Plagiarism এর বাংলা প্রতিশব্দ নাকি ‘কুম্ভীলকবৃত্তি’ । কথাটা দেখতে শুনতে একটু খটমট হলেও তার শব্দের ভেতরে একটা গাম্ভীর্য আছে। তার বদলে সোজাসুজি ‘টুকলি’ বললে সহজেই অর্থটা মগজে ঢুকে যায় বটে তবে ওজনটা একটু হালকা,খেলো শোনায়।
সুধীন্দ্রনাথ দত্তের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের একটা অসমবয়সি সখ্য গড়ে উঠেছিল। তাঁর দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ “অর্কেষ্ট্রা” সম্পর্কে সুধীন্দ্রনাথ মজা করে লিখেছিলেন –” এবারেও আপনার ছন্দ, আপনার শব্দ, এমনকি আপনার পদ ভেঙে-চুরেই আমি আমার কবিতাগুলি লিখেছি – তবে আমার চাতুর্য আজকাল নিশ্চয়ই আগের চেয়ে বেড়েছে তাই এ-চৌর্য্য এখন আর সহজে ধরা পড়েনা।” এই ব্যাপারে টি.এস.এলিয়ট যা বলেছিলেন অল্পকথায় তার সারমর্ম ছিল যে ছোটখাট কবিরা আশ্রয় নেয় অন্ধ অনুকরণের আর বড় মাপের কবিরা ‘চৌর্যের’। আমার বন্ধুস্থানীয় একজন রসিক অধ্যাপক হাসতে হাসতে একবার বলেছিলেন একটিমাত্র জার্নাল থেকে গোটা প্রবন্ধ কপি করলে সেটা হয় ‘চুরি’ কিন্তু খানদশেক জার্নাল থেকে কিছু কিছু তুলে একজায়গায় রাখলে সেটাকে বলে ‘থিসিস’।

আমার একজন দিল্লীপ্রবাসী ভাইঝি সেখানকার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতির বিভাগীয় প্রধান ছিল। পরবর্তীকালে সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিন হিসেবে কিছুদিন আগে অবসর নিয়েছে। শ্রীরামপুরের যে স্কুলের ছাত্রী হিসেবে সে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় ষষ্ঠ স্থান অধিকার করেছিল সেখানে ক্লাশ ফাইভের ছাত্রী থাকার সময় একবার বাড়িতে একটি ছুটির দিনে নিভৃত দুপুরে চুপিচুপি সবার চোখের আড়ালে “নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ” সম্পূর্ণ কবিতাটি একটা খাতায় লিখে রবীন্দ্রনাথের “সঞ্চয়িতা” কাব্যগ্রন্থটি খুব সন্তর্পনে খাটের মোটা গদির নীচে লুকিয়ে রেখে ভেবেছিল প্রমাণ লোপাট। তাই সগর্বে বাড়ির সবাইকে সগর্বে জানিয়েছিল কবিতাটি সে নিজে লিখেছে।
সেটা নাহয় একটি ছোট্ট মেয়ের কান্ড ছিল কিন্তু আমাদের পাড়ার ওভারস্মার্ট অশোকদার ব্যাপারটা একটু বৈশিষ্ট্য দাবী করতে পারে। ইস্কুলে ক্লাস টেনে বার তিনেক অবলীলাক্রমে হোঁচট খাবার পরে অশোকদা স্কুলের ছোট, বড়ো ও মাঝারি — সব মাপের ছাত্রদের কাছে “বড়দা” সম্বোধন অর্জন করেছিল। এহেন বড়দা অর্থাৎ অশোকদা হঠাৎ “হ্যারিকেন ও মশা” নাম দিয়ে একটা স্বরচিত দীর্ঘ প্রবন্ধ লিখে প্রথমটা সবাইকে রিতিমত তাক লাগিয়ে দিয়েছিল। সেটা পড়ে পাড়ার অনেক বয়স্ক মানুষও নাকি বলেছিলেন যে অশোকের ভেতরে যে এতো প্রতিভা ছিল কোনোদিন বুঝতে পারা যায়নি। এই বয়সেই যদি এমন লিখতে পারে তাহলে ভবিষ্যতে খুব বড়ো সাহিত্যিক হবার সম্ভাবনা যে আছে সে বিষয়ে কোনো সন্দেহই নেই। তারপর কিছু দুষ্টু ছেলে গোপনে গোপনে প্রবন্ধটির ময়নাতদন্ত করে যা রিপোর্ট দিলো সেইটা জেনে সবাই আরও বেশি চমকে উঠেছিল, হাসাহাসিও কম হয়নি। জানা গেলো সেইসময় বিখ্যাত সাহিত্যিক এস.ওয়াজেদ আলীর লেখা ” প্রদীপ ও পতঙ্গ” শিরোনামে একটি প্রবন্ধ যেটা তখনকার স্কুল ফাইনালে সবার পাঠ্য ছিল, অশোকদা তার সবটুকুই নিখুঁতভাবে কপি করে শুধু “প্রদীপ”-এর জায়গায় “হ্যারিকেন” আর “পতঙ্গ”-এর জায়গায় “মশা” লিখেছিল। এই নির্মম সত্যটা জানার পর বেচারা বড়দা থুড়ি অশোকদাকে কিঞ্চিৎ নাকাল হতে হয়েছিল।


মাসখানেক আগে ডায়মন্ড হারবার থেকে একটু দূরে একটা বেশ জমকালো কবিতাপাঠের আসরে আমার খুব স্নেহভাজন এক কবির উপস্থিতিতে তারই সদ্যপ্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ থেকে একটি কবিতা স্বরচিত কবিতা হিসেবে একজন মহিলা মাইকের সামনে দাঁড়িয়ে পাঠ করে উপস্থিত শ্রোতাদের কাছে প্রচুর তারিফ পেয়েছেন।তার নামটা আমি জানতে পেরেছিলাম। তবে তখনো তাকে চোখে দেখিনি শুধু কীর্তির কথাটাই শুনেছিলাম। ঘটনাচক্রে মাত্র কয়েকদিন আগে, এই বছরের ফেব্রুয়ারী মাসে কলকাতায় “নলিনী গুহ সভাঘরে” একটি কবি সম্মেলনে অনেকের সঙ্গে আমিও একজন আমন্ত্রিত কবি হিসেবে উপস্থিত ছিলাম। সেখানে মঞ্চে একজন মহিলার নাম ঘোষণা হতেই আমি সচেতন হলাম। নামের সঙ্গে পরিচয় হয়েছিলো, এবার স্বয়ং কবিকে দেখলাম। এখানে যে স্বরচিত কবিতাটি পাঠ করে উনি প্রশংসিত হলেন, জানিনা সেটি তাঁর নিজের লেখা কিনা।
শুনেছি এরকম ঘটনা নাকি আকছার শোনা যায়।
এবার একটা গুরুগম্ভীর চৌর্য্যবৃত্তির ঘটনা দিয়ে শেষ করছি। এ ঘটনা নিশ্চয়ই অনেকেই জানেন। কবিতা, প্রবন্ধ অথবা গল্প
ছাড়াও সুরের জগতেও চৌর্য্বৃত্তি যে হয় সেখবর অনেকেই জানেন। সেইরকমই এটাও একটি।
জর্জ হ্যারিসন ১৯৭৬ সালে তাঁর বিখ্যাত
“My sweet lord” গানটি গাইবার পর গোটা বিশ্বজুড়ে হৈচৈ পড়ে গেলো। কিন্তু এই কলরব স্তিমিত হবার পরেই শোনা গেলো ১৯৬২ সালে জন ম্যাকের গাওয়া ” He is so
fine” গানটির সুর চুরি করে এই গানটির সৃষ্টি। ব্যস্ , আর যায় কোথা! লড়াই একেবারে আদালত পর্যন্ত পৌঁছে গেলো। শেষ পর্যন্ত আদালতের রায়ে জর্জ হ্যারিসন দোষী সাব্যস্ত হয়ে প্রায় ছয় লক্ষ ডলার জরিমানা দিতে বাধ্য হন।

সহযোগিতার হাত বাড়াতে ওপরের ছবিতে ক্লিক করুন

[লেখকের পূর্ব রচনা]

[পরম্পরা ওয়েবজিন, মার্চ ২৬, সূচিপত্র – এখানে ক্লিক করুন]

0 0 ভোট
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
পংক্তির ভেতর মন্তব্য
সব মন্তব্য