
একটি নিরীহ কাক ও ছুটন্ত বুলেট
তখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলছে । রেঙ্গুন চলে গেছে জাপানের দখলে । তারা এবার আমাদের এদিকে আসছে । জাপানি বোমা পড়ছে চারিদিকে । কখনো কলকাতার খিদিরপুরে , কখনো হাতিবাগানে , কবে কখন কোথায় যে বোমা পড়বে কেউ বুঝতে পারছেনা । বাংলার মানুষ দিবারাত্রি আতঙ্কে কাঁপছে । মনে আছে তখন লোকের মুখে মুখে একটা ছড়া খুব চালু ছিলো :
সা রে গা মা পা ধা নি
বোম্ ফেলেছে জাপানী
বোমার ভেতর কেউটে সাপ
বৃটিশ বলে ‘ বাপরে বাপ্ ‘
জাপানি বোমার ভয়ে যে যেখানে পারছে শহর ছেড়ে পালাচ্ছে । কেউ চলে যাচ্ছে সুদূর কোনো গ্রামে তাদের দেশের বাড়ীতে, কেউ বাংলার বাইরে কোনো আত্মীয়ের কাছে। শ্রীরামপুরে আমাদের তখন বৃহৎ পরিবার ।
শেষ পর্যন্ত অবশ্য আমরাও বাড়িশুদ্ধ যাকে বলে একেবারে ‘লক্ স্টক্ এ্যান্ড ব্যারেল’ চলে গেলাম থুড়ি, পালিয়ে গেলাম রংপুর ( বর্তমানে বাংলাদেশে ) ডিভিশানের নীলফামারী জেলার ‘ডোমার’ (Domar) নামে একটি আধাশহরে যেখান আমাদের পারিবারিক ব্যবসাসূত্রে বেশ বড়ো বাড়ি,জমি, বাগান ইত্যাদি সবই ছিলো।
সালটা সম্ভবত ১৯৪৩ সালের শুরুতে । আমরা সবাই আবার শ্রীরামপুরে ফিরে এলাম ১৯৪৫ সালের শেষের দিকে অর্থাৎ যুদ্ধটুদ্ধ মিটে যাবার পরে । মোটামুটি বছর তিনেক সেখানে ছিলাম।
যদিও আমার তখন নিতান্তই শৈশব কিন্তু আশ্চর্য লাগে ভাবতে যে ডোমারে থাকার কিছু কিছু স্মৃতি এখনো মনে স্থায়ী জায়গা করে নিয়েছে । তার ভেতরে একটি ঘটনার কথা এখন লিখতে চাই ।
তখন বৃহৎ একান্নবর্তী পরিবারে আমাদের প্রজন্মের সব ভাইদের মধ্যে সবার বড় ছিলেন যিনি তাঁর নাম ছিল নিখিলেশ, তাঁকে আমরা সবাই ‘দাদা’ বলতাম।এ ঘটনার কেন্দ্রীয় চরিত্র তিনিই।
বাড়িতে একটা ডাবল ব্যারেল অর্থাৎ দোনলা বন্দুক ছিল যেটা তখনকার দিনে অনেকের বাড়িতেই থাকতো । অবশ্য সম্ভাব্য ডাকাতদল আক্রমণ করলে কে সেটা চালনা করবে সেটা লাখ টাকার প্রশ্ন।
একবার ঠিক হলো আমাদের দাদা সেই বন্দুক দিয়ে একটা কোনো পাখিকে নিশানা করে গুলি ছুঁড়বেন । চারিদিকে পাখি অনেক থাকলেও সেইসময় সামনে গাছের ওপর বসে থাকা একটি নিতান্ত নিরীহ কাককে নির্বাচন করা হলো । বোধহয় সম্ভ্রান্ত পাখিদের সাম্রাজ্যে কাক কিছুটা দলিত শ্রেণীর, সেইজন্য। এছাড়া তার গায়ের রং মিশকালো, কন্ঠস্বর কর্কশ।
দাদা তখন কিশোর ।রিতিমত প্রোগ্রাম করে সেদিন একটু বেলার দিকে বন্দুক হাতে দাদা দাঁড়িয়ে পড়লেন বাড়ির উঠানে। আমরাও সবাই খুব উত্তেজিত । দাদার ঠিক পেছনে বাড়ির কেউ কেউ ও কয়েকজন পারিবারিক পরিচিত স্থানীয় বয়স্ক মানুষ এ্যাডভাইসার হিসেবে গোটা ব্যাপারটা পরিচালনা করছেন। এখন বুঝতে পারি এনারা নিজেরা মনে হয় জীবনে কোনোদিন বন্দুকে হাত দেননি , গুলি ছোঁড়া তো অনেক দূরে । বেশ মনে আছে তাঁরা একেক জন একেক রকমে আনকোরা নতুন এক কিশোর বন্দুকধারীকে পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছেন । এ যেন অর্জুনের পেছনে চারজন দ্রোণাচার্য । দাদার সামনে টার্গেট অদূরে একটি নারকোল গাছের ওপর বসে থাকা একটি নিতান্ত নিরীহ কাক। অন্যদিকে মুখ করে বসেছিলো তাই বেচারা এদিকের এতো আয়োজন কিছুই খেয়াল করেনি নিশ্চয়ই। দাদা সোজা দাঁড়িয়ে একদল আনাড়ি মানুষদের পরামর্শে বন্দুকের বাট বগলদাবা করে লক্ষ্য বস্তুর দিকে একটা চোখ বুজে মনঃসংযোগ করে আছেন এ দৃশ্য আমি চোখ বুজলে এখনো দেখি ।
এই প্রসঙ্গে আমি একটু জানাতে চাই যে পরবর্তীকালে প্রচুর রাইফেল শুটিং করার আমার সুযোগ ঘটেছিল । তখন সৈন্যবাহিনী যুদ্ধে combat rifle হিসেবে যা ব্যবহার করতো সেই রাইফেলে। আমার অভিজ্ঞতায় এখন জানি স্ট্যান্ডিং পোজিসনে রাইফেল ছোঁড়ার নিয়ম কী এবং কীভাবে হোল্ড করতে হয় যেটা না শিখলে পরিণাম কতটা বিপজ্জনক হতে পারে । যাইহোক, বন্দুকের ট্রিগারে দাদার আঙ্গুল আর কিছুটা দূরে গাছের ওপরে বসে থাকা একটি অন্যমনস্ক নিরীহ কাক । গোটা গোস্বামী পরিবারের ছোট বড়ো সব সদস্যরা রূদ্ধশ্বাসে মাহেন্দ্রক্ষণের অপেক্ষায় নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে । আইহোলে চোখ রেখে দাদার মনঃসংযোগ চললো অন্তত মিনিট পাঁচেক।
এক সময় হঠাৎ আকাশবাতাস কাঁপিয়ে এক ভয়ঙ্কর কানফাটানো আওয়াজ । পরমুহুর্তে দেখলাম ট্রিগার টেপার সঙ্গে সঙ্গে বিপুল পুশব্যাকের কারণে দাদা মাটিতে পড়ে আর সেফটি ক্যাচের একটা ধারালো অংশ সোজা ধাক্কা মেরেছে দাদার চোখের ঠিক নীচে, সারা মুখ রক্তে ভেসে যাচ্ছে ।বরাতজোরে চোখটা বেঁচে গিয়েছিল । এদিকে কাকটি কিন্তু অক্ষত, শুধু তার গা ঘেঁষে হঠাৎ গুলি ছুটে যাওয়ার জন্য অল্প আহত ও সামান্য একটু রক্তক্ষরণ , মাটিতে পড়ে গিয়ে ছটফট করছে। পরে কয়েকদিনের মধ্যেই সে সুস্থ হয়ে যায় । দাদা ছিলেন ভীষন নরম মনের মানুষ, কখনো কাউকে আঘাত করতে পারতেন না। সেই আহত রক্তাক্ত কাকটিকে দেখে দাদার কান্না আমার এখনো মনে পড়ে। সে ঘটনার জীবিত সাক্ষী বোধহয় এখন একমাত্র আমি।
দাদার মুখের ঐ কাটা দাগটা অনেকদিন পর্যন্ত ছিল আর কাকটা কয়েকদিনের মধ্যেই সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে শুধু একটু খুঁড়িয়ে চলতো এবং দাদার আশেপাশে দিব্যি ঘোরাঘুরি করতো আমি দেখেছিলাম ।
জানিনা দাদার দিকে আড়চোখে তাকিয়ে সেই নিরীহ খোঁড়া কাকটা মুচকি হাসতো কিনা ।

[পরম্পরা ওয়েবজিন, সেপ্টেম্বর ২৬, সূচিপত্র – এখানে ক্লিক করুন]

মজার বায়সপুরাণ…
খুব ভাল লাগল।