
এস-৩১৭
অমিয়ব্রত সেনের একটা বিশেষ ক্ষমতা ছিল। তিনি যে-কোনও সুখের ভিতর থেকে খুব অল্প সময়ে একটা দুঃখ খুঁজে বার করতে পারতেন। শীতকালে রোদ উঠলে বলতেন, “রোদটা আজকাল বড় কড়া।” বৃষ্টি নামলে বলতেন, “এই দেশে ড্রেনেজ বলে কিছু নেই।” স্ত্রী কেয়া লুচি ভাজলে প্রথম লুচিটা মুখে দিয়ে বলতেন, “আর একটু ফুলতে পারত।” ছেলে অনির্বাণ বেঙ্গালুরু থেকে ফোন করলে বলতেন, “ফোন করেছিস যখন, তখন আবার তাড়া কীসের?” আর দু’দিন ফোন না করলে কেয়াকে বলতেন, “নিজের ছেলে, অথচ দু’মিনিট সময় নেই!” কেয়া বিয়ের বত্রিশ বছরে ব্যাপারটা মেনে নিয়েছিল। শুধু মাঝে মাঝে বলত, “তোমাকে যদি স্বর্গেও পাঠায়, তুমি গিয়ে প্রথমে মেঘের রং নিয়ে আপত্তি করবে।” অমিয়ব্রত খবরের কাগজ থেকে মুখ না তুলেই বলতেন, “স্বর্গ যদি ঠিকঠাক জায়গা হয়, আপত্তি করব কেন?”
সেদিন রাত সাড়ে দশটা নাগাদ কলিংবেল বাজল। দরজা খুলে অমিয়ব্রত দেখলেন, বছর পঞ্চাশের রোগা একটা লোক দাঁড়িয়ে। পরনে ধূসর প্যান্ট, সাদা ফুলহাতা জামা, হাতে পুরনো চামড়ার ব্যাগ। লোকটা বলল, “অমিয়ব্রত সেন?” অমিয়ব্রত মাথা নাড়তেই সে একটা নীল খাম এগিয়ে দিল। “আপনার অ্যালটমেন্ট হয়েছে।” “কিসের?” “ফ্ল্যাটের।” খামের উপর সোনালি অক্ষরে লেখা— স্বর্গ আবাসন সমবায় সমিতি, ব্লক—অনন্ত, ফ্ল্যাট নং এস-৩১৭।
অমিয়ব্রত খামটা ফেরত দিয়ে বললেন, “আমি কোনও ফ্ল্যাট বুক করিনি।” লোকটা হালকা হেসে বলল, “সব বুকিং নিজে করতে হয় না।” অমিয়ব্রত ভেবেছিলেন, নিশ্চয়ই কোনও রিয়েল এস্টেটের জালিয়াতি। তিনি দরজা বন্ধ করতে যাচ্ছিলেন। লোকটা তখন বলল, “চব্বিশ ঘণ্টা জল। লোডশেডিং নেই। গরম নেই। মশা নেই। অসুখ নেই। বাজার নেই, বিল নেই, ট্যাক্স নেই। আর কোনও অভিযোগও থাকবে না।” অমিয়ব্রতের হাত থেমে গেল।
লোকটির নাম গজেন মল্লিক। পরিচয়পত্রে লেখা— ক্ষেত্র-পরিদর্শক, স্থানান্তর বিভাগ। অমিয়ব্রত হেসে বললেন, “স্বর্গেরও স্থানান্তর বিভাগ আছে?” গজেন বলল, “লোক এত বেড়েছে যে বিভাগ না খুলে উপায় ছিল না।” তারপর ব্যাগ থেকে একটা মোটা ফাইল বার করল। “আপনার আবেদনপত্র।”
ফাইলে তারিখ দিয়ে দিয়ে লেখা— “এই গরমে আর বাঁচা যায় না।” “এই শহরে থাকা নরক।” “এই সংসার করে মরলাম।” “মরলেই বাঁচি।” “এই পৃথিবীর কিছু হবে না।” অমিয়ব্রত চমকে বললেন, “রাগের মাথায় মানুষ কত কিছুই বলে!” গজেন মাথা নাড়ল। “একবার বললে আমরাও গুরুত্ব দিই না। কিন্তু একই আবেদন বারবার জমা পড়লে সিস্টেম সিরিয়াসলি নেয়।”
অমিয়ব্রত জিজ্ঞেস করলেন, “ধরুন যেতে চাই। কত টাকা?” “টাকা লাগে না।” “তা হলে গোলমাল আছে।” গজেন বলল, “একটা মাত্র শর্ত। নতুন ফ্ল্যাটের চাবি নিলে পুরনো ফ্ল্যাটের দখল ছাড়তে হবে।” অমিয়ব্রত বললেন, “এই বাড়ি? এটা তো আমার নিজের!” গজেন শান্ত গলায় বলল, “আমি বাড়িটার কথা বলিনি।”
সেই রাতে অমিয়ব্রতের ঘুম এল না। পাশেই কেয়া ঘুমোচ্ছে। বাইরে কুকুর ডাকছে, দূরে ট্রেন যাচ্ছে, ঘড়ি টিকটিক করছে। রাত তিনটে সতেরো মিনিটে মোবাইল বেজে উঠল। গজেন বলল, “সাইট ভিজিট করবেন?” কী ভেবে যেন অমিয়ব্রত উঠে পড়লেন। লিফটে ঢুকে দেখলেন গজেন দাঁড়িয়ে। সাধারণ দশটা বোতামের নিচে আজ আরও একটা বোতাম জ্বলছে— S।
লিফট দশতলা পেরিয়ে এগারো, বারো ছুঁয়ে থামল। অথচ তাঁদের বাড়ি দশতলা। দরজা খুলতেই ধবধবে সাদা করিডর। কোথাও ময়লা নেই, শব্দ নেই, গরম নেই, ঠান্ডাও নেই। গজেন এস-৩১৭ খুলে দিল। ভিতরে নরম বিছানা, সোফা, বইয়ের তাক, টেলিভিশন, এসি, গরম জল, জানলার বাইরে নীল আকাশ। ফ্রিজে অমিয়ব্রতের প্রিয় সন্দেশ। মোবাইলে ফুল নেটওয়ার্ক। তিনি মুগ্ধ হয়ে বললেন, “একটু চা হলে মন্দ হয় না।” সঙ্গে সঙ্গে টেবিলে ধোঁয়া ওঠা চা হাজির। এক চুমুক দিয়ে অমিয়ব্রত বললেন, “চিনি একটু বেশি।” গজেন পকেট থেকে পেন বার করে ফাইলে একটা টিক দিল।

পাঁচ মিনিটের মধ্যেই ঘরটা অমিয়ব্রতের কেমন যেন লাগতে শুরু করল। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “কেয়া কোন ঘরে থাকবে?” গজেন ফাইল দেখে বলল, “ওঁর কোনও বুকিং নেই।” “অনির্বাণ?” “নেই।” “বন্ধুবান্ধব?” “প্রত্যেকে নিজের আবেদন অনুযায়ী আসে।” অমিয়ব্রত চুপ করে গেলেন। চারটে চেয়ারের মধ্যে তিনটে খালি। কেউ বকবে না, কেউ রিমোট কেড়ে নেবে না, কেউ বলবে না বাজার থেকে ধনেপাতা আনতে ভুলেছ। কিন্তু কেউ পাশ ফিরে জিজ্ঞেসও করবে না, “ঘুমোচ্ছ?”
জানলার বাইরে রাস্তা নেই, চায়ের দোকান নেই, অটোওয়ালার গালাগাল নেই, পাশের বাড়ির প্রেসার কুকারের সিটি নেই। অদ্ভুত শান্তি। এমন শান্তি যে নিজের শ্বাসের শব্দও বিরক্তিকর লাগে। অমিয়ব্রত বললেন, “একটু নিচে যাব।” গজেন উত্তর দিল, “এখানে নিচে বলে কিছু নেই।”
ফেরার সময় গজেন একটা ফর্ম দিল। “কাল রাত বারোটার মধ্যে সই করবেন। না করলে অ্যালটমেন্ট বাতিল।” অমিয়ব্রত জিজ্ঞেস করলেন, “পরে আবার পাব?” গজেন বলল, “আপনি যে হারে আবেদন করেন, খুব দেরি হওয়ার কথা নয়।”
পরদিন সকাল থেকেই অদ্ভুত ব্যাপার শুরু হল। ন’টায় লোডশেডিং। অমিয়ব্রতের মুখ দিয়ে প্রায় বেরিয়ে যাচ্ছিল—“এই দেশটার কিছু হবে না।” কিন্তু কথাটা থামল। জানলার পাশে দাঁড়িয়ে তিনি প্রথমবার লক্ষ্য করলেন, সামনের কৃষ্ণচূড়ার পাতাগুলো বাতাসে কীভাবে উল্টে যায়। জল সরু ধারায় পড়ছিল। হাতটা তার নিচে রেখে তিনি হঠাৎ ভাবলেন, দেওয়ালের ভিতর দিয়ে জল তাঁর হাতের কাছে চলে এসেছে; তাঁকে কুয়ো থেকে তুলতে হয়নি, নদী থেকে মাথায় করে আনতেও হয়নি। এতদিন ব্যাপারটাকে তিনি আশ্চর্য বলেই ভাবেননি।
দুপুরে গ্যাস শেষ হয়ে গেল। পাশের ফ্ল্যাটের তিথি ইন্ডাকশন কুকার দিয়ে গেল। এই তিথির বিরুদ্ধেই অমিয়ব্রতের হাজার অভিযোগ—জুতো বাইরে থাকে, ছেলে সিঁড়িতে ক্রিকেট খেলে, কুকুর ঘেউঘেউ করে। সেই তিথির কুকারেই কেয়া ডাল রাঁধল। অমিয়ব্রত খেতে খেতে বললেন, “ডালটা বেশ হয়েছে।” কেয়া চামচ নামিয়ে তাঁর দিকে তাকাল। “তোমার শরীর ঠিক আছে তো?”
বিকেলে অনির্বাণ ভিডিও কল করল। পাঁচ বছরের পিউ ছবি দেখিয়ে বলল, “দাদু, দেখো!” ছবিতে একটা বাড়ি, নীল ছাদ, সূর্য আর চারটে মানুষ হাত ধরে দাঁড়িয়ে। অমিয়ব্রত জিজ্ঞেস করলেন, “ওরা কারা?” পিউ বলল, “আমি, বাবা, মা আর তুমি।” “দিদা?” পিউ একটু ভেবে বলল, “দিদাও আছে। কাগজ শেষ হয়ে গেছে।” অমিয়ব্রত হেসে ফেললেন। অনেক দিন পরে নিজের হাসির শব্দ তাঁর নিজের কাছেই নতুন লাগল।
রাত আটটা পর্যন্ত বিদ্যুৎ এল না। কেয়া দুটো মোমবাতি জ্বালিয়ে বারান্দায় দুটো চেয়ার টেনে বলল, “বসবে?” অমিয়ব্রত বসলেন। সামনের বাড়িগুলো অন্ধকার। কোথাও হারমোনিয়াম বাজছে, রাস্তার দোকান থেকে চায়ের গন্ধ আসছে। অন্ধকারে কেয়ার মুখ পুরো দেখা যাচ্ছে না। অমিয়ব্রত হঠাৎ বললেন, “আমরা শেষ কবে এভাবে পাশাপাশি বসেছিলাম?” কেয়া বলল, “মনে নেই।” কিছুক্ষণ পরে বলল, “আলো কখন আসবে কে জানে!” অমিয়ব্রত শান্ত গলায় বললেন, “আসুক না আসুক। তুমি বসো।”
কেয়া তাঁর দিকে তাকাল। “কী হয়েছে তোমার?” অমিয়ব্রত বললেন, “ধরো তোমাকে খুব আরামের একটা জায়গায় থাকতে দিল। কোনও কষ্ট নেই। কিন্তু সেখানে আমি নেই। যাবে?” কেয়া সঙ্গে সঙ্গে বলল, “অবশ্যই। বত্রিশ বছর তোমার সঙ্গে সংসার করার পরে কিছুদিন শান্তিতে থাকব!” দু’জনেই হেসে উঠলেন। তারপর কেয়া তাঁর হাতের উপর হাত রাখল। ঠিক তখন বিদ্যুৎ এল। পাখা ঘুরল, ঘর আলোয় ভরে গেল। অথচ কেউ উঠে ভিতরে গেলেন না।
রাত এগারোটা সাতান্নে আবার কলিংবেল। গজেন দাঁড়িয়ে, হাতে ফর্ম। “মাত্র তিন মিনিট।” অমিয়ব্রত বললেন, “যাব না।” “ওখানে লোডশেডিং নেই।” “জানি।” “জলের সমস্যা নেই, রোগ নেই, বার্ধক্য নেই।” অমিয়ব্রত কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন, “তবু থাক।” গজেন জিজ্ঞেস করল, “কারণ?” অমিয়ব্রত ভিতরে তাকালেন—কেয়া সোফায়, রান্নাঘরে এঁটো বাসন, টেবিলে ওষুধ, দেয়ালের রং উঠে গেছে, বাইরে কুকুর ডাকছে, পাশের ফ্ল্যাটে বাচ্চা চেঁচাচ্ছে। তিনি বললেন, “জায়গাটা একটু বেশি নিখুঁত।”
গজেন ফর্মে লাল কালিতে লিখল— বাতিল। তারপর বলল, “আজ সন্ধে আটটা বিয়াল্লিশে আপনার অ্যাকাউন্টে একটা নতুন বিবৃতি জমা পড়েছে।” অমিয়ব্রত অবাক। “আমি তো কিছু বলিনি!” গজেন ফাইল খুলে পড়ল— ‘আসুক না আসুক। তুমি বসো।’ অমিয়ব্রত জিজ্ঞেস করলেন, “এর সঙ্গে স্বর্গের কী সম্পর্ক?” গজেন বলল, “ওপরের অফিস জানে।” “আপনাদের ওপরেও অফিস আছে?” গজেন দীর্ঘশ্বাস ফেলল। “অফিসের ওপর অফিস। স্বর্গ হলেও আমলাতন্ত্র থেকে মুক্তি নেই মশাই।”
লিফটে ওঠার আগে অমিয়ব্রত তাকে ডাকলেন, “আমার এস-৩১৭ এখন কাকে দেবেন?” গজেন হাসল। “ওটা ফ্ল্যাট নয়। নমুনা। মানুষ আসলে কী চায়, সেটা বোঝার জন্য মাঝে মাঝে দেখানো হয়।” অমিয়ব্রত জিজ্ঞেস করলেন, “তা হলে আসল স্বর্গ কোথায়?” লিফটের দরজা বন্ধ হতে হতে গজেন বলল, “সেই ঠিকানাটা আমাদের কাছেও নেই।”
পরদিন সকালে অমিয়ব্রত সুইচ টিপলেন। আলো জ্বলে উঠল। আরেকটা সুইচ টিপতেই পাখা ঘুরল। কল খুলতেই জল এল। রান্নাঘর থেকে কেয়া বলল, “আজ চিনি একটু কম হয়ে গেছে।” অমিয়ব্রত চায়ে চুমুক দিয়ে বললেন, “না, বেশ হয়েছে।” ঠিক তখন পাশের বাড়ির ছেলে সিঁড়িতে বল মেরে ধপাস করে আওয়াজ করল। তাঁর মুখ দিয়ে প্রায় বেরিয়ে যাচ্ছিল—“এই বাড়িতে থাকা নরক!” তিনি থেমে গেলেন।
জানলার বাইরে কৃষ্ণচূড়ার পাতা নড়ছে। মোবাইলে পিউর মুখ ভেসে উঠেছে। রান্নাঘরে কেয়া কাপ ধুচ্ছে। কল থেকে জল পড়ছে। মাথার উপর পাখা ঘুরছে। অমিয়ব্রত চায়ের কাপ হাতে নিয়ে একটু হাসলেন।
কারণ তিনি বুঝে গেছেন, স্বর্গের সবচেয়ে বড় অসুবিধা সম্ভবত এই—সেখানে সবকিছু নিখুঁত হতে পারে, শুধু কাউকে পাশে বসিয়ে বলার সুযোগ নাও থাকতে পারে—
“আসুক না আসুক। তুমি বসো।”

[পরম্পরা ওয়েবজিন, সেপ্টেম্বর ২৬, সূচিপত্র – এখানে ক্লিক করুন]

চমৎকার গল্প!