত বাড়াতে ওপরের ছবিতে ক্লিক করুন

[লেখকের পূর্ব রচনা]

[পরম্পরা ওয়েবজিন, অগাস্ট ২৬, সূচিপত্র – এখানে ক্লিক করুন]

0 0 ভোট
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
পংক্তির ভেতর মন্তব্য
সব মন্তব্য