
পলাতক
টেস্টিং রুমের লম্বা টেবিলে বাহাত্তরটা সাদা কাপ সাজানো। প্রতিটার সামনে একমুঠো শুকনো চা-পাতা, পাশে নম্বর। দেখলে হাসপাতালের সারি সারি বিছানার কথা মনে পড়ে। আমি চামচে লিকার তুলি, শব্দ করে মুখে টানি, জিভে ঘুরিয়ে পিতলের পিকদানিতে ফেলে দিই। এগারো বছর ধরে মিশন রো-র এক চা-ব্রোকার ফার্মে দিনে তিনশো কাপ চা মুখে দিই, একটাও গিলি না। খাতায় লিখি, ব্রিস্ক, ব্রাইট, গুড কালার। কিংবা কোর্স, ফ্ল্যাট, লেস ক্যারেক্টার। আমার একটা বিশেষণে নিলামে কোনও বাগানের চায়ের দাম ওঠে, নামে।
সেদিন দুপুরে বড়সাহেব ডাকলেন। মিস্টার বাগচী বাঙালি, তবু অফিসে সবাই তাঁকে সাহেব বলে। ডাকটা দেড়শো বছর ধরে এক চেয়ার থেকে আরেক চেয়ারে চলে আসছে, পুরোনো আসবাবের মতো। একটা ফোল্ডার ঠেলে দিয়ে বললেন, ‘বরাক উপত্যকার রতনছড়া টি এস্টেটের একশো পঁচিশ বছর। হেরিটেজ রিজার্ভ আনবে। তুমি গিয়ে চা যাচাই করবে, পুরোনো নথিও দেখবে।’
পাশে ল্যাপটপ খুলে বসেছে তিস্তা, আমাদের নতুন ব্র্যান্ডিং কনসালট্যান্ট। পর্দায় একটার পর একটা বিজ্ঞাপনের খসড়া। প্রথমটায় পুজোর সকাল। বৃদ্ধা বারান্দায় দুটো কাপ সাজিয়ে বসে আছেন। দূরে শাঁখ বাজতেই দরজায় মেয়ে আর নাতনি। দ্বিতীয়টায় হস্টেলের ছেলে মাকে ফোনে বলছে, ‘তোমার হাতের চায়ের মতো হয় না।’ মা পুরোনো টিনের কৌটো খুলছেন। তৃতীয়টায় সেপিয়া রঙের একশো বছরের পুরোনো ছবি বদলে যাচ্ছে আজকের চা-বাগানে। একই পরিবারের দুই প্রজন্ম একই ভঙ্গিতে পাতা তুলছেন।
‘শালিমারের পুজোর বিজ্ঞাপনগুলো দেখেছ?’ তিস্তা বলল। ‘ছোট্ট একটা গল্প, শেষে পণ্য। আমাদেরও একটা সত্যিকারের পরিবার চাই। পুরোনো শ্রমিক পরিবারের উত্তরসূরি। তাঁদের ছবি, তাঁদের স্মৃতি। অনুমতি নিয়ে বিজ্ঞাপনে ব্যবহার করব। লোকে এখন নস্টালজিয়া কেনে। বিশেষ করে অন্যের নস্টালজিয়া।’
‘আমি চা চাখি, বংশলতিকা খুঁজি না,’ বললাম।
বাগচীসাহেব বললেন, ‘তোমাকে বংশলতিকা লিখতে হবে না। বাগানের দাবি যাচাই করতে হবে। পুরোনো নথিতে কোনও পরিবারের সূত্র পেলে খোঁজ নেবে। তোমার রিপোর্ট ছাড়া ব্র্যান্ডের ঐতিহাসিক দাবিতে আমরা সই করব না।’
তিস্তা হাসল। ‘চা যত সাধারণ, গল্প তত জমকালো।’
রতনছড়ার বাংলো টিলার মাথায়। নিচে কোমরসমান চায়ের ঝোপ। মেয়েরা কপালে বাঁধা ফিতের সাহায্যে পিঠের ঝুড়ি সামলে পাতা তুলছেন। ম্যানেজার বড়ুয়াবাবু বললেন, ‘দুটি পাতা একটি কুঁড়ি। এর বেশি তুললে কোয়ালিটি নষ্ট।’

স্যাম্পল চেখে লিখলাম, কোর্স, স্ট্রং, লো অ্যারোমা। বড়ুয়াবাবু আমাকে পুরোনো অফিসঘরের একটা উইধরা আলমারি দেখালেন। ‘ব্রিটিশ আমলের লেবার রেজিস্টার। এতকাল সবাই সাহেবের বাংলোর ছবি খুঁজেছে। শ্রমিকদের খাতা কেউ চায়নি।’
চামড়ায় বাঁধানো খাতার গায়ে লেখা, Labour Register, Ratanchhara Tea Estate। ১৯২১ সালের রেজিস্টার খুলতেই লাল কালির তিনটি লাইন চোখে পড়ল।
No. 412. Budhni, w/o Mangal. Dist. Manbhum. Absconded, 9.5.21.
No. 413. Mangal, s/o Bhagirath. Dist. Manbhum. Absconded, 9.5.21.
No. 414. Phulo, d/o Mangal. Child. Absconded, 9.5.21.
তারপর সাত পাতা জুড়ে একই তারিখ, একই শব্দ। পলাতক। তিনজনের নামের পাশে গ্রামের ঠিকানা, বেলডিহ, থানা কাশীপুর। মানভূমের ওই অঞ্চল এখন পুরুলিয়ায়।
ছবিগুলো তিস্তাকে পাঠালাম। সঙ্গে লিখলাম, ‘এই পরিবারের তিনজনই ১৯২১ সালে বাগান ছেড়েছেন।’
তিস্তা ফোন করল। ‘দারুণ! বিজ্ঞাপনের নাম হবে ফিরে আসা। প্রথম দৃশ্যে চা-বাগান, তারপর লাল মাটির গ্রাম। উত্তরসূরি পুরোনো কোনও জিনিস হাতে নিয়ে বলবেন, আমাদের গল্প এখানেই শুরু। লোকটাকে খুঁজে বার করো। সম্মতি পেলে শুটিং করব।’
‘কিন্তু ওদের পাশে পলাতক লেখা।’
‘সেটা বিজ্ঞাপনের লাইন নয়, সুমন্ত। তুমি আগে পরিবারটাকে খুঁজে দেখো।’
অফিসের কাজেই পুরুলিয়া গেলাম। কাশীপুরের বেলডিহ গ্রামে পুরোনো নামের খোঁজ কেউ দিতে পারল না। শেষ বিকেলে এক চায়ের দোকানি বলল, ‘আসাম থিকে ফিরেছিল এমন বুড়ির কথা শুনেছি। উয়ার নাতি ভীম মাহাতো ওই মাঠের ধারে থাকে।’
ভীম মাহাতোর বয়স ছিয়াশি। দাওয়ায় শালপাতার দোনা বুনছিলেন। ফোনে রেজিস্টারের ছবি দেখিয়ে বুধনি, মঙ্গল, ফুলোর নাম পড়লাম। তাঁর হাত থেমে গেল।
‘ফুলো আমার মা। বুধনি আমার দিদিমা। উরা লিখে রেখেছে? কী লিখেছে?’
বললাম, ‘পলাতক।’
বৃদ্ধ হেসে উঠলেন। ‘ঘরের মানুষ ঘরে ফিরলে পলাতক হয়, ই কথা শুনেছ বাবু? আমার মা তখন আট বছরের মেয়ে। উয়াও পলাতক?’
টিনের বাক্স থেকে লাল সুতো বাঁধা পিতলের চাকতি বার করলেন। গায়ে R.T.E. 412।
‘মজুরির হিসাবের জন্য ইটা লাগত। দিদিমা গলায় পরে ফিরেছিল। মাকে দিয়ে বলেছিল, ই আমাদের লাম লয়, ই আমাদের দাম। দামটো মনে রাখবি। নইলে আবার কেউ কিনে লিয়ে যাবেক।’
তারপর ঝুমুরের ভাঙা সুরে গাইলেন,
‘টিকিট দিল না বাবু, জানালা দিল বন্ধ, পায়ে পায়ে মুলুক চলি, পথ যে বড় মন্দ।’
আমি বিজ্ঞাপনের কথা বলতেই বৃদ্ধ জিজ্ঞেস করলেন, ‘আমাদের ছবি দিয়ে কী হবে?’
‘আপনাদের পরিবারের গল্প দিয়ে চায়ের বিজ্ঞাপন হবে।’
তিনি চাকতিটা বাক্সে রেখে দিলেন।
‘দিদিমা চা-পাতার দাম পায় নাই। উয়ার কান্না দিয়ে আবার চায়ের দাম বাড়াবেক?’
সম্মতিপত্রটা ব্যাগ থেকে বার করলাম না। বরং বৃদ্ধকে বললাম, ‘তারপর কী হয়েছিল, বলুন।’
বুধনি আসামে যায় ১৯০৮ সালে, চোদ্দো বছর বয়সে। আগের বছরের খারাপ ফসলে মানভূমে অভাব। আড়কাঠি তার বাবাকে দশ টাকা আগাম দিয়ে কাগজে টিপছাপ নিয়েছিল। বলেছিল, আসামে এমন গাছ আছে, পাতা ছিঁড়লেই টাকা। রেল, স্টিমার পেরিয়ে বুধনি রতনছড়ায় পৌঁছোলে বড়বাবু চাকতি ধরিয়ে দেন। চারশো বারো।
বুধনি বলেছিল, ‘আমার লাম বুধনি।’
বড়বাবু ততক্ষণে পরের শ্রমিককে ডাকছেন।
তারপর তেরো বছর। পাতা তোলা, ওজনের হিসাব, বাগানের দোকানের ধার। মজুরি হাতে আসার আগেই খরচ কাটা যায়। সর্দারের নজরদারি আর ঋণের ভয়ে ঘরে ফেরা সহজ নয়। বাগানেই মঙ্গলের সঙ্গে বিয়ে হলো, জন্মাল ফুলো। এই ব্যবস্থার কথা দ্বারকানাথ গঙ্গোপাধ্যায় অনেক আগেই ‘সঞ্জীবনী’তে লিখেছিলেন। কলকাতায় সে লেখা পড়া হয়েছিল। বুধনি কোনওদিন পড়তে পারেনি।
১৯২১-এ চায়ের বাজার মন্দা, চালের দাম চড়া। শ্রমিকদের মধ্যে খবর ছড়াল, গান্ধী মহারাজের রাজ আসছে। মে মাসের গোড়ায় চরগোলা, তারপর লংলাই অঞ্চলের বাগান থেকে মানুষ দলে দলে বেরিয়ে পড়লেন। ‘মুলুক চলো।’
মঙ্গল ভয় পেয়েছিল। ‘ফুলোটা ছোট। সর্দার ধরলে?’
বুধনি ঝুড়ি নামিয়ে কপালের ফিতে খুলল। ‘ঘরে ফিরতে চাওয়া কি চুরি?’
মেয়ের হাত ধরে হাঁটা দিল।
করিমগঞ্জ স্টেশনে হাজার হাজার শ্রমিক। টিকিটের জানালা বন্ধ। ভিতরে খাকি কোট, গোল চশমা পরা এক বাঙালি বুকিং ক্লার্ক। বুধনি টোকা দিল।
‘টিকিট দাও কেনে, বাবু। পয়সা আছে।’
লোকটি বললেন, ‘সাহেবের হুকুম। কুলিদের টিকিট নেই।’
‘আমরা কুলি লই। ঘরে যাচ্ছি।’
একবার চোখ তুলে লোকটি কাঠের পাল্লা নামিয়ে দিলেন।
খট করে।
বুধনি সেই শব্দ আর ভোলেনি।
কেউ টিকিট জোগাড় করে, কেউ বিনা টিকিটে ট্রেনে উঠলেন। চাঁদপুরে পৌঁছে পরে আসা হাজার হাজার শ্রমিক দেখলেন, স্টিমারে ওঠার পথ বন্ধ। বৃষ্টি, অনাহার, কলেরা। কয়েকজন বাঙালি যুবক খাবার নিয়ে এলেন। বুধনি ভাবল, সব বাবু এক রকম নয়। কেউ জানালা বন্ধ করেন, কেউ হাঁড়ির ঢাকনা খোলেন।

২০ মে রাতে পুলিশ ইয়ার্ড খালি করতে এসে লাঠি চালাল। পরদিন সশস্ত্র গোর্খা বাহিনীর আক্রমণে ভিড় আবার ছত্রভঙ্গ। মঙ্গল ফুলোকে বাঁচাতে গিয়ে মাথায় আঘাত পেল। বুধনি মেয়েকে নিয়ে মালগাড়ির নিচে আশ্রয় নিল। ফুলো শুধোল, ‘বাবা কুথায়?’
পরে মঙ্গলকে খুঁজে পেল বুধনি। কাঁধ ধরে ডাকল, ‘ওঠ কেনে। ঘরে যাবি না?’
মঙ্গল আর উঠল না।
কতজন মরলেন, সরকারি ও অন্য বিবরণে তার হিসাব মেলে না। বুধনির হিসাবে একজন মানুষ কমে গেল।
দমনপীড়নের প্রতিবাদে রেলকর্মীরা ধর্মঘটে গেলেন, পরে স্টিমারের কর্মীরাও। বুধনি শেষ পর্যন্ত নৌকা, রেল আর পায়ে হেঁটে মানভূমে ফিরল। সঙ্গে ফুলো আর পিতলের চাকতি। রতনছড়ার রেজিস্টারে মৃত মঙ্গলের পাশেও রইল একই শব্দ—পলাতক।
ভীম মাহাতো থামলেন। সন্ধে নেমেছে। উঠোনে তাঁর নাতবউ উনুন ধরাচ্ছে।
‘আমার লাতিটো বিশ সালের লকডাউনে কেরালা থিকে ফিরল,’ বৃদ্ধ বললেন। ‘কারখানা বন্ধ। রেল বন্ধ। মালিক বলল, বাড়ি যাও। কিন্তু যাবে কী করে? পকেটে কয়েকশো টাকা। কখনও হাঁটল, কখনও ট্রাকে উঠল, কখনও রাস্তার ধারে রাত কাটাল। কুড়ি দিন পরে ঘরে পৌঁছোল। পায়ের জুতোজোড়া আর আস্ত ছিল না।’
তিনি পিতলের চাকতিটা হাতে তুলে নিলেন।
‘দিদিমা যখন ফিরেছিল, সাহেব টিকিট দেয় নাই। আমার লাতি যখন ফিরল, প্রথম দিকে টিকিট কাটবার ট্রেনই ছিল না। একশো বছর গেল বাবু। ঘরে ফেরার রাস্তাটাই খালি বদলাল না।’
একটু থেমে বললেন, ‘ঠিকাদার আগাম পাঁচ হাজার টাকা দিয়েছিল। আড়কাঠির লাম বদলেছে, কাজটো বদলায় নাই।’
দূরে ছৌয়ের মুখোশ বাঁধা পর্যটকের গাড়ি চলে গেল। বৃদ্ধ তাকিয়ে বললেন, ‘উরা মুখোশ কিনতে আসে। পিছনের মুখ দেখে না।’
কলকাতায় ফিরে তিস্তাকে জানালাম, ভীম মাহাতো ছবি ব্যবহারের অনুমতি দেননি। গল্পটাও বললাম। তিস্তা চুপ করে শুনল। তারপর পর্দায় নতুন খসড়া খুলল। পুজোর উঠোন, দিদিমা, নাতনি, এক কাপ চা।
‘এইটুকুই রাখি। মানুষ চা খেতে খেতে বিপদের গল্প দেখতে চায় না।’
বাগচীসাহেব বললেন, ‘সাহেবের বাংলোর ছবি দাও। ঝামেলা নেই।’
আমি স্যাম্পলটা আবার চাখলাম। এগারো বছরে প্রথমবার পিকদানিতে না ফেলে গিলে ফেললাম।
কড়া। তেতো। মোটা।
বাড়ি ফেরার পথে প্রপিতামহের কথা মনে পড়ল। শুনেছি, তিনি আসাম-বেঙ্গল রেলওয়ের কেরানি। ১৯২১-এর রেল ধর্মঘটে যোগ দিয়ে চাকরি হারিয়েছিলেন। পুজোর সময় তাঁর ছবিতে মালা পড়ে। কিন্তু কোন স্টেশনে কাজ করতেন?
মা পুরোনো সিন্দুকের চাবি দিলেন। কাপড়ে মোড়া ডায়েরির প্রথম পাতায় লেখা, ‘শ্রীশশিভূষণ সেন। বুকিং ক্লার্ক। করিমগঞ্জ।’
মে, ১৯২১।
‘অদ্য বড়সাহেবের হুকুমে কুলিদিগকে টিকিট দিলাম না। একটি মেয়েলোক জানালায় মাথা ঠুকিতেছিল। বলিল, সে কুলি নহে, ঘরে যাইতেছে। আমি মুখের দিকে চাহিতে পারি নাই। চাকরি গেলে সংসার চলিবে কীসে।’
পরের পাতায় চাঁদপুরের সংবাদ।
‘সেই মেয়েলোকটি কি উহাদের মধ্যে ছিল? আমি জানালা বন্ধ করিয়াছিলাম।’
পরে লেখা, ‘কাল রেলে ধর্মঘট। আমিও যাইব। চাকরি যায় যাক। কিন্তু অপরাধ কি মুছিবে?’
মেয়েটি বুধনি ছিল কি না জানি না। হয়তো আরও কতজন সেই জানালায় মাথা ঠুকেছিলেন। আমরা শুধু ধর্মঘটের গল্প মনে রেখেছি। জানালা বন্ধ করার ঘটনাটি নয়।
মা ডায়েরি পড়ে বললেন, ‘তোর ঠাকুরদা এসব বলেনি।’
আমি বললাম, ‘ধর্মঘট করেছিলেন। তার আগে কী করেছিলেন, সেটাও সত্যি।’
শশিভূষণের হাতে ছিল কলম, স্ট্যাম্প, কাঠের জানালা। আমার হাতে চামচ আর চায়ের দামের খাতা। দাম নামলে চাপটা কোন শ্রমিকের মজুরিতে পড়ে, জানতে চাইনি। শশিভূষণ প্রথমে চাকরি বাঁচিয়েছিলেন, পরে বিবেকের ডাকে সাড়া দিয়েছিলেন। আমি এতদিন কেবল চাকরিটাই বাঁচিয়েছি।
পরদিন তাঁর ছবির কাচের নিচে ডায়েরির প্রথম পাতার প্রতিলিপি রাখলাম। মালা খুললাম না। অফিসে রতনছড়ার রিপোর্টে লিখলাম, Coarse. Strong. Low Aroma. তার নিচে যোগ করলাম, ‘এই বাগানের শ্রমিকেরা একদিন ঘরে ফিরতে চেয়েছিলেন। রেজিস্টারে তাঁদের পলাতক লেখা আছে।’ এই লাইনটা আর কাটলাম না।
সেদিন সন্ধ্যায় ভীম মাহাতোর পাঠানো একটা ছবি পেলাম। তাঁর নাতি উঠোনে বসে পায়ে ওষুধ লাগাচ্ছে। পাশে সেই পিতলের চাকতি। ছবির নিচে বৃদ্ধের নাতবউ লিখেছে, ‘ওর দিদিমার দিদিমাও ঘরে ফিরেছিল। ও-ও ফিরেছে।’

ছবিটা তিস্তাকে পাঠালাম না। ওদের অনুমতি নেই। তাছাড়া কোনও বিজ্ঞাপনেরও দরকার নেই।
বুধনি পালিয়েছিলেন ঋণের বেড়া থেকে। মঙ্গল ঘরে ফিরতে গিয়ে মরেছিলেন। আট বছরের ফুলো মায়ের হাত ধরে হেঁটেছিল। একশো বছর পরে ভীমের নাতিও হেঁটেছে। তার কাছে মোবাইল ফোন ছিল, পরিচয়পত্র ছিল। কিন্তু ঘরে ফেরার জন্য সেদিন সেসবের কোনওটাই যথেষ্ট ছিল না। ১৯২১ সালে ঔপনিবেশিক প্রশাসন শ্রমিকদের টিকিট দিতে বাধা দিয়েছিল। ২০২০ সালে লকডাউনে যাত্রীবাহী ট্রেন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অসংখ্য পরিযায়ী শ্রমিক পথে নেমেছিলেন। কারণ আলাদা, সময় আলাদা। ঘরে ফেরার অসহায়তাটা একই রয়ে গেল।
শশিভূষণ নিজের বিবেকের কাছ থেকে পালিয়েছিলেন। আমাদের পরিবার তাঁর ডায়েরির প্রথম পাতা থেকে। তিস্তা পালিয়েছে এমন গল্প থেকে, যা বিজ্ঞাপনে বিকোবে না। আমি নিজের খাতার বাইরে থাকা মানুষদের কাছ থেকে। অথচ পলাতক লেখা হয়েছে তাঁদের নামে, যাঁরা নিজেদের ঘর ছাড়া আর কিছু চাননি।
আবার খুললাম রেজিস্টারের ছবিটা। চারশো বারো, চারশো তেরো, চারশো চোদ্দো। বড়ুয়াবাবুর কথাটা মনে পড়ল—দুটি পাতা একটি কুঁড়ি। চাঁদপুরে একটা পাতা ঝরে গিয়েছিল। আরেকটা পাতার বুকে কুঁড়িটা বেঁচেছিল। সেই শিশুর ছেলেই আজও চাকতিটা আগলে রেখেছেন।
লাল কালিতে বুধনি, মঙ্গল আর ফুলো আজও পলাতক।
অথচ তাঁরা পালাচ্ছিলেন না।
তাঁরা ঘরে ফিরছিলেন।

