
নুড়ি পাথরের সঙ্গে চলতে চলতে (২৩)
পত্রিকার নাম ত্রিবেণী রাখার কারণ ছিল শ্রীরামপুর , ত্রিবেণী , আর পঞ্চানন কর্মকারকে মনে রেখে ৷

পত্রিকা প্রকাশের আগে সে কী প্রবল উত্তেজনা ৷ রাতে ঘুম নেই চোখে ৷ হাতে টাকা নেই , প্রেসে টাকা না দিলে পত্রিকা হাতে পাবো না ৷ গোসাই প্রেসের অমিয় গোস্বামী , যিনি ঐকতান পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন ৷ তাঁর সহযোগিতায় পত্রিকা প্রকাশ হল ৷ পত্রিকা প্রকাশের পর দেখলাম স্থানীয় অনেকেই বেশ উৎসাহ দিলেন ৷ বছরে তিনটি সংখ্যা প্রকাশিত হত ৷ ২৫ শে বৈশাখ , শারদ সংখ্যা , এবং শীত সংখ্যা ৷ সে সময় হঠাৎ একটা ধারা এসেছিল নানা আকারের লিটল ম্যাগাজিন করার ৷ আমাদের পঁচিশে বৈশাখ সংখ্যাটি গ্রিটিংস কার্ডের মতো করা হয়েছিল দু’বার ৷ ১৩৮৪ র বৈশাখ সংখ্যাটির দাম ছিল ১৫ পয়সা ৷ জোড়াসাঁকো আর রবীন্দ্রসদনে ২৫ বৈশাখ ভোরবেলায় গিয়ে বিক্রি করতাম একাই ৷ সে এক মহা উৎসাহের দিন ৷ অতি ভোরে উঠি ফাস্ট ট্রেনে ছুটি রবীন্দ্র পুজোর দিন ৷ আমার সঙ্গে যারা সমবয়সের ছিল তারা কেউ সাহিত্যে উৎসাহী ছিল না ৷ আমার নেশাতেই তাদের নেশা আসলেও দ্রুত তা কেটেও যায় , যে যার জীবনসংগ্রামে যুক্ত হয়ে সরে যায় ৷
একবার একটা “হঠাৎ সংখ্যা ” করেছিলাম ফিলটার উইলস আকৃতির , লম্বা কাগজে ১৬টা ছোটো ছোটো কবিতা ছেপে রোল করে নীচে ব্রাউন পেপার কেটে ফিল্টারের মতো করে লাগিয়ে ১২ পয়সা দাম করা হয়েছিল ৷ খুব ভালো মনে আছে ৷ পত্রিকা থেকে ১টাকা ১৮ পয়সা লাভ হয়েছিল ৷ শ্রীরামপুরের একজন মজার মানুষ ছিলেন অনন্তদা ৷ একমাথা জটা ৷ পদ্য করে কথা বলতেন ৷ তিনি একাই দশটাকা দিয়ে একশো পত্রিকা কিনে নিয়েছিলেন ৷ তবে সবচেয়ে মজার ঘটনা ২৫ শে বৈশাখে রবীন্দ্রসদনে হঠাৎ সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়কে দেখে ২৫ বৈশাখ সংখ্যাটি তাঁর হাতে ধরিয়ে দিতেই তিনি বলেছিলেন বিনা পয়সায় দেবে কেন ? বলে পকেট থেকে ১০ নয়া পয়সা হাতে দিয়েছিলেন ৷ আমি সিগারেট সংখ্যাটি দেখাতেই খুব কৌতুক করে বলেছিলেন বাঃ বেশ হয়েছে তো ৷ সেটি অবশ্য তাঁকে উপহার দিয়েছিলাম ৷

সে সময় আমাদের পত্রিকায় বিভিন্ন সময়ে লেখকদের মধ্যে ছিলেন স্বপনবুড়ো , কুমারেশ ঘোষ , শুদ্ধসত্ব বসু , সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় , রঞ্জিতবিকাশ বন্দ্যোপাধ্যায় , মতি মুখোপাধ্যায় (কুলটি)দের মতো মানুষরা ৷ আমি তখন নিয়মিত শুদ্ধসত্ব বসুর বাড়িতে রবিবার
” একক ” পত্রিকার আড্ডায় নিয়মিত যেতাম ৷ সেখানেই পরিচয় “যষ্ঠীমধু”র সম্পাদক কুমারেশ ঘোষের সঙ্গে ৷ সঞ্জীব বসুর সঙ্গে ৷ যষ্ঠীমধুতে আমি দু’তিনবার মজার ছড়াও লিখেছিলাম ৷

এরপর ক্রমশ দেখলাম বাবা আমার ওপর অসন্তুষ্ট হচ্ছিলেন ৷ তাঁর মনে হচ্ছিল ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়িয়ে লাভ নেই ৷ আর্থিক সহযোগিতার লোকও কমে আসছিল ৷ ফলে একটা সময় পত্রিকা বন্ধ করতে বাধ্য হলাম ৷
যদিও নয়ের দশকে কবি অরুণকুমার চক্রবর্তীর উৎসাহে ও নামকরণে ” মউল” নামে আর একটি পত্রিকা প্রকাশ করেছিলাম ৷ সে কথা যথা সময়ে হবে ?
১৯৭৮ সাল পর্যন্ত পত্রিকা চালিয়েছিলাম ৷ আমার পত্রিকায় কলকাতার দু’একজন বিখ্যাত কবির লেখা থাকলেও অধিকাংশ কবিতাই ছিল গ্রাম তথা মফস্ সল বাংলার লেখকদের ৷ এরকমই একজন লেখক বীরভূমের আদিত্য মুখোপাধ্যায় ৷ আজ সে বিখ্যাত মানুষ ৷ গবেষক প্রাবন্ধিক , কবি , গল্পলেখক ৷ ৫০ বছর ধরে তার সঙ্গে বন্ধুত্ব আজও একই রকম ৷ আমার অসুস্থতার খবর শুনে সে বীরভূম থেকে এসে দেখে গিয়েছে এক সন্ধায় ৷
লিটল ম্যাগাজিনই আমায় পরিচিতি দিয়েছে গ্রামে গঞ্জে ৷ আমায় যে কয়েকজন মানুষ চেনে তা লিটল ম্যাগাজিনের সৌজন্যেই ৷

সত্যরঞ্জন বিশ্বাস ছিলেন ” কন্ঠস্বর ” পত্রিকার সম্পাদক ৷ তিনিই আমায় প্রথম শান্তিনিকেতনে নিয়ে যান দোল উৎসবে ৷ সেখানে পরিচয় হয় বাংলাদেশের কবি ও রবীন্দ্র গবেষক হারুন অর রসিদের সঙ্গে ৷ সে তার মেসের ঘরটিতে আমায় তিনদিন থাকতে দিয়েছিল ৷ সেসব আজ সোনালী স্মৃতি ৷
বিভিন্ন সময়ে ত্রিবেণী ছাপা হয়েছিল তিনটি ছাপাখানা থেকে শ্রীরামপুর গোসাই প্রেস , শ্রীরামপুর প্রিন্টার্স এবং কোন্নগর স্মৃতি প্রেস ৷ টেডেল মিসিনে অক্ষর সাজিয়ে বসিয়ে ছাপা হত ৷ একবার পুরো একপাতা কম্পোজ করা জিনিস মেসিনে বসাতে গিয়ে হঠাৎ স্লিপ করে ভেঙে ছড়িয়ে গেল ৷ সারাদিনের পরিশ্রম শেষ ৷ সেদিন দেখেছিলাম কম্পোজিটার বিশুদার মোটাকাঁচের চশমার পেছনে জল গড়িয়ে নামতে ৷ এরকম কত অশ্রু কত রক্তের গন্ধ মিশে ছিল লিটল ম্যাগাজিনের গায়ে ৷ নিজের রক্ত বিক্রি করে পত্রিকার টাকা শোধ করেছে সে সময়ের কত মানুষ ৷ আজ সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সেসব আবেগ হারিয়ে গিয়েছে ৷ অাজ অনেকেই সেসব ক্ষণিকের আবেগ বলে মর্যাদা দিতে চাননা ৷ কিন্তু সেই লিটল ম্যাগাজিনের গন্ধ আজও লেগে আছে আমার নাকে ৷ মাঝে মাঝে দীর্ঘশ্বাস নিলে গন্ধটা মাতাল করে আজও ৷

