এই ঘটনা অনেকবছর আগের।

একদিন বিকেলে একটা দোকানের সামনে যখন দাঁড়িয়েছিলাম, দেখলাম একটা হোন্ডা-সিটি গাড়ি থেকে বেশ দামী স্যুট পরিহিত এক স্মার্ট ভদ্রলোক নেমে এসে দোকানদারকে জিজ্ঞেস করলেন ” নস্যি আছে ?” । তারপর পছন্দের নস্যি কিনে নিয়ে চলে গেলেন ।

আমি একটু চমকে উঠলাম । ভাবলাম নস্যি নেওয়ার মানুষ তাহলে এখনো আছে! নেশার ব্যাপারে গত কয়েক দশকে যে রীতিমত কালচারাল রেভোলিউশন ঘটে গেছে, সেখানে নাসারন্ধ্রে নস্যি গুঁজে নেশা করার সংস্কৃতি আমরাতো অনেক পেছনে ফেলে এসেছি। হ্যাঁ, চল্লিশ বা পঞ্চাশের দশকে এটা বোধহয় নেশার জগতে একটু-আধটু কেন যথেষ্ট কৌলিন্য দাবী করতে পারতো। পঞ্চাশের দশকে যখন আমি স্কুলে পড়তাম সেইসময় আমাদের এক আত্মীয়ের প্রযোজনায়  “দেবদূত” নামে একটা সিনেমা তৈরি হয়েছিল । এখনো মনে আছে তার নায়কের পরণে ছিল ফুলপ্যান্টের ওপর পান্জাবী ( যদিও ঐ বিশেষ স্টাইলের তখন চলন ছিলনা, কিন্তু ডিরেক্টরের তেমনই ইচ্ছে হয়েছিল ) এবং তার হাতে সুন্দর একটি রুপোর নস্যির ডিবে। আরও আশ্চর্যের বিষয় ছিল যে গল্প অনুযায়ী সেই নায়ক বিলেত ফেরত ব্যারিস্টার। তার হাতে নস্যির রুপোর ডিবে, এখন ভাবাই যায়না। ছবিটি দেখানো হয়েছিল শেওড়াফুলির  “উদয়ন” সিনেমা হলে ।

জানিনা নেশার সঙ্গে পেশার কোনো সাযুজ্য আবিষ্কার করা যায় কিনা । যেমন সাহেবের মুখে পাইপ , জমিদারের গড়গড়া এবং পণ্ডিতদের জন্যে নস্যি । অবশ্য “জুতা আবিষ্কার” কবিতায়  যাদের জন্যে ” ফুরায়ে গেল উনিশ পিপে নস্য” তারা কেউই ঠিক চতুষ্পাঠীর পণ্ডিত ছিলেননা , তাঁরা ছিলেন রীতিমত “উপাধি-ধরা বৈজ্ঞানিক ভৃত্য ” ।

আমার তখনকার স্কুলজীবনে দেখেছি অনেক মাস্টারমশাইরা নিয়মিত নস্যি নিতেন । ইংরেজীর নীরেনবাবু তাঁর দু আঙুলে টিপে ধরা বিপুল পরিমাণ নস্যি যখন ক্লাসের মধ্যে সশব্দে নাসারন্ধ্রে প্রবেশ করাতেন, তখন আমাদের শ্রীরামপুরের চাতরা নন্দলাল স্কুলের ছোটো ক্লাসঘরটার বাতাস “পরিমল” নস্যির গোলাপফুলের মতো গন্ধে ম ম করতো । নেশার জগতে নস্যির সেই ধ্রুপদী ঐতিহ্যের আমি সাক্ষী ।

আমার এক সহপাঠীর নাম ছিল যুধিষ্ঠির। সে নাকি জীবনে ভুলেও কখনো সত্যি কথা বলতোনা। অবশ্য আমি জানি সে একবার তার কথা রেখেছিলো। সে কথায় পরে আসছি । পড়া না পারলে সেই আমলে যত রকম কঠিন ও উদ্ভট শাস্তি প্রতিভাবান মাষ্টারমশাইরা  আবিষ্কার করেছিলেন সেগুলি সব যুধিষ্ঠিরের জন্যে বরাদ্দ ছিলো । এ-হেন যুধিষ্ঠির বারবার ফেল করতে করতে ক্লাস সেভেনে আমার সহপাঠী হয়ে গেল। তখনকার দিনে লেখাপড়ায় যারা একটুআধটু গুডবুকে থাকতো তারা ফার্স্ট বেঞ্চে বসতো। একটা অলিখিত নিয়মের মতোই বলা যায়। যুধিষ্ঠিরের সঙ্গে আমার খুব ভাব ছিলো । তারও আমাদের সঙ্গে ফার্স্ট বেঞ্চে বসার ইচ্ছে হল ।  চুপি চুপি আমাকে একদিন বলল , ” আমি নস্যি নিই, ডিবে আছে । স্যারকে বলে তোদের পাশে বসতে দিলে তোদেরও মাঝে মাঝে দেব । একটা টিপ নাকে দিলেই দেখবি কি মজা আর আরাম, মাথা সমেত পুরো শরীরটা একেবারে ফুরফুরে।” 

সেই বয়সে নিষিদ্ধ নেশা করার উত্তেজনায় আমি স্যারকে অনেক অনুরোধ করে  যুধিষ্ঠিরকে পাশে বসালাম আর সবার অলক্ষ্যে আমাদেরও একটুআধটু নস্যি নেওয়ার শুরু হল । তার ফলে শরীর বেশি ফুরফুরে লাগতো কিনা জানিনা তবে বেশ মজা লাগতো। যুধিষ্ঠিরের বোধহয় একটিমাত্রই নীল রং এর সার্ট ছিলো যেটা পরে সে রোজই স্কুলে আসতো, যে কারণে অনেক দূর থেকেই বোঝা যেত কে আসছে । আমার পাশে মাসদুয়েক বসার পর একদিন হঠাৎ বলে উঠল, ” কাল থেকে আমি আর আসবো না , তোরা দেখতে পাবি।”
আমরা অবশ্যই এই কথাটায় একেবারেই কোনো গুরুত্ব দিইনি। একেবারে হেসে উড়িয়ে দিয়েছিলাম।

পরদিন, ঠিক পরের দিন। আচমকা খবরটা শুনে ক্লাস সেভেনের আমরা কয়েকজন ছুটে পৌঁছলাম যুধিষ্ঠিরের বাড়ি । বাড়ির সামনে খুব ভিড় হয়ে গেছে আর সবাই ফিসফিস করে কিছু কথাবার্তা বলছে।

আমাদের দেখে ওর দাদা দৌড়ে কাছে এলো। বলল , ” ওহ্, তোমরাও খবরটা পেয়ে গেছো? শোনো, গলায় দড়ি দিয়ে যুধিষ্ঠির আত্মহত্যা করেছে “। বলেই সে চলে গেল। পরে একজন বলল একটা চিরকুটে যুধিষ্ঠির লিখে গেছে – ” গত এক সপ্তাহ ধরে আমার গলা দিয়ে কাশির সঙ্গে ভীষণ রক্ত উঠছিল । আমি জানি এটা টিবি, যার কোনো চিকিৎসা নেই । আছে হয়তো কিন্তু তার জন্যে প্রচুর খরচ করতে হবে। আমার মতো একটা ফালতু ছেলের জন্যে কষ্ট করে এতো খরচের কোনো দরকার নেই। তাই নিজেই চলে গেলাম।”

জীবনের সাফল্য-ব্যর্থতা,সত্যমিথ্যার সব জটিল অংকগুলো এতো অল্প বয়সেই এক টিপ নস্যির মতো উড়িয়ে দিয়ে এইভাবে চলে গিয়েছিল আমাদের যুধিষ্ঠির ।

সহযোগিতার হাত বাড়াতে ওপরের ছবিতে ক্লিক করুন

[লেখকের পূর্ব রচনা]

[পরম্পরা ওয়েবজিন, অগাস্ট ২৬, সূচিপত্র – এখানে ক্লিক করুন]

0 0 ভোট
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
পংক্তির ভেতর মন্তব্য
সব মন্তব্য