
বাঁধন ছেড়ে সেদিন ( 22.10.23 )
মহাষ্টমীর সন্ধ্যায় একা একাই বেরিয়েলাম … রাস্তা, আলো, ভীড়, মন্ডপ, সাজসজ্জা, প্রতিমা..ভীড়ের মধ্যে একা, কলরবের মধ্যে শুধু নিজের সঙ্গে নিজের কথা।
বছর কয়েক আগে একবার মোবাইল ফোন বাড়িতে রেখে ( অবশ্য মেয়েকে বলেই গিয়েছিলাম, পাছে ফোনে না পেয়ে থানা, পুলিশ, হসপিটাল করে) দক্ষিণেশ্বর গিয়েছিলাম। বালি খাল অবধি অটো রিক্সা তারপর হাঁটা… বিবেকানন্দ ব্রীজ ধরে বন্ধনহীন, প্রাত্যহিক ঘেরাটোপে যেন যাযাবর। নীচে কলকল ভাগীরথী, সামনে দূরে ভবতারিণী র মন্দির… হাঁটছি, উফ্ফ্ কী উন্মুক্ত লাগছিল নিজেকে… পৃথিবীর কারোও সঙ্গে সংযোগ নেই, বন্ধনহীন গ্রন্থির হাঁটা…
আজ আবার একা… জামা কাপড় অবশ্য নতুন… পকেটে মোবাইল ফোন। ইচ্ছেমত ছবি তুলছি, কখনো উজ্জ্বল কোনো পথচারী, আমার অনুরোধে ছবি তুলে দিচ্ছে, তার সঙ্গীনীকে অপেক্ষায় রেখে। কখনো দায়িত্ব প্রাপ্ত পুলিশ। আমি আবার ‘সেলফি’ তুলতে পারি না…
বেশ ভালো লাগছিল, কিন্তু একা কী আর থাকতে দেয়!
স্মৃতিরা ঘুরছিল, ছোটো ছোটো গল্প ঘুরছিল, একা থাকার জো নেই। বন্ধু দীপক কিছুক্ষণ জি. টি. রোড বরাবর… প্রায় 50-52 বছর আগে দল বেঁধে আমাদের ঠাকুর দেখতে বেরোনো, লুকিয়ে সিগারেট, আড় চোখে চাহনি, হাসি, ঠাট্টা, পায়ে নতুন জুতোর ফোস্কা… দীপক কে ছাড়লাম বটতলার মোড়ে।
একটু হাঁটা ঋষি বঙ্কিম সরণী বরাবর, পরিচ্ছন্ন দুটি মন্ডপ, মন কাড়া সজ্জা, কোন উগ্রতা নেই… পাখীর ডাক… নীরব তুলিতে সাবেকী শিল্পকলা ।
অবাক হয়ে, আত্মস্থ হয়ে দেখছিলাম, হঠাৎ আহ্বান “দাদুন” ! আমিও বিস্মিত, নাতনী ‘রাই’ ডাকছে। ঠিক এক ঘন্টা আগে যাদের দেখেছি বাড়িতে, মেয়ে, জামাই, রাই । তারা সামনে… হঠাৎ মনে হলো, যেন বহুদিন পর আবার দেখা হলো … কোথায় ডুবেছিলাম…
যথারীতি আরোও ছবি, সেলফি… এবার ভিডিও কলে সাগরপার থেকে আধো আধো গলায় “দা দুউউন্”, সাগরপার থেকে আর এক নাতনী ‘রিমঝিম’ .. আহ্বান তার এড়ানো কঠিন বড়।
সবাইকে হাত নেড়ে আমি এবার বাঁ দিকে ছোট্ট গলিতে… অবাক হয়ে দেখছিলাম, পন্ডিত কালীনাথ ভট্টাচার্য লেনে এখন একাধিক পারিবারিক পূজো… বারোয়ারি ত আছেই। মনে পড়লো দিদি আসতো ইংরেজি পড়তে, কোন্ বাড়িটায় যেন… সেও ত প্রায় 60-62 বছর আগের কথা।
এই পাড়ায় আমার অনেক বন্ধু। কিন্তু আমি ত কোনো বন্ধুদের আড্ডায় যাবো না, বাড়িতে কড়া নাড়বো না… আমি একা হাঁটবো। দেখছি মানুষের ভীড়, রোশনাই, কত নীরব, উচ্চ কন্ঠে কথা ।
হঠাৎ আহ্বান, “কি রে কেমন আছিস? ” কাঁধে হাত রাখলো, ( যা আমার কাছে সুখকর নয় ) — দেখি, সুদর্শন, আমার স্কুলের বন্ধু, অবশ্য সামান্য কুশল বিনিময়ের পর আমরা একে অন্য দিকে।

দে স্ট্রিট — সামনে আলোর রোশনাই, একটা সুন্দর, ছোট্ট নিটোল, মন্ডপ — দাঁড়িয়ে দেখছি আর মানুষ খুঁজছি, কাকে বলবো আমার ছবি তুলে দিতে…
“প্রবণ না? ” নারী কন্ঠ, তাকিয়ে দেখি ‘প্রতিভা দি’, এক সময়ের নাম করা গায়িকা…আবার একটু কথা, বার্ধক্য নেমেছে কথায় ও চলনে, জানলাম ওর ছেলে বড় ডাক্তার, আমার দিদি দের খবর নিল… হাত তুলে দেখালো পাশের রাস্তায় ওদের নতুন বাড়ি… আমি বললাম, “ওখানে ই ত বসাকদের বাড়ি?”… একজন মহিলা দাঁড়িয়ে পড়লেন, ” আপনি ত বাচ্চু দা? আপনাকে চিনি “,
” আপনি”?
“আমি ঐ বসাকবাড়ির সেজ ভাইয়ের স্ত্রী”
আমি চমকে উঠলাম, ‘আপনি সেজদার স্ত্রী ‘
একসময় ওরা সবাই ছিল আমাদের প্রতিবেশী, আত্মীয়ের মতো। সেই অর্থে বড়দা, মেজদা , সেজদা “… আবার পুরোনো কথা, গল্প, ছন্দা বৌদির কথা.. একদিন আসবেন…
পেরিয়ে এলাম গ্রন্থি…ঐ দূরে ‘দে বাবু দের’ বিশাল বাড়ি, তৎকালীন বিত্তশালী পরিবার। এখনও দুর্গা মন্ডপে জাঁকজমক সহকারে ঐতিহ্যবাহী পূজো। পায়ে পায়ে ঢুকলাম। এ বাড়িতে আমার বহু পরিচিত মুখ। অনেক গল্প। অবাক কান্ড, কাওকে আর চিনতে পারছি না, বুঝতে পারলাম, জীবনের অনেক বছর পার হয়ে আজ ঢুকেছি… তখনকার ছোট্টো ছোট্টো ছেলে মেয়েরা আজ সাবালক, সবাই রয়েছে অচেনা গাম্ভীর্য — একজন দু একটা ছবি তুলে দিলেন…এবার বেরোব এই উঠোন থেকে, হঠাৎ দেখা, মেয়ের বন্ধু ‘তিতিরা’ আর তার বোনের সঙ্গে…আবার গল্প, আমার সব লেখা তিতিরা পড়ে, ওর খুবই পছন্দের, সে প্রশংসা আবার… একটা সেলফি তুললো।
এবার ফেরা, না একা নয়, প্রচুর গল্প, হাসি, ঘটনার স্মৃতিরাও চলছে আমার সঙ্গে সঙ্গে, সদর দরজার মুখে, “প্রবণ দা, ভালো আছেন”, হ্যাঁ, ও আমার পরিচিত, ওরা তিন ভাই, লেপা, কাবা, খোখো … কোনটা কার নাম গুলিয়েছি, তবু দাঁড়ালাম, আবার গল্প, কথা… কথায় কথায় বললাম ওদের, ” আমাদের চট্টোপাধ্যায় পরিবারের বন্টননামা তে ( ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে ) , সাক্ষী হিসাবে এই দে পরিবারের তৎকালীন কর্তা বরদা প্রসাদ দে মহাশয়ের সহি আছে।
নাঃ, একা থাকা দুঃসাধ্য.. আমি বাড়ি ফিরবো…. হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছলাম মহিষমর্দিনী তলা। প্রাচীন পূজো। দেখলাম মন্ডপে ভীড় নেই… দু একজন অল্পবয়সী আছে বসে, নিজেদের মধ্যে চটুল আলোচনায় মগ্ন… নাঃ, আমাকে ডাকার কেউ নেই।
অবশেষে নিজেদের পাড়া… সুপ্রাচীন রাধাবল্লভ মন্দিরের মণ্ডপে কিছুক্ষণ দাঁড়ালাম.. ধীরে ধীরে এলাম বড়ির সামনে আটপৌরে অথচ আন্তরিক, গভীর পূজো মন্ডপে… সামান্য দু একটা কথা আবার… এবার বাড়ি।
বুঝতে পারলাম, একা থাকবো বললেই, একা থাকা যায় না। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, “আপনি প্রভু সৃষ্টি বাঁধন পরে/ বাঁধা সবার কাছে”
শঙ্খ ঘোষ গুনগুন করছেন,
“শূন্যতাই জানো শুধু!
শূন্যের ভিতরে এতো ঢেউ আছে, সে কথা জানো না ! ‘

[পরম্পরা ওয়েবজিন, সেপ্টেম্বর ২৬, সূচিপত্র – এখানে ক্লিক করুন]
