অপূর্ব সুন্দর চাঁদের আলোয় ভেসে যাচ্ছে ঘর। আটপৌরে মশারির শরীর গলে সেই আলো চুঁইয়ে এসে পড়ছে বিছানায়। তার পাশে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে থাকা ইরার মুখটা জোছনার আলোতে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে অরিত্র। পালিয়ে যাওয়ার আগের রাতে হয়ত কোনও মানুষই ঘুমোতে পারে না।

হ্যাঁ, কাল সন্ধেয় পালিয়ে যাবে অরিত্র। চলে যাবে এই মায়ার বাঁধন ছেড়ে। বড় পলকা হয়ে গেছে এই বাঁধন। নিজে থেকে ছিঁড়ে গিয়ে তিক্ততা তৈরির আগেই পালিয়ে যাচ্ছে সে। যদিও সে নিজে ছাড়া ব্যাপারটা আঁচ করতে পারছে না কেউই। সব কিছুই চলছে ঘড়ির কাঁটা ধরে নিখুঁতভাবে। নিজে কিছুটা এলোমেলো চললেও তার আশপাশটা গুছিয়ে রাখার, সামলে চলার চেষ্টা করে সে। কিছু কিছু পরিকল্পনা ঠান্ডা মাথায় বাস্তবায়ন না করলে বড় ধরনের ভুল থেকে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে, এক্ষেত্রে সে কোনও ভুল করতে চায় না। তাই গত এক বছরে একটু একটু করে সে এগিয়েছে তার প্লান ধরে। কালই সেই প্ল্যানের চূড়ান্ত দিন।

ভালবাসা অদ্ভুত এক বাঁধন। অজানা অচেনা একটা মানুষকে কি ভয়াবহ আকর্ষণে কাছে টেনে আনে ভালবাসা! তার কাছে মন খুলে সব কিছু বলা যায়, পরম নির্ভরতায় ধরা যায় তার হাত। নিজের সুখ গৌণ হয়ে যায় তখন, তার জন্য কিছু একটা করতে পারলে জীবন সার্থক মনে হয়। পাগলের মতো তার মায়াভরা মুখ, হাসি, চোখের তারায় ভালবাসাটুকু দেখতে ইচ্ছে করে। মনে মনে অস্ফুটে হাজারবার বলতে ইচ্ছে করে, ভালবাসি, ভালবাসি, ভালবাসি…

প্রথম দেখায় কি প্রেম হয়? হয় না আসলে। শুধু আকর্ষণ জন্মায়, মায়া তৈরি হয়। ডিমের ভেতরের কুসুমের মতো, তুলতুলে গাঢ় মায়া। তার চারপাশে তখনও অনিশ্চয়তার মেঘ। হয়ত ভালবাসা হবে, হয়ত না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই প্রথম দেখার ভাল লাগাটুকু অব্যক্তই থেকে যায়। কিছুদিন মন অশান্ত থাকে, পরে এক সময় এই সময়ের কথা চিন্তা করে হাসি পায়। অরিত্রর জীবনও ঠিক এমনই হতে পারত। প্রথমবার ইরাকে দেখার পর তার ভেতরে কোনও স্পন্দনই জাগেনি। আর পাঁচটা সাধারণ মেয়ের মতোই মনে হয়েছিল সাদা সালোয়ার পরা, ছিপছিপে মেয়েটাকে। স্বভাবসুলভ দূরত্ব বজায় রেখেই চলত সে। কিন্তু পরিচয়ের কয়েক দিনের মাথায় অরিত্রর মনে হল, এই মেয়েটা বুকের ভেতর আস্ত একটা নিঃসঙ্গতা পুষে রাখে। সে তার বয়সি আধুনিকাদের মতো প্রগলভ নয়, কোনও উগ্রতা নেই। অদ্ভুত এক স্নিগ্ধতা সবসময় ঘিরে থাকে ইরাকে। সেই একই স্নিগ্ধতা আজ ঘুমন্ত ইরার মুখেও লেপ্টে আছে। অরিত্রর খুব ইচ্ছে করছে ইরার ওই গোলাপ-পাপড়ির মতো ঠোঁটে আলতো করে চুমু এঁকে দিতে। কিন্তু না, সেদিনের সেই ইরা আর আজকের এই ঘুমন্ত স্ত্রী ইরার মাঝে বিস্তর ফারাক, যোজন যোজন দূরত্ব। কী আশ্চর্য মোহময় ছিল সেই দিনগুলো! প্রতিদিন ভোরবেলায় উঠে বেরিয়ে পড়া। তারপর একসঙ্গে ব্রেকফাস্ট করে ইরাকে ক্লাসে পৌঁছে দিত অরিত্র। যার ক্লাস আগে শেষ হত, সে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করত অন্যজনের জন্য। বন্ধুদের খুনসুটি, লাজুক হাসি, আর একে অপরের চোখের ভাষায় বোনা হত কত স্বপ্ন। প্রতিটা দিন যেন নতুন আনন্দের মোড়কে মোড়া ছিল। সবার চোখ এড়িয়ে আড়ালে হাত ধরা, পাশাপাশি হাঁটার সময় ইচ্ছে করেই একটু বেশি কাছাকাছি চলে আসা। অরিত্রর হাত জড়িয়ে ধরে নিশ্চিন্ত পদক্ষেপে হাঁটা ইরার সেই অস্তিত্ব, ওর চুলের সেই মিষ্টি গন্ধ, অরিত্রকে পাগল করে রাখত। এখনও সদ্যস্নাতা ইরাকে সুযোগ পেলেই কাছে টেনে নিতে চায় অরিত্র, যদিও আজকাল তার পরিণতি হয় একরাশ বিরক্তি। নাহ, অরিত্র ইরাকে কিছুই বুঝতে দেয়নি। মেয়েটা ঘুণাক্ষরেও জানে না, সে নিজের অজান্তেই অরিত্রর অস্তিত্বে কত বড় এক ভাঙন ধরিয়েছে। সম্পর্কের ছয় মাসের মাথায় হঠাৎ একদিন ইরা বলেছিল, “চলো, আমরা বিয়ে করে ফেলি।” কথাটা শুনে ভেতরে ভেতরে তীব্র ধাক্কা খেয়েছিল অরিত্র। প্রেম আর বিয়ের মাঝে তো বিস্তর ফারাক। প্রেম হল মুক্ত বিহঙ্গের মতো ডানা মেলা, আর বিয়ে— এক বিশাল দায়িত্বের প্রতিশ্রুতি। আমাদের সমাজে নিজের পছন্দের মানুষকে পরিবারের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তোলাটা রীতিমতো একটা যুদ্ধ। কত শত অযৌক্তিক বাধা, কত অজুহাত। কিন্তু কয়েকদিন পর যখন ইরা জানাল, ওর রুমমেট বিয়ে করে বাসা ভাড়া নিয়ে থাকছে, তখন বুকের ভেতর অদ্ভুত এক সাহস সঞ্চারিত হয়েছিল অরিত্রর। একটা বয়স থাকে, যখন ছক ভাঙাটাই সবচেয়ে বড় আনন্দ। তার ওপর ভালবাসার মানুষটিকে একান্তে নিজের করে পাওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা তো ছিলই। শুধু তো শরীর নয়, তার সঙ্গে প্রতিটা মুহূর্ত ভাগ করে নেওয়ার দুর্নিবার নেশা। এরপর কত শত জল্পনা, কত স্বপ্নবুনন। একদিন সত্যিই ওদের বিয়েটা হয়ে গেল। কোর্টের হলফনামায় সই করার সময় প্রিয় বন্ধুরা পাশে ছিল। অরিত্র এক নিমেষে সই করে দিলেও, ইরা কলম হাতে নিয়ে কেমন যেন থমকে গিয়েছিল। ওর চোখের কোণে মুক্তোর মতো জমেছিল আনন্দাশ্রু। পার্কের সেই বিশাল ছাতার নীচে দাঁড়িয়ে থাকা অরিত্র আর ইরা— সামনে ওদের অদেখা ভবিষ্যৎ, আর সম্বল বলতে শুধু দুজনের একে অপরের প্রতি বিশ্বাস।


সেদিন বিকেলে যখন প্রথা মেনে বিয়েটা হল, ইরা তখন আদ্যোপান্ত লাজুক নববধূ। মাথায় টানা ঘোমটা, চোখের দৃষ্টিতে অদ্ভুত এক আবেশ। অরিত্র তখন ভাসছে এক-আকাশ পূর্ণতায়, নিজেকে বড্ড পরিণত আর দায়িত্ববান মনে হচ্ছিল তার। বন্ধুদের সাজানো সেই ছোট্ট বাসরঘরে রাজকীয় জৌলুস ছিল না, গয়নার চাকচিক্য ছিল না। ইরার উপহার ছিল শুধু ছোট্ট একটা সোনার নাকফুল আর অরিত্রর এক-সমুদ্র ভালবাসা। কিন্তু বিয়ের পর বোধহয় সবকিছুই অলক্ষ্যে বদলাতে শুরু করে। আর এই পরিবর্তনগুলো একসময় বড্ড প্রকট হয়ে ধরা দেয়। এটাই বোধহয় নিয়ম, এটাই রূঢ় বাস্তব। বিয়ের আগে প্রেমের মুহূর্তগুলো কাটে রঙিন ঘোরে। দেখা হওয়ার আগে পরিপাটি সাজ, নিজেদের ত্রুটিগুলো সযত্নে লুকিয়ে রাখা, ছোট ছোট উপহারে চমকে দেওয়া, এসবই থাকে প্রেমের অনুষঙ্গ। কিন্তু বিয়ের পর সকালে ঘুম থেকে ওঠা থেকে শুরু করে রাতের ক্লান্তি পর্যন্ত, দুটো আটপৌরে মানুষ যখন একই ছাদের নীচে থাকে, তখন সেই তীব্রতা ধীরে ধীরে কমতে থাকে। শুরু হয় একসঙ্গে বেঁচে থাকার, নির্ভরতার নতুন অধ্যায়। অরিত্র ব্যস্ত হয়ে পড়ল সংসার গোছানোর তাগিদে, আর ইরা হয়ে উঠল পুরোদস্তুর গৃহিণী। বাজারের ফর্দ আর প্রাত্যহিক হিসেবনিকেশের মাঝে হারিয়ে যেতে লাগল সেই কপোত-কপোতী ভাব। একটা সময় দুজনেই অনুভব করল, জীবনটা যেন একঘেয়েমির চোরাবালিতে আটকে গেছে। শুরু হল অভিযোগ, জন্ম নিল অভিমান। অথচ দুজনেই যে নিজের অজান্তে কতটা বদলে গেছে, সেদিকে কারও খেয়ালই রইল না। বুকের মাঝে পাহাড়প্রমাণ অভিমান জমিয়ে দুজনেই পথ চলতে লাগল। এক রাতে কথার পিঠে কথায় বেরিয়ে এল ইরার চাপা ক্ষোভ। অরিত্র স্তব্ধ হয়ে শুনল। সে অনুভব করল, ইরার কথাগুলো মিথ্যে নয়। তবু নিজের জমে থাকা অভিমানগুলো সে একবারও মুখে আনল না। মায়া বড় অদ্ভুত অনুভূতি! ইরার অভিযোগগুলো শুনে অরিত্রর যেমন কষ্ট হচ্ছিল, সে কিছুতেই চায়নি তার কথায় ইরাও কষ্ট পাক। বরং এরপর থেকে সে আপ্রাণ চেষ্টা করেছে নিজেকে পাল্টে ফেলার, পুরনো সেই দিনগুলোকে ফিরিয়ে আনার। কিন্তু সবার জীবনেই এমন কিছু অতীত থাকে, যা চাইলেও মোছা যায় না। একদিন ইউনিভার্সিটি থেকে ফিরতে দেরি হওয়ায় অরিত্র যখন এগিয়ে যাচ্ছিল, হঠাৎ দেখল দিঘির পাড়ে একা বসে আছে ইরা। কাছে যেতেই দেখল, মেয়েটার চোখভরা জল। অরিত্রর সাজানো পৃথিবীটা যেন নিমেষেই এলোমেলো হয়ে গেল। যে মেয়েটা অন্ধের মতো বিশ্বাস করে তার হাত ধরে চলে এসেছে, তার চোখে জল কেন? অরিত্র তো কোনও ত্রুটি রাখেনি! সেদিন রাতে ইরা কিছুই খায়নি। বিছানায় বসে ডুকরে কেঁদেছে শুধু। একসময় বেরিয়ে এল আসল সত্যিটা। যে ছেলেটাকে ইরা একসময় ভালবাসত, সে ভার্সিটি ছাড়ার সময় কোনও প্রতিশ্রুতি দিয়ে যায়নি। শুধু এক অব্যক্ত ভালবাসা ছিল দুজনের মাঝে। সেই ছেলেটা চলে যাওয়ার পরই অরিত্রর সঙ্গে ইরার বিয়ে হয়। আজ প্রায় এক বছর পর সেই অতীত ফিরে এসেছে। ছেলেটা এখন সুপ্রতিষ্ঠিত, সে ইরাকে নিজের করে পেতে চায়। আর সে কারণেই ইরার আজ মরে যেতে ইচ্ছে করছে!
ভালবাসার মানুষকে আর যাই হোক, কারও সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া যায় না, একবিন্দুও না। অরিত্র সেদিন বুকের ভেতর ভয়াবহ এক শূন্যতা অনুভব করেছিল। কিন্তু ইরাকে কিছুই বুঝতে দেয়নি। সারা রাত ওকে বুকে জড়িয়ে বসেছিল সে। কারণ অরিত্র জানে, ইরা এখন একান্তই তার। ওই ছেলেটা শুধুই অতীত। পরবর্তী দিনগুলোয় অরিত্র আরও নিবিড় ভালবাসায় ভরিয়ে দিতে চেয়েছে ইরাকে। পরিবারের হাজারও বাধা পেরিয়ে একসময় সে ইরাকে তুলে এনেছে নিজের বাড়িতে। কিন্তু চাকরির কারণে অরিত্রকে বদলি হতে হল অন্য শহরে। নতুন চাকরিতে সংসার পাতার মতো সামর্থ্য তখনও হয়নি, তাই একা থাকতে বাধ্য হল সে। প্রতি উইকএন্ডে সে বাড়ি ফেরে। আর একটু একটু করে লক্ষ করে ইরার বদলে যাওয়া। ইরা এখন কথায় কথায় রেগে যায়, অদ্ভুত এক শূন্যতায় ডুবে থাকে সারাক্ষণ। একসময় পরিস্থিতি এমন দাঁড়াল যে, অরিত্র শুধু গুনত, ইরা ঠিক কতক্ষণ তার সঙ্গে স্বাভাবিক আচরণ করছে। সারাক্ষণ অজানা আতঙ্কে সিঁটিয়ে থাকত সে, এই বুঝি ইরা রেগে গেল! ছুটি শেষে ফিরে যাওয়ার সময় অরিত্র যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচত। দূরে থাকলেই ফোনে ইরা আগের মতোই মিষ্টি আর স্বাভাবিক। কিন্তু কাছে এলেই সব এলোমেলো।
অরিত্র যা ঘুণাক্ষরেও কল্পনা করেনি, সেটাই ঘটল একদিন। টানা কয়েক রাত ফোন করে ইরার নম্বর ব্যস্ত পেল সে। একদিন রাতে আচমকা ঘুম ভেঙে অরিত্র দেখল, ইরা বারান্দার এক কোণে দাঁড়িয়ে ফিসফিস করে কার সঙ্গে যেন কথা বলছে। ইরা বাথরুমে যেতেই অরিত্র কললিস্ট চেক করে দেখল, হ্যাঁ, এটা সেই অতীতেরই নম্বর। অরিত্রর ভেতরটা ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল। নিজেকে অনেক বোঝাল। কিন্তু সন্দেহের এই আত্মদহন বড় বেশি যন্ত্রণাদায়ক। একদিন সরাসরি জিজ্ঞেস করায় ইরা ক্ষোভে ফেটে পড়ল। সম্পর্ক নেই দাবি করে উলটে অরিত্রকেই অপমান করল, এমনকি বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়ার হুমকিও দিল। অরিত্র সেদিনই বুঝেছিল, তাদের মাঝখানে তৃতীয় এক ব্যক্তি খুব শক্তভাবে নিজের জায়গা করে নিয়েছে।
পৃথিবীতে দু’ধরনের প্রেমিক থাকে। একদল ভালবাসার নামে অধিকার ফলাতে গিয়ে সবকিছু কেড়ে নিতে চায়। আরেক দল দেবতার মতো, শুধু একটুখানি খাঁটি নৈবেদ্যয় তুষ্ট। তারা প্রয়োজনে শূন্য হাতে ফিরে যাবে, তবু কারও কাছে ভিক্ষে চাইবে না। অরিত্র দ্বিতীয় দলের মানুষ। ইরার এই পরিবর্তনে তার ভেতরটা দুমড়েমুচড়ে গেলেও সে কাউকে কিছু বুঝতে দেয়নি। স্বামী বা প্রেমিক হিসেবে তার কর্তব্যে একচুলও ঘাটতি হয়নি। শুধু সে জানে, এক বিছানায় শুয়ে থেকেও ইরার মনটা তার থেকে আজ শত যোজন দূরে। এখন আর কোনও রাখঢাক নেই। অরিত্রর অনুপস্থিতিতে ইরা রোজ ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলে সেই মানুষটার সঙ্গে। আর ঠিক তখন থেকেই অরিত্র ঠিক করে নিয়েছে তার নিঃশব্দ প্রস্থানের পরিকল্পনা।
দূরের কোনও মসজিদ থেকে ফজরের আজানের সুর ভেসে আসছে। আর কয়েক ঘণ্টা পরেই অরিত্র তার চেনা এই পৃথিবীটা ছেড়ে অনেক দূরে চলে যাবে। সবাই জানে, সে উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে যাচ্ছে। কিন্তু অরিত্র নিজে জানে, এই ফেরার পথ সে চিরতরে মুছে দিয়ে যাচ্ছে। দূরে গিয়ে একসময় সে মুক্তি দেবে ইরাকে। কাছে থেকে এই কাজটা করা তার পক্ষে অসম্ভব। সে যে বড্ড ভালবাসে ইরাকে। কিন্তু যে নারী তার ভালবাসার আশ্রয়ে নিজেকে বেঁধে রাখতে পারেনি, অন্য এক মোহের জালে স্বেচ্ছায় জড়িয়েছে, তাকে জোর করে আটকে রাখার কোনও মানে হয় না। ভাঙা আয়নার মতো একটা ফাটল-ধরা সম্পর্ক বয়ে বেড়ানো শুধুই আত্মপ্রবঞ্চনা। কিছু মানুষ ঠিক এমনই হয়। তারা জানে যে তারা ভুল করছে, সাময়িক মোহে পড়ে চরম মূল্য দিতে চলেছে। নিজের হাতে নিজের সুন্দর জীবনটাকে খাদের কিনারায় ঠেলে দিচ্ছে। তবু তারা কিছুতেই নিজেকে ফেরাতে পারে না। কিছুতেই না!
ঘুমন্ত ইরার উন্মুক্ত গ্রীবার ওপর এসে পড়েছে একফালি জোছনা। অরিত্রর বুকের ভেতর জমে থাকা দীর্ঘ এক বছরের সুপ্ত আগ্নেয়গিরি যেন আজ সমস্ত বাঁধন ছিঁড়ে ফেলতে চাইল। কাল থেকে এই চেনা গন্ধ, এই রেশমের মতো নরম স্পর্শ, এই চাদরের ওম— কিছুই আর তার থাকবে না। এক অদ্ভুত ঘোরে অরিত্র সন্তর্পণে ইরার পাশে শুল। সুতো বোনার মতো নিপুণ, তুলতুলে আবেশে ছুঁয়ে দিল ওর শরীর। ঘুমের ঘোরেই চেনা স্পর্শ পেয়ে ইরা পাশ ফিরে জড়িয়ে ধরল অরিত্রকে। অরিত্রর কাঁপতে থাকা ঠোঁট নেমে এল ইরার কপালে, গালে, তারপর সেই গোলাপ-পাপড়ির মতো ঠোঁটে। দীর্ঘ, মদির চুম্বনে যেন শুষে নিতে চাইল ইরার সমস্ত অস্তিত্ব। ইরার আধো-ঘুমন্ত শরীরটা প্রথমে একটু চমকে উঠলেও, মুহূর্তেই সাড়া দিল আদিম শিহরণে। নিবিড় প্রেমের বন্য উন্মাদনায় জড়িয়ে গেল শরীর দুটো। দুটো ছটফটে আত্মার শেষবারের মতো মিশে যাওয়ার করুণ আর্তি। দীর্ঘ এক বছরের জমানো তৃষ্ণা, না-বলা অভিমান, আর বুকের ভেতর লুকিয়ে রাখা এক-সমুদ্র ভালবাসা, সবকিছুর নির্যাস অরিত্র ঢেলে দিল ইরার শরীরের ভাঁজে ভাঁজে। ইরার নখ বসে গেল অরিত্রর পিঠে, অন্ধকারের বুক চিরে এক অপূর্ব প্রণয়ের ক্যানভাসে দুজনে আঁকতে লাগল তাদের শেষ মিলনের ছবি। অরিত্র জানত, এই রাত তার জীবনের শেষ বসন্ত। তাই প্রতিটা স্পর্শে, প্রতিটা আদরে সে রেখে গেল অনন্ত কালের মোহর। ভোর হল। ক্লান্ত, তৃপ্ত ইরা গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। ওর নগ্ন, সুন্দর পিঠের ওপর পরম মমতায় চাদরটা টেনে দিল অরিত্র। বুকে পাথর বেঁধে বিছানা ছাড়ল সে। আর এক মুহূর্তও এখানে থাকা যাবে না, তাহলে এই মায়ার বাঁধন ছিঁড়ে বেরোনো আর সম্ভব হবে না। নিজের গোছানো স্যুটকেসটা হাতে নিয়ে নিঃশব্দে ঘর থেকে, এবং ইরার জীবন থেকে চিরতরে বেরিয়ে এল অরিত্র।


এয়ারপোর্টের লাউঞ্জে বসে আছে অরিত্র। ফ্লাইটের অ্যানাউন্সমেন্ট শুরু হয়ে গেছে। তার গন্তব্য এমন এক দেশ, যেখান থেকে সে আর কোনওদিন ফিরবে না। হঠাৎ পকেটে রাখা ফোনটা বেজে উঠল। হোয়াটসঅ্যাপ নোটিফিকেশন। একটা আননোন নম্বর থেকে মেসেজ। রাজীব। সেই ছেলেটা, যাকে ইরা একসময় ভালবাসত। অরিত্রর আঙুল কেঁপে উঠল। সে মেসেজটা খুলল। ‘অরিত্র, আমি আর পারলাম না ভাই। গত এক বছর ধরে তোর দেওয়া টাকায় আমি ইরার সঙ্গে পরকীয়ার অভিনয় করেছি, ঠিক যেভাবে তুই স্ক্রিপ্ট লিখে দিয়েছিলি। তুই বলেছিলি, তোর ব্রেন টিউমারের লাস্ট স্টেজের কথা জানলে ইরা বাঁচতে পারবে না। তুই মরে গেলে ও যেন আমাকে নিয়ে নতুন করে সংসার পাতে, সেই জন্যই তুই নিজের চোখে খারাপ হয়ে ওকে আমার দিকে ঠেলে দিতে চেয়েছিলি। তোর এই নিখুঁত পরিকল্পনা অনুযায়ী আমি রোজ রাতে ওকে কল করে ব্ল্যাকমেল করেছি, জোর করে কথা বলেছি, যাতে তুই সন্দেহ করার নাটক করে ওর থেকে দূরে সরে যেতে পারিস। কিন্তু কাল রাতে আমি সব সত্যিটা ইরাকে বলে দিয়েছি। তোর ক্যানসারের কথা ও জেনে গেছে। তুই নিজের জীবন দিয়ে যে নিখুঁত পরকীয়ার জাল বুনেছিলি, তা আজ ছিঁড়ে গেছে অরিত্র। তুই যাস না, ইরা আসছে। পাগলের মতো ছুটে আসছে। ইরা তোকে নিতে আসছে অরিত্র।’ অরিত্রর হাত থেকে ফোনটা খসে পড়ে গেল। চারপাশের কোলাহল যেন মুহূর্তে স্তব্ধ হয়ে গেছে। বুকের ভেতরটা দুমড়েমুচড়ে যাচ্ছে এক অসীম শূন্যতায়। সে চেয়েছিল তার মৃত্যুর পর ইরা যেন ঘেন্নায় তাকে ভুলে গিয়ে নতুন করে বাঁচে, অথচ সে নিজেই বুঝতে পারেনি ভালবাসার সুতোগুলো কতটা গভীরে বোনা ছিল। চোখ তুলে সামনের দিকে তাকায় অরিত্র। লাউঞ্জের গ্লাসের ওপারে, দূরে গেটের কাছে দাঁড়িয়ে থাকা একটা চেনা, ছিপছিপে অবয়ব… এলোমেলো চুল, চোখে শ্রাবণের ধারা নিয়ে তাকেই খুঁজছে। তার ইরা। তার একান্ত নিজের ইরা।
অরিত্রর দু’চোখ বেয়ে জল নামছে। তার টি শার্টের বুকের কাছটা ভিজে যাচ্ছে। ও বুঝতে পারছে, শার্টের নীচে ছড়িয়ে থাকা ওর চওড়া বুকে ওর নিজের চোখের জল আর ইরার চোখের জল মিলেমিশে যাচ্ছে। ওটা বড় আদরের জায়গা ছিল ইরার কাছে, ওখানে মাথা রাখত পরম নিশ্চিন্তে, আশ্রয়ে।
কোনও মহিলার সুরেলা কণ্ঠে প্লেন ছেড়ে যাওয়ার অ্যানাউন্সমেন্ট ভেসে এল। এবার যে ওকে উঠতেই হবে, না হলে বড্ড দেরি হয়ে যাবে। উঠে দাঁড়িয়ে পা বাড়াল অরিত্র। বাতাসে ইতিউতি ছড়িয়ে থাকা শূন্যতা ভরাট করে দিচ্ছে জমাট অভিমান, বুকফাটা কান্না।

সহযোগিতার হাত বাড়াতে ওপরের ছবিতে ক্লিক করুন

[পরম্পরা ওয়েবজিন, নভেম্বর ২৬, সূচিপত্র – এখানে ক্লিক করুন]

0 0 ভোট
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
পংক্তির ভেতর মন্তব্য
সব মন্তব্য