এক মাঝবয়সী মহিলা ঠিক পাশে এসে জিজ্ঞাসা করলো, নমস্তে, ইয়ে কোন সা মন্দির হ্যায়?
চকিতে তার দিকে তাকালাম। আমরা তখন জোর পায়ে হাঁটছি গ্যালারির দিকে। বসার জায়গা পেতে হবে তো।
বললাম, ভারতমাতা কি মন্দির।
ভারতমাতা কা মন্দির হ্যায়? ম্যাইনে কভি শুনা নেহি।
পরনের তীক্ষ্ণ গোলাপী রঙের জড়ি চুমকি দেওয়া শাড়ি,মাথায় লম্বা ঘোমটা নাকের মাঝে ইয়া নথ দেখে বুঝলাম আমার কথার মর্ম উদ্ধার ইনি করতে পারবেন না।
বললাম,ইয়ে কোই মন্দির নেহি হ্যায়। ইয়ে ইন্ডিয়া পাকিস্তান কা বর্ডার হ্যায়। থোরী দের বাদ, ইধার বহুত সুন্দর প্যারেড হোগা। দোনো দেশকা বিচমে জো গেট হ্যায় ও খুল জায়েগা। আর্মি কা লোক প্যারেড করেগা,হ্যান্ডশেক করেগা,পতাকা ডাউন করেগা,ফির ও সীমানা কা গেট বন্ধ হয় হো জায়েগা।
আমার কথায় খুব আলহাদিত হয়ে বললেন, হ্যাঁ হ্যাঁ ম্যাইনে দেখা থা টি ভি মে। বলেই সে প্রায় দৌড় লাগালো ।
আমি দাঁড়িয়ে গেছি আমার পরিবারের জন্য। সিকিউরিটি চেকআপ এর লেডিস এন্ড জেন্স আলাদা লাইন।
আটারি ওয়াগা বর্ডার কেন যে শুধু ওয়াগা বর্ডার নামে বেশি পরিচিত তা জানি না। আমাদের দেশের সীমানার নাম আটারি ,পাকিস্থানের সীমানার নাম ওয়াগা।এটা আমি ওখানে যাবার আগে শুনিই নি।
দুই দেশের মধ্যে যে কাঁটাতারের সীমানা তার গেট প্রতিদিন বিকালে কিছু সময়ের জন্য খোলে ,দুই দেশের মধ্যে সৌহার্দ্য বিনিময় হয়,দু দেশের ফৌজদের প্যারেড হয়।
গেট দিয়ে ভিতরে প্রবেশ করার আগেই India’s first lines of defence এর বিল্ডিংয়ের ছাদ থেকে নীল আকাশের বুক ছুঁয়ে গর্বিত বাতাসে উড়ছে আমাদের দেশের ত্রিবর্ন রঞ্জিত পতাকা। বুক ভরে শ্বাস নিলাম।
ভিতরে গিয়ে দেখি গ্যালারি প্রায় ভর্তি। আমরাও বসলাম। দুধারের জয়েন্ট স্ক্রিনে ভাসছে বিভিন্ন সময়ের কুচকাওয়াজ,কখনও রাষ্ট্র নেতাদের কথপোকথনের কিছু বিচ্ছিন্ন চিত্র।
আমাদের গ্যালালির বাঁ দিকে পাকিস্থান বর্ডার। এখনো নির্মীয়মান সে দিকের গ্যালারি। অল্প কিছু ভিজিটার্স। উদগ্রীব হয়ে আমরা অপেক্ষায়।


শুরু হবে মার্চ পাস্ট। বাজছে দেশাত্মবোধক গান।জাতীয় পতাকা নিয়ে দৌড়ে এসে দাড়িয়ে গেল দুজন জওয়ান । ততক্ষনে তৈরি হয়ে গেছে মহিলাদের এক লম্বা লাইন। গ্যালারির অনেক উঁচুর দিকে বসে থাকার জন্য কিসের লাইন,কেন লাইন কিছুই বুঝতে না পেরে শুধু অপেক্ষা। নিচে কর্ডলেস মাইক্রোফোন নিয়ে এক জওয়ান এর সাথে সমবেত জনতা ধ্বনি দিচ্ছি হিন্দুস্থান কি জয়,ভারত মাতা কি জয়,বন্দে মাতরম। ওদিক থেকে ভেসে আসছে পাকিস্থান কি জয়। অদ্ভুত রোমাঞ্চ খেলে যাচ্ছে রন্ধ্রে রন্ধ্রে।
এরই মধ্যে চলছে চিপস,পপকর্ন আর সফট ড্রিঙ্কস এর কেনা বেচা।
ইতিমধ্যে দুটি ট্রেন্ড কুকুর নিয়ে রাউন্ড দিয়ে গেলেন দুই জওয়ান। কুকুররা প্রণাম জানালো দর্শকদের।
মার্চ পাষ্ট করে এগিয়ে এলেন বি এস এফ কয়েকজন। তাদের মধ্যে কয়েকজন মহিলাও ছিলেন।
নিচে লাইন করে দাঁড়ানো মহিলাদের হাতে তুলে দেওয়া হলো জাতীয় পতাকা। অনেকটা রিলে রেসের মতো, হাত থেকে হাতে ঘুরতে লাগলো পতাকা। সেই পর্ব শেষ হতে আমন্ত্রণ জানালো হলো দেশাত্মবোধক গানের সাথে নাচবার। মুহূর্তে ভরে গেল নিচের প্রাঙ্গণ। বাজতে লাগলো গান ( অবশ্যই হিন্দি) সাথে নিচের মহিলাদের গানের তালে তালে নাচ। দর্শক ভর্তি মানুষের তালে তালে হাততালি। ভারি শোভন সুন্দর সে দৃশ্য।
তারপর বেজে উঠলো বিগিউল।
শুরু হলো মার্চপাস্ট । দুই দেশের মধ্যখানের গেট খুলে গেল। করমর্দন হলো দু দেশের সৈনিকদের। ক্ষনিকের জন্য মনে হলো ঐতো একই আকাশ,একই বাতাস।একই শীতের রোদ। তবে কেন এই কাঁটাতারের বেড়া।
কিন্তু ইমোশনের ভাষায় রাজনীতি চলে না।
মার্চ পাস্ট করতে করতে দু দেশের সৈনিকদের পা দিয়ে নিজের মাথা স্পর্শ করা দেখে স্তম্ভিত হয়ে গেলাম।
অনেকবার চললো এই অভিবাদন এর পালা। গার্ড অফ অনার নিলেন একজন উচ্চ পদস্থ মিলিটারি অফিসার।( তিনি কে তা এত দূর থেকে জানতে পারলাম না ) তারপর একেবারে গেটের কাছে দাঁড়ানো সৈনিকদের হাতে হাতে জাতীয় পতাকার সাথে লাগানো দড়ি বিনিময় হলো ক্রস করে। ধীরে ধীরে সেভাবেই নামিয়ে আনা হলো দু দেশের জাতীয় পতাকা। আবার করমর্দন। ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে গেল লোহার দরজা।

কাল বিকালে আবার খুলবে। কিন্তু রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে যে বিভাজন ঘটে গেছে স্বাধীনতার প্রত্যক্ষ ফল হিসাবে , যে কাঁটাতারের সীমানা জারি হয়ে গেছে ,যে চিরন্তন সম্প্রীতির বুকে চির ধরে গেছে তা আর ঠিক হবে কি কোনোদিন?বুকের দুয়ার হাট খোলা থাকবে কি আর সেই অতীতের মত?
উত্তরহীন প্রশ্নমালা বুকে বেরিয়ে এলাম। বাইরের নীল আকাশের সীমানায় তখন আমাদের জাতীয় পতাকা উড়ছে।
মনে মনে ভারতমাতা কে প্রণাম জানিয়ে এগিয়ে গেলাম।
পিছনে রইলো অতীত,ঘটমান বর্তমান এবং ভবিষ্যত।

সহযোগিতার হাত বাড়াতে ওপরের ছবিতে ক্লিক করুন

[লেখকের অন্য রচনা]

[পরম্পরা ওয়েবজিন, মার্চ ২৫, সূচিপত্র – এখানে ক্লিক করুন]

0 0 ভোট
Article Rating
2 Comments
Oldest
Newest Most Voted
পংক্তির ভেতর মন্তব্য
সব মন্তব্য
Rajat Chakraborti
Rajat Chakraborti
1 month ago

লেখাটা ভালো শুরু হয়েও এতো তাড়াহুড়ো করে কেন শেষ করা হলো বুঝলুম না। ভালো লেগেছে বলেই বললাম।

Nandita Sinha
Nandita Sinha
1 month ago

ধন্যবাদ।
ওই ঘটনার ওখানেই সমাপ্তি। ওই অনুভূতির রেশ নিয়ে ফিরে এলাম রাতের স্বর্ণমন্দিরে।কিন্তু দুটো বিষয় মেলানো ঠিক হবে না বলেই ওখানে থেমে গেছি।
আপনার বক্তব্য আমাকে ভাবিয়েছে।আমি মাথায় রাখলাম।