
বিশ্ববাংলা গেটের ট্রাফিক সিগন্যালটার অনেকটা দূরে এসে অটোটা দাঁড়িয়ে পড়লো ।
সিগন্যালের ঘড়িটা এখান থেকে দেখা যাচ্ছে না বটে, তবে লাল সিগন্যালটা নিশ্চয়ই লম্বা টাইম ধরেই আছে ।
কারণ পরপর অনেক গাড়ি দাঁড়িয়ে রয়েছে, বিশাল লম্বা লাইন, তাদের বিভিন্ন মেক, নানারকম কালার।
গাড়ির মেলা দেখতে দেখতে হঠাৎ সুকোমলের মনে হলো, সে ভালো করে খেয়াল করার আগেই তো কয়েক বছরের মধ্যে কেমন সাদা আর কালো রঙের অ্যামবাসাডরের যুগ শেষ হয়ে গেলো !
তারপর প্রায় স্বগতোক্তির মতো বললো, বাব্বা, কতো গাড়ি ! কি ট্রাফিক ! এই দুপুর বেলায় !
প্রৌঢ় অটোচালক ঘাড় ঘুরিয়ে বললো, পনেরো বিশ বছর আগেও কিন্তু এসব জায়গা এরকম ছিলো না স্যার। রাস্তায় কোন সিগন্যাল ছিল না, এই দুপুরবেলায় পুরো সুনসান, রাস্তার দুপাশে কোন ফ্ল্যাটবাড়ি ছিল না, চওড়া রাস্তায় গাড়িগুলো হু হু করে বেরিয়ে যেতো । চারদিকে ছিল কেবল জলা আর ঝোপজঙ্গল, গরীব লোকেদের বাথরুম করার জায়গা !
বলে অটো ড্রাইভার হালকা করে হাসলো।
সুকোমল বললো, আপনি কোলকাতায় অনেকদিন অটো চালাচ্ছেন ?
-হ্যাঁ, তা প্রায় চল্লিশ বছর হবে।
-চল্লিশ বছর !
-হ্যাঁ । নদীয়া জেলার বেথুয়াডহরি জায়গাটা চেনেন স্যার ? ওখানকারই একটা গ্রাম থেকে কুড়ি বছর বয়সে যখন কোলকাতায় এলাম, তখন এই সল্ট লেকে পাবলিক বাস প্রায় নেই, বেশিরভাগ অটোই চলতো । তখন সদ্য সদ্য শুরু হয়েছিলো, পুরো গাড়ি বুকিং করে চলতো, পয়েন্ট টু পয়েন্ট ! এখনকার মতো শেয়ার করে প্যাসেঞ্জার নেওয়ার চল ছিল না ।
-তাই !
-হ্যাঁ । এখন অবশ্য দুটোই চলে । পাঁচজনের শেয়ার কাস্টমার যদি দিয়ে দিতে চায়, তাহলে পুরো বুকিং। যাদের তাড়া আছে, তাদের জন্য এটা অনেক সুবিধের, ওয়েটিং-এর কোন ঝামেলা নেই। এই যেমন আপনি এখন নিলেন ।
-আপনি এখানে থাকেন কোথায় ?
-আমার বাড়ি ? এই যে নিউ টাউনে অ্যাকশান এরিয়া ওয়ান বলে, এর বেশ পেছনে কেষ্টপুর এলাকায় । আমাদের বাড়ি মানে আর কি ! বস্তিতে একটা বড়ো ঘর স্যার, ফ্যামিলি তো আর করিনি, একজনের মতো মাথা গোঁজার ঠাই। এই শহরে আমাদের আর ঘর কোথায় হবে বলুন !
বলে অটো ড্রাইভার আবার হাসলো।
ড্রাইভারের সঙ্গে আলাপটা সুকোমলের ভালো লাগছিলো, ক্রুশিয়াল বিজনেস মিটিংয়ের আগে যেন স্ট্রেসবাস্টার!
-কেন ? চল্লিশ বছরে এই এতো বড়ো শহরে একটা পার্মানেন্ট কিছু করে উঠতে পারলেন না ?
-পার্মানেন্ট ! আপনি স্যার, উলটোডাঙ্গায় অটোতে ওঠার সময় ওই লোকটাকে দেখলেন না, গলায় ব্যাগ ঝুলিয়ে ঘুরছিলো…ওই যে, যে লোকটা আপনার ট্রিপের জন্য আমার দুশো টাকা ভাড়াটা ঠিক করে দিলো !
-হ্যাঁ, মনে পড়ছে বটে ! খুব তেল দিয়ে আঁচড়ানো টেরিকাটা চুল, সেই লোকটা তো ?
-হ্যাঁ হ্যাঁ ! একদম ঠিক বলেছেন ! ওই ওরা সব স্ট্যান্ডের দালাল, গুন্ডা সব । আমার ধারণা, এই শহরের সব অটো স্ট্যান্ডে বোধহয় ওরা আছে ! আমার এই ভাড়াটার দুশো টাকার থেকে কুড়ি টাকা কমিশন ওকে দিতে হবে ।
-সে কি ! কেন ?

সিগন্যাল খুলে গেছে বোধহয় । লাইনে অনেক দূরের গাড়িগুলো নড়তে শুরু করেছে ।
ড্রাইভার অটোটা স্টার্ট করে বললো, না দিলে স্ট্যান্ডে দাঁড়াতে দেবে না । ব্যস ! তাহলে বুঝুন, দিনে যদি আমার হাজার বারশো রোজগার থেকে একশো কুড়ি টাকার মতো এভাবে চলে যায়, তাহলে মাসে যায় প্রায় সাড়ে তিনহাজার, বছরে চল্লিশ হাজারের মতো আমার রোজগার কম হচ্ছে । ওই টাকাটা হাতে যদি জমতো, তাহলে দশ-বারো বছরে হয়তো বস্তি এলাকায়ও একটা নিজের ঘর, বাথরুম, রান্নাঘর করতে পারতাম স্যার !
সুকোমল ড্রাইভারের মানসাঙ্কের দক্ষতায় চমৎকৃত হলো।
অটো চলতে শুরু করেছে ।
সুকোমল বললো, আর এই অটোটা ? এটা আপনার নিজের ?
অটোর ইঞ্জিনের আওয়াজের ওপরে গলার স্বরটা তুলে ড্রাইভার বললো, স্যার, চল্লিশ বছরে এ শহর আমাকে কিছুই দেয়নি, এই অটোটা ছাড়া । তাও এর জন্য জোগাড়যন্ত্র করে ব্যাঙ্ক লোনের ব্যবস্থা করে দিয়েছিলো আমার দেশের গ্রামেরই এক বন্ধু, ব্যাঙ্কের ক্লাস থ্রি স্টাফ । এখনও এর ইএমআই চলছে । ইএমআই মিটে গেলে অটো বেচে দিয়ে বেথুয়াডহরির গ্রামে চলে যাবো। এ শহরটায় চল্লিশটা বছর কাটিয়ে দিলাম, কিন্তু এ আমাকে নিজের করলো না স্যার।
-কিন্তু গ্রামে গিয়েও তো আপনাকে একটা কিছু করতে হবে। ষাট বছর বয়েস হলেও আপনি তো এখনও কাজ করার জন্য পুরো ফিট আছেন।
-করবো তো ! আমার গ্রামের বাড়ির পাশের বড়ো রাস্তায় বাস স্টপেজ হয়েছে এখন, ঘরের পাশেই । চা, বিস্কুট, পুরি সবজির দোকান দেবো, প্ল্যান করে রেখেছি । একটা পেট, চলে যাবে । নিন, আপনার নিউ টাউন বিজনেস ক্লাব এসে গেছে স্যার ।
সুকোমল ক্লাবের গেটে নেমে দাঁড়িয়ে পার্স খুলে ভাড়ার টাকা দিলো ।
-আপনি তো দুশো সত্তর দিয়েছেন স্যার !
-ওর থেকে কুড়ি টাকা তো আপনার ওই দালালকে দিতে হবে, বাকিটা আপনার। আপনার গ্রামের দোকানের জন্য অনেক শুভেচ্ছা রইলো ।

-আপনাকে অনেক ধন্যবাদ স্যার । বাড়তি টাকার জন্য নয় ! গত চল্লিশ বছরে এ শহরে কেউ আমাকে আপনি করে কথা বলেনি ! আপনি ভালো মানুষ স্যার, যে কাজে যাচ্ছেন, আমার মন বলছে, সেটা ভালো হবে। নমস্কার স্যার !

[পরম্পরা ওয়েবজিন, সেপ্টেম্বর ২৬, সূচিপত্র – এখানে ক্লিক করুন]

ভালো গল্প – একটা মানবিক দিক আছে…
বাস্তবতার ঝলক ও সারল্য মাখা একটি সুন্দর অণুগল্প।
Very well written….
বাস্তবতাই ভালো সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ গুণ।এই ধরনের আরো লেখা হোক
বেশ লাগল।
খুব সুন্দর গল্প । বাস্তবতার প্রতিরূপ
Good story. Deep thinking in the story.
মনস্তত্ত্ব নিয়ে সহজ সরল একটা লেখা মনছুঁয়ে গেলো ।
বাস্তব জীবনের গল্প। রাস্তায় বেরিয়ে সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বললে এরকম অনেক গল্প বেরিয়ে আসে। গল্পের বুনট বেশ ভালো লাগলো। তবে ৪০ বছর আগে কলকাতায় অটোর কোন চিহ্ন ছিল না। এই বিষয়টা সম্ভবত লেখকের নজরে পড়েনি।