
নেক্সট অ্যাসাইনমেন্ট
নির্দিষ্ট সময়ের কিছুটা আগেই নির্দিষ্ট জায়গায় পৌঁছে গেল অভীক। শীতের দিন।বেলা বারোটা বাজছে। রাস্তাঘাট জমজমাট। অভীক দেখলো এখনো কুড়ি মিনিট মতো সময় হাতে আছে। এই রাস্তার ওপর দাঁড়িয়ে থাকাটা বুদ্ধিমানের মতো কাজ হবে না। একটু চিন্তা করে অভীক ঢুকে পড়ল সামনের এক রেস্টুরেন্টে এ। এক কাপ কফি অর্ডার করে এমন জায়গায় বসলো যেখান থেকে রাস্তাটা দেখা যায়। ওয়েটার কফি রেখে গেল। ধূমায়িত কফির সাথে সাথে অভীকের মনটা সিনেমার ফ্ল্যাশব্যাকের মতো পিছনে চলে গেল।
মা,বাবা আর বোন কে নিয়ে ছিল অভীকের পরিবার। সেখানে বিরাট কিছু আর্থিক সচ্ছলতা না থাকলেও জীবনে আনন্দ ছিল। বাবা একটা প্রাইভেট কোম্পানিতে চাকরি করতেন। ছোটবেলা থেকেই অভীকের পড়াশোনার থেকেও খেলাধূলা, শরীর চর্চার দিকে ঝোঁক ছিল। এখনও তার মেদহীন ছয়ফুটের চেহারাটা অনেকের কাছে ঈর্ষনীয়।পড়াশোনায় মনোযোগ ছিল না বলে কোন রকমে টেনেটুনে বি.কমের দরজায় পৌঁছে ছিল। হঠাৎই বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো বাবা একটা রোড অ্যাক্সিডেন্টে মারা গেলেন। অভীকের মাথায় বাজ ভেঙে পড়লো। কোম্পানি সামান্য কিছু টাকা দিয়ে হাত ধুয়ে ফেললো। কি করবে কিছুই বুঝতে পারছিল না অভীক। বাবা ছিল বটগাছের মতো। এখন সেটা সরে যাওয়াতে খোলা আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে অভীক অনুভব করলো বাস্তবটা কতো কঠিন। অভীক পাগলের মতো ছোটাছুটি করতে লাগলো কিছু রোজগারের আশায় । টোটো চালানোর চেষ্টা,প্রাইভেট টিউশন, দোকানের কর্মচারী। কিন্তু কিছুতেই বিশেষ সুবিধা হলো না। এর মধ্যেই আবার আর এক বিপদ। মায়ের কিছুদিন হলো মাথায় যন্ত্রনা হচ্ছিল। কিছুদিন চিকিৎসার পর ডাক্তারবাবু বললেন ব্রেনের সিটি স্কান করাতে হবে। ইঙ্গিত দিয়েছেন সামনে চিকিৎসার খরচের একটা বড় ধাক্কা আসছে।

কদিন আগে এইসব কথা ভাবতে ভাবতে অন্যমনস্ক হয়ে রাস্তা দিয়ে হাঁটছিল অভীক। হঠাৎই একটি বাইক এসে ওর সামনে ব্রেক কষে দাঁড়ালো। উড়ে এলো একটি মন্তব্য, ” সুইসাইড করতে হলে মেট্রো রেলের লাইনে চলে যা। আমার বাইকের সামনে কেন?” অভীক দেখলো সুপুরুষ চেহারার এক ভদ্রলোক বাইকে আসীন। পরনে দামী পোষাক, দামী জুতো, চোখে রে ব্যানের সানগ্লাস। গলার চেনটা সোনারই বলে মনে হল।পরক্ষণেই বুঝতে পারলো আরে! এ তো দেবুদা! কলেজে ওর থেকে দু বছরের সিনিয়র ছিল।পড়াশোনায় ভাল ছিল না। কিন্তু দাদাগিরি চালাতো ষোলআনা। পুরো নামটা ছিল দেবপ্রতিম রায়। কিন্ত সকলে ” দেবু ” নামেই চিনতো। দেবুদা বলল,” আমার বাইকে উঠে বোস।” দেবুদার মোটর বাইকের পিনিয়নে উঠে বসলো অভীক। দেবুদা নিয়ে এলো একটা রেস্টুরেন্টে। কফিতে চুমুক দিয়ে মৌজ করে একটা সিগারেট ধরিয়ে বলল,
” বল, তোর সমস্যাটা শুনি।”
“সমস্যা !”- অভীক অবাক হলো। দেবুদা বলল,
” যেভাবে রাস্তা দিয়ে হাঁটছিলি, বোঝাই যাচ্ছে প্রব্লেমটা গভীর। চটপট বলে ফ্যাল “।
অভীক সব খুলে বলল। কিচ্ছু বাদ দিল না। সবশেষে বলল,
” দেবুদা আমাকে একটা যে কোন কাজের ব্যাবস্হা করে দাও। আমার কোন ইগো নেই। প্রয়োজন হলে আমি জুতো পালিশও করতে পারি।”
দেবুদা নিজের পা টা এগিয়ে দিয়ে বলল,
” কর জুতো পালিশ। কিন্তু আমি তোকে কটা টাকা দেব? দশ টাকা? বিশ টাকা? বড় জোর তিরিশ টাকা। এতে তোর মায়ের ট্রিটমেন্ট হবে? তোকে ওসব করতে হবে না। আমি যা বলবো করবি? অঢেল টাকা তার সাথে জীবনে ভরপুর আনন্দ আর মানুষের আশীর্বাদ”।
অভীক বলল,
” দেবুদা, আমি কোন অসামাজিক কাজ করতে পারবো না। ” এবার দেবুদা রেগে গেল। বলল,” ভাগ এখান থেকে, তোর দ্বারা কিস্যু হবে না। আমি একবারও বলেছি অসামাজিক কাজের কথা। তুই তো ভয়েই মরলি। যা ভাগ। মর তুই না খেয়ে।আর তার মা মরুক বিনা চিকিৎসায়। “
অভীক দেবুদার দুটো হাত চেপে ধরলো। বলল,
” সরি দেবুদা, ভুল হয়ে গেছে। ” তুমি কাজের কথা বলো।”
দেবুদা বলেছিল,
” দ্যাখ তোর কাজ হবে কিছু নিঃসঙ্গ মহিলাকে সঙ্গ দেওয়া।বিনিময়ে তুই পাবি মোটা টাকা। সমস্ত ব্যবস্হা করবো আমি। আমাকে দিতে হবে 20% কমিশন। “
অভীক বলল,
” কিন্ত দেবুদা আমার মহিলাদের সঙ্গে সম্পর্কের ব্যাপারে মানে সেক্সের ব্যাপারে কোন আইডিয়া নেই। শরীর চর্চা নিয়েই ব্যাস্ত থেকেছি। ওসব ভাবার সময় পাইনি। “
দেবুদা বলল,
” ওসব তাকে ভাবতে হবে না। পুরুষরা যেমন কুমারী মেয়ে চায়, কিছু মহিলাও আনকোরা পুরুষ পছন্দ করে। এই লাইনে আমার অনেক দিন হলো। আসলে আমার আন্ডারে যারা কাজ করে তাদের আমি এক মাস ট্রেনিং এ রাখি। শুধুমাত্র ওয়েষ্ট বেঙ্গল নয়, এই রাজ্যের বাইরেও আমার ক্লায়েন্ট, নেট ওয়ার্ক আছে। একশোর মতো ছেলে আমার আন্ডারে কাজ করে। তোর যা শিরে সংক্রান্তি, তোকে ট্রেনিং দেবার সময় নেই। সরাসরি ফিল্ডে নামাতে হবে। আর তুই শারীরের কথা বলছিলি না! সবাই শারীরিক ভোগ চায় না। চায় শুধু সঙ্গ। গতকালই আমার একটি ছেলে দুদিন মন্দারমনিতে কাটিয়ে এলো। ভদ্রমহিলা ওনাকে টাচ করতে দেননি। কিন্ত ওনার ফুটবলের নেশা। প্রতি বিশ্বকাপের সময়ে অনেক টাকা খরচা করে বিদেশে যান। আমিও এমন ছেলেকে পাঠিয়ে ছিলাম যাকে ফুটবলের বিষয়ে এনসাইকোপ্লেডিয়া বলা যায়। শুধু শরীর ফিট রাখা নয়, আমার আন্ডারে যারা কাজ করে সব ব্যাপারে তারা তুখোড় “।

অভীক অবাক হয়ে শুনছিল। ভাবছিল এমনও হয়। এও সম্ভব! আজ দেবুদার সঙ্গে দেখা না হলে ও জানতেই পারতো না দুনিয়া কিভাবে এগিয়ে যাচ্ছে! দেবুদা হাসিমুখে ওর পিঠ চাপড়ে হাতে একটা ভিজিটিং কার্ড ধরিয়ে দিয়ে বলল,
-” বাড়ি যা। ঠান্ডা মাথায় বিষয়টা ভাব। আগামীকাল সকালে আমাকে জানাস কি স্থির করলি”।
পর মুহুর্তেই দেবুদার মুখ চোখ কঠিন হয়ে গেল। হিংস্র ভাবে বলল,
-” একটা কথা অভীক। আমার সঙ্গে কাজ করবি কি করবি না সেটা তোর ব্যাপার। কিন্ত যদি কোথাও এই বিষয়ে মুখ খুলেছো…..”
বাকি টা বলতে হলো না। অভীক যা বোঝার বুঝে গেল। রেস্টুরেন্ট থেকে বেড়িয়ে এসে কার্ড টা দেখলো অভীক। দেবুদার নামের পাশে লেখা আছে ,”অর্ডার সাপ্লায়ার ।”
সারারাত ভাল করে ঘুমাতে পারলো না অভীক। ছেঁড়া ছেঁড়া ঘুমের মধ্যেই স্বপ্ন দেখলো তার আদর্শবাদী বাবা এসে দাঁড়িয়েছে সামনে। বাবার চোখে একরাশ ঘৃণা। আবার একবার দেখলো ডাক্তার বাবু বলছেন, “মায়ের ট্রিটমেন্ট এখনই শুরু না করলে ওনাকে বাঁচানো যাবে না”। সকাল সাতটার সময়েই ফোন করলো দেবুদাকে। বলল,
-” আমি রাজি”।
দেবুদার ছক অনুযায়ী আজকের প্রোগ্রাম। ভাবনায় ছেদ পড়লো। এখান থেকেই দেখা যাচ্ছে রাস্তায় একটা দামী গাড়ি এসে দাঁড়িয়েছে। দেবুদার দেওয়া গাড়ির মডেল আর নম্বরও মিলে যাচ্ছে। কফির দাম মেটানো ছিল। তাড়াতাড়ি রেস্টুরেন্টের বাইরে এলো। অভীকের পরনে দেবুদার কিনে দেওয়া লাল রঙের টি শার্ট। কাঁধে ছোট ব্যাগ। ড্রাইভার নেমে গাড়ির পিছনে দরজা খুলে দিল। অভীক গাড়ির ভিতরে ঢুকে দেখলো এক ভদ্রমহিলা বসে আছেন, শাড়ি পরা। মাথায় ঘোমটা। চোখে সানগ্লাস। অভীক বসার পর ভদ্রমহিরা হাত জোড় করে বললেন,
-” নমস্কার, আমি মনিরা বসু “। অভীক ও প্রতি নমস্কার করে বললো,
-” আমি অনিক, অনিক সেন”।
গাড়িতে বিশেষ কথা হলো না। গাড়ি কোথাও দাঁড়ালো না। অভীক একটা অপরাধবোধে ভুগছিল। ভাবছিল,এই প্রথম বার এই শেষ। দেবুদাকে বলে দেবে এই কাজ করা তার পক্ষে সম্ভব নয়।।
বিকাল তিনটে নাগাদ ওরা পৌঁছে গেল নির্দিষ্ট রিসর্টে।অভীককে কিছুই করতে হলো না।অভীক ভাবছিল ও আধার কার্ড নিয়ে এসেছে। কিন্ত এখানে আধার কার্ড চাইলেই মুশকিল কারন ও নিজের নামটা সঠিক বলেনি।কিন্ত কেউ কোন ডকুমেন্ট চাইল না। যা করণীয় মনিরা দেবীই করলেন। রুমে পৌঁছে অবাক হয়ে গেল অভীক। এই রকম ঘরে থাকা তার স্বপ্ন। মনিরা দেবী ঘরে এসেই ওয়াশ রুমে চলে গেছিলেন। ওয়াশরুমে যাবার আগে অভীক কে বললেন,” তোমার জন্য একটা খাম রাখা আছে টেবিলের ওপর। মনিরা দেবী ওয়াশ রুমে যাবার পর অভীক খাম খুলে দেখলো খামের মধ্যে বারো হাজার টাকা। কিছুক্ষন পর মনিরাদেবী ওয়াশ রুম থেকে বার হয়ে এলেন এক স্বচ্ছ রাতপোষাক পরে।শরীরের প্রতিটি রেখা প্রকট হয়ে উঠেছে। অভীক কে বললেন,
” যাও ফ্রেশ হয়ে এসো। “

অভীক ফ্রেশ হয়ে ওয়াশ রুম থেকে বার হয়ে দেখলো ইতিমধ্যেই চা,স্ন্যাক্স, অনেক খাবার দিয়ে গেছে। অভীকের খিদেও পেয়েছিল। এগারোটা নাগাদ ভাত খেয়ে বার হয়েছিল। মাকে বলেছিল,” আমার এক বন্ধু এক রাজনৈতিক নেতার বডি গার্ডের কাজ করে। নেতা একদিনের জন্য বাইরে যাচ্ছেন। বন্ধুর একটু অসুবিধা আছে। তাই আমাকে কাজটা করতে হবে।। একটা রাত বাইরে থাকতে হবে।”। বার হবার সময়ে মা যখন ঠাকুরের প্রসাদী ফুল ওর পকেটে দিয়ে ছিলেন তখন অভীকের খুব খারাপ লেগেছিল। অভীক আবার মনে মনে বলল এই শেষ। মনিরাদেবী বললেন,
” কি হলো কি চিন্তা করছো? খাও ভাল করে। “
খেতেখতে টুকটাক গল্প হচ্ছিল। মাঝে মনিরা দেবী সম্ভবত নিজের বাড়িতে কারো সঙ্গে কথা বললেন। নিজের ছেলের খবর নিলেন। তারপর বললেন, “ওনাদের ‘ধ্যানযোগ’ এর ক্লাস কিছুক্ষনের মধ্যেই শুরু হবে। এরপর ওনার মোবাইল সুইচ অফ থাকবে”। এখন বিকাল পাঁচটা। কিন্তু ঘরের মধ্যে রাত নেমে এসেছে। ভারি পর্দায় বাইরের আলো আবার পথ বন্ধ হয়ে গেছে। একটা নীলাভ আলো জ্বলছে। অভীক শুনেছিল বড় হোটেলের রুমের বাইরে অনেকে নাকি “ডোন্ট ডিসটার্ব” বোর্ড ঝুলিয়ে রাখে। এখানকার সিস্টেম অনুযায়ী রুমের বাইরে মনিরা দেবী লাল আলো জ্বালিয়ে দিয়েছেন। এখন ভুলেও এই ঘরে কেউ নক করবে না। মনিরা দেবী ইতিমধ্যেই বোতল, গ্লাস ও আনুসাঙ্গিক সবকিছু সাজিয়ে ফেলেছেন। অভীকের কাছে অবশ্য মদ্যপান নতুন নয়। বন্ধুদের পাল্লায় পড়ে বেশ কয়েক বার মদ্যপান করেছে। কিন্ত বোতলের চেহারা দেখেই বুঝতে পারলো এটি অত্যন্ত দামী মদ। মনিরা দেবী দুটি গ্লাসে পানীয় ঢেলে একটি নিজে নিয়ে একটি অভীক কে দিলেন। চিয়ার্স বলে দুজনে পান শুরু করলো। আস্তে আস্তে নেশা চড়ছে দুজনেরই। দুজনেই চলে এলো বিছানায়। মনিরা দেবী ঘনিষ্ঠ হয়ে অভীকের কানে কানে বললেন,
” এখন কিন্ত নেট প্র্যাকটিস। ট্রেলার। আসল খেলা ,পিকচারের জন্য রাতে নিজেকে রেডি রেখো।”
এখন ঘড়িতে ঠিক পৌনে নটা বিছানা ছেড়ে আস্তে আস্তে উঠলো অভীক। পোষাক পড়লো। লাল আলোর সুইচ অফ করলো। ঠিক রাত নটার সময়ে ডিনার সার্ভ করার কথা। মনিরা দেবী ঘুমিয়ে আছেন। কম্বলটা গলা অবধি টেনে দিল অভীক। মেয়েদের বয়স বোঝার উপায় নেই তবুও হলফ করে বলা যায় উনি অভীকের থেকে অন্তত পনেরো বছরের বড়।
ব্যালকনিতে এসে দাঁড়ালো অভীক। একটা সিগারেট ধরালো। তারপর পকেট থেকে মোবাইল ফোন বার করে পরপর দুটো ফোন করলো । প্রথমে ওর বোনকে ফোন করে বলল, আগামীকাল সকালেই মায়ের সিটি স্কানের ব্যাবস্থা করতে। টাকার যোগাড় হয়ে গেছে। দ্বিতীয় ফোন টা করলো দেবুদাকে। দেবুদা ফোন রিসিভ করামাত্র অভীক বলল,
” দেবুদা আমার নেক্সট অ্যাসাইনমেন্ট কবে ? আমি রেডি।”

[পরম্পরা ওয়েবজিন, ফেব্রুয়ারি ২৫, সূচিপত্র – এখানে ক্লিক করুন]