
শেষে দিল রা -বিশ

ক্লিনিকে ঢুকতে আজ খানিকটা দেরী হয়ে গেছে আমার। অপেক্ষায় থাকা লোকজনের ভিড় কমে আসতে পুষ্পল এলো।
সামান্য বিধ্বস্ত যেন সে।
পুষ্পল একটা ছোট খাটো কোম্পানির অ্যাকাউন্টস্ দেখে। তার চেয়েও বড় কথা হলো, সে নিয়মিত লেখালেখি করে।
এমনকি নিজের লেখা কবিতার বইও উপহার দিয়েছে সে আমায়।
সেসব লেখা মোটেও ফেলে দেওয়ার মতো নয়, একটা স্ট্যান্ডার্ড আছে।
ক্লিনিকে আসার ব্যাপারে পুষ্পল নিয়মিত নয়।
মাঝেমধ্যে ওর ডিপ্রেশনের ধাক্কা সামলাতে না পারলে তখন আসে। ওষুধ খায়, আবার খায়ও না। ফ্যামিলি হিস্ট্রি স্ট্রং, ওর মায়ের আর বোনেরও মেজর ডিপ্রেশন আছে।
কয়েক মিনিট আর কোনো কথা নেই। ওর সঙ্গে আজ পাপড়ি এসেছে। পাপড়ি ওর স্ত্রী। একটা স্কুলে পড়ায় সে।
পুরোনো প্রেসক্রিপশনে চোখ বোলাতে বোলাতে বলি, গত বছরের জুলাইতে এসেছিলে তোমরা, এখন তো এ বছরের অগাষ্ট! ঠিকই ছিলে নিশ্চয়ই?
— ও একদম ঠিক নেই ডাক্তারবাবু!
রাতের পর রাত জেগে বসে থাকে। বাড়ি থেকে বেরোতেই চায়না!
সারাদিন ওই এক মোবাইল!
আমাকে তো বেরোতেই হয়, বড়ো দুশ্চিন্তায় পড়ে গেছি স্যার!
আজকাল মোবাইল ফোন একটা উপদ্রব ! উপযোগিতার দিকটা মাথায় রাখলেও এ একটা নতুন রোগবালাই বটে,
আট থেকে আশি প্রায় সকলেই কমবেশি এ রোগের রোগী।
তাই বলি,
সে তো সকলেই করছে! সকল পক্ষী মৎস্য ভক্ষী!
— না ডাক্তারবাবু! ওর ব্যাপারটা সিরিয়াস! অনেক ক্ষতি হয়ে গেছে এজন্য! ও অনলাইনে জুয়া খেলে!
পাপড়ির চোখ ছলছল করছে, পাশে বসা পুষ্পল অধোবদন।
— কবে থেকে শুরু এসবের? চাকরি? আছে তো? কি হলো পুষ্পল, তুমি নিজেই বা বলছ না কেন?
আমি অধীর হই।
— বছর দুয়েক আগেও এরকম হয়েছে স্যার! আপনাকে বলতে বারণ করেছিল ও। সেবার একটা ফ্ল্যাট বিক্রি করে সামলে ছিলাম। তারপর ঠিকই ছিল।
মাস ছয়েক আগে থেকে আবার শুরু করেছে।
ওর অফিস থেকে অনেক টাকা লোন নিয়েছে স্যার!
কি দিয়ে শোধ করব জানিনা!
— কত টাকা?
বলি আমি।
— অনেকটাই! ভেবেছিলাম, একটা শেষ দাঁও মেরে ধারবাকি শোধ করে দেব সব! হলো না, আমার জন্যে এরা পথে বসছে স্যার!
এতক্ষণে মুখ খোলেন পুষ্পলবাবু।
— কার্যকালে এসব মনে থাকেনা বোধহয়!
বিরক্তি ফুটে বেরোয় আমার কথায়। সামলে নিয়ে বলি,
অফিস যাচ্ছো এখন, নাকি সব বন্ধ করে বসে আছো? সামলাবে কি করে?
প্রশ্ন করতে ইচ্ছে না করলেও করি।
— অফিসের ক্যাশ মেলাতে না পারলে জেল হয়ে যাবে স্যার!
পাপড়ি করুণ মুখে বলে।
শুধু তো লোন না,পেটি ক্যাশও ভেঙ্গে ফেলেছে তো!
— কি করবে ভেবেছ কিছু?
জিগ্যেস করি।
— প্রথমটা রাগ হয়েছিল খুব! ভেবেছিলাম চলেই যাব বাচ্চাটাকে নিয়ে! এভাবে কি চলে, বলুন তো! ও কি কখনও ভালো হবে না?
টাকার অ্যামাউন্টটা বলেনি ও, সবমিলিয়ে তিপ্পান্ন লাখ শোধ করতে হবে আমাদের!
ঠকঠক করে কাঁপছে এখন পাপড়ি, এক্ষুনি যেন ঝরে পড়বে সে।
— সব্বনাশ! আত্মীয় স্বজন কেউ জানে?
— জানলেই বা সাহায্য করবে কে ডাক্তারবাবু? আর এটা কি বলা যায়?
মাথাটা ঠাণ্ডা হলে ভাবলাম আমার শেষ গয়না গুলো বেচে দিলে হয়তো বেঁচে যাবে এ যাত্রায়! তবে এই শেষ,আর না!

চুপ করে থাকি।
কী বলব মেয়েটাকে!
এও তো স্থায়ী কোনো সমাধান নয়।
বাস্তবে এ হলো বিহেভিয়ারাল অ্যাডিকশন!
মদ গাঁজা এসবের কাছে তুশ্চু এখন।
কদিন আগে অসহায় এক বাবা এলেন। ভদ্রলোক নামি একটা কলেজে পড়ান। ছেলেকে সাথে এনেছেন, সারারাত সে গেম খেলছে! কলেজ যায়না, সারাদিন ঘুমোচ্ছে!
কথা বললাম, অনলাইন গেমিং চলছে!
রাশিয়া, ব্রাজিল, নিউগিনি,জাপান, সারা দুনিয়ার ভবিষ্যত সারা রাত জুড়ে খিলাড়ি এখন!
সত্যি সত্যিই খিলাড়ি, নাকি ক্রীড়নক মাত্র?
পৃথিবী জোড়া মারণ যজ্ঞ চলেছে, মস্তবড় সোস্যাল এক্সপেরিমেন্ট এটা। সেখানে সমিধ জোগাতে হবে না?
মস্তিষ্কের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে রিওয়ার্ড সার্কিটের চক্কর! নেশার বস্তু যেমন সে সার্কিটকে করাপ্ট করে, কলুষিত করে, তেমনটাই করে বিহেভিয়ারাল অ্যাডিকশন! কমপালসিভ কেনাকাটা থেকে শুরু করে বিঞ্জ ইটিং, এমনকি জিম এর অ্যাডিকশন, কী নেই সেখানে!
উপায় আছে কিছু, বেরোনোর পথ?
আছে, অবশ্যই আছে! তবে তারও আগে এটা যে একটা সিরিয়াস সমস্যা, সেটাও তো বুঝতে হবে!
মহাভারতের কথা অমৃতসমান! সেকালে
স্বয়ং ধম্মপুত্তুরকেই গাড্ডায় ফেলে নাকানিচোবানি খাওয়াতে পারে যে নেশা, হাজার পুষ্পল সেখানে লড়তে পারবে তো!

