স্টেশনের প্ল্যাটফর্ম বা শহরের ফুটপাথ থেকে যখনই হকারদের উচ্ছেদ করা হয়, তখনই এটা নিয়ে একটা অদ্ভুত বিতর্ক শুরু হয়ে যায়। এক পক্ষ খুব সোজা একটা প্রশ্ন তোলেন—”আচ্ছা, স্টেশনে বা ফুটপাথে বসার আগে হকাররা কি রেল বা পুরসভার পারমিশন নিয়েছিলেন? তাহলে আজ উচ্ছেদের সময় কোন মুখে পুনর্বাসনের দাবি করছেন?” মধ্যবিত্ত নাগরিক সমাজ বা ট্যাক্সপেয়ারদের একটা বড় অংশ যখন এই ধরণের কথা বলছেন, তখন হকাররা বেঁচে থাকার জন্য নির্মম লড়াই চালাচ্ছেন। শিয়ালদহ, দমদম, আসানসোলের মতো স্টেশনের আশেপাশে প্লাস্টিক মাথায় দিয়ে, ভাঙা খাটিয়া বা চটের বস্তা পেতে এখন তাঁরা রাত জাগছেন। হকার সংগ্রাম কমিটির যুবকেরা লাল ঝান্ডা হাতে বিনিদ্র রাত কাটাচ্ছেন স্টেশন চত্বরেই। সবারই লক্ষ্য একটাই—যদি মাঝরাতে জেসিবি-র আওয়াজ পাওয়া যায় বা সাইরেন বেজে ওঠে, তবে শরীর দিয়ে আটকে দিতে হবে হকারদের রুজি-রুটির শেষ সম্বলটুকুকে। হকারদের এই রাত জাগা আর হতাশা নিয়ে বিক্ষোভের যে ছবি আমরা চারদিকে দেখছি, তা কিন্তু কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়।

আপাতদৃষ্টিতে নাগরিক সমাজের প্রশ্নটাকে খুব আইনি বা যৌক্তিক মনে হতেই পারে, কিন্তু আমাদের শহরের অর্থনীতির গভীরে ঢুকলে বোঝা যায়, বিষয়টা এতটা সহজ নয়। হকার উচ্ছেদ বা পুনর্বাসনের এই পুরো টানাপোড়েনটা আসলে কোনো সাধারণ আইনি লড়াই নয়; এটা ত্রিমুখী একটা যুদ্ধ—যেখানে একদিকে আছে রাষ্ট্রের আইন, অন্যদিকে লোকাল রাজনীতির ‘তোলাবাজি’, আর সবার ওপরে রয়েছে গরিব মানুষের বেঁচে থাকার অধিকার।

ফুটপাথ বা স্টেশন-ই কেন শেষ ভরসা?

নাগরিক সমাজের একটা বড় অংশ প্রায়শই হকারদের ‘আইন অমান্যকারী’ বলে তাঁদের দিকে আঙুল তোলেন, তার আড়ালে ঢাকা পড়ে যায় এক রূঢ় অস্তিত্বের লড়াই। রোদ-বৃষ্টি মাথায় নিয়ে ফুটপাথের ধুলোবালিতে কিংবা রেল প্ল্যাটফর্মের তীব্র চিৎকার-চেঁচামেচির মধ্যে দোকান পাতার এই বাধ্যবাধকতা কোনো শখ নয়। বরং তা আমাদের সামগ্রিক অর্থনীতির দুটি বড় সংকটের চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ—একদিকে গ্রামীণ কৃষির বিপর্যয় এবং অন্যদিকে শহরের তীব্র বেকারত্ব।

একদিকে, গ্রামের চাষবাসে যখন আর পেট চলে না, প্রান্তিক কৃষকেরা যখন ঋণের জালে জড়িয়ে পড়েন, তখন স্রেফ জীবন বাঁচানোর তাগিদে তাঁরা গ্রাম ছেড়ে শহরের দিকে চলে আসেন। অন্যদিকের বাস্তবটাও একই রকম নির্মম। গত কয়েক দশকে আমাদের চটকল, কাপড়ের মিল থেকে শুরু করে একের পর এক ছোট-বড় কলকারখানা বন্ধ হয়ে গেছে, সরকারি কিংবা বেসরকারি সংস্থাতেও নতুন চাকরির কোনো ব্যবস্থা নেই। স্বাভাবিকভাবেই এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আধা-শিক্ষিত বা ডিগ্রিধারী শহুরে যুবকদের পাকাপাকি কাজের অভাব। আজ কারখানা থেকে ছাঁটাই হওয়া শ্রমিক হোক বা ডিগ্রিধারী তরুণ—সবার সামনেই যখন উপার্জনের সমস্ত চেনা দরজা বন্ধ হয়ে গেছে, তখন পেটের টানে মানুষ নিজেদের উদ্যোগে এই ‘স্বনির্ভর’ পথটা বেছে নেন।

স্টেশন চত্বর বা শহরের প্রধান ফুটপাথগুলো হলো এমন জায়গা, যেখানে সবচেয়ে বেশি মানুষের যাতায়াত। একটা ছোট দোকান ঘর ভাড়া নেওয়ার বা চড়া দামে কেনার ক্ষমতা এই কাজ হারানো শহুরে মানুষ কিংবা গ্রাম থেকে কাজের খোঁজে শহরে আসা মানুষগুলোর নেই। ফলে, যেখানে ক্রেতা বেশি আর বিনিয়োগ খুব কম, সেই প্ল্যাটফর্ম বা ফুটপাথটুকুই তাঁদের কাছে খোলা আকাশের নিচে শেষ ভরসা হয়ে দাঁড়ায়। এটা কোনো আইন ভাঙার বিলাসিতা নয়, এটা স্রেফ পেটের টানে বেঁচে থাকার এক মরিয়া লড়াই।

সিন্ডিকেটরাজ

হকারদের এই বেঁচে থাকার বাধ্যবাধকতা, আর এদের কোনো আইনি স্বীকৃতি না থাকা – এই দুই অসহায়তাকে হাতিয়ার করে গড়ে উঠেছে এক রাজনৈতিক নেক্সাস। হকাররা যেহেতু সরকার বা রেলের কাছ থেকে কোনো অফিশিয়াল অনুমতি পান না, তাই রাষ্ট্র তাঁদের ‘অবৈধ’ তকমা দিয়ে নিজেদের দায় এড়িয়ে যেতে চায়। কিন্তু এই ‘অবৈধতা’-কে ঢাল করেই গত কয়েক দশক ধরে আমাদের দেশের প্রতিটি বড় শহর আর স্টেশন চত্বরে এক অদৃশ্য সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। আর এই ব্যবস্থার মাথায় বসে থাকেন স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা, মস্তান আর প্রশাসনের একাংশ।

হকারদের সরকারকে সরাসরি কোনো ট্রেড লাইসেন্স ফি বা ট্যাক্স দেওয়ার সুযোগ নেই ঠিকই, কিন্তু এই অবৈধ সিন্ডিকেটকে প্রতিদিন বা প্রতি মাসে তাঁদের কষ্টের উপার্জনের একটা নির্দিষ্ট অংশ ‘তোলা’ বা ‘চাঁদা’ হিসেবে দিয়ে যেতে হয়। এই কোটি কোটি টাকার তোলাবাজির অর্থনীতির বিনিময়ে হকাররা পান একটা অলিখিত গ্যারান্টি—”তোমাদের দোকান ভাঙা হবে না।” অর্থাৎ, হকাররা খাতায়-কলমে করদাতা না হতে পারেন, কিন্তু তাঁরা এই নোংরা ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় শোষিত ‘খাজনা দাতা’। অথচ, যখন রেলের আধুনিকীকরণ বা কর্পোরেট মলের রাস্তা পরিষ্কার করতে রাষ্ট্র বুলডোজার পাঠায়, তখন এই কোটি কোটি টাকার ‘তোলা’ নেওয়া নেতারা রাতারাতি হাওয়া হয়ে যান। তখন হকারদের পাশে দাঁড়ানোর কেউ থাকে না। মজার বিষয় হল, হকার উচ্ছেদ হয়ে গেলেও, তাঁদের ঘিরে গড়ে ওঠা রাজনৈতিক চক্রটি বহাল তবিয়তেই থেকে যায়। তবে এই ঘোর অন্ধকারের মধ্যেও একটা আলোর রেখা দেখা যায় —যখন এই অসহায় হকারদের পাশে এসে দাঁড়ায় বামপন্থী দলগুলো। লাল ঝান্ডা হাতে তাদের এই মরণপণ লড়াই আর আন্দোলনের জেরেই কিন্তু উচ্ছেদ হওয়া মানুষগুলো আবার ঘুরে দাঁড়ানোর সাহস পান, কখনও কখনও রুখে দিতে পারেন বুলডোজারের দাপট।

সুপ্রিম কোর্টের রায় ও ২০১৪-র আইন

ভারতের হকার উচ্ছেদ বা নিয়ন্ত্রণের আইনি ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, আমাদের দেশের সুপ্রিম কোর্ট কিন্তু বারবার এই গরিব মানুষের রুটি-রুজির অধিকারকে আইনি সুরক্ষা দেওয়ার চেষ্টা করেছে। ১৯৮০-র দশক থেকেই বোম্বে বা দিল্লির মতো বড় বড় শহরে হকার উচ্ছেদের বিরুদ্ধে যে লড়াই শুরু হয়েছিল, তা আমাদের বিচারব্যবস্থায় এক নতুন আইনি দিক খুলে দেয়।

এই আইনি সুরক্ষার প্রথম এবং সবচেয়ে শক্তিশালী ভিতটি তৈরি হয়েছিল ১৯৮৫ সালের ঐতিহাসিক ‘ওলগা তেলিস বনাম বম্বে মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশন’ মামলায়, যেখানে সুপ্রিম কোর্টের যুগান্তকারী রায় ভারতের সংবিধানের ২১ নম্বর অনুচ্ছেদে প্রদত্ত ‘জীবন ধারণের অধিকার’ (Right to Life)-কে এক অন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিল। মামলাটা বোম্বের ফুটপাথবাসী আর বস্তিবাসীদের উচ্ছেদ নিয়ে হলেও, এর মূল আইনি ভাবনাটাই পরে হকার আন্দোলনের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হয়ে ওঠে। তৎকালীন প্রধান বিচারপতি ওয়াই. ভি. চন্দ্রচূড়ের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ পরিষ্কার করে জানিয়ে দিয়েছিল—বেঁচে থাকার অধিকারের মধ্যেই সম্মানজনকভাবে ‘জীবিকার অধিকার’ (Right to Livelihood) ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। কোনো মানুষকে তাঁর রুজি-রুটি থেকে জোর করে বঞ্চিত করার মানে হলো তাঁকে তাঁর বেঁচে থাকার অধিকার থেকেই বঞ্চিত করা। আদালত স্পষ্ট জানিয়েছিল, সরকার চাইলেই হুট করে কাউকে উচ্ছেদ করতে পারে না; পুনর্বাসনের মানবিক দিকটি বিবেচনা না করে এবং হকারদের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে তাঁদের বেঁচে থাকার ন্যূনতম অবলম্বনটুকু কেড়ে নেওয়ার একচেটিয়া অধিকার রাষ্ট্রের নেই।

ওলগা তেলিস মামলার এই তাত্ত্বিক অধিকারকে বাস্তব রূপ দিতে ঠিক ওই সময়েই সুপ্রিম কোর্টে শুরু হয় ‘বোম্বে হকার্স ইউনিয়ন’-এর লড়াই। এই রায়ে আদালত পূর্ববর্তী রায়ের সূত্র ধরে স্পষ্ট জানিয়ে দেয়, শহরের রাস্তা বা ফুটপাথ মূলত পথচারীদের হাঁটার জন্য হলেও, হকারদের ব্যবসা করার অধিকারকে সমাজ বা প্রশাসন পুরোপুরি উড়িয়ে দিতে পারে না। আদালত প্রথমবার নির্দেশ দেয় যে, যখন-তখন নির্বিচার উচ্ছেদ না করে প্রশাসনকে ‘হকার জোন’ (Hawking Zones) আর ‘নন-হকার জোন’ ভাগ করতে হবে, যাতে সাধারণ মানুষের যাতায়াত আর গরিবের পেট চালানো—দুটির মধ্যেই একটা ব্যালেন্স বা ভারসাম্য রাখা যায়।

বোম্বের এই লড়াইয়ের রেশ কাটতে না কাটতেই, চার বছর পর রাজধানীর বুকেও আইনি অধিকারের পরিধি আরও এক ধাপ বিস্তৃত হয়। ১৯৮৯ সালে ‘সোদান সিং বনাম দিল্লি মিউনিসিপ্যাল কমিটি’ মামলায় সুপ্রিম কোর্টের সংবিধান বেঞ্চ আরও এক ধাপ এগিয়ে ঐতিহাসিক রায় দেয়। শীর্ষ আদালত স্পষ্ট জানিয়ে দেয়—ফুটপাথে বা রাস্তায় ব্যবসা করার অধিকার সংবিধানের ১৯(১)(g) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী স্বাধীনভাবে জীবিকা নির্বাহের মৌলিক অধিকারের (Fundamental Right) অংশ। আদালত বলেছিল, একজন বড়লোক নাগরিক যেমন বড় দোকানে ব্যবসা করতে পারেন, তেমনই পুঁজিহীন গরিব মানুষের ফুটপাথে ব্যবসা করার অধিকারও সমান জরুরি। সরকার চাইলে জনস্বার্থে তা অবশ্যই আইনি উপায়ে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, কিন্তু কোনোভাবেই ধ্বংস করতে পারে না।

মৌলিক অধিকারের এই স্বীকৃতির পরও যখন হকারদের ওপর প্রশাসনিক জুলুম কমেনি, তখন এর বহু বছর পর, ২০১০ সালে ‘গেন্ডা রাম বনাম দিল্লি মিউনিসিপ্যাল কমিটি’ মামলায় সুপ্রিম কোর্ট অত্যন্ত কড়া ভাষায় সরকারকে মনে করিয়ে দেয় যে, হকাররা কোনো অপরাধী নন। তাঁরা স্রেফ সম্মানজনকভাবে বাঁচতে চান। আদালত সরকারকে নির্দেশ দেয়, হকারদের সুরক্ষায় অবিলম্বে একটা নির্দিষ্ট আর স্থায়ী কেন্দ্রীয় আইন তৈরি করতে হবে, কারণ হকার উচ্ছেদের নামে ক্ষমতার অপব্যবহার আর পুলিশি জুলুম দিনের পর দিন বাড়তে দেওয়া যায় না।

সর্বোচ্চ আদালতের এই দীর্ঘ তিন দশকের আইনি লড়াই আর ধারাবাহিক নির্দেশের ওপর ভিত্তি করেই অবশেষে ২০১৪ সালে ভারতের হকার আন্দোলনের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় মোড়টা ঘোরে। তৎকালীন কেন্দ্রীয় সরকার পাস করে ‘স্ট্রিট ভেন্ডরস (প্রোটেকশন অফ লাইভলিহুড অ্যান্ড রেগুলেশন অফ স্ট্রিট ভেন্ডিং) অ্যাক্ট, ২০১৪’। এই আইনটি হকারদের স্রেফ ‘দয়ার পাত্র’ বা ‘অবৈধ দখলদার’ হিসেবে দেখার মানসিকতাটাই আইনগতভাবে বদলে দেয়। এই আইনের মূল কথাগুলো ছিল খুব সহজ:

সমীক্ষা ছাড়া উচ্ছেদ নয়: কোনো শহর বা রেল স্টেশন চত্বরে নির্দিষ্ট ‘টাউন ভেন্ডিং কমিটি’ (TVC) দিয়ে বায়োমেট্রিক সমীক্ষা না করে কোনো হকারকে সরানো যাবে না। আইন অনুযায়ী, একটি শহরের মোট জনসংখ্যার অন্তত ২.৫ শতাংশ মানুষ হকার হিসেবে ব্যবসা করার আইনি অধিকার পেতে পারেন।

ভেন্ডিং শংসাপত্র: সমীক্ষা শেষ করার পর হকারদের আইনি পরিচয়পত্র বা ‘সার্টিফিকেট অফ ভেন্ডিং’ দিতে হবে, যা তাঁদের ব্যবসাকে আইনি বৈধতা দেবে।

পুনর্বাসনের আইনি বাধ্যবাধকতা: যদি কোনো জরুরি কারণে (যেমন রেলের বা রাস্তার সম্প্রসারণ) হকারদের সরাতেই হয়, তবে তাঁদের উপযুক্ত বিকল্প জায়গা দিতে হবে এবং সেই নতুন জায়গায় ব্যবসা গুছিয়ে নেওয়ার জন্য অন্তত ৩০ দিন সময় দিতে হবে।

আজ যখন ‘অমৃত ভারত স্টেশন স্কিম’ বা শহরের সৌন্দর্যায়নের নামে রাতের অন্ধকারে কোনো আগাম নোটিশ ছাড়াই দোকানপাট গুঁড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে, তখন তা আসলে সুপ্রিম কোর্টের এই সমস্ত ঐতিহাসিক রায় আর ২০১৪ সালের সংসদের তৈরি কেন্দ্রীয় আইনকে সরাসরি বুড়ো আঙুল দেখানো। দেশের আইন যেখানে হকারদের উচ্ছেদ না করে ‘নিয়ন্ত্রণ ও পুনর্বাসন’ দেওয়ার কথা বলছে, প্রশাসন সেখানে আইন ভেঙে ‘বুলডোজার দিয়ে সব ধ্বংস’ করে দিচ্ছে।

অর্থনীতি ও সামাজিক মূল্যায়ন

অর্থনীতিতে হকাররা কিন্তু কোনো ‘শহরের নোংরা’ নন। তাঁরা হলেন আমাদের অসংগঠিত ক্ষেত্রের সবচেয়ে বড় চালিকাশক্তি। ভারতের মোট কর্মসংস্থানের প্রায় ৮০ থেকে ৯০ শতাংশই এই অসংগঠিত ক্ষেত্রের ওপর টিকে আছে। ফুটপাথের একটা ছোট ডালি বা স্টেশনের ধারের একটা ঝুপড়ি হোটেল আসলে রাষ্ট্রকে এক বড় সামাজিক বিস্ফোরণ থেকে বাঁচিয়ে রাখে।

আজকের এই একমুখী উন্নয়নের জাঁতাকলে হকাররা শহরের নিম্ন ও মধ্যবিত্ত অর্থনীতির ভারসাম্য রক্ষা করেন। বড় বড় মল বা সুপারমার্কেটের এসি ঘরের চড়া দামের জিনিসপত্র সাধারণ দিনমজুর, রিকশাচালক বা মধ্যবিত্ত চাকুরিজীবীর সাধ্যের বাইরে। হকাররা উৎপাদক আর ক্রেতার মধ্যকার দূরত্ব কমিয়ে খুব কম দামে জিনিসপত্র সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেন। এই অর্থনীতি যদি স্তব্ধ হয়ে যায়, তবে শুধু হকাররা না খেয়ে মরবেন না, আমাদের শহরের সস্তা জীবনযাত্রার (Low Cost of Living) সুবিধাও সাধারণ মানুষের হাত থেকে একবারে চলে যাবে।

উচ্ছেদ বনাম অধিকার

নাগরিক সমাজের ক্ষোভটাও কিন্তু সম্পূর্ণ অমূলক নয়। ফুটপাথ যদি পুরোপুরি দখল হয়ে যায়, তবে পথচারীরা হাঁটবেন কোথায়? স্টেশনের ঢোকার মুখটাই যদি আটকে থাকে, তবে সাধারণ যাত্রীদের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয়। কিন্তু এর সমাধান কোনোভাবেই ‘নির্বিচার উচ্ছেদ’ বা ‘বুলডোজার নীতি’ হতে পারে না। এর আসল সমাধান লুকিয়ে আছে ২০১৪ সালের আইনের সঠিক রূপায়ণের মধ্যে। সমাধান হলো ‘রেগুলেটেড ভেন্ডিং জোন’ (Regulated Vending Zone) বা নিয়মতান্ত্রিক হকার জোন তৈরি করা। এর জন্য শহরের রাস্তা আর স্টেশন চত্বরকে মূলত তিনটি ভাগে ভাগ করতে হবে—

এক, নো-ভেন্ডিং জোন (No-Vending Zone): যেখানে যানজট বা নিরাপত্তার কারণে একেবারেই দোকান পাতা যাবে না।
দুই, রেস্ট্রিক্টেড ভেন্ডিং জোন (Restricted Vending Zone) : যেখানে নির্দিষ্ট সময়ে বা নির্দিষ্ট সংখ্যায় বসা যাবে।
তিন, ভেন্ডিং জোন (Vending Zone): যেখানে হকাররা স্থায়ীভাবে বসতে পারবেন।

সবচেয়ে বড় কথা, হকারদের ওই সিন্ডিকেটের তোলাবাজি থেকে মুক্ত করে পুরসভা বা রেলের সরাসরি লাইসেন্সের আওতায় আনতে হবে। তাঁরা নির্দিষ্ট লাইসেন্স ফি বা ট্যাক্স দেবেন সরাসরি সরকারকে, কোনো মস্তান বা মাফিয়াকে নয়। রাস্তা বা স্টেশন আধুনিক হবে, ঝাঁ-চকচকে হবে—তাতে কারও কোনো আপত্তি নেই। কিন্তু সেই প্রগতির আলো যেন ফুটপাথের প্রান্তিক মানুষের ঘরের উনুন নেভানোর কারণ না হয়ে দাঁড়ায়। রাষ্ট্রকে বুঝতে হবে, হকারদের উচ্ছেদ করা আইনের শাসন নয়, বরং আইনি পরিকাঠামো তৈরি করে তাঁদের অর্থনীতির মূল স্রোতে শামিল করাই হলো প্রকৃত উন্নয়ন।

সহযোগিতার হাত বাড়াতে ওপরের ছবিতে ক্লিক করুন

[লেখকের পূর্ব রচনা]

[পরম্পরা ওয়েবজিন, জুলাই ২৬, সূচিপত্র – এখানে ক্লিক করুন]

0 0 ভোট
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
পংক্তির ভেতর মন্তব্য
সব মন্তব্য