
হয়তো কিছুই নয় তবুও অনেকটা
কবিতা পাঠের আসর থাকলেই এক সপ্তাহ আগে থেকে মাথায় চিন্তা ঢুকে যায়। কোন কবিতা তো লেখা হলো না , নতুন কি পড়বো ? তখন তোলপাড় চলে, ভিতরে বাইরে। বই খাতা উল্টে, ফোন নেড়েঘেঁটে কবিতা খুঁজতে বসি ।
এই ছবি প্রত্যেকবারের। প্রত্যেকবার অনুষ্ঠান থেকে ফেরার সময় ভাবি, এইবারে ঠিক একটা মাসে দুটো নতুন কবিতা লিখে ফেলবোই। লিখিনা যে তা নয়। কিন্তু ওই যে, দুদিন পরেই মনে হয় ইসস এইগুলো আবার কবিতা হল নাকি !
আজ একটু বেলার দিক থেকে আকাশ কালো মেঘে ঢেকে গেল। বিদ্যুতের আলো জানালার গ্রিল ভেদ করে যেন ঘরের ভেতর আছড়ে পড়তে চাইছে ,সঙ্গে তুমুল বাজ। মনে মনে জেদ ধরেছি আজকে যাবোই । বিকেলের দিকে বৃষ্টির তোড় আমার ইচ্ছা শক্তির কাছে হয়তো নতজানু হলো। আকাশ কালো মেঘের আলিঙ্গন একটু দূরে রেখে ঈষৎ আলো আলো ভাব ফুটিয়ে তুলল।
বাড়ি থেকে বেরিয়ে রাস্তায় পা দেওয়া মাত্র একটা টোটো এসে হাজির। বাঃ মেঘ না চাইতেই জল!স্টেশন যাবে কিনা জিজ্ঞাসা করতেই থেমে গেল সে। আমিও উঠে পড়লাম। দেখি সওয়ারি এক বয়স্কা ভদ্রমহিলা এবং উল্টোদিকে একটি ইয়াং ছেলে। আমারই ছেলের বয়সি, কিংবা একটু ছোট হলেও হতে পারে। বয়স্ক মহিলাটির ফর্সা টুকটুক করছে গায়ের রং ,সিঁথি ভর্তি সিঁদুর ,কপালে লাল রঙের বড় টিপ ,হাতের পায়ের আঙুলে ডিপ মেরুন রঙের নেল পালিশ। আপাদমস্তক সুখি সুখি চেহারার একজন গৃহিণী।
আমার দিকে তাকিয়ে হেসে বললেন, আমার খুব শরীর খারাপ। নাতি ডাক্তার দেখাতে নিয়ে যাচ্ছে। সাবেক কালের মানুষ তো মানুষের সাথে আত্মীয়তা ওনাদের মজ্জায় মজ্জায়। আমরা তো এখন দীর্ঘ সময় পাশাপাশি বসে অচেনা মানুষের সাথে আলাপিত না হয়ে তার অস্তিত্বকে প্রায় অগ্রাহ্য করে মোবাইলে নিমগ্ন হবার বিদ্যে রপ্ত করে ফেলেছি।
আমি জিজ্ঞাসা করলাম , কি হয়েছে আপনার? আমার ভীষণ বুক ধড়ফড় করছে। নাতি ডাক্তারের কাছে নাম লিখিয়েছে, আমার নাতি খুব ভালো । ও থাকলে আমার আর কোন চিন্তা হয় না। এখন তো আর ডাক্তাররা লোকের বাড়িতে আসে না, তাই মরতে মরতে ডাক্তারের কাছেই রোগীকে পৌঁছাতে হবে। তারপর হাত বাড়িয়ে নাতির হাতে হাত রেখে বলল , পিকলু আমাকে বলে , আমি তো আছি, তোমার চিন্তা কি ?
ভীষণ ভালো লাগায় মনটা ভরে গেল। ঘাড় ঘুরিয়ে ছেলেটিকে দেখলাম। কী অপরূপ প্রশান্তি সারা মুখে! কী নিবিড় আশ্বাসে দুই হাতে দুটি হাঁটু ধরে বসিয়ে রেখেছে দিদিমাকে। তখন বাইরে বেশ জোরে বৃষ্টি পড়ছে। আমার মনে হল আমি যেনএকটা বটবৃক্ষের তলায় এসে দাঁড়িয়েছি।
নির্দিষ্ট চেম্বারের সামনে টোটোটি দাঁড়াতেই আমি নেমে উনাদের নামার রাস্তা করে দিলাম। টোটো ভাড়া মিটিয়ে নাতিবাবু দিদিমাকে সাবধানে যত্নে পরম দক্ষতায় কোলে তুলে নিল। বোঝা গেল এই কাজটি হয়ত তাকে প্রায়শই করতে হয়। ভদ্রমহিলা যেতে যেতে আমার দিকে তাকিয়ে হাসলেন।
বহুদিন ঐরকম কদম ফুটে উঠতে দেখিনি কারো হাসির মধ্যে!

আমার মনে হল কবিতা লেখা নিয়ে মাথা খুঁড়ে মরি ,এই দৃশ্য যদি কবিতা না হয়, এই মমত্ব যদি ছন্দ না হয় ,বৃদ্ধাকে কোলে নিয়ে হেঁটে যাওয়া যদি ঈশ্বর প্রদত্ত কবিতার প্রথম লাইন না হয় তাহলে কাকে কবিতা বলে আমার জানা নেই।
আমার চারপাশের বৃষ্টিফোঁটা গুলোকে তখন আমার মনে হলো পুষ্পবৃষ্টি । রাস্তার কাদা যেন ধরিত্রী মায়ের আশীর্বাদ।
বৃহস্পতিবার পথের দু ধারের স্থায়ী কিছু দোকান বন্ধ থাকে। দাওয়াতে বসে অস্থায়ী পসরা নিয়ে বিক্রেতারা। সেদিকে তাকিয়ে হাঁটতে হাঁটতে আমার চোখের সামনে একটার পর একটা যেন কবিতার লাইন ফুটে উঠেছিল। ন্যাপথলিন এর পাশে গাছের চারা, হেডফোনের পাশে ঝুলছে কানের দুল , টোটোর পাশে রিক্সোর হাঁকডাক, চায়ের দোকানের বড় ডেচকি তে টগবগ করে ফুটতে থাকা ঘিয়ে রঙের পুরু সর ভাসা দুধের সুঘ্রাণ। এইসব শব্দ স্পর্শ গন্ধ সারিবদ্ধ ভাবে খাতা কলমের কাছে এসে যেন দাবি জানাচ্ছে- আমি জীবনের গল্প জানি, আমি, আমিও জানি…
কে যেন ছড়া কেটে কেটে বলছে, ‘হাতি নাকি ঘোড়ার মাথা, দাম মাত্র দেড়শ টাকা’। পেছন ফিরে ব্যাপারটা কি তাকিয়ে দেখতে গিয়ে খানা-খন্দ ভর্তি রাস্তার জলে পা টা ডুবে গেল আচমকা। ব্যথাও পেলাম একটু।
তবু কোথাও যেন বিরক্তি নেই। যে অমৃতস্পর্শ আমি একটু আগে ফুটে উঠতে দেখেছি সম্পর্কের আবেষ্টনের মধ্যে আমাকে সেটা আবিষ্ট করে রাখলো সারা পথ।
আমার বুকের মধ্যে স্বর্গের পারিজাত মন্দারের সুবাস নিয়ে ফুটে উঠতে লাগলো একটার পর একটা কবিতা। হয়তো তাদের লিখতে পারবো না কিংবা লিখলেও যা দেখেছি যা অনুভব করেছি সেই মায়াময়তা ফুটিয়ে তুলতে পারবো না।
তবু একটা বৃষ্টির বিকেল, মাসের শেষ বৃহস্পতিবার, কবিতা পাঠের আসর ,একজন অসুস্থ বৃদ্ধার অফুরান আনন্দ-গৌরব, শরীরী বেদনার খণ্ড চিত্র আমাকে এক অলৌকিক আনন্দে অভিষিক্ত করে দিল।

মনে হলো, ” অন্তরগ্লানি সংসারভার
পলক ফেলিতে কোথা একাকার
জীবনের মাঝে স্বরূপ তোমার
রাখিবারে যদি পাই”…

