শ্রীরামপুর কলেজের দিন শেষ করে সবে চাকরীর চেষ্টা শুরু করছি ৷ বাড়িতে ইলেভেন থেকেই দুজনকে পড়াতাম ৷ প্রতি মাসে পাঁচ টাকা মাইনে ৷ ক্লাস ফাইভ আর সিক্স ৷ তারা পরবর্তী কালে এইট নাইনে উঠে ছেড়ে দিলেও ৷ নতুন দু’তিনজন করে যুক্ত হয়েছে ৷ মাসে ৩০ টাকা রোজগার হয় ৷ অনেকদিন আগে পৈতের পর স্টেশনের কাছে ইউনাইটেড ব্যাঙ্কের শ্রীরামপুর শাখায় বাবা পাঁচটাকা দিয়ে একটা বাবার সঙ্গে জয়েন্ট একাউন্ট করে দিয়েছিলেন ৷ সেখানেই জমানো ছিল পৈতের পাওয়া টাকা ৷ টিউসনের টাকা থেকে সামান্য কিছু টাকা হাতে রেখে বাকি টাকাটা ওখানেই জমাতাম ৷


হঠাৎ “ওলি ” সেন্টের এজেন্সি তে চাকরি পেলাম ৷ হুগলি জেলার নির্দিষ্ট কয়েকটি শহরের দোকানে দোকানে সাপ্লাই দিতে হবে ৷ প্রতি সপ্তাহে ৩৫ টাকা দেবে ৷ একটা এটাচি ব্যাগ হাতে খুবই উৎসাহ নিয়ে কাজ শুরু করলাম ৷ কোম্পানী বললেন – প্রতি সপ্তাহে মাল সাপ্লাই দিয়ে পরের সপ্তাহে টাকা তুলে আনতে হবে ৷ সে প্রায় তিন চার হাজার টাকা ৷ সেই সময় অনুযায়ী অনেক টাকা ৷ বাবা শুনে খুবই অখুশী হলেন ৷ দু’তিন সপ্তাহ পরেই বুঝলাম সে কাজ আমার নয় ৷ ছেড়ে দিলাম যখন ঠিক তখনই বাবার এক বন্ধু বাবার কাছে প্রস্তাব দিলেন আপনার ছেলেকে আমার কাছে আসতে বলুন , আমি তাকে এল.আই.সি এবং পিয়ারলেসের এজেন্ট করে নেবো ৷ ভবিষ্যত স্ট্রং হয়ে যাবে ৷ বাবার নির্দেশে গেলাম তাঁর কাছে ৷ এল.আই.সির বেশ বড় অফিসার ৷ তাঁর স্ত্রী মেনকাবৌদির আন্ডারে আমি এজেন্ট হলাম ৷ তিনচার দিন ক্লাস হল কিভাবে লোককে কনভিন্স করিয়ে পলিসী করাতে হবে সেই নিয়ে ৷ অনেক কষ্টে দু’একটা পলিসি করালাম ৷ ভালো টাকাও পেলাম ৷ পরে বুঝলাম সে কাজটিও আমার দ্বারা হবে না ৷
এর মধ্যে আকাশবাণীর যুববাণীতে অনুষ্ঠান করছি ৷ ক্যাজুয়াল এনাউন্সার ও হয়েছি ৷
একদিন হঠাৎ শোয়ার ঘরের বাইরের বারান্দা থেকে শুনলাম বাবা তাঁর সেতারের ছাত্রী যোগমায়া পিসীকে বলছেন – জানেন দিদি আমি একটা ব্যাপারে নিশ্চিন্ত শ্রীমাণ টাকা ওড়াবে না ৷ ওই ডাকটিকিট জমানো ছাড়া আর কোনও নেশা নেই ওর ৷ জমানো হ্যাবিটটা তৈরী হয়ে গিয়েছে ৷
শুনে খুব আত্মতৃপ্তি লাভ করেছিলিম ৷ যদিও বাবা সব সময় আমায় একটা গালাগাল দিতেন “গট্টাকশাল”৷ যদিও আজ অবধি কোনও অভিধানে শব্দটির হদিশ পাইনি ৷ অনেক পরে বাবা অবশ্যি বলেছিলেন – গট্টাকশাল মানে ” গুড ফর নাথিং ” ৷ তাই আজ বারবার মনে হয় বাবা আমায় ঠিক কথাই বলতেন ৷
যাই হোক এল. আই. সি বা পিয়ারলেসের কোনও এজেন্সির কাজই আমার দ্বারা হল না ৷ মেনকা বৌদি বা অলোকদা নিজেরা বেশ কয়েকটা ক্লায়েন্ট এর সঙ্গে আমায় যোগাযোগ করিয়ে দিয়ে উৎসাহিত করার চেষ্টা করেছিলেন ৷ কিন্তু “গট্টাকশাল” আমার পক্ষে সে এজেন্সি করাও হল না ৷
তারপর শুধু কলকাতায় চাঁদপাল ঘাটে নেমে মাসে তিন চারদিন আকাশবাণী ভবন ছাড়া আর যাওয়া নেই কোথাও ৷
মাঝে মাঝে জিপিওতে যেতাম ৷ সেই যে এগারো বছর বয়েসে আমাদের শহরের ভূমিপুত্র তৎকালীন মন্ত্রী ডা. গোপাল দাস নাগ একটা নেশা ধরিয়ে দিয়েছিলেন ৷ সে নেশা থেকে তো বাইরে আসতে পারিনি আজও ৷ মদ বিড়ি গাঁজা চরস আর যা যা সব নেশা বস্তু তার কাছে আজ আমার বাচ্ছা মনে হয় ৷

নেশার নাম “ডাকটিকিট সংগ্রহ ” ৷ বর্তমানে যার পরিমান আমার কাছে এক লক্ষ বিশ হাজারের কিছু বেশি ৷ প্রতি শনিবার বহু সংগ্রাহকের ভিড় হত জিপিওর ফিলাটেলি বিভাগের সামনে ৷ কত রকমের দেশবিদেশের ডাকটিকিট কয়েনস ৷ সেসব বড় নেশার ব্যাপার ৷

সহযোগিতার হাত বাড়াতে ওপরের ছবিতে ক্লিক করুন

[লেখকের পূর্ব রচনা]

[পরম্পরা ওয়েবজিন, অগাস্ট ২৬, সূচিপত্র – এখানে ক্লিক করুন]

0 0 ভোট
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
2 Comments
Oldest
Newest Most Voted
পংক্তির ভেতর মন্তব্য
সব মন্তব্য
Susobhan Adhikary
Susobhan Adhikary
17 hours ago

Susobhan Adhikary

Dr Dipak Banerjee
Dr Dipak Banerjee
12 hours ago

বাঃ স্ট্যাম্প জমাবার নেশা আমারও ছিল!
এর পর সময় করে একদিন দেখে আসবো!
খুব আনন্দ পেলাম।