
জুজু
আজ আসরে সবাই বোকা বনে গেছে গল্পের টপিক শুনে।সহজপুরের গল্প বুড়োর আড্ডার জন্য পরমার্থ দের একতলার বৈঠক খানার ঘরটা ইদানীং ভিড় হচ্ছে খুব। কারণ স্কুলে স্কুলে চালু হয়েছে স্টোরি-টেলিং ক্লাস । বাচ্চা আর কিশোরদের গল্প শোনাবে কে? শেখাবেই বা কে? টিচার নেই কোথাও।
অবশেষে পরমার্থ -র দাদুই এগিয়ে এলেন। অশীতিপর মানুষটি নিজেই জানালেন নাতিনাতনিদের গল্পের শিক্ষক তিনিই হবেন স্বেচ্ছায়। দীর্ঘদিন ভারত সরকারের নানা দপ্তরের উচ্চপদে কর্মরত ছিলেন। অসাধারণ পড়ুয়া হিসাবে খ্যাতি দেশব্যাপী। আর অভিজ্ঞতার ঝুলি এতটাই ভারী যে সর্বভারতীয় নানা দপ্তরের নানা সমস্যার সমাধান সূত্র নিরূপনের দায়িত্ব পালন করতে হয় ওপর তলার অনুরোধ মেনে। বিশেষত কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা দফতর গুলোর নানা শাখার নানা কাজে।
নিজের সময় কাটানোর পাশাপশি নিজের এতদিনের অভিজ্ঞতা আর অগাধ পাঠের কিছুটা ভবিষ্যত প্রজন্মের হাতেও তুলে দিতে চান।তাই প্রতিমাসেই একদিন করে পরমার্থদের বাড়িতেই বসে দারুণ এই আড্ডার আসর। আসর জমায় পরমার্থ ,অচ্যুত ,বিবেক,সতীর্থ দের মতন একদল কিশোর- কিশোরী। যৌবনের দোরগোড়ায় দাঁড়ানো ছেলেমেয়েদেরকে জীবনের গল্পগুলোর সালতামামি করিয়ে দেওয়ার একটা চেষ্টাও যেন করে চলেছেন বৃদ্ধ নিশীথ কমল সান্যাল। তাই পরমার্থ র বন্ধুদের কাছে এই বুড়ো এখন- আওয়ার গ্রেট ‘গল্প – দাদু ‘—দ্য বেস্ট।
আজ আড্ডার শুরুতেই অচ্যুত জানাল স্কুলের নতুন লিজা ম্যাম স্টোরি টেলিং টপিক দিয়েছে -জুজু ।বাচ্চাগুলোও এই অদ্ভুত টপিক নিয়ে চিন্তায় পাগল। কেউ কিছুই বলতেই পারছে না। সবাই দাদুর শরণাপন্ন। দাদু একটু ভেবে বললেন-বেশ।কিন্তু ট্রেন এ আটকে আছে তিথি, প্রাংশু সুনন্দ–রা। ফোন করেছিল। শেওড়াফুলিতে টিকিট চেকিং নিয়ে গোলমাল চলেছে। যাত্রীদের সাথে রেল পুলিশের। ফলে ট্রেনে আটকে ওরা।
একটু থেমেই শুরু করলেন নিশীথবাবু- আজ আমি আমার নিজের এক অনুগামীর সাথে আলাপ এর গল্প বলব। সেদিন ওর মনের জুজুর কথা ও নিজেই পরে বলেছিল।
এরমধ্যে গুটি গুটি ঢুকে বসে পড়েছে পর্ণা, তিথি আর প্রাংশুরা।

বেশ।-একটু থেমেই গল্প শুরু করলেন পরমার্থ এর দাদু।- সেদিন বৈদ্যবাটির ভাইয়ের বাড়ি আসছি ব্যান্ডেলের একটা কাজ সেরে। দাঁড়িয়ে আছি দরজার কাছে।হাওয়া খাব বলে। হঠাৎই দেখি , স্টেশন আসলেই কামরা থেকে ঝপাঝপ ঝাঁপ মেরে নেমে লোকজন দৌড়চ্ছে।এক ইয়া মোটা মহিলা তো সদ্যছাড়া ট্রেনটা থেকেই বাচ্চা সমেত দৌড়ে নামতে গিয়ে ব্যালেন্স হারিয়ে গড়িয়ে পড়লেন ভদ্রেশ্বর স্টেশন এর এক নম্বর প্লার্টফর্মে।ঝপাঝপ কামরা বদলাচ্ছে লোকে।
এ টেনডেনসি খুব চেনা । চেকার উঠেছে। দুপুরের ট্রেন, ফাঁকা গাড়ি। একটু দেখেই উঠেছিল, কিন্তু ওর মতন অনেকের হিসাব গেছে গুলিয়ে।মালেরা সব বসেছিল নানা জায়গায় ছড়িয়েছিটিয়ে। দাঁড়িয়ে ছিল না কেউ। স্টেশন থেকে ট্রেন ছাড়তেই উঠে দাঁড়িয়েছে।ব্যস, খেলা শুরু।
জগাও উঠে দাঁড়াল। যদিও অনেকগুলো গেট আগেই ওরা, তবুও চিন্তা বাড়ল জগার। ভদ্রেশ্বর থেকে বৈদ্যবাটির গ্যাপটা অনেক। গাড়ির গতি, মনের গতির বিপরীতে যেন।
শালা ঝামেলায় ফেলল মামারা- পাশে দাঁড়ানো ওরই সমবয়সী লোকটার মন্তব্য কানে আসতেই মনে মনে হাসল জগা। সত্যি , শব্দটা কতদিন পর শুনল। ওদের ছোট বেলার খুব চেনা শব্দ। চেকার,পুলিশ দুইই মামা। না ব্যবহার হতে হতে হারিয়ে গেছে।
অনেকেই আস্তে আস্তে ওদের দরজার দিকে সরে আসছে গুটি গুটি।এ হিসেব জগার মুখস্থ। প্রায় পঞ্চাশ বছর বয়স হতে চলল জগার।কত বার লোকালে টিকিট কেটে উঠেছে তা বোধ হয় হাতে গুণে বলে দিতে পারবে। আগে এসব পরোয়াই করত না।ইদানিং করে।দুইছেলে বড়। চাকরি করে। নিজের চুলেও পাক ধরেছে। এঅবস্থায় ধরা পড়লে একটু ইয়ে হয়।পকেটে হাত দিয়ে বুঝল- কুড়িয়ে বাড়িয়ে ষাটের বেশি হবেনা।দেখল – লোকগুলো সামনের তিনটে গেটে ছড়িয়ে গেল।আশপাশের এলাকার লোকজন সব এদিকে চলে এসেছে।
শালা আড়াই শো টাকা পকেটে থাকলে এসব চিন্তা মাথাতেই আনত না।কিন্ত এখন যা পরিস্থিতি তাতে চিন্তা দুশ্চিন্তার হাত ধরেই দৌড়চ্ছে। এখন মনে পড়ছে বন্ধুদের প্রশ্নের উত্তরে গর্ব করে বলেছিল- ডব্লিউ টি হয়ে যাতায়াতের একটা আলাদা রেলা আছে।
বন্ধুরা বলত- হাতকাটা জগন্নাথ।
পাশের আরও একটা চ্যাংড়া ছেলে বলল- শালা ওঠার আর জায়গা পেল না? ট্রেনটা হঠাৎই এত স্পিড নিল যে কি বলব? নইলে টুক করে কামড়া বদলানো কোন ব্যাপার না।
সবাই ওকেই সমর্থন করল।
ট্রেনটার গতি কমছে না লোকজন এর চাহিদা মেনে।সবার চোখ সাদা জামা প্যান্ট পরা লোকগুলোর দিকে।
এইবার হালকা ধাক্কা দিয়ে গতি কমল গাড়িটার।
জগার প্ল্যান ছকাই আছে।আর একটু স্পিড কমলেই পায়ের ব্যালান্স এ নেমে যাবে।এসব কতকালেরঅভ্যেস ।
হঠাৎই সামনের দিকের একটা দরজায় হৈ’- হৈ।
পড়বে পড়বে এবার।
জগা একবার ওদিকে তাকিয়ে দেখল- দলটা কপাকপ হাত পাকড়েছে কটা চ্যাংড়ার। ধস্তাধস্তি চলছে খুব। নামবে না , নামবে না- বলতে বলতেই একজন লাফ মারল স্টেশনে। চিৎকার উঠল- গেল,গেল ; ধর ধর ।
গতি রানিং এ নামার মতন স্পিড এ আসতেই জগা পায়ের ব্যালান্স এ সোজা প্ল্যাটফর্ম এ।নেমেই বুঝল এ যাত্রায় প্রাণে বাঁচল।কারণ পুরো স্টেশন ছুটছে তখন পরে যাওয়া ছেলেটার দিকে। এমনকি সাদা প্যান্ট জামারাও।
জগার মাথায় ঢুকল না হাতের ধরা শিকারগুলো ছেড়ে পালানো শিকারের পেছনে কেন ছুটছে?
ওর চিন্তার অবসান ঘটিয়ে উল্টোদিক থেকে আসা এক বয়স্ক ভদ্রলোক হাসতে-হাসতেই বললেন- কি কাণ্ড!!! বেচারা টিটি ভেবে লাফ দিয়েছে। ব্যস। জগার দৃষ্টিতে জিজ্ঞাসা আছে দেখে ভদ্রলোক যোগ করলেন- আরে এরা সব চুঁচুড়া কোর্টের উকিল। দল বেঁধেই যায় রোজ।ফেরেও তাই। আগেও একদিন ঠিক একই কাণ্ড হয়েছিল। বছর তিনেক আগে।মামা ভেবে লাফ মেরেছিল এক ভাগ্না। সোজা পৌঁছে গেছিল- আসল মামার বাড়ি।
জগার পাশে দাঁড়ানো ট্রেনের কামরার সহযাত্রী ভদ্রলোকটি এতক্ষণ পাশেই এসে গেছেন দেখে বেশ অবাক হল জগা।ছাতাটা গুটিয়ে ব্যাগে ভরতে ভরতে বললেন- একটা জিনিস বুঝিনা,মামার বাড়ির ভয়ে সব ভাগ্নারা ভীত হয়ে পড়ে কেন?
যা বলেছেন- ওপাশের এক অচেনা ভদ্রলোক যোগ করলেন- তাহলে বলি শুনুন, সেদিন আমার শালা, খাকিউর্দি পরে বাইক নিয়ে আমার বাড়িতে এসেছিল।বলব কি দাদা ,পাড়ার সবচেয়ে নটোরিয়াস ছেলেটাই বিকেলে দেখা হতেই জিজ্ঞেস করল- কাকা ,বাড়িতে পুলিশ এসেছিল মনে হল।
হাসতে হাসতেই বললাম- পুলিশ নয় বাবা। আমার শালা দমকলে আছে । একটা গাছপাকা কাঁঠাল দিতে এসেছিল তার দিদিকে ।বলব কি দাদা , কথাটা শুনে কি প্রশান্তির হাসি যে হাসল ছেলেটা!
সেদিন খুব অবাক হয়েছিলাম। আর আজ নিজের চোখেই দেখলাম মামারবাড়ির জুজু কে।
জগা লক্ষ্য করল সেই সাদা জামা পরিহিতদের দুজন ব্যবহারজীবি হাসতে হাসতেই ওদের পাশ দিয়েই যাচ্ছেন।জগার মনে একটু সাহস এসেছে,ধরা না পড়ার ফলে। তাই মামারূপী উকিল বাবুটিকে জিজ্ঞেস করে বসল -দাদা, ছেলেটার লাগেনি তো?
উত্তরে সাদা মামা বনে যাওয়া ভদ্রলোকটি বললেন এ যাত্রায় বেঁচে গেছে বটে, কিন্ত সামান্য এধার ওধার হলেই হত আরকি!!
সাবধানী সেই পুরোনো সহযাত্রী বললেন- আসলে মামার বাড়ির ভয়েই তো সব না ?
সাদা পোশাকের উকিল বাবুটির প্রত্যুত্তর -আসলে অপরাধকে গোপন করতে গিয়ে সব ভাগ্নারাই মনেমনে সাদা পোশাকের পুলিশ হতে চায় মামারবাড়ির নানান বিপদ এড়িয়ে যাওয়ার হিসেব মেলাতে মেলাতে। আর ওইখানেই ঘটে বিপদ।
তার সঙ্গী অপর সাদা মামাটি বলল- তুই কি করে বুঝলি?
সরল উত্তর এল- এসব শিক্ষা খোদ আমার নিজের মামার কাছ থেকেই শেখা,আমার নিজের মামার বাড়িতে বসে।
-যাহ্, তোর যত সব গ্যাঁজাখুরি তথ্য। হাসছেন অন্য উকিল বাবুটি।
-বিলিভ মি,ইয়ারকি মারছি না,সত্যি সত্যিইআমার মামা ছিলেন একজন সাদা পোশাকের পুলিশ। তিনিই আমার সেই ছোটবেলার সাদা মনে একটা কালো দাগ টেনে দিয়ে গিয়েছিলেন।
ডব্লিউ – টি জগা , মামার হাতে ধরা না পরা বাধ্য ভাগ্নার মতন স্টেশন ছেড়ে বেরিয়ে যাবে ভাবছে, এমন সময় হঠাৎই হাতটা খপ করে চেপে ধরলেন কেউ। চমকে পেছন ফিরেই দেখেন সেই ট্রেন এর সহযাত্রীটি।
স্থির তাকিয়ে আছেন… কোথায় যাওয়া হবে?
তোতলাচ্ছে জগা… মামারবাড়ি। এখানেই। কেন?
ভদ্রলোক একই গলায় বললেন… বিনে পয়সার মামার বাড়ি।
তোতলচ্ছে জগা… আপনি কে?
-আমি একজন সাদা পোশাকের পুলিশ।
কথা শেষ হবার আগেই লাফিয়ে উঠল বিবেক। -তুমি তখন আইবি তে ছিলে?
-কি করে বুঝলি?
হাসছে বিবেক…
ওইযে, শব্দটা… উইদ আউট। ফলো করে।
অ্যাবসিলিউটলি কারেক্ট, মাই চাইল্ড। …লাফিয়ে উঠলেন নিশীথ কমল… বাইরে থেকেও সঙ্গে থাকো।গোয়েন্দাদের প্রথম মন্ত্র। এই উইদ- আউট এর টিকটিকি মণ্ত্রে জগাকে সেই যে ধরেছিলাম ,আজও পালাতে পারেনি, আজও আমার গাড়ি চালায়।
তোমার জগা না পালাতে পারলেও এরা কিন্তু ঠিক পালাবে, বাইরেটা দেখেছো, কালো মেঘে পুরো ঢেকে আছে,ঝড় উঠল বলে… ঘাম মুছতে মুছতে ঘরে ঢুকলেন পরমার্থ এর ঠাম্মি… মণিদীপা।
না,না,তুমি নিশ্চিত থাকো ঠাম্মি, আজ তোমার হাতের চসির পায়েস না খেয়ে নড়ছি না।…তিথি বলে উঠল।
অবাক মণিদীপা বললেন…ওমা, কি করে বুঝলি? অরিত্র লাফিয়ে উঠল…কেন? ঢুকেই দেখেছি। বাইরে শুকোচ্ছিল। তুমি নিয়ে রান্না ঘরে ঢুকলে।
ভেরি গুভ, স্মার্ট ওয়াচ, টিকটিকিদের দ্বিতীয় মহামণ্ত্র।
প্রাংশুর হাতে প্রথম পৌছল চসির পায়েসের বাটি। হাতে নিয়েই বলল… এই টিকিটিকিরা ডাইনোসর হবে কি করে? হাত কাটা জগাকে ধরলে?
হাসছেন নিশীথ কমল…জগার মতন দেখার বড় বড় চোখ পেলে।
সবাই হো হো করে হেসে উঠল।

[পরম্পরা ওয়েবজিন, সেপ্টেম্বর ২৬, সূচিপত্র – এখানে ক্লিক করুন]
