
জিডিপি বাড়ছে, তবুও মানুষের জীবনে এত যন্ত্রণা কেন?
একদিকে সরকারের নিরন্তর প্রচার—দেশ অর্থনৈতিক বৃদ্ধির শীর্ষে পৌঁছাতে চলেছে, জিডিপি বৃদ্ধির হার ৮ শতাংশের কাছাকাছি এবং ভারত বিশ্বমঞ্চে চতুর্থ বৃহত্তম অর্থনীতির স্থান দখল করতে চলেছে। অথচ ঠিক একই সময়ে, সাধারণ নাগরিকদের সোনা কেনা, আন্তর্জাতিক ক্রেডিট কার্ডে খরচ করা কিংবা বিদেশে ভ্রমণের ব্যাপারে সরকারের কড়াকড়ি। ‘উদারীকৃত রেমিট্যান্স স্কিম’ (LRS)-এর অধীনে বিদেশে ভ্রমণের প্যাকেজে এক ধাক্কায় ২০ শতাংশ পর্যন্ত ‘উৎসস্থলে কর সংগ্রহ’ (TCS) এর নিয়ম চালু হয়েছে কিংবা সোনা আমদানিতে চড়া কাস্টমস ডিউটি চাপানো হয়েছে—এই ধরনের নীতিগত বৈপরীত্যই এক বিরাট প্রশ্ন তুলে দেয়: দেশের অর্থনীতি যদি সত্যিই এতটা স্বাবলম্বী ও শক্তিশালী হয়ে থাকে, তবে নাগরিকদের স্বাভাবিক খরচে এমন সরকারি হস্তক্ষেপ কেন?
একটি গতিশীল অর্থনীতির আসল শক্তি লুকিয়ে থাকে তার সাধারণ মানুষের আর্থিক স্বাধীনতা ও খরচের সামর্থ্যের মধ্যে। কিন্তু ভারতের নীতি-নির্ধারকদের এই চরম নিয়ন্ত্রক মনোভাবের নেপথ্যে লুকিয়ে রয়েছে সমষ্টিগত অর্থনীতির (Macroeconomics) এক গভীর সংকট। সহজ কথায়, ভারতের বৈদেশিক মুদ্রার ভাণ্ডার ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের মূল ভিতটি বাস্তবে তীব্র চাপের মুখে পড়েছে। ডলার বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কায় সোনা আমদানি কিংবা বিদেশে ভ্রমণের ওপর বাড়তি কর চাপিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার এই চেষ্টা আসলে মূল ব্যাধির চিকিৎসা নয়, কেবল উপসর্গে মলম লাগানো।
ভারতের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য যদি পণ্য উৎপাদনের শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে থাকত, তবে সামান্য কিছু ডলার বাইরে চলে যাওয়ার ভয়ে রাষ্ট্রের এত উদ্বেগ তৈরি হতো না। এই পরস্পর বিরোধী ছবি প্রমাণ করে, জিডিপির বিশাল আড়ম্বর আর গালভরা পরিসংখ্যানে যে মেকি স্বাবলম্বিতার গল্প বলা হচ্ছে, তার আড়ালে মূল বাণিজ্য ও অর্থের বাজারের সার্বিক দুর্বলতাকেই ঢেকে রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে।
জিডিপি বলতে কেবল নির্দিষ্ট ভৌগোলিক সীমানার মধ্যে উৎপাদিত মোট পণ্য ও সেবার বাজারমূল্যকে বোঝায়। কিন্তু সেই আয়ের সুফল সমাজের প্রান্তিক মানুষদের কাছে পৌঁছাল কি না, কিংবা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত হলো কিনা—তার কোনো হিসাব এই পরিসংখ্যানে থাকে না। ১৯৩৪ সালে আধুনিক জিডিপি পরিমাপ পদ্ধতির জনক সাইমন কুজনেটস মার্কিন কংগ্রেসকে সতর্ক করে বলেছিলেন, কোনো জাতির সামগ্রিক উন্নতিকে কখনোই কেবল জিডিপির হিসাব দিয়ে বিচার করা উচিত নয়।
ভারতের বৃদ্ধি যে একেবারেই হচ্ছে না তা কিন্তু নয়, কিন্তু সেই বৃদ্ধি এগোচ্ছে এক বিপজ্জনক পথ ধরে। আজ ভারতের বৃদ্ধি এগোচ্ছে ‘কে-শেপড’ (K-Shaped) পথ ধরে। অর্থাৎ, অর্থনীতির উন্নয়নের সিংহভাগ সুফল গিয়ে জমা হচ্ছে সমাজের শীর্ষ ৫ থেকে ১০ শতাংশ অতি-ধনীদের পকেটে—যাদের আয়ের রেখাটি ইংরেজি ‘K’ অক্ষরের ঊর্ধ্বমুখী বাহুর মতো দ্রুত ওপরের দিকে উঠছে। ওয়ার্ল্ড ইনইকুয়ালিটি ল্যাবের (World Inequality Lab) সাম্প্রতিক রিপোর্ট অনুযায়ী, ভারতে আজ শীর্ষ ১ শতাংশ ধনীর দখলে দেশের মোট আয়ের ২২.৬ শতাংশ এবং মোট সম্পদের ৪০ শতাংশেরও বেশি—যা ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ আমলের চরম বৈষম্যকেও ছাপিয়ে গেছে। অন্যদিকে, দেশের অসংগঠিত খাত, ক্ষুদ্র শিল্প ও কৃষি খাতের সঙ্গে যুক্ত বিশাল জনগোষ্ঠীর প্রকৃত আয় মুদ্রাস্ফীতির চাপে থমকে গেছে বা কমছে—যা নির্দেশ করে ‘K’ অক্ষরের নিম্নমুখী বাহুটিকে।
এই বিষম বৃদ্ধির ছবিটা স্পষ্ট ধরা পড়ে কেনাকাটা বা ভোগের ধরনে। ভারতের জিডিপির অর্ধেকেরও বেশি আসে অভ্যন্তরীণ ভোগব্যয় থেকে। কিন্তু বর্তমান বাজারের দিকে তাকালে দেখা যায়, উচ্চবিত্তের বিলাসবহুল গাড়ি, দামি আইফোন কিংবা বাজেট-ট্রাভেলের বাজার চাঙ্গা। অথচ, গ্রাম ও মফস্বলের বিশাল নিম্ন-মধ্যবিত্তের সাবান, তেল, নিত্যব্যবহার্য জিনিস বা বাইক-স্কুটারের বাজারে চলছে মন্দা। অর্থাৎ, বৃদ্ধির এই চটকদার চেহারাটি সম্পূর্ণ কৃত্রিম এবং একটি অতি-ক্ষুদ্র উচ্চবিত্ত গোষ্ঠীর ক্রয়ক্ষমতার ওপর ভর করে টিকে রয়েছে।
ভারতের এই কাঠামোগত দুর্বলতার মূল কারণ হলো, এ দেশের অর্থনীতি বিশ্ব অর্থনীতির স্বাভাবিক গতিপথ এড়িয়ে সরাসরি সেবা বা ‘সার্ভিস সেক্টর’-এর ওপর অতি-নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন অর্থনীতিবিদ হা-জুন চ্যাং ভারতের এই উন্নয়ন মডেলকে ‘পরিসংখ্যানের মারপ্যাঁচ’ বলে চিহ্নিত করেছেন এবং একে “স্পিড রানিং ক্যাপিটালিজম (SRC)” বলে বর্ণনা করেছেন।
ভিডিও গেমে গেমাররা যেমন গেমের সূক্ষ্ম ত্রুটি বা ‘গ্লিচ’ ব্যবহার করে কোনো ধাপ পার না হয়েই দ্রুত শেষ স্তরে পৌঁছাতে চায়, ঠিক তেমনই টেকসই ও শ্রম-নিবিড় শিল্পায়নের দীর্ঘ পথ এড়িয়ে ভারত চালনা করছে একটি শর্টকাট পুঁজিবাদী মডেল। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের কঠিন নিয়মনীতি ও দেশীয় নীতি নির্ধারণের ধারাবাহিক ব্যর্থতাই ভারতকে এই ঝুঁকিপূর্ণ পথে ঠেলে দিয়েছে।
বিশ্বের উন্নত অর্থনীতির ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়—মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া কিংবা চীন তাদের অর্থনৈতিক রূপান্তরের সময় জিডিপিতে উৎপাদন খাত বা ম্যানুফ্যাকচারিংয়ের অবদান ২৮ থেকে ৩৪ শতাংশ পর্যন্ত নিয়ে গিয়েছিল। কারণ, শ্রম-নিবিড় ম্যানুফ্যাকচারিং খাতই পারে কৃষি থেকে বেরিয়ে আসা বিপুল স্বল্প-দক্ষ জনশক্তিকে কাজে লাগাতে। এর ঠিক উল্টো মেরুতে দাঁড়িয়ে ভারতের ম্যানুফ্যাকচারিং খাত, যা কখনোই জিডিপিতে ২০ শতাংশের বেশি অবদান রাখতে পারেনি এবং বর্তমানে তা কমে মাত্র ১৩ থেকে ১৫ শতাংশের ঘরে আটকে আছে।

শক্ত শিল্পভিত্তিক উৎপাদন ব্যবস্থা না গড়ে তুলে সরাসরি সার্ভিস সেক্টরে লাফ দেওয়ার পরিণতি দাঁড়িয়েছে শিক্ষিতদের মধ্যে ভয়াবহ বেকারত্ব। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (ILO) তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে ভারতে স্নাতকদের মধ্যে বেকারত্বের হার ছিল ২৯.১%, যা নিরক্ষরদের তুলনায় নয় গুণেরও বেশি। ২০২৪ সালের পরিসংখ্যানেও দেখা যায়, মাধ্যমিক ও তার ওপরের স্তরের শিক্ষিতদের মধ্যে বেকারত্বের হার যেখানে ৬.৫%, সেখানে নিরক্ষরদের ক্ষেত্রে তা মাত্র ০.২%। অর্থনীতি আজ বিপুল শিক্ষিত মানবসম্পদ তৈরি করলেও, ম্যানুফ্যাকচারিংয়ের অভাবে তাদের উপযুক্ত কাজের সুযোগ তৈরি করতে পারছে না।
অভ্যন্তরীণ ম্যানুফ্যাকচারিং ক্ষেত্রের এই ঐতিহাসিক ব্যর্থতা ভারতের বৈদেশিক বাণিজ্যে এক স্থায়ী ‘চলতি হিসাবের ঘাটতি’ (Current Account Deficit) তৈরি করেছে। খনিজ তেল, ইলেকট্রনিক্স ও প্রয়োজনীয় কাঁচামালের জন্য ভারত আমদানিনির্ভর, কিন্তু বিশ্ববাজারে পণ্য বিক্রি করে ডলার আয় করার মতো মজবুত শিল্প কাঠামো ভারতের নেই। ফলে ভারতের বাণিজ্য ঘাটতি মেটাতে নির্ভর করতে হয় তথ্যপ্রযুক্তি (IT) খাতের আয় এবং প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সের ওপর।
সংবাদপত্রের পাতায় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৬০০ বিলিয়ন ডলার ছাড়ানোর খবর দেখে আমজনতা স্বস্তি পেতে পারেন, কিন্তু সেই রিজার্ভের উৎস অত্যন্ত অস্থিতিশীল। চীন বা জাপানের মতো উদ্বৃত্ত বাণিজ্যের দেশগুলোর রিজার্ভ গড়ে ওঠে পণ্য বিক্রি করে অর্জিত নিজস্ব আয় (Trade Surplus) থেকে। কিন্তু ভারতের রিজার্ভের সিংহভাগই স্থায়ী আয় নয়; তা হলো শেয়ার বাজারে আসা অস্থিতিশীল পুঁজি বা ‘হট মানি’ (FPI)। আন্তর্জাতিক বাজারে কোনো সংকট তৈরি হলেই এই অস্থিতিশীল পুঁজি রাতারাতি বের হয়ে যায়, যার ফলে দেশীয় মুদ্রার দরপতন রোধ করতে রিজার্ভ খালি করে শত শত কোটি ডলার ঢালতে হয় রাষ্ট্রকে।
এই নড়বড়ে মডেলের ওপর নতুন ধাক্কা নিয়ে এসেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (Generative AI) ও অটোমেশন। ভারত মূলত কল সেন্টার বা ব্যাক-অফিস সেবার মতো যেসব নিম্ন-মূল্যের পরিষেবা খাতের ওপর ভর করে দাঁড়িয়েছিল, সেগুলো এখন এআই দ্বারা দ্রুত প্রতিস্থাপিত হওয়ার মুখে। শক্ত ম্যানুফ্যাকচারিং ক্ষেত্রের ভিত্তি না থাকায় পরিষেবা খাত যদি এভাবে কাজ হারাতে শুরু করে, তবে এই বিশাল শিক্ষিত জনশক্তিকে আশ্রয় দেওয়ার মতো কোনো বিকল্প অর্থনৈতিক সুরক্ষা ভারতের হাতে থাকবে না।
ভারতের সাবেক অর্থনৈতিক উপদেষ্টা কৌশিক বসু সম্প্রতি মন্তব্য করেছেন যে—আকাশছোঁয়া বেকারত্ব, বিপর্যস্ত শিক্ষাব্যবস্থা, সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগের (FDI) আকস্মিক পতন এবং দূষণ সত্ত্বেও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মিথ্যা প্রচার দেশীয় ও আন্তর্জাতিক মহলে ভারতের গ্রহণযোগ্যতা কমিয়েছে। অন্যদিকে সংসদীয় তথ্যই প্রমাণ করে, চালচলনে ভারত বিশ্ব অর্থনীতিতে নিজেকে চার নম্বরে দাবি করলেও বাস্তব পরিসংখ্যানে তা এখনো পঞ্চম স্থানই আঁকড়ে রয়েছে।
বাণিজ্য ঘাটতি বা আন্তর্জাতিক ভঙ্গুরতার মূল স্থায়ী সমাধান না করে সাধারণ মানুষের ভ্রমণ, কেনাকাটা বা সঞ্চয়ের ওপর কড়াকড়ি বসানো কোনো আত্মনির্ভর অর্থনীতির লক্ষণ নয়। দেশকে সত্যিই স্থিতিশীল করতে হলে নীতি-নির্ধারকদের এই নিয়ন্ত্রণমূলক শর্টকাট মানসিকতা ছেড়ে কয়েকটি মৌলিক সংস্কারে নামতে হবে:
১. শ্রম-নিবিড় শিল্পায়ন:* বস্ত্র, চামড়াজাত পণ্য, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য ও মাঝারি শিল্প (MSME) খাতকে চাঙ্গা করে রপ্তানিমুখী ম্যানুফ্যাকচারিং হাব তৈরি করা—যাতে নিজস্ব পণ্য বিক্রি করে বিশ্ববাজার থেকে স্থায়ী ডলার আয় করা যায়।
২. কর্মসংস্থান কেন্দ্রিক জিডিপি মূল্যায়ন:* কেবল ‘জিডিপি বৃদ্ধি’ নয়, ‘নিট কর্মসংস্থান সৃষ্টি’কে রাষ্ট্রীয় উন্নয়নের মূল একক হিসেবে গণ্য করতে হবে।
৩. দক্ষতা ও প্রযুক্তি সমন্বয়:* ডিগ্রির বাইরে গিয়ে শিল্পের চাহিদামতো শিক্ষা তৈরি করা এবং এআই-এর যুগে কর্মীদের দ্রুত পুনঃপ্রশিক্ষণের (Reskilling) ব্যবস্থা করা।
৪. আন্তর্জাতিক মঞ্চে নীতিগত স্বাধীনতা:* বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (WTO) নীতির মুখোমুখি দাঁড়িয়েও দেশীয় উদীয়মান উৎপাদন শিল্পকে প্রয়োজনীয় সুরক্ষা দিতে হবে।
পরিসংখ্যানের মারপ্যাঁচ বা চটকদার প্রচার দিয়ে সাময়িকভাবে নজর ঘোরানো সহজ, কিন্তু সাধারণ মানুষের রুটি-রুজির সংকটকে আড়াল করা যায় না। জিডিপির মেকি চমক ছেড়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও বৈষম্যহীন অর্থনৈতিক ভিত গড়ে তোলাই এখন আসল কাজ।


এই ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে দেখানো জিডিপি যে আসলে একটি ধাপ্পা, তা এই লেখা পড়ে আরো পরিষ্কার হল। খুবই প্রয়োজনীয় লেখা।