অঙ্গারেওয়ালি রসিদ জাহান

দিল্লি সফর

‘বহেন, আমাকে ভিতরে আসতে দাও,’ বাইরের উঠোন থেকে শব্দটা শোনা গেল। আর সঙ্গে সঙ্গে কুর্তায় হাত মুছতে মুছতে একটি মেয়ে এগিয়ে এল। নিজের সমস্ত পরিচিতের মধ্যে মালিকা বেগম একমাত্র একজন যে ট্রেনে চড়েছিল এবং তার উপর আবার একদিনের জন্য ফরিদাবাদ থেকে দিল্লি গিয়েছিল। তার সেই কাহিনি শুনতে সমস্ত পাড়াপ্রতিবেশি জড়ো হয়েছে।

‘আরে হ্যাঁ, আসতে চাইলে অবশ্যই চলে এসো। কথা বলতে বলতে আমার চোয়াল ব্যথা করছে! মিথ্যা বললে আল্লাই আমাকে থামিয়ে দেবেন, কিন্তু আমি এই কাহিনি হাজার বার বলেছি। আমি এখানে ট্রেনে চেপেছিলাম আর দিল্লি পৌঁছেছিলাম। কিন্তু সেখানে তিনি এক হতভাগা স্টেশন মাস্টারের দেখা পেয়েছিলেন। লাগেজের উপর আমাকে বসিয়ে রেখে তিনি তার সঙ্গে চলে গেলেন। বোরখা পরে আমি সেখানে বসে রইলাম। ভাবতে পারো সেই দমবন্ধ করা বোরখার নীচে বসে থাকা আর সেই সব অদ্ভূত পুরুষদের মাঝে! জানো তো পুরুষদের কথা। যে মিনিটে তারা এক মহিলাকে একা বসে থাকতে দেখে তারা তাকে ঘিরে দাঁড়ায়। একটা পানও আমি মুখে দিতে পারছিলাম না। সেই হতভাগাদের একজন কাশলো, আর একজন মন্তব্য ছুঁড়ে দিল। আর আমি, আমি ভয়ে প্রায় মূর্ছা যাই। প্রচণ্ড খিদের কথা শুনিয়ে আর কী হবে, একমাত্র খোদাকেই তখন ডেকে চলেছি। ভাবতে পারছো দিল্লি স্টেশন কত বড়! কোন দূর্গও তার থেকে বড় হবে না। এইখান থেকে ঐ অতদূর পর্যন্ত লম্বা, যতদূর চোখ যায়। চোখ পড়ে শুধু রেলের লাইন, ইঞ্জিন আর মালগাড়ি। আর আমাকে সবচেয়ে বেশি আতঙ্কিত করেছে, ইঞ্জিনের মধ্যে কাজ করা সেই আলকাতরা রঙের মানুষগুলো।’
‘কারা ইঞ্জিনের মধ্যে থাকে?’ একজন জিজ্ঞেস করলো।
‘খোদাই জানেন, কারা সেখানে থাকে…ওদের পরনে কালো পোশাক, কিছু মানুষের গালে দাড়ি, অন্যদের দাড়ি কামানো। একহাতে রেলিং ধরে ওরা লাফিয়ে ইঞ্জিনে উঠে পড়ে। যে কেউ সেই দৃশ্য দেখলে ভয় পাবে। আর সাহেব আর মেমসাহেবরা, দিল্লি স্টেশনে এতজন ঘুরে বেড়াছে, গুনে শেষ করা যাবে না। গিট-পিট কথা বলতে বলতে হাতে হাত ধরে ওরা হাঁটছে। আর দেশি ভাইরা চোখ বড় বড় করে ওদের দেখছে। ওদের চোখ যে বেরিয়ে আসছে না, সেটাই আশ্চর্যের ব্যাপার! ওদের একজন আমাকে বললে, “আপনার মুখ দেখাবেন?” আমি সঙ্গে সঙ্গে…।’
একজন ঠাট্টার সুরে বললে, ‘আচ্ছা, তুমি মুখ দেখালে না কেন?’
‘আল্লা-আল্লা, আমি কি সেখানে ওদের মুখ দেখাতে গেছি?’
আর তখন তার স্বর আর চেহারায় এক আকস্মিক পরিবর্তন দেখা গেল, ‘ইচ্ছা হয় তো শোনো, ফোড়ন কেটো না।’ সঙ্গে সঙ্গে এক নীরবতা নেমে এলো। যতই হোক, ফরিদাবাদে কখনো তো কেউ এমন মুখরোচক কাহিনি শোনেনি। মালিকার কাহিনি শুনতে অনেক দূর থেকে মহিলারা এসেছে।

‘আর বিক্রেতারা…আমরা এখানে যেমন দেখি একদমই সেরকম নয়। প্রত্যেকেরই পরনে পরিষ্কার খাকি পোশাক। অনেকের পোশাক সাদা। কিন্তু অনেকের ধূতি নোংরা। তারা ঝুড়ি নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। পান, বিড়ি, সিগারেট, দইবড়া, খেলনা বিক্রি করছে। খেলনা আর মিঠাই। ওরা চলন্ত ট্রেন থেকে লাফিয়ে নামছে। কোনো এক ট্রেন এসে পৌঁছলে এমন হইচই শুরু হয় যে তোমার মনে হবে কানের পর্দা ফেটে যাবে। কুলিরা মাথা ঝাঁকিয়ে চিৎকার করছে, বিক্রেতারা তোমার কানের কাছে হেঁকে যাচ্ছে। তার মাঝে যাত্রীরা একে অন্যের গায়ের উপর পড়ে যাচ্ছে। আর বেচারা আমি, এই সব হুল্লোড়ে মাঝে লাগেজের উপর চুপ করে বসে আছি। নিশ্চিত ভাবে এর মধ্যে আমাকে হাজার বার আঘাত আর গুঁতো খেতে হয়েছে। সব সময়েই আমি ঘাবড়ে গিয়ে নিজেকেই নিজে বলছি, জাল তু, জালাল তু, আই বালা কো তাল তু।

‘দীর্ঘ সময় পরে, ঠিক যখন ট্রেন নড়তে শুরু করলো, যাত্রী আর কুলিদের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হয়ে গেল। এক টাকা দাও। না, তোমাকে শুধু দু’আনা দেবো। বাদানুবাদ প্রায় এক ঘন্টা ধরে চললো। আর শুধুমাত্র তখনই স্টেশন খালি হয়ে গেল। তার মানে একবারে খালি নয়। স্থানীয় গুণ্ডারা ঘুরে বেড়াতে থাকলো।

‘দু’ঘণ্টা পরে তিনি দেখা দিলেন, ভাবলেশহীন ভাবে দাড়ি বোলাতে বোলাতে। বললেন, “খিদে পেলে আমি কিছু পুরি কিনে আনছি। খাবে কি? আমি হোটেলে খেয়েছি।” আমি বললাম, “আল্লার দোহাই, শুধু আমাকে বাড়ি নিয়ে চল। তোমার এই বেকার দিল্লি সফরে আমার ঘাট হয়েছে। আমি তোমার সঙ্গে জান্নাতেও যেতে চাই না। এই সফরের জন্য আমাকে টেনে নিয়ে এলে?” ফরিদাবাদ ফেরার ট্রেন তখন ছাড়তে চলেছে। তিনি আমাকে তাতে তুলে বসিয়ে দিয়ে মুখ গোমড়া করে বললেন, “তোমার যা মর্জি! তুমি যদি দিল্লির সুন্দর জায়গাগুলো দেখতে না চাও, দেখো না!”’

সহযোগিতার হাত বাড়াতে ওপরের ছবিতে ক্লিক করুন

[লেখকের অন্য রচনা]

[পরম্পরা ওয়েবজিন, মার্চ ২৫, সূচিপত্র – এখানে ক্লিক করুন]