বেঁচে থাকার চাহিদায় তথা খাদ্য বন্দোবস্ত সুনিশ্চিতিকরণের তাগিদে একসময় আদিম মানুষেরা চারিদিকে ছড়িয়ে পড়তে বাধ্য হয়েছিল। তাদের সেই অপসারী অভিযাত্রা মানবজাতির আদিম সমসত্ত্ব বৈশিষ্ট্যটিকে কালে কালে আপাদমস্তক বদলে দিল। ‘আমি’, ‘আপনি’, ‘উনি’, ‘তিনি’ – সবাই আমরা একেক দলে ভাগ হয়ে গেলাম এবং সময়ের পাকদন্ডী বেয়ে কখনো চড়াই, কখনো উতরাই পথে চলতে চলতে আমাদের জীবনবোধও নানান আদল নিতে শুরু করল…

একেক দল একেক দিকে গেলেও, প্রাথমিকভাবে আমাদের মধ্যে পারস্পরিক ব্যবধান খুব বেশি ছিল না, আমাদের জীবনও কার্যত একই সুরে বাঁধা ছিল। ছুঁচালো পাথর কিম্বা গাছের ডাল দিয়ে শিকার অথবা স্থানীয় কোনো গাছ থেকে ফল সংগ্রহ – এভাবেই মূলত দিন কেটে যেত। না, আরেকটা কাজও ছিল – পাথর সংগ্রহ এবং তাকে ঘষে মেজে ছুঁচালো করা। এবং বলাই বাহুল্য, সেই কাজে যে পরিমাণ শ্রম দিতে হত, সেই অনুযায়ী ফল পাওয়া যেত না!

আপনার বিচক্ষণ ক্ষমতার বহুগামিতা নিয়ে আমাদের কোনোদিনই সন্দেহ ছিল না! আপনি অচিরেই বুঝলেন – শুধু ছুঁচালো পাথর দিয়ে কাজ হবে না, কারণ হাত থেকে একবার বেরিয়ে গেলেই তার আর ব্যবহারযোগ্যতা থাকে না। এমন কিছু দরকার – যাকে শিকারের কাজে বারবার ব্যবহার করা যাবে। একদিন শিকার ধরতে বেরিয়ে পথচলতি শুকনো লতায় আপনার পা জড়িয়ে গেল। বেশ কিছুক্ষণ চেষ্টাচরিত্র করে যখন ছাড়া পেলেন, কী মনে হতে পাশের ছোকরার হাতে ধরা গাছের শক্ত ডালটা চেয়ে নিলেন। এরপর নিজের হাতের ছুঁচালো পাথরটিকে মাটিতে রাখা ওই শক্ত ডালটির উপর রেখে, শুকনো লতা দিয়ে জড়িয়ে দিতেই মুস্কিল আসান হয়ে গেল; তৈরি হল ইতিহাসের সর্বপ্রথম প্রযুক্তি – কুঠার! মানুষের অবিশ্বাস্য কারিগরী দক্ষতার অঙ্কুরোদগম ঘটল সেই মূহুর্তে! সেই নবনির্মিত বস্তুটির কার্যকারিতা অচিরেই টের পাওয়া গেল। আপনি বরাবরই আকাশহৃদয় – স্বোপার্জিত জ্ঞান নিজের কাছে কুক্ষিগত করে রাখার চেয়ে সকলের মধ্যে বিলিয়ে দেবারই পক্ষপাতি। তাই সেই নতুন আয়ুধের সন্ধান পেতে আমাদেরও সময় লাগলো না। বাকি দলগুলির লোকজন এই নতুন অস্ত্রটি নিয়ে শিকারে বেরোতে শুরু করল…

আক্ষরিক অর্থেই ‘দিন আনি, দিন খাই’ সেই যাপন বন্দোবস্তে তখনও বস্তুপ্রাচুর্যের ছোঁয়াচ লাগেনি। সেই কারণেই, সেসময় জুড়ে আমাদের ব্যবহার্য যৎসামান্য বস্তু সামগ্রী, যারা কালের পাঞ্জাছাপ এড়িয়ে বর্তমান সময়ে প্রত্নসামগ্রী হিসাবে পরিচিতি পেয়েছে, তাদের মধ্যে বৈচিত্র্যের অভাব নৃতত্ত্ববিদদের হয়রান করেছে আমাদের যাপনচিত্রের অনুপুঙ্খ নাগাল পেতে! তাই অধিকাংশ ক্ষেত্রে নৃতত্ত্ববিদদের ভরসা রাখতে হয়েছে নিজেদের অনুমান ক্ষমতা এবং যুক্তিমাত্রিক বোধের উপর। তবে একথাও সত্যি, বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে মাটির গভীরে বিভিন্ন স্তরে একই ধরণের পাথুরে হাতিয়ার প্রমাণ করে – অস্ত্র নির্মাণের সেই কারিগরী প্রকৌশল (Technique) কয়েক হাজার বছর ধরে, প্রজন্মের পর প্রজন্ম মানুষের মধ্যে ধারাবাহিক ভাবে প্রবাহিত হয়েছিল।

শিকারের উপর গোষ্ঠীর সকলের অধিকার থাকা উচিত – সাম্যবাদের এই শিক্ষাই আমরা আপনার কাছ থেকে পেয়েছিলাম। যদিও ততদিন পর্যন্ত আমার মধ্যে, শুধু আমার মধ্যে বলি কেন, বাকিদের মধ্যেও তেমন ভাবে ন্যায়-অন্যায়, ঠিক-বেঠিক বোধ বাসা বাধেনি। প্রেম-ভালোবাসার চেয়েও শারীরিক প্রয়োজন তখনো আমাদের অধিক নিয়ন্ত্রণ করত। বয়স্ক, স্থবির কিম্বা নিতান্ত শিশুদের বোঝা বহন করতে অনেক সময়ই নারাজ ছিল ভুখারি গোষ্ঠী। বিশেষত, শিশুদের প্রতি গোষ্ঠীর বহু পুরুষের মধ্যেই একটা বীতরাগ কাজ করত! প্রথমত, শিশুটির পিতৃত্বের দাবিদার কেউ থাকত না, বহুগামী সেই দিনগুলিতে কার ঔরসজাত সেই শিশু, তা জানার কোনো প্রত্যক্ষ্য উপায় ছিল না। ফলতঃ, পিতৃহৃদয়ে সন্তানের প্রতি সুধারস ক্ষরণের কোনো সম্ভাবনা বা দায় – সেই অর্থে ছিল না। দ্বিতীয়ত, শিশুর জন্মের পর তার ভরণপোষণের দায়িত্ব যেহেতু তার জন্মদাত্রীর উপরেই বর্তাত, তাই সেই নব্যপ্রসূতিকে অঙ্কশায়িনী করার ক্ষেত্রে শিশুটি কার্যত প্রতিবন্ধক হিসাবেই বিবেচিত হত। তৃতীয়ত, ষষ্ঠ পর্বে যেমন আলোচিত হয়েছিল – সদ্যজাত মানবশিশু যেন একতাল নরম পলিমাটি, তাকে গড়েপিটে অবয়ব দিতে সময় লাগে। আর সেই সময় দাবি করে স্থৈর্য, মন্থরতা। ফলত, শিকারসন্ধানী গোষ্ঠীর স্বাভাবিক গতিময়তায় যেন বেড়ি পড়াতে চাইত সেই অনাকাঙ্খিত শৈশব! তাই অনেক সময়েই সেইসব শিশুদের জীবন হত স্বল্পায়ু। জৈবিক নিয়মে জন্ম নেওয়া জীবন, অনেকক্ষেত্রেই জীবনধারণের জন্য নির্ধারিত প্রয়োজন-অপ্রয়োজনের হাঁড়িকাঠে অকাল পরিণতি পেত। তবু তার মধ্যে দিয়েই জীবনপ্রবাহ বজায় থাকত, কারণ বংশ পরম্পরা রক্ষার তাগিদ আমাদের ছিল, গোষ্ঠীর সদস্য সংখ্যায় ভারসাম্য রক্ষা করার দায়ভার আমাদের বহন করতে হত…

তখনও অব্দি গোষ্ঠীর দলপতির উপরই খাদ্য বন্দোবস্তের মূল ভার ন্যস্ত থাকত। কার্যত, দলপতি নির্বাচিত হত নিজের কার্যকারিতা, শারীরিক বল ও দক্ষতার প্রমাণ সাপেক্ষেই। তাকে যেমন সেই স্থানে লভ্য প্রাণীদের খবরাখবর, তাদের গায়ের গন্ধ, কন্ঠস্বরের তফাত, চলাফেরার শব্দ সম্পর্কে ওয়াকিবহাল থাকতে হত, তেমনই সেই প্রাণীদের সম্ভাব্য সঞ্চারপথে অতর্কিতে হানা দিয়ে, গোষ্ঠীর জন্য খাদ্যের যোগান অক্ষুণ্ণ রাখার দায়িত্বও পালন করতে হত। শিকার্যের গতিপথের পূর্বাভাস – এটি ছিল আগাগোড়া নিজ জ্ঞান এবং অনুমান নির্ভর। যেখানে শিকার্যের অপ্রতুলতা ছিল না, সেখানে এই অনুমান মেলা, না-মেলায় বড় একটা অসুবিধে হত না। কিন্তু উল্টোটার ক্ষেত্রে তা স্বভাবতই এক ছিল না! সময়ের সাথে সাথে, প্রকৃতির নিজস্ব খামখেয়ালে কিছু কিছু গোষ্ঠীর ভাগ্যাকাশে এই ধরণের অনিশ্চিত পরিস্থিতির কালো মেঘ জমতে শুরু করল…

ইতিহাসের পাতা ওল্টালে দেখা যায়, সংকট মূহুর্তে বারবার মানবসভ্যতা গতিমুখ বদল করেছে এবং সম্পূর্ণ ভিন্ন খাতে বইতে শুরু করেছে। সংকটময় গিরিবর্ত্মের মধ্যে পথ হারানো মানুষ ঠোক্কর খেতে খেতেও আবার উঠে দাঁড়িয়ে নতুন পথের সন্ধান পেতে চেয়েছে, সংকটের জটিল ঘূর্ণাবর্তে তলিয়ে যেতে যেতেও মানুষ সামান্য খড়কুটোকে আঁকড়ে ধরে পেরিয়ে যেতে চেয়েছে সংসার-সিন্ধু, সংকটের কুজ্ঝটিকা যখন তার দৃষ্টিশক্তিকে ক্ষীণ করে দিতে চেয়েছে, তখন সে বাহির ভুলে নিজের অন্তর্দৃষ্টিকে আরো শানিত করেছে…

ততদিনে প্রকৃতিকে আমরা আরো নিবিড় ভাবে চিনতে শিখেছি। দিনের আকাশে সূর্যের রোদ্দুরময় উপস্থিতি, রাতের জোনাকিময় চন্দ্রাতপে জীবজগতের গোপন অভিসার, মেঘের সঙ্গোপনে বিজলির আকাশজোড়া আকস্মিক বিস্তার, বরিষধারা মাঝে শ্যামল বনানীর আনন্দ হিল্লোল – জগৎ মাঝে নিজেদের অস্তিত্ব সম্পর্কে আমরা আরো বেশি সচেতন হয়ে উঠতে শুরু করেছিলাম। আমাদের মধ্যে নানান প্রশ্ন ধীরে ধীরে দানা বাঁধতে শুরু করছিল, আমাদের দেখা ক্রমশ পর্যবেক্ষনে উন্নীত হতে শুরু করেছিল, আমাদের চিন্তাভাবনার গভীরতা ক্রমশঃ বিস্তৃতি লাভ করছিল… বেশ কিছু সাধারণ ঘটনা আমাদেরকে ভাবিয়ে তুলতে শুরু করল।

দিনের আলো ফুটলে পরেই আমাদের মূল কাজ ছিল খাদ্য সন্ধান। তখনও আমাদের যাপনচিত্র আজকের মত রংবাহারি ছিল না। জৈবিক প্রয়োজন ব্যতীত খুব বেশি টানাপোড়েনের মধ্যে আমরা যেতাম না। সেই সময় একদিন শিকারে বেরিয়ে আমার খেয়াল হল – কেউ যেন আমাকে নিরন্তর অনুসরণ করছে! আমি যেখানে যাচ্ছি, যেভাবে হাঁটছি, যেভাবে দাঁড়াচ্ছি – সেও যেন ঠিক সেভাবেই আমাকে নকল করতে চায়! অথচ আমার আদল তার মধ্যে থাকলেও, আমার শারীরিক স্পষ্টতা তার মধ্যে নেই; বরং যেটা আছে তা হল, কেমন যেন নিগূঢ় সতর্কতা এবং রহস্যজনক অমানিশা! ততদিনে আমাদের ভাষাও একটু একটু করে নিজের পায়ে হাঁটতে শুরু করেছে। আমার সকল জিজ্ঞাসার অভিসার বিন্দুটি ছিলেন আপনি। আপনাকে জিজ্ঞেস করাতে আপনি বেশ কিছুক্ষন ভেবে জবাব দিলেন – ‘আমিও দেখেছি এই রহস্যময় অনুসরণকারীকে, আমারও সে কাছছাড়া হতে চায় না… কিন্তু এতদিন ভাবতাম সে শুধু আমারই পিছু নেয়… তুমিও যখন একই অভিজ্ঞতার কথা বলছ, তখন এ বিষয়ে আরো একটু ভেবে দেখা দরকার। আপাতত এই অবিকল প্রতিমূর্তিটির নাম দেওয়া যাক – ছায়া’!

এরপর থেকে আরো নিবিড়ভাবে ছায়া দেখা শুরু করলাম। চোখে পড়ল, শুধু আমার আপনার ছায়া পড়ে না, আমাদের গোষ্ঠীর বাকি সকলেরও ছায়া পড়ে… মায় পশু, গাছ এমনকী মেঘের ছায়াও পড়ে! আবার যতক্ষন আলো আছে, ততক্ষন ছায়ার দেখা মেলে; বস্তুত সে এক মূহুর্তের জন্যও তখন কাছছাড়া হতে চায় না। অথচ অন্ধকার মাত্রেই সে উধাও হয়ে যায়। আরো একটা বিষয় বেশ খটকা লাগার মত – আলো থাকা সত্তেও মাটিতে কেউ ঘুমিয়ে থাকলে, তার ছায়া স্থির এবং যৎসামান্য তার উপস্থিতি, ঠিক যেমনটা মৃত মানুষগুলির ক্ষেত্রেও দেখা যায়… তবে কি ছায়ার সাথে প্রাণের কোনো সম্পর্ক আছে…??

আরেকটি আপাত অকিঞ্চিতকর ব্যাপারও বেশ ভাবিয়ে তুলল আমাদের। ঘুম – অতি সাধারণ তুচ্ছ ঘটনা। রোজ সূর্য পাটে যেতে যেতে আমাদের চোখেও নিদকাঠি বুলিয়ে দিয়ে যেত। আবার ভোরের আলো ফোটার সময়, পাখির ডাকে আমাদের চোখ খুলত। আমাদের জীবন আবার চেনা ছন্দে চলতে শুরু করত। অথচ কোন কোন সময় কিছু কিছু মানুষ যেন চিরঘুমে চলে যেত… কী এমন হল, যে আমার, আমার পাশের জনের, তার পাশের জনের ঘুম ভাঙল অথচ আমার সামনের মানুষটার আর ঘুম ভাঙল না। অথচ আমাদের সবার ঘুমের ভঙ্গিমায় তো কোনো তফাত ছিল না! আমরা একসাথে ঘুমোতে গেলাম, একই ভাবে একই ভঙ্গিতে ঘুমোলাম, অথচ একজন আর কিছুতেই ঘুম থেকে জাগলো না! কেন…??

একদিকে মৃত ব্যক্তির সাথে ঘুমন্ত ব্যক্তির বাহ্যিক সাদৃশ্য আপাত ঘুমের মত নিরীহ বিষয়টিকে জটিল করে তুলছিল। আরেকদিকে, নিদ্রাকালীন আরো একটি সমান্তরাল অভিজ্ঞতা আমাদের মধ্যে অজানা অস্বস্তি এবং উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছিল। বাইরে থেকে যে ব্যক্তিটি মৃতবৎ; গভীর শয়ানে, মুদিত নয়ানে সেই ব্যক্তিটিই আবার প্রত্যক্ষ্য করছিল নানান অলীক ঘটনাপ্রবাহ। নিদ্রামগ্ন সেই মানস পটে ঘটে যাচ্ছিল নানান রঙবেরঙের বিক্রিয়া, বাস্তব-অবাস্তবের সীমাবন্টন যেখানে সহজসাধ্য ছিল না। ঘুমের ঘোর মিলিয়ে গেলেও সেই অনুভূতিগুলোর ঘোর কাটতে সময় লাগত। হিসেব মেলানো যেত না – যে মানুষটা মৃত, তার সাথে কীভাবে আবার দেখা হল, কোথায় দেখা হল, কথোপকথনের আড়ালে কেনই বা সে নানান জানা-অজানা অনুষঙ্গের অবতারণা করে গেল! ক্রমশঃ আমাদের উর্বর অনাবাদী মনোভূমে এক অজ্ঞাত আশংকার বীজ চারিয়ে যাচ্ছিল – নিদ্রাসুপ্তি আসলে কী, কেনই বা তার অলীক দৃশ্যপটে ভেসে বেড়ায় নানান অজাগতিক, মায়াবী অনুভূতি। অর্ধচেতনের রহস্যময় চোরাবালিতে যখন ক্রমশঃ আমরা তলিয়ে যাচ্ছি, তখন আবার একবার আমাদের দিশা দেখালেন – আপনি। আজ্ঞে হ্যাঁ, আপনার কাছেই আমরা জানলাম – পরাবাস্তব সেই সূক্ষ্মলোকের নাম – স্বপ্নলোক!

এরপর একদিন আমরা আবিষ্কার করলাম – আমাদের দলপতি চিরনিদ্রায় গেছেন। তখনো কোনো মানুষ চলে গেলে আমাদের মধ্যেকার তন্ত্রীগুলোতে খুব একটা আলোড়ন অনুভূত হত না। জন্ম-মৃত্যর স্বাভাবিক ছন্দে আমরা অভ্যস্ত ছিলাম। আবেগ তখনো আমাদের যাপনচিত্রে খুব বেশি আঁচড় কাটতে শুরু করেনি। তা সত্ত্বেও দলপতির শূণ্যতা সামগ্রিকভাবে গোষ্ঠীর উপর প্রভাব ফেলত। দিশেহারা সে গোষ্ঠী জীবনে হঠাৎ করেই স্বপ্নের সাঙ্ঘাতিক ভূমিকা আমরা টের পেলাম। কাকতালীয়ভাবে আমিই ছিলাম সেই ঘটনাচক্রের কেন্দ্রবিন্দুতে। স্বপ্নলোকে আমি দেখা পেলাম আমাদের দলপতির। তিনি তার সামূহিক জ্ঞানের উত্তরাধিকার দিয়ে গেলেন আমাকে। যদিও তার সকল কার্য খুব কাছ থেকে দেখার সৌভাগ্য আমার হয়েছিল, তবু সবকিছু কার্যের অমন সুললিত ব্যাখ্যা আমাকে রোমাঞ্চিত করে তুলল। ঘুম ভাঙতেই সে কথা যখন গোষ্ঠীর সকলকে শোনাতে গেলাম, তারাও অভিভূত হয়ে পড়ল। এমন কী, তাদের মধ্যে কেউ কেউ মৃত দলপতির চেহারার সাথে আমার আশ্চর্য মিলও তৎক্ষনাৎ খুঁজে পেল! কিন্তু কীভাবে সেই বৈশিষ্ট্য আমার মধ্যে সঞ্চারিত হয়েছিল, তা আমাদের সকলেরই বোঝা দুঃসাধ্য ছিল। কিন্তু অচিরেই আমরা টের পেলাম, এর’ম যে শুধু আমার ক্ষেত্রেই ঘটেছে এমনটা নয়… অন্যান্য অনেক ব্যক্তির ক্ষেত্রেও আমাদের গোষ্ঠীর পূর্বপুরুষদের স্পষ্ট আদল খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে। ফলে একদিকে যেমন আমার স্বপ্নলব্ধ জ্ঞান এবং শরীরী আদল নবদলপতি হিসাবে আমার মনোনয়ন সুনিশ্চিত করল, তেমনই আরেকদিকে আমাদের সাথে আমাদের নিকট-পূর্বপুরুষদের মিল এক নতুন প্রশ্নের সামনে আমাদেরকে দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল। কী এমন কারণ – যার জন্য যারা মৃত, তাদের সাথে কারোর কারোর চেহারায় অদ্ভুতুড়ে মিল থাকতে পারে! কোন বিনি সুতো দিয়ে এই ধরণের নানান অবোধ্য অভিজ্ঞতা আর অনুভূতির মালা গাঁথা হচ্ছিল, তা আমাদের চিন্তার সীমানায় ধরা দিচ্ছিল না…

আপনি আমাদের মুরুব্বি। তাই আপনার কাছেই একমাত্র এইসব না-জানা ব্যাকুলতা প্রকাশ করা যেত। এখন বুঝি, সব প্রশ্নের যথাযথ উত্তর আপনার কাছে তখন ছিল না। কিন্তু তা সত্ত্বেও আপনি চেষ্টা করতেন সব কিছুকে তলিয়ে দেখতে, ভাবতে এবং আপনার মত করে সুরাহা করতে। এতদিন সেই সমাধানগুলি আমাদের বস্তুবাদী জীবনের সাথে সম্পৃক্ত ছিল। কিন্তু এই প্রথম আমাদের সমস্যাগুলি লৌকিক সমাধানের লক্ষ্মণরেখা পেরিয়ে অলৌকিকতার অন্তহীন সম্ভাবনাময় মায়াজগতে প্রবেশ করতে চাইছিল; তাই আপনিও একটু সময় নিলেন। আপনার সকল জ্ঞান, মেধা, বোধ, কল্পনাশক্তি দিয়ে হলকর্ষণ করে বেড়ালেন আপনার উর্বর মনোভূমি… এবং একটা সময় অগ্রহায়ণের সোনালি সকালে দিগন্তবিস্তৃত ধানজমিতে হেমন্ত বাতাসের আলতো বিলি কেটে যাওয়া দেখে যেমন হাসি ফোটে কৃষকের চোখে-মুখে, তেমনই আপনার মুখেও খেলে গিয়েছিল পরিতৃপ্তির হাসি। আপনার অবিশ্বাস্য উদ্ভাবনীশক্তিতে মাথানত করেছিলাম আমরা সবাই। সেই যুগসন্ধিক্ষনে মানবসমাজ পেয়েছিল আগামীদিনে যা তাকে ধারণ এবং বহন করতে চলেছে, সেই আশ্চর্য যোজকের আভাস – আত্মা!

পরতের পর পরত সাজিয়ে আপনি আমাদের বোঝালেন – আত্মা হল আমাদের প্রাণের প্রতিরূপ, তার বায়বীয়, সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম উপস্থিতি। আত্মা আছে বলেই আমাদের চেতনা আছে, সংবেদনশীলতা আছে। কিন্তু সে অদৃশ্য, অস্পর্শনীয়, আমাদের ধরাছোঁয়ার বাইরে এক স্বাধীন, সর্বময় সত্তা… বিশ্বাস করুন, সেদিন আপনার সব কথা আমাদের বোধগম্য হয়নি। কিন্তু আমরা বেশ বুঝতে পারছিলাম, এই নতুন জিনিষটি মোটেই সুবিধের নয়। এতদিন ধরে আমরা যা কিছু দেখেছি, শিখেছি, অনুভব করেছি, তার কোনোটার সাথেই এর মিল নেই। আর মিল নেই বলেই আমাদের মধ্যে সেই প্রথম এক অজানা আশঙ্কার মেঘ ঘনাতে শুরু করল। এর আগে ভয় বলতে আমরা শুধু হিংস্র প্রাণী, বিদ্যুতের চমক কিম্বা দাবানলের দাপট বুঝতাম। তাছাড়া আমাদের সরল দিনযাপনে অন্য কোনো উদ্বেগ বা উৎকন্ঠার ছায়া ছিল না। কিন্তু এই প্রথম আমরা সকলেই শিহরিত, ত্রস্ত হয়ে পড়লাম… এমন কিছু যে থাকতে পারে, যাকে ছোঁয়া যায় না, স্পর্শ করা যায় না, অথচ তার জন্যই আমরা বেঁচে আছি; এ আমাদের সামান্য বোধক্ষমতার অতীত ছিল!

সেদিন আমরা এটুকুই শুধু বুঝতে পেরেছিলাম – আত্মা নামক বিচিত্র বস্তুটি মানুষ ঘুমিয়ে থাকলে তার দেহ থেকে বেরিয়ে এসে আলাদা এক ছায়ামূর্তি হিসাবে নাকি হাজির হতে পারে। আবার কখনো সখনো সে অন্য মানুষ, প্রাণী, এমনকি জড়বস্তুর দেহেও প্রবেশ করতে, সেগুলোর মধ্য দিয়ে অবাধে যাতায়াত এমনকি কাজ করতে বা করাতেও পারে! এমনতরো সর্বশক্তিমান একটি অস্তিত্বের নিকট মাথানত করা ছাড়া আমাদের আর কোনো উপায়ান্তর ছিল না। আমরা সমর্পণ করলাম, এবং সেই সমর্পণ আজও নিরবিচ্ছিন্নভাবে চলমান…

‘ঈশ্বরই ধ্রুবক’ শিরোনামে এ লেখার এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। যা কিছু দুর্বোধ্য, ব্যাখ্যার পরিধিতে যা ধরা দেয় না, তাকে বোঝার জন্য আজও আমরা সেদিনের জলদমন্দ্র কন্ঠে উচ্চারিত আপনার বীজমন্ত্রটি ‘ভুলি নাই’। বস্তুত যতদিন মানবসভ্যতা থাকবে, যতদিন না বিজ্ঞান আমাদের সব প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবে, ততদিন অবধি আমাদের সব অনির্ণেয় রথচক্র – আত্মা এবং তার নানান উপপাদ্যের দিকেই ধাবিত হবে…

আগামী পর্বে আত্মা কীভাবে আমাদের মধ্যে প্রথম ধর্মের বীজ বুনল, কীভাবে আমাদের মধ্যে প্রথম জাতিসত্তার উদ্রেক হল, কীভাবে অলৌকিকতা আমাদের সহজ জীবন কে আমূল বদলে দিল, তাই নিয়ে আলোচনা থাকবে…

ভালো থাকবেন।

সহযোগিতার হাত বাড়াতে ওপরের ছবিতে ক্লিক করুন

[লেখকের পূর্ব রচনা]

[পরম্পরা ওয়েবজিন, জুলাই ২৬, সূচিপত্র – এখানে ক্লিক করুন]

0 0 ভোট
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
পংক্তির ভেতর মন্তব্য
সব মন্তব্য