
অনাহত

[পূর্বানুবৃত্তিঃ শুরু হয়ে গেল লক-ডাউন। রেশন দোকানে লম্বা লাইন। গগন তিয়াসা-র মধ্যেকার রসায়ন নতুন করে ধরা দেয়। গগনের বেতন কমে গেল। এক বৃদ্ধকে অকারণ মার খেতে দেখে। রাতে ন’মিনিটের ব্ল্যাক আউটের পর অকাল দীপাবলি। বন্ধু বিকাশ আত্মশক্তির ওপর নির্ভর করতে বলে। বুঝতে পারেনা কোথায় সেই শক্তি পাবে? বিকাশের কথায় জোর পায়, ঠিক করে একদিন ওর আশ্রমে যাবে। ছোট্ট নুরুল ভাবে ঈদের ছুটিতে বাড়ি যাবে। তা আর হয়না। ওর চাচা মুম্বাই থেকে বাড়ি ফিরতে পুলিশের হাতে মার খায়। ভাবে হেঁটেই ফিরবে! রেভেনিউ টার্গেটের চাপে গগন দিশেহারা, তিয়াসার শরীরে আশ্রয় খোঁজে। তিয়াসার মনের ভেতর দ্বন্দ্ব চলতে থাকে।]
পর্ব ৮- আততায়ী
গতজন্ম কাকে বলে? তা কি ছোঁয়া যায়? অনেক রাস্তা পার হয়ে এসে, হঠাৎ করে পিছনে তাকালে সেই সময়টাকে গতজন্ম বলেই মনে হয়। অন্ততঃ সোমনাথের তেমনি মনে হয়েছিল। ডক্টর সোমনাথ। বেড়ে ওঠার দিনগুলোতে পাড়াতে চোখে পড়ার মতো সৌন্দর্য ছিল তিয়াসার। যদিও সোমনাথের চেয়ে দুই ক্লাস ওপরে পড়তো, কিন্তু আবেগ আটকাতে পারেনি। নিজেকে নিবেদন করেছিল তিয়াসার বেদীতে। তিয়াসা তখন আকাশে ওড়া তুলোটে মেঘের মতো, সোমনাথের ধরাছোঁয়ার বাইরে। একদিন আলতো করে গাল টিপে বলেছিল, “দিদিদের পিছনে ঘুরে কী হবে? তোর থেকে দুতিন ক্লাস নিচে খোঁজ রাখ, কত কুঁড়ি ফুল হয়ে ফুটবে বলে বসে আছে।”
সোমনাথের ভালো লাগেনি সে কথা শুনতে। সেদিন তিয়াসাদের বাড়িতে কেউ ছিল না। সোমনাথ চৌকাঠ ডিঙিয়েছিল। কীজানি, তিয়াসারও সেদিন কী হয়েছিল, করুণা করেছিল সোমনাথকে। ওই একদিনই, তারপর আর ফিরেও চায় নি।

একটা ভাঙা দুপুরের স্মৃতি নিয়ে সোমনাথ সময়ের সাথে ঘুরে চলল, তার নিজের পথে। ডাক্তারি পড়ল, বিয়ে হল বীথির সাথে, একটা ছেলে নাম সায়ন্তন। কিন্তু কোথায় যেন মনটা পড়ে রইল। বীথির সাথেও সম্পর্কটা কেমন খাপছাড়া হয়ে রইল। সোমনাথের পরিধিতে ওর হাসপাতাল, রুগী, গ্রামদেশের চেম্বার, ওষুধ কোম্পানির সেমিনার। এর মধ্যে বীথি আর সায়ন্তন এক অনন্ত কক্ষপথের পৃথক গ্রহ হয়ে রইল। তাকে গলগ্রহ না বলে অভ্যাস বলা চলে।
ছেলেবেলায় অমন ধাক্কা অনেকের হয়, সেটা সবাই কালের নিয়মে ভুলেও যায়। সোমনাথ তেমন ভুলেও গিয়েছিল। আলগা শুনেছিল, তিয়াসার সঙ্গে বড় বহুজাতিক কোম্পানির এক দাপুটে সাহেবের বিয়ে হয়েছে। তাই তিয়াসার জন্য যে নিজের সংসারে শিকড় গজায়নি, এমনটা সোমনাথ নিজেও কখনও ভাবেনি। গোল বাধালো ফেসবুক। কোথা থেকে সময় খুঁড়ে সম্পর্ক বার করে আনে। ছোটবেলার বন্ধু, স্কুলের সহপাঠী, হস্টেলের রুমমেট যে কিনা এখন লন্ডনের প্রতিষ্ঠিত ডাক্তার, এমন অনেককেই খুঁজে পেয়ে যেন পূর্বজন্ম বোধ তৈরী হতে থাকে। আর সেই বোধ অস্তিত্বে রূপান্তরিত হয়, যখন তিয়াসাকে খুঁজে পেল। হঠাৎ করে ছবি দেখে, মনে হল সময় দাঁড়িয়ে গেছে। এতগুলো বছরের ব্যবধানেও মানুষ কীকরে একই রকম থাকে? অবাক হয়ে তিয়াসাকে মেসেজ করেছিল, “প্রোফাইলের ছবিটা কবেকার?”
তিয়াসা জবাব দেয়, “এই তো, গত ডিসেম্বর মাসে, দীঘা গিয়েছিলাম। গগন তুলেছে।”
তারপর থেকে নিয়ম হয়ে যায়। দুপুরগুলো অনেক সময়, দুজনের শব্দ চালাচালির খেলা। ক্রমে ফোন নম্বরের আদান প্রদান। মাঝে কয়েকবার দেখাও করেছে।
আজ ডক্টর সোমনাথ বুঝতে পারে তিয়াসা হঠাৎ করে কথা শেষ করে। ঠিক কী কারণে কথা বন্ধ হল, বুঝতে পারলো না। একবার ভাবে, আবার ফোন করে। কোথাও যেন একটা বাধা এলো। লকডাউনে তিয়াসার স্বামী এখন বাড়িতে, এই সময় ফোন করা হয়তো ঠিক হবে না। নিজেকে ফোন থেকে বিরত করে, অন্য কথা ভাবে।
সোমনাথ বাইপাসের ধারে একটা নামী বেসরকারী হাসপাতালের চিকিৎসক। কলকাতা থেকে পঞ্চাশ কিলোমিটার দূরের গঞ্জ আমনদীঘি। সোমনাথ এখানে সপ্তাহে দুইদিন আসে। কলকাতায় প্রাইভেট প্র্যাকটিস করতে হলে, ওকে ওর মাস্টারমশাইদের সাথে প্রতিযোগিতায় নামতে হবে। প্রথিতযশা সেইসব ডাক্তারদের কাছে ওর মতো অল্প বয়সী চিকিৎসক হালে পানি পাবে না। তাই বিকল্প উপায় হিসেবে জেলা শহরগুলোকে বেছে নিয়েছে। আমনদীঘি, সে হিসেবে বেশ ফলপ্রসূ। সাধারণ চিকিৎসা ছাড়া এখানকার অনেককেই কলকাতার নিজের হাসপাতালে চিকিৎসা করাতে নিয়ে যেতে পারে। এছাড়া, সীমান্ত পার করে অনেক মানুষ আসে, তাদেরও উদ্দেশ্য কলকাতার সুপার স্পেশালিটি হাসপাতাল। সব মিলিয়ে সোমনাথের ভালোই পশার জমেছে।
কয়েক সপ্তাহ লকডাউনের কারণেই আর আমনদীঘিতে আসেনি। স্থানীয় পলিক্লিনিক থেকে অনেকবার ফোন করে অনুরোধ করাতে আজ সকালে এসেছে। গত দুদিন ওর হাসপাতালে টানা ডিউটি ছিল। আজ এখানে রুগী দেখে আগামীকাল ভোরে ফিরবে। পলিক্লিনিকের মালিক মইদুল ফোন করেছিল, “স্যার তো আমাদের ভুলেই গেলেন।”
“লকডাউনে আটকে গেছি। হাসপাতালেও এখন চাপ বাড়ছে। রোজ নিত্য নতুন গাইডলাইন আসছে। শিগ্গিরি আসছি।”
“সামনে রমজান মাস আসছে। তার আগে কয়েকটা দিন চেম্বার করে যান। রোজগার তো সব বন্ধ হয়ে গেছে।”
মইদুলের অনুরোধের চেয়েও, নিজে শহর থেকে বেরতে চাইছিল সোমনাথ। সম্পূর্ণ জনপদ যেন কোটরের ভেতর সেঁধিয়ে গেছে। এ যেন আবাহমানের এক সুড়ঙ্গ। এখান থেকে কবে যে নিস্তার পাবে, কারও কাছে তার কোন খবর নেই।
এখন পিপিই কিট পরেই চেম্বারে বসে সোমনাথ। সকালে বেশ কয়েজন রুগী দেখে, যাদের সারি (সিভিয়ার একিউট রেসপিরেটরি ইনফেকশন) রয়েছে। তৎক্ষণাৎ, হয় পঞ্চায়েত আপিসে যোগাযোগ করিয়ে নিভৃতবাসের ব্যবস্থা করে, নয়তো অবস্থাপন্নদের অ্যাম্বুলেন্স করে, শহরে নিজের হাসপাতালে পাঠিয়ে দেয়। [documentation of recent time]

চেম্বার শেষ করে, পিপিই কিট ছাড়ে। ভাগ্যিস গত বছর মইদুল চেম্বারে এসি বসিয়েছে, না হলে এই গরমে এমন ধরাচূড়া পরে বসা যেত না। এতক্ষণ রুগী দেখে গ্লাভস খুলে মনে হচ্ছে, মর্গে থাকা অন্য কারো হাত। পোশাক ছেড়ে ফেলে তিনতলায় নিজের ঘরে যায়। ডাক্তারদের বিশ্রামের জন্য সুন্দর গেস্টহাউজ বানিয়ে রেখেছে। বেশিরভাগই শহরের চিকিৎসকরা আমনদীঘিতে খেপ খেলে যায়। তাদের আতিথেয়তার কোন ত্রুটি রাখে না মইদুল। স্নান করে খেতে আসে সোমনাথ। মইদুল জিজ্ঞাসা করে, “রাতে বিরিয়ানি করি? একটা ভালো স্কচ আছে।”
সোমনাথ খেতে খেতে জিজ্ঞেস করে, “কতজন নাম লিখিয়েছে?”
“তা পনেরো হয়ে গেছে।”
“এই গরমে বিরিয়ানি আর স্কচ খাওয়াবি? সেদ্ধ হয়ে যাবো তো?”
“তবে কী খাবেন? হালকা করে ভদকা আর চিকেন রোস্ট?”
“বেশ তাই কর। কিন্তু এতসব রাঁধবে কে? তোর হোটেল রেস্তোঁরা তো এখনও খোলে নি?”
মইদুল বলে, “ও নিয়ে আপনাকে ভাবতে হবে না। আপনি খাবেন কিনা বলুন?”
“বেশ তবে, ভদকাই হোক। কিন্তু রোস্ট কোন হোটেলের?”
“হোটেল নয়। আমার ভাবির হাতের রান্না। বড়ভাই, মুশারফ কলকাতার বড় শেফ। তার পরিবার, এখানে থাকে। ভাবির হাতও বড়ভাইএর থেকে কম কিছু নয়।”
“ও তোর দাদা শেফ বুঝি?”
মইদুলের গলায় প্রচ্ছন্ন গর্ব, “হ্যাঁ, চাচার ছেলে। এই তো রমজানে নিশ্চয়ই বাড়ি ফিরবে। তখন ওর হাতের রান্নাও খাওয়াবো।”
দুপুরের খাওয়া সাঙ্গ করে, একটা সিগারেট ধরিয়ে তিয়াসাকে ফোন করেছিল। কথা শুরু হতে না হতে ফোন রেখে দিল তিয়াসা। তারপর থেকে বারবার হাত নিশপিশ করছে, আবার ফোন করতে। কিন্তু সোমনাথের ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় ওকে বারণ করে। খানিক অন্যমনস্ক ভাবে জানলার বাইরে তাকিয়ে থাকে। মইদুলের পলিক্লিনিক বাজারের ভেতর, তবে জানলা দিয়ে খানিক দূরেই দেখা যায় দিগন্তছোঁয়া ক্ষেত। সবুজের সমারোহে কেমন মায়া ছড়িয়ে রেখেছে। দূর থেকে একটা সাইকেল ভ্যানে একজনকে শুইয়ে নিয়ে আসছে। সোমনাথের অভিজ্ঞ চোখ বুঝতে পারে, এদিকেই আসছে। কিছুক্ষণের ভেতর ইন্টারকমে নিচ থেকে মইদুলের ডাক, “স্যার, একটা পেশেন্ট এসছে। দেখবেন নাকি?”
“কী হয়েছে?”
“বুকে ব্যথা বলেছিল, তারপর আর জ্ঞান নেই।”
“কিন্তু তোর এখানে তো এমারজেন্সি ঠেকানোর ব্যবস্থা নেই।”
মইদুল বেশ কাতর গলায় বলে, “আমি একটা অক্সিজেনের ব্যবস্থা করছি। আপনি একবারটি দেখুন।”
সোমনাথ আবার ধরাচূড়া গায়ে দিয়ে নিচে নেমে আসে। পেশেন্টের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারে, আর নেই। তবু বুকে স্টেথো ছোঁয়ায়। বয়স ষাটের কোঠায় হবে, শক্ত সমর্থ গঠন। সাথে একটি স্ত্রীলোক। মাথায় ঘোমটা দিয়ে মুখ নিচু করে বসে। সোমনাথ জিজ্ঞেস করে, “কে হয়?”
মাথা নিচু করে জবাব দেয় “স্বামী”
“সঙ্গে আর কেউ আছে?”
মহিলাটি একই রকম ভাবে জবাব দেয়, “ওই ভ্যানওয়ালা আছে।”
“ও কি তোমার গ্রামের?”
মাথা ঝাঁকিয়ে সমর্থন জানায়। সোমনাথ আরও বলে, “কখন ব্যথা হয়েছিল?”
“সে কাল সন্ধ্যা বেলায়।”
সোমনাথ অবাক হয়, “এতক্ষণ কী করছিলে?”
“কাল থেকে ঘুরছি। কোন ডাক্তার পাইনি। হাসপাতালে গেলে ফিরিয়ে দিয়েছে। একটা হাসপাতালে শুধু করোনার চিকিৎসা হচ্ছে। আর অন্যটাতে করোনা ধরা পড়েছে বলে বন্ধ।”
এই সময় ভ্যানওয়ালাকে সাথে করে মইদুল একটা সিলিন্ডার নিয়ে ঢোকে। সোমনাথ হাত তুলে বলে, “কোন লাভ নেই। আমি পিএম-এর জন্য বলে দিচ্ছি।”
মইদুল থমকে দাঁড়ায়, ও জানে পিএম অর্থ ‘পোস্ট মর্টেম’। তারপর ভ্যানওয়ালাকে নিয়ে চেম্বারের বাইরে যায়। সোমনাথ চেয়ার ছেড়ে ভেতরে আসে। ঘোমটা পরা স্ত্রীলোকটি তার স্বামীর দেহের পাশে জড়সড় হয়ে বসে থাকে। কতটা বুঝেছে, বোঝা যাচ্ছে না। সোমনাথ সিঁড়ি ভেঙে ওপরে উঠতে উঠতে নিচ থেকে গোঙানির মতো আওয়াজ পেলো। হয়তো মইদুল এবার বুঝিয়ে বলেছে। [unforgettable death era]

আনেকদিন পর মৃত শহর থেকে ছাড়া পেয়ে আমনদীঘিতে এসে মেজাজটা যেমন ফুরফুরে হয়েছিল। পরপর দুটো ঘটনায় কেমন বিষিয়ে গেল। বিশ্রাম নেওয়ার ঘরে এসে, ফেলে রাখা জানালা চোখে তুলে নেয়। একটু আগে মহিলাটি এক টুকরো আশা নিয়ে এইদিকে আসছিল আর এখন সব কিছু শেষ করে শবদেহ নিয়ে ফিরে যাচ্ছে। সেই দিকে তাকিয়ে সোমনাথের অলীক মনে হয়। দুপুরের রোদ কমে এসেছে। কিছুক্ষণ পরেই আরেকটা দিনের পাট শেষ করে আলো নিভবে। সন্ধ্যা থেকে আবার পনেরো জন রোগীর নাম লেখানো রয়েছে। এবার ঘন্টাখানেক ঘুমিয়ে নেওয়া প্রয়োজন। গতরাতের হাসপাতাল করে ভোরবেলা এতটা গাড়ি চালানোর ধকলে চোখ টেনে আসছে।
অনেকক্ষণ ঘুমিয়ে পড়েছে। হুঁশ এলো মইদুলের ডাকে। সাড়ে ছটা থেকে চেম্বার শুরু। ইতিমধ্যে রোগীরা এসে বসে আছে। সোমনাথ প্রস্তুত হয়ে নিচে আসে। মইদুল ঘরে চায়ের ব্যবস্থা করেছে। বলে, “স্যার, আগে চা টা খেয়ে নিন। একবার পিপিই পরে ফেললে তো আর সুযোগ হবে না।”
মইদুলের পলিক্লিনিক লাগোয়া গোপলের চায়ের দোকান। গলায় কন্ঠী দেওয়া গোপাল নাকি কীর্তনের দলে শ্রীখোল বাজায়। চা নিয়ে নিজেই এসেছে। সোমনাথকে জিজ্ঞেস করে, “ডাক্তারবাবু গোচোনায় কী সত্যি কাজ হয়?”
সোমনাথ বুঝতে পারে না। একটু অবাক হয়ে তাকায়। মইদুল খোলসা করে দেয়, “আসলে করোনার ঔষধ হিসেবে অনেকে গোরুর হিসি খেতে বলেছে। তাই জিজ্ঞেস করছে।”
সোমনাথ হাসে, ভাবে এদের কী বোঝাবে? “ডাক্তারি শাস্ত্রে তো এমন কিছু লেখা নেই। যারা এই সব প্রচার করছে, তাদের কে জিজ্ঞেস করতে হবে।”
গোপাল বলে, “ওরা তো বলছে এটা নাকি আয়ুর্বেদিক!”
“ওরাই বলতে পারবে। তবে কোন বৈজ্ঞানিক ভিত্তি থাকলে, আমারাও জানতে পারতাম।”
গোপাল চলে যায়। সোমনাথ বুঝতে পারে, উত্তর মনঃপূত হয়নি।
সোমনাথ চা খেয়ে রুগী দেখতে বসে। এর মধ্যেই তিন চারবার অ্যাম্বুলেন্স আসে, সেখানে দুপুরের মতোই মৃত মানুষ। সাথে থাকা আত্মীয়রা জানেও না মানুষটি আর বেঁচে নেই। বেশ বিব্রত হয়ে ওর কলেজের সিনিয়ার প্রশান্তকে ফোন করে। প্রশান্ত এই জেলারই অন্য একটা ব্লকের স্বাস্থ্য আধিকারিক। ফোন পেয়ে প্রশান্ত বলে, “ভাইরে, আমাদের হাসপাতালে কোভিড ধরা পড়েছে, তাই আপাততঃ বন্ধ রাখা আছে। আর যে সব প্রাইভেট ক্লিনিক ছিল, সে সবও ইন অ্যান্টিসিপেশন বন্ধ। বহু পেশেন্ট চিকিৎসা না পেয়ে মারা যাচ্ছে। আমাদের কিছু করার নেই। এরা বেশি ভাগ হার্ট, কিডনি, নার্ভ বা ক্যান্সার পেশেন্ট। সময় মতো চিকিৎসা দিতে পারলে, হয়তো সারভাইভ করে যেতো।”
প্রশান্তর গলায় স্পষ্ট হতাশার সুর। “কী নিয়ে যে আমরা যুদ্ধ করছি, আমরাই জানি। এখনও স্ট্যন্ডার্ড পিপিই পাইনি।”
সোমনাথ ওর বেসরকারি সুপার স্পেশালিটি হাসপাতালের থেকে পিপিই কিট পায়। পেশেন্টদের সার্ভিস দিতে ভেন্টিলেটর সহ অন্যান্য আনুষঙ্গিক যন্ত্রপাতিও পায়। আমনদীঘিতে চেম্বার করতে এসে এই মৃত্যুর স্রোত একদিনেই বিচলিত করে দিয়েছে। প্রশান্তর সাথে কথা বলে একটা ভয়ের মেঘ যেন ওকে ঢেকে ফেলে। গত কয়েক মাস, এই মড়ক শুরু হয়েছে। প্রথম থেকে সোমনাথের হাসপাতাল যথাযথ ব্যবস্থা রেখেছে, আইসোলেশন উইনিট, ভেন্টিলেটর, নিয়মিত স্যানিটাইজ করা, স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রয়োজনীয় পোশাক ইত্যাদি। তাই সোমনাথের কাছে এই সঙ্কট তেমন কঠিন আকার ধারন করেনি। এইবার প্রথম শহরের বাইরে এসে, একদিনেই আত্মবিশ্বাসের ভিত নড়ে গেল। প্রশান্তকে কৌতুহলে জিজ্ঞেস করে, “এই যে ব্রট ডেড কেসগুলো ফিরিয়ে দিচ্ছি, এদের কী হবে? মানে তোমরা গাইডলাইন কী পেয়েছো?”
প্রশান্ত বলে, “মর্গে পিপিই পরে পিএম করছে। তারপর ডিসি-র (ডেথ সার্টিফিকেট) জন্য আমাদের কাছে, অর্থাৎ সরকারি হাসপাতালেই আসে। আর কোভিড হলে, পেশেন্ট-পার্টি বডি পাবে না।”
সোমনাথ রাতে মইদুলের আতিথেয়তা তেমন করে নিতে পারলো না। শুধু কয়েক পেগ ভদকায় বিক্ষিপ্ত মনটা ঠান্ডা করার চেষ্টা করে। পরদিন ভোর ভোর বেরতে হবে। নিজের হাসপাতালে ডিউটি ধরতে হবে। মইদুলও বোঝে, আজ অন্যদিনের মতো সোমনাথের মনে খুশি নেই। কোন রকমে খাওয়ার পাট শেষ করে মইদুল চলে যায়।
সোমনাথ ঘুমের চেষ্টা করে, ঘুম আসতে চায় না। অ্যালকোহলেও মনকে শুষে নিতে পারেনি। আমনদীঘিতে দশটা-ই গভীর রাত। সেখানে বারোটা পার হয়ে গেছে। জানালার বাইরে জ্যোৎস্নায় ঢালা মাঠ, সেখানে কোন কলুষ নেই, নেই কোন অস্থিরতা অথচ কেমন নিঃশব্দে আততায়ী ঢুকে পড়েছে দৈনন্দিন জীবনে। একজন চিকিৎসক হিসেবে মানুষকে বাঁচানো ওর প্রধান কর্তব্য। সব রোগী বাঁচে না ঠিকই, কিন্তু আজ সারাদিনে রোগী দেখলো কম, মৃতদেহ দেখলো বেশি। যে শরীর আগে থেকেই মৃত, তাকে কী শুশ্রূষা দেবে? এই অসহনীয় মানসিক চাপ ভাগ করার মতো কেউ নেই। বীথি এক-বাড়িতে থাকলেও স্বতন্ত্র দ্বীপে বাস করে। তিয়াসাকে হয়তো বলতে পারতো। ছোটবেলা থেকেই তিয়াসা অনেক পরিণত। কিন্তু এই অসময়ে একজন বিবাহিত মহিলাকে ফোন করা অনুচিত। সোমনাথ আলগোছে কাচের মধ্যে দিয়ে বাইরে তাকিয়ে থাকে। ঘরের ভেতর শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের হাল্কা শব্দ যেন এক অজানার পদধ্বনির মতো ওকে ঘিরে ধরছে। [covid pain]

এখান থেকে পালাবে কী করে? সোমনাথের সত্যিই জানা নেই।

