২০২৬ সাল বাঙালির আবেগের রাজপুত্র, মহানায়ক উত্তমকুমারের জন্মশতবর্ষ। একশো বছর পেরিয়েও তাঁর সেই মায়াবী হাসি আর রাজকীয় উপস্থিতি আজও বাঙালি-মননে একইভাবে জীবন্ত। তিনি কেবল রুপোলি পর্দার নায়ক ছিলেন না, ছিলেন বাঙালি সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অধ্যায়। প্রজন্মের পর প্রজন্ম বদলে গেছে, কিন্তু রোম্যান্টিকতার সংজ্ঞা হিসেবে উত্তমকুমার আজও অনন্য, অপরাজেয়। তিনি আমাদের চেতন-অবচেতনে বেঁচে আছেন এবং থাকবেন তাঁর কালজয়ী সৃষ্টির আলোকবর্তিকা হয়ে।

বিংশ শতাব্দীর বাঙালি মননে রোমান্টিকতার সংজ্ঞা যিনি একাই বদলে দিয়েছিলেন, তিনি মহানায়ক উত্তমকুমার। শুধু একজন অভিনেতা বা রুপোলি পর্দার এক অবিস্মরণীয় জাদুকরই নন, হয়ে উঠেছিলেন বাঙালির আবেগ, বাঙালির স্মৃতিমেদুরতা।

আজ এত বছর পরেও, যখন প্রেমের প্রসঙ্গ ওঠে, তখন এতটুকুও কিন্তু অপ্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠেন না উত্তমকুমার। তখন অবচেতনে সবার আগে ভেসে ওঠে তাঁর সেই চিরপরিচিত ভুবন ভোলানো হাসি।

সাধারণ অরুণ থেকে মহানায়ক উত্তম

১৯২৬ সালের ৩ সেপ্টেম্বর কলকাতার ভবানীপুরে এক সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারে অরুণ কুমার চট্টোপাধ্যায়ের জন্ম। রুপোলি পর্দায় প্রতিষ্ঠা পাওয়ার পথটা তাঁর জন্য একেবারেই সহজ ছিল না। শুরুর দিকে একের পর এক ছবি ফ্লপ হওয়ায় স্টুডিও পাড়ায় তাঁর নাম হয়ে গিয়েছিল ‘ফ্লপ মাস্টার’। কিন্তু হার-না-মানা জেদ আর উন্নতির নিরন্তর চেষ্টা তাঁকে ক্রমশ এগিয়ে নিয়ে গেছে। ১৯৫৩ সালে ‘সাড়ে চুয়াত্তর’ ছবিটি বাঙালিকে এক নতুন নায়ক উপহার দেয়। অরুণ চট্টোপাধ্যায় হয়ে ওঠেন ‘উত্তমকুমার’। ভবানীপুরের একটি সাধারণ ছেলে কালক্রমে হয়ে ওঠেন ‘মহানায়ক’।

উত্তম-সুচিত্রা: রোম্যান্টিকতার স্বর্ণযুগ

উত্তম-আলোচনায় অনিবার্যভাবে চলে আসে সুচিত্রা সেনের নাম। এই অবিস্মরণীয় জুটি বাংলা সিনেমার ইতিহাসকে এক অনন্য উচ্চতায় তুলে নিয়ে গিয়েছিল। ‘অগ্নিপরীক্ষা’, ‘সপ্তপদী’, ‘হারানো সুর’, ‘চাওয়া পাওয়া’ বা ‘ইন্দ্রাণী’র মতো ছবিতে তাঁদের অনবদ্য রসায়ন আজও অতুলনীয়। উত্তমকুমারের রাজকীয় ব্যক্তিত্ব আর সুচিত্রা সেনের মায়াবী দৃষ্টিপাত তৈরি করত এক সম্মোহনী জাদু।

‘সপ্তপদী’ ছবির সেই আইকনিক মোটরসাইকেলে চেপে ‘এই পথ যদি না শেষ হয়’ গানটি আজও বাঙালির প্রেমের শ্রেষ্ঠ প্রতীক। তাঁদের পর্দার রসায়ন এতটাই জীবন্ত ছিল যে, সাধারণ মানুষ বাস্তবের সঙ্গে পর্দার দূরত্বের কথা ভুলে যেত। বাঙালির ড্রয়িংরুম থেকে শুরু করে পাড়ার রক, সব আড্ডায়, রোমান্টিকতার একমাত্র নিখুঁত মাপকাঠি হয়ে উঠেছিলেন তাঁরা।

অভিনয়ের বৈচিত্র্য: শুধুই কি রোম্যান্টিক হিরো?

উত্তমকুমার কেবল মিষ্টি প্রেমের ছবিতে নিজেকে বেঁধে রাখেননি। তাঁর অভিনয়ের বহুমুখিতা ছিল রীতিমতো উল্লেখ্য। সত্যজিৎ রায়ের ‘নায়ক’ (১৯৬৬) ছবিতে অরিন্দম মুখার্জির চরিত্রে তাঁর অভিনয় ছিল এক সফল অভিনেতার অন্তর্দহন ও একাকীত্বের নিখুঁত আত্মবিশ্লেষণ। আবার ‘চিড়িয়াখানা’ ছবিতে শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের ব্যোমকেশ বক্সী হয়ে মেলে ধরেছিলেন তাঁর তীক্ষ্ণ বুদ্ধিমত্তা।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছোটগল্প অবলম্বনে তৈরি ‘খোকাবাবুর প্রত্যাবর্তন’ সিনেমায় একজন বিশ্বস্ত গৃহভৃত্যের চরিত্রে তাঁর অভিনয় দর্শককে কাঁদিয়ে দিয়েছিল।

অন্যদিকে ‘বাঘবন্দী খেলা’ ছবিতে একটি নেতিবাচক বা অ্যান্টি-হিরো চরিত্রে এবং ‘ধন্যি মেয়ে’ ছবিতে এক ফুটবল-পাগল বাঙালির চরিত্রে তাঁর কমিক টাইমিং প্রমাণ করে দিয়েছিল, তিনি যে কোনও চরিত্রেই মিশে যেতে পারতেন অনায়াসে।

‘অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি’ ছবিতে এক পর্তুগিজ কবির চরিত্রে অনবদ্য অভিনয়ের জন্য তিনি শ্রেষ্ঠ অভিনেতা হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছিলেন।

বাঙালি সংস্কৃতি ও যাপনে উত্তম প্রভাব

উত্তমকুমারের হাঁটার স্টাইল, তাঁর ধুতি-পাঞ্জাবি পরার ধরন, কিংবা ঈষৎ কোঁকড়ানো ঢেউ খেলানো চুলের ইউ কাট—সবকিছুই তৎকালীন বাঙালি যুবসমাজ অন্ধের মতো অনুকরণ করত। পর্দার ওপারে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠ আর পর্দায় উত্তমকুমারের লিপ সিঙ্কিং—এই দুই মিলে তৈরি হয়েছিল এক অবিচ্ছেদ্য মেলবন্ধন। মান্না দে, শ্যামল মিত্র বা কিশোরকুমারের কণ্ঠেও তিনি পর্দায় এমন নিখুঁত ঠোঁট মেলাতেন, মনে হত, গানগুলো তাঁর নিজের গলাতেই গাওয়া। সেই গানগুলো আজও বাঙালির মনকে ব্যাকুল আর স্মৃতিমেদুর করে তোলে।

চিরকালীন নস্টালজিয়া

১৯৮০ সালের ২৪ জুলাই ‘ওগো বধূ সুন্দরী’ শুটিং চলাকালীন এই মহানায়ক আমাদের ছেড়ে চলে যান। কিন্তু জাগতিক প্রস্থান ঘটলেও, বাঙালির হৃদয় থেকে তিনি কখনও হারিয়ে যাননি। প্রজন্মের পর প্রজন্ম পার হয়ে গেলেও তাঁর জনপ্রিয়তা বিন্দুমাত্র কমেনি। আজও দুপুরের অলস সময়ে টেলিভিশনের পর্দায় উত্তমকুমারের কোনও ফিল্ম চললে চলমান মন থমকে দাঁড়ায়। তিনি ছিলেন, আছেন এবং থাকবেন বাঙালির চিরকালের শ্রেষ্ঠ রোমান্টিক হিরো হয়ে, ‘মহানায়ক’ হয়ে।

উত্তমকুমারের অভিনয় জীবনের সেরা ১০টি সিনেমার তালিকা

-সপ্তপদী (১৯৬১):- সুচিত্রা সেনের সঙ্গে জুড়ি বেঁধে করা এই সিনেমাটি বাংলা চলচ্চিত্রের অন্যতম শ্রেষ্ঠ রোমান্টিক ছবি, যেখানে ‘কৃষ্ণেন্দু’র চরিত্রে তাঁর অভিনয় চিরস্মরণীয় হয়ে আছে।

-নায়ক (১৯৬৬):- সত্যজিৎ রায়ের পরিচালনায় একজন সফল অভিনেতার অন্তর্দহন ও একাকীত্বের গল্প, যা উত্তমকুমারের কেরিয়ারের অন্যতম মাইলফলক।

-হারানো সুর (১৯৫৭):- স্মৃতিশক্তি হারিয়ে ফেলা এক যুবকের চরিত্রে অনন্য অভিনয়, সুচিত্রা সেনের সঙ্গে তাঁর রসায়ন এখানে এক নতুন মাত্রা পায়।

-অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি (১৯৬৭):- একজন পর্তুগিজ কবির ভূমিকায় শ্রেষ্ঠ অভিনেতা হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান উত্তম।

-সাড়ে চুয়াত্তর (১৯৫৩):- উত্তম-সুচিত্রা জুটির ঐতিহাসিক যাত্রার সূচনা হয়েছিল কমেডি ঘরানার এই ছবিটির মাধ্যমেই।

-অগ্নিপরীক্ষা (১৯৫৪):- রোম্যান্টিক হিরো হিসেবে উত্তম কুমারের অবস্থানকে বাঙালি মননে অনেক পোক্ত করে এই ছবি।

-খোকাবাবুর প্রত্যাবর্তন (১৯৬০):- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছোটগল্প অবলম্বনে তৈরি এই সিনেমায় একজন বিশ্বস্ত গৃহভৃত্যের চরিত্রে তাঁর অভিনয় চোখে জল এনে দেয়।

-চিড়িয়াখানা (১৯৬৭):- সত্যজিৎ রায়ের পরিচালনায় শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিখ্যাত গোয়েন্দা চরিত্র ‘ব্যোমকেশ বক্সী’র ভূমিকায় উত্তমকুমারের তীক্ষ্ণ অভিনয়।

-বাঘবন্দী খেলা (১৯৭৫):- একটি ধূসর বা নেতিবাচক চরিত্রে তাঁর অসাধারণ অভিনয় ক্ষমতা এই ছবিতে প্রকাশ পায়।

-ধন্যি মেয়ে (১৯৭১):- ফুটবল পাগল বাঙালির আবেগকে কেন্দ্র করে তৈরি এই নিখাদ কমেডি ছবিতে তাঁর কমিক টাইমিং ছিল দুর্দান্ত।

সহযোগিতার হাত বাড়াতে ওপরের ছবিতে ক্লিক করুন

[লেখকের পূর্ব রচনা]

[পরম্পরা ওয়েবজিন, অক্টোবর ২৬, সূচিপত্র – এখানে ক্লিক করুন]

0 0 ভোট
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
পংক্তির ভেতর মন্তব্য
সব মন্তব্য